Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

কলাম

মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ এবং একটি কবিতার জন্মকথা

নির্মলেন্দু গুণ। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার।

২০২৪-১৯৭১=৫৩। এখন যাদের বয়স ষাটের কম, ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চ মাস সম্পর্কে তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকার কথা নয়।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ যে বালকেরা শুনেছিল, তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠদের বয়স এখন ৫৩+১২=৬৫ বছর হওয়ার কথা।

অর্থাৎ, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেছি বা তাঁকে ভাষণ দিতে দেখেছি— এই গৌরবের দাবিদার ক্রমশ হ্রাস পেতে পেতে প্রায় শূন্যের কোঠায়।

যারা সত্তর বছর বা তদুর্ধ্ব আশি-নব্বই বছর বয়সের অধিকারী হয়েছেন— তাদের পক্ষেই এরূপ দাবি করা সম্ভব যে, আমি বা আমরা ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দশ লক্ষাধিক জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণটি দিয়েছিলেন, আমি তাঁর ওই ভাষণটি স্বকর্ণে শুনেছিলাম এবং তাঁকে ভাষণ দিতে দেখেছিলাম।

প্রাকৃতিক নিয়মেই সেই সৌভাগ্যবান প্রজন্ম আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে আছেন।

যারা সত্তর বছর বা তদুর্ধ্ব আশি-নব্বই বছর বয়সের অধিকারী হয়েছেন— তাদের পক্ষেই এরূপ দাবি করা সম্ভব যে, আমি বা আমরা ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দশ লক্ষাধিক জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণটি দিয়েছিলেন, আমি তাঁর ওই ভাষণটি স্বকর্ণে শুনেছিলাম এবং তাঁকে ভাষণ দিতে দেখেছিলাম।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উদ্দীপ্ত হয়ে যারা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন, মুজিবনগর সরকার গঠন করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন— আমার জানা মতে, তাঁদের অনেকেই সামরিক অভ্যুত্থানচক্রে নিহত হয়েছেন, অনেকেই লোকান্তরিত হয়েছেন।

১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের শূন্যতা এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

এমতাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির সামনে উপস্থিত শূন্যতাকে এমনভাবে সুবিন্যস্ত করতে হবে— যাতে দশ বছর পর বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা আরও শক্তিশালী, আরও আদর্শবান প্রজন্ম হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে।

এবার আমার কবিতাটির (স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো) জন্মকথা কথা বলে লেখাটি শেষ করবো।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ আমি মঞ্চের খুব কাছে বসে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণটি শুনেছিলাম। তখন আমার বয়স ২৫।

নবীন সাংবাদিক, তরুণ কবি। পরিচয়হীন প্রায়।

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে পত্রিকা অফিসে ফিরে গিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাটি ওইদিনের ‘গণবাংলা’র টেলিগ্রাম সংখ্যায় বক্স করে মুদ্রিত হয়।

২৫শে মার্চের রাতে পাকিস্তানের সেনারা ওই পত্রিকা অফিসটি গান পাউডার ছিটিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।

পাঁচ থেকে দশজন সাংবাদিক ও প্রেসকর্মী ওই রাতে আগুনে পুড়ে এবং মেশিনগানের গুলিতে নিহত হয়।

অনেক পত্রিকার সঙ্গে আমার কবিতাটিও ভস্মীভূত হয়।

১৯৭১ এর অগ্নিঝরা মার্চের বিরুদ্ধে শুরু হয় সেনাবাহিনীর মার্চপাস্ট। বুলডোজার চালিয়ে, সামরিক বুটের তলায় পিষ্ট করা হয় একাত্তরের রক্তার্জিত সংবিধান। এরকম একটা ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমি নতুন করে রচনা করি আমার সেই কবিতাটি, ২৫শে মার্চে যে কবিতা ভস্মীভূত হয়েছিল— পাকসেনাদের হাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দ্য পিপল ও গণবাংলা পত্রিকার অফিসে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির হাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে— স্বাধীন বাংলাদেশে শুরু হয় এক গভীর কালো অধ্যায়।

বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে নির্বাসিত করা হয়। ১৯৭১ এর রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’-কে প্রতিস্থাপিত করা হয় ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ দিয়ে। বাংলাদেশ বেতারকে করা হয় রেডিও বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ প্রচার নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জেনারেল জিয়ার নামে লও লও সালামে প্রকম্পিত হতে থাকে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।

১৯৭১ এর অগ্নিঝরা মার্চের বিরুদ্ধে শুরু হয় সেনাবাহিনীর মার্চপাস্ট।

বুলডোজার চালিয়ে, সামরিক বুটের তলায় পিষ্ট করা হয় একাত্তরের রক্তার্জিত সংবিধান।

এরকম একটা ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমি নতুন করে রচনা করি আমার সেই কবিতাটি, ২৫শে মার্চে যে কবিতা ভস্মীভূত হয়েছিল— পাকসেনাদের হাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দ্য পিপল ও গণবাংলা পত্রিকার অফিসে।

তাতে একটা লাভ হয়। আমার হারিয়ে যাওয়া কবিতার চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী একটি কবিতা (স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো) আমি রচনা করতে সক্ষম হই।

৪ মার্চ, ২০২৪, ঢাকা।

লেখক: কবি।

সকাল সন্ধ্যা’র পাঠকদের জন্য কবিতাটি এখানে পুনর্মুদ্রিত হলো:

স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো

নির্মলেন্দু গুণ

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে কখন আসবে কবি?

এই শিশুপার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না
তাহলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?
তাহলে কেমন ছিল শিশু পার্কে বেঞ্চে বৃক্ষে ফুলের বাগানে
ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?

জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত
কালো হাত। তাই দেখি— কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ…।

হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,
শিশুপার্কের রঙ্গিন দোলনায় দোল খেতে খেতে— তুমি
একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প
সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর।
না পার্ক না ফুলের বাগান— এসবের কিছুই ছিলনা,

শুধু একখণ্ড অখণ্ড আকাশ যেরকম, সে দিগন্ত প্লাবিত
ধু ধু মাঠ ছিল— দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়।
আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল
এই ধু ধু মাঠের সবুজে।

কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,
লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,
পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক।
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,
নিম্ন মধ্যবিত্ত— করুণ কেরানী— নারী— বৃদ্ধ— বেশ্যা— ভবঘুরে
আর তোমাদের মতো শিশু— পাতা কুড়ানীরা দল বেঁধে।

একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের: কখন আসবে কবি? কখন আসবে কবি?

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে— জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

[রচনাকাল: ১৯৮০ সাল। স্থান: ময়মনসিংহ।]

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist