Beta
রবিবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৪

কলাম

ঢাকাবাসীর কলকাতা পুনর্দর্শন

কলকাতা মহানগরে নগরজীবনের দৃশ্য। প্রতীকী ছবি। আলোকচিত্র: ফ্রিওয়েবস্টক।

প্রাচীনত্বসহ বিভিন্ন দিক থেকে জোব চার্নকের কেনা তিন অজপাড়া গ্রাম থেকে কালক্রমে মহানগরে পরিণত কলকাতা আর মুঘলদের জাহাঙ্গীরনগর থেকে আজকের ঢাকার রূপ নেওয়া নগরের পার্থক্য অনেক। কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা দুয়ের মধ্যে তুলনা করতে পছন্দ করি। তা এ দুটি জনপদ বাঙালি অধ্যুষিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই শহর বলেই। কলকাতা একসময় ছিল লন্ডনের বাইরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় শহর। আজকের ক্ষুদে ধনী দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর একদা শাসিত হয়েছে কলকাতার অধীনে। আর অনেকাংশে অগম্য ভাটি পূর্ববঙ্গের মধ্যাঞ্চলের ঢাকা ১৬১০ সালে মুঘলদের প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার পরবর্তী এক শতাব্দী যা একটু গুরুত্ব পায়। রাজধানী সরে যাওয়ার পর ঢাকা আবার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। পরবর্তীকালের ইংরেজ আর পাকিস্তান শাসনেও ঢাকা ছিল অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার। তবে সে সবই পরাধীনতার কালের কথা। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় পর ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশের রাজধানী হিসেবে কোথায় আছে সে আলোচনাটা করাই যেতে পারে।

হঠাৎ কলকাতার সঙ্গে তুলনা কেন তা বলে নেওয়া দরকার। ঢাকা থেকে বিমানে ঘণ্টারও কম দূরত্বের এই শহরে সম্প্রতি যাওয়া হয়েছিল বেশ কয়েকবছর পর। এতদিন পর যে, কিছু বদল চোখে-মনে ধাক্কা দিল। বছরে বেশ কয়েকবার যাওয়া বা কলকাতাবাসী লোকজনের কাছে শুনেছি অনেককিছু। টিভি, ইন্টারনেটের কল্যাণে চোখেও পড়ে নানা খণ্ডচিত্র। কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অন্য ব্যাপার। এবারের ভ্রমণে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে যেটি তা হচ্ছে টানা পাঁচ দিনে একবারও যানজটের মুখে না পড়া। পাঁচ মিনিটের জন্যও না। বেড়ানোর জন্য শহরের বিভিন্ন দিকেই ঘোরা হয়েছে। কাজেই গবেষণালব্ধ তথ্য না হলেও এই যানজটহীনতাকে নিশ্চয়ই ঠিক কাকতালীয়ও বলা যাবে না। যানজটের কমবেশির সঙ্গে অবশ্যই সম্পর্কিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। সিগন্যাল বাতিতে ঠিক ঠিক থেমে যাচ্ছিল গাড়ি। সিগন্যালে যান থেমে থাকার সময়ের কাউন্ট ডাউন চলছে। আমাদের প্রিয় ঢাকা শহরের সিগনাল বাতিতে কি ডিজিটাল ঘড়ির মতো কাউন্টার ছিল? মনে নেই। ধুসর অতীতে পরিণত যেন। অনেক টাকার যন্ত্রপাতি কিনেও নানা সমস্যায় তা নাকি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সে সমস্যার সুরাহা কবে হবে তা কী কেউ জানে? এ নিয়ে মিডিয়ায় কিছু দেখা যায় না বললেই চলে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, কলকাতার ট্রাফিক পুলিশ যেখানে সেখানে বাস থামতে দিচ্ছিল না। বেশ কয়েকটা মোড়ে দেখলাম বাস তো বটেই, বাসের জন্য অপেক্ষমান মানুষজনকেও বলা হচ্ছে, ‘‘সামনে গিয়ে দাঁড়ান’’! একটু দূরেই স্টপেজ। লোকজন পুলিশের কথা মোটের ওপর শুনছে। অতি লক্করঝক্কর বা ধোঁয়া ওগড়ানো বাস একটিও চোখে পড়েনি। তা হয়তো মফস্বলে আছে। ঢাকার অভ্যাসমতো স্টপেজ ছাড়া কয়েকবার হাত দেখিয়েছি সিটি সার্ভিসের বাস থামাতে। কাজ হয়নি।

কোনও স্টপেজে বাস বিরক্তিকরভাবে লম্বা সময় দাঁড়িয়ে আছে তা দেখলাম না। গাড়ি অর্ধেক খালি থাকলেও না। দুএকবার বেজায়গা দিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে শুনেছি, ‘‘দাদা, সামনে সাবওয়ে বা জেব্রা ক্রসিং দিয়ে যান। ধরে ফাইন করে দেবে কিন্তু!’’ পরে স্থানীয়দের কাছে শুনেছি কড়াকড়িভাবে কিছুদিন জরিমানা আদায় করা হয়েছেও। এর ভালোমন্দ দিয়ে অনেক কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে এ ধরনের কিছু ব্যবস্থার প্রভাব নিশ্চয়ই আছে।

বয়সের বেলা ঢলে পড়ায় কত কথাই মনে পড়ে! সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখলের বছরে স্কুলের মাঝামাঝি পর্যায়ে পড়ি। তখন হুজুগে হিসেবে পরিচিত এরশাদ সাহেবের মাথা থেকে আসা বিভিন্ন কথিত পরিকল্পনার কথা লোকমুখে ঘুরতো। বৃহত্তর মতিঝিল এলাকায় প্রচলিত একটা গল্প ছিল শাপলা চত্বরকে কেন্দ্র করে ব্যাবিলনের শুন্য উদ্যান টাইপ কিছু গড়ার এক পরিকল্পনা। এটা দিয়ে কি মেট্রো রেলের মতো কিছু বলতে চাওয়া হয়েছিল কিনা তা জানি না। আমাদের স্কুলের বন্ধুদের একজন ছিল সংলগ্ন এলাকার জাতীয় পার্টির এক নেতা/এমপির ছোটভাইয়ের বন্ধু। তার কাছ থেকেও কথাটা শুনেছিলাম।

তখন থেকে বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। সে নদীর পানির রঙ ক্রমেই আলকাতরাপ্রতিম হয়ে উঠেছে, তলে পুরু থেকে পুরুতর হয়েছে পলিথিন বর্জ্যের স্তর। জাতীয় পার্টির দীর্ঘ নয় বছর, (তাদের সময় সড়ক যোগাযোগের উন্নতির কথা কমবেশি সবাই বলেন। স্বৈরশাসকদের এসব করতেই হয়) তারপর বিএনপি ও আওয়ামী লীগের একাধিক আমলের পর শেষে মুখ দেখা গেছে মেট্রো রেলের। দৃশ্যত টাকা এখন আর সমস্যা নয়। তার সঙ্গে বড় অবকাঠামো দিয়ে দেশের চেহারা পাল্টে দেওয়ার রাজনৈতিক পণ এটা সম্ভব করেছে। অবকাঠামোতে চোখে পড়ার মতো বদল বা বদলের আয়োজন দেশের চারদিকেই। শহরে, গ্রামে, উপকূলে। কিন্তু মানুষের অভ্যাসে বিশেষ কোনও বদল নেই। তা বরং অনেকাংশে খারাপের দিকে গেছে। দুই নগরের আলাপে সেদিকেই মন দিতে চাই।

নব্বই দশকের শুরুতে সম্ভবত উত্তরা-মতিঝিল রুটে এসি বাস চালু হয় প্রথমবারের মতো। মিনিবাস ধরনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুদৃশ্য সাদা রঙের গাড়ি ছিল সেগুলো। যুগের পর যুগ প্রাদেশিক ও পরে স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী শহরের নাগরিকরা আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে খুব সম্ভব প্রথমবার দেখেছিলাম, লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে উঠছে লোক। সঙ্গত কারণেই আমার সত্তর দশকের বা স্বাধীনতা-পূর্বকালের ঢাকার স্মৃতি নেই। কিন্তু বয়োজ্যেষ্ঠ অনেকের ভাষ্য এবং পত্রিকার খবরের বিবরণ অনুযায়ী লাইন ধরে বাসে ওঠা এ শহরে একটা অভূতপূর্ব বিষয় বলেই মনে হয়েছিল তা স্পষ্ট মনে আছে।

প্রবীণদের কাছেই শোনা, মহানগর নামে পরিচিত এ শহরে স্বাধীনতার আগে-পরে বহুদিন আদৌ ট্যাক্সি সার্ভিসও ছিল না। যে সার্ভিস ছিল বা আছে তা নিয়েও আছে বিস্তর অভিযোগ। ঢাকা অভিজাত ‘ছিটমহল’ গুলশানসহ একাংশের চাকচিক্য সত্ত্বেও এতদিনেও যে একটুও সত্যিকারের কসমোপলিটান হলো না একটা স্থিতিশীল, নির্ভরযোগ্য ট্যাক্সি সার্ভিসের উপস্থিতি তার বড় দৃষ্টান্ত। হাল আমলে উবার ইত্যাদি একশ্রেণির মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে। তা প্রকৃত অর্থে সর্বসাধারণের নাগালে যেতে আরও বহুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আশা করতে পারি ততদিনে গণপরিবহনের কিছু বড় প্রকল্প ফল দিতে শুরু করবে। কারণ ব্যক্তিগত গাড়ি কোনও সমাধান নয়।

টিকিট দিয়ে চলা অনেক বাসে উঠতে এখন লোকজনকে বাধ্য হয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু পথ চলাচলে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রবণতা সর্বব্যাপী। ২শ গজ দূরে থাকলেও ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করতে চান অতি নগণ্যসংখ্যক মানুষ। ঢাকার ফুটপাথে হাঁটাও অনেক ক্ষেত্রেই এক বিড়ম্বনা। ফুটপাত এবং পথের দুপাশের অনেকটা দোকানপাট দিয়ে এবং গাড়ি পার্কিং করে দখল করে রাখা।

বলা হয়, রিকশার চেয়ে প্রাইভেটকার বেশি জায়গা নেয়। মানুষ কম বহন করে। এবং যানজটে বড় ভূমিকা রাখে। এ কথা খুবই সত্যি হলেও প্রাইভেট কার সিঙ্গাপুরের কায়দায় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঢাকা থেকে অযান্ত্রিক যান রিকশাও তুলে দেওয়ার পথে হাঁটতে হবে। রিকশার ওপর নির্ভরশীলদের কর্মসংস্থানের বিকল্প ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তাদের সমবায় করে সিএনজি অটো ট্যাক্সি এমনকী বাস দিতেও কোনও অসুবিধা থাকার কথা নয়। বিশেষ করে যখন কয়েক হাজার বাস নামানোর চিন্তাভাবনা চলছে।

কলকাতাবাসীর হাঁটার প্রবণতাও সম্ভবত আমাদের চেয়ে বেশি। শহরের প্রায় সব রাস্তা থেকে টানা রিকশা বিদায় নিয়েছে বেশ আগে। একটু দূরের রাস্তায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান দেখেছি। শহরের কম দূরত্বে হয় মেট্রো বা বাস না হয় হাঁটো। ট্রাম প্রায় বিলুপ্ত। আমাদের ‘‘সিএনজি’’ টাইপ অটো, ট্যাক্সি বা অ্যাপক্যাব/বাইক (পাঠাও উবার) অবশ্যই মূল অবলম্বন না সেখানে। আমরা ছিলাম রবীন্দ্র সরোবরের অদূরে একটি বাড়িতে। আমার স্ত্রী শখ করে এক সকালে কাছাকাছি একটি কাঁচা বাজারে যেতে ট্যাক্সি ধরার চেষ্টা করছিলেন। পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন সত্তরের মতো বয়সের এক বৃদ্ধা। তিনি বললেন, ‘‘বাজারে যেতে ট্যাক্সি কেন, এই দ্যাখো আমি হেঁটে বাজারেই যাচ্ছি। তোমার বয়স এত কম। চলো আমার সাথে!’’ এই এক ঘটনা থেকে কোনও সিদ্ধান্তে আসছি না। কিন্তু যে শহরে রিকশা নেই সেখানে মানুষ হাঁটতে বা বাসে চড়তে বাধ্য হবে। কাজেই বাসসহ গণপরিবহনের অবস্থা অবশ্যই ভালো করতে হবে। যথেষ্ট সংখ্যক (ও ভালো মানের) বাসের অভাবে অসুস্থ, বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য এখন পর্যন্ত রিকশা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার যে কোনও রাস্তায় দাঁড়ালে দেখবেন টগবগে তরুণরাও ৫ শ গজ দূরে যাওয়ার জন্য রিকশা ডাকে। বলা হয়, রিকশার চেয়ে প্রাইভেটকার বেশি জায়গা নেয়। মানুষ কম বহন করে। এবং যানজটে বড় ভূমিকা রাখে। এ কথা খুবই সত্যি হলেও প্রাইভেট কার সিঙ্গাপুরের কায়দায় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঢাকা থেকে অযান্ত্রিক যান রিকশাও তুলে দেওয়ার পথে হাঁটতে হবে। রিকশার ওপর নির্ভরশীলদের কর্মসংস্থানের বিকল্প ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তাদের সমবায় করে সিএনজি অটো ট্যাক্সি এমনকী বাস দিতেও কোনও অসুবিধা থাকার কথা নয়। বিশেষ করে যখন কয়েক হাজার বাস নামানোর চিন্তাভাবনা চলছে।

কলকাতায় ছিলাম এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া হয় এমন একটি বাসায়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারটির কর্তা অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী। তার বছর কয়েক আগে মাস্টার্স পাস করে চাকরিতে ঢোকা মেয়ে বাবা-মায়ের সহায়তা নিয়ে এটি চালায়। আরেক মেয়ে ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়ছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। দুই বোনই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের লেখাপড়া করেছে সুদূর দক্ষিণ ও উত্তর ভারতে। তাদের ভাড়া দেওয়া ছিমছাম ফ্ল্যাটটায় সুরুচির ছাপ স্পষ্ট। মা আর দুই মেয়ে পরম যত্নে ফ্ল্যাটটি সাজিয়ে রাখেন। এ পরিবারটিকে আমি প্রায় ২০ বছর ধরে জানি। জানতাম মেয়ে দুটিকে কীভাবে ছোটবেলা থেকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলেছেন ওদের বাবা-মা। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের মতো বিয়ের অপেক্ষায় বসে না থেকে তারা উপার্জন করে প্রবীণ বাবা-মাকে সাহায্য করছে। নিচ্ছে উদ্যোক্তার পাঠ। এটা সম্ভব হয়েছে পারিবারিক শিক্ষা আর ইতিবাচক পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণেই। এয়ারবিএনবির ওয়েবসাইটে তাদের বাসার ইউজার রিভিউতে দেখেছি বেশ কিছু অতিথির ইতিবাচক মন্তব্য। এর একটা বড় অংশ নারী পর্যটক। বাংলাদেশিও বেশ কয়েকজনের মন্তব্য দেখলাম।

আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা শিক্ষিত, কম শিক্ষিত, কথিত অশিক্ষিত সংগ্রামী মেয়ের অভাব এ দেশেও নেই। কিন্তু বাড়ির বাড়তি ফ্ল্যাট বা কক্ষটিতে হোটেলের মতো অতিথি রাখার মতো আয়োজনে কয়টি কথিত ভদ্র শিক্ষিত পরিবার আগ্রহী হবে তা আমরা ভালো করেই জানি। ঘরের মেয়েদের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা তো পরের কথা। সড়কপথে বেনাপোল পার হয়ে বনগাঁর পথে একের পর গ্রামের মেয়েকে সাইকেল চালাতে দেখে অবাক হয়েছিলাম নব্বই দশকের শেষে। আমাদের এখানে এখনও মেয়েদের সাইকেল চালানোর ছবি পত্রিকায় ছবি ছাপার মতো ঘটনা। 

দুই বাংলার মধ্যে তুলনামূলক আলাপে কিছু আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কথা আসবে। বিশাল ভারতের সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতার চাপ পশ্চিমবাংলার মানুষকে লড়িয়ে মনোভাবের করেছে। একই সঙ্গে বৃহত্তর সুযোগ আর বৈচিত্রের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করেছে তাকে। কিন্তু সব কিছু পরও পশ্চিমবাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী জাতিতে বাঙালি, তারা হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বাস করে আসা হিন্দু-মুসলমান। পরস্পরকে চেনা জানা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ছাড়া দুই সম্প্রদায়ের জীবনাচরণে খুব বেশি তফাত থাকার বিশেষ কোনও কারণ নেই।  ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও শিক্ষার ব্যবধানের (বিশেষ করে ইংরেজি ভাষা) পর্ব তো আমরা এতদিনে পেরিয়ে আসার জায়গায় আছি। সাম্প্রতিককালে শোনা যাচ্ছে আমাদের সাধারণ শিক্ষার স্কুল কমছে আর মূলত ‘‘অতীতমুখী শিক্ষা দেওয়া’’ মাদ্রাসা বাড়ছে। এর জন্য কোন উপনিবেশিক ব্যবস্থা দায়ী?

স্বাধীন বাংলাদেশের বাঙালি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে আর ভারতবর্ষের বৈচিত্র আর বিশালতার অংশ না থাকলেও তার সামনে তো এখন খোলা ভারতসহ সারা বিশ্বের দরজা। বলা হয়, বাংলাদেশের এক কোটি মানুষ প্রবাসী। তারা যেসব দেশে থাকেন বা কাজ করেন তার প্রায় সবই অর্থনৈতিকসহ নানাভাবে আমাদের চেয়ে অগ্রসর। স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত, অতি উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নব্যধনীসমাজ বরাবরই বিদেশ বেড়ান। পুকুর কাটা থেকে স্কুল টিফিনের মেন্যু পর্যন্ত বহুবিধ বিষয় বুঝতে সফরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তার সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু আমরা কেউই বিদেশ থেকে ফেরার সময় মুগ্ধতা ছাড়া কিছু নিয়ে আসি না। ভালো কিছু শিখি না বা নিজের দেশে অনুসরণের দরকার মনে করি না। ব্যাপারটা অনেকটা এমন হয়ে গেছে যে, ওসব এদেশে হওয়ার নয়।

এখন সমাজে যে হারে ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডুকতা বাড়ছে (উল্টো হওয়ার কথা ছিল) তাতে সামনে এগোনোর বদলে আমরা হয়তো অনেক ক্ষেত্রে ভুতের মতো পেছন দিকেই হাঁটছি। গোটা দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই আজ ধর্মান্ধতা, উগ্রতার ছবিটা কমবেশি একরকম। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অন্য আলাপ। মাথাপিছু আয়ের চমকপ্রদ বৃদ্ধি আর অবকাঠামোর চোখ ধাঁধানো উন্নতি তো শেষ কথা নয়। ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের ছায়াটাও মাথার ওপর থেকেই যাচ্ছে।

দুই শহরের এলোমেলো গল্প থেকে আলাপটা হয়ত খেই হারিয়ে প্রসঙ্গান্তরে চলে গেল। কিন্তু সুনাগরিকতার বোধ, নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতা, উদারতার মতো বিষয় অনেকাংশে নির্ভর করে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষা, অর্থনীতি, সুশাসনের চর্চা ইত্যাদি গভীরতর বিষয়ের ওপর। পেছনের অন্ধকারে হাঁটা সমাজকে তাই ‘ব্রেক কষে’ ঈষৎ আলোকিত পথে ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ। তাকে প্রশ্রয়ী, একুশ শতকের উপযোগী সমাজে পরিণত করতে হয়ত অনেকবছর আরও অপেক্ষা করতে হবে। কসমোপলিটান, বসবাসযোগ্য, সুনাগরিকে ভরা ঢাকার স্বপ্নও দেখতে হবে এ বাস্তবতার আলোকেই।

লেখক: সাংবাদিক ও অনুবাদক।
ইমেইল: sumonkaiser@gmail.com

সুমন কায়সার। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার
ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist