Beta
সোমবার, ৪ মার্চ, ২০২৪

গণমাধ্যম এখন

সংবাদমাধ্যম কি বিজ্ঞাপন বাজারে পিছিয়ে পড়বে

রাশেদ আহসান। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার

গণমাধ্যমের সাথে বিজ্ঞাপনের সম্পর্ক কেমন? গণমাধ্যম নিজেদের সম্পাদকীয় নীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কিভাবে সমন্বয় করে?  বৈশ্বিক ও বাংলাদেশ পরিপেক্ষিতে এ সম্পর্কের অন্দর-বাহির নিয়ে খানিকটা আলোচনা করতেই এই নিবন্ধের অবতারণা।

গণমাধ্যমের সাথে বিজ্ঞাপনের সম্পর্ক জটিল ও দ্বান্দ্বিক অথচ পরস্পর নির্ভরশীল। আধুনিক মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কিছুদিন আগেও ভোগ্যপণ্যের প্রচার ও প্রসার পুরোপুরি গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ছিল বলছি এই কারণে যে, কন্টেন্ট ডিজিটাইজেশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক বিস্তৃতির ফলে বিজ্ঞাপন আর কেবল গণমাধ্যম নির্ভরশীল নয়। যদিও বিজ্ঞাপন ও গণমাধ্যমের স্বতন্ত্র পথ চলার দীর্ঘ ইতিহাস আছে।  বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞাপন ও গণমাধ্যম গলাগলি ধরে দলাদলি করে বিকশিত হয়েছে। মুক্ত বাজার অর্থনীতি নির্ভর গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বিনোদন জগৎ ও মিডিয়া যতটা প্রসারিত হয়েছে অন্য দেশগুলোতে ততটা হয়নি। তাই গণতান্ত্রিক ও উদার সমাজ বিজ্ঞাপন এবং গণমাধ্যমের জন্য সহায়ক। উদাহরণ হিসেবে আমরা উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার কথা বিবেচনা করতে পারি। তবে বিষয়টি এমন সরলও নয়। বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান নিউজ রুমের অক্সিজেন শুষে নেয় এমন কথা প্রচলিত হয়েছে। সেটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাথে গণমাধ্যমের পরস্পর স্বার্থবিরোধী অবস্থানের কারণে।
বহুজাতিক আর্থিক পরামর্শক ও নিরীক্ষা সংস্থা প্রাইস ওয়াটার কুপার এ বছর ২৩ শে জুন বিনোদন ও গণমাধ্যমের বাৎসরিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাদের নিয়মিত প্রতিবেদন গ্লোবাল এন্টারটেইনমেন্ট এন্ড মিডিয়া আউটলুক ২০২৩-২৭ প্রকাশ করে।  ‘Resetting expectations refocusing inward and recharging growth’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আগামী পাঁচ বছরে গণমাধ্যম ও বিনোদন জগতের সম্ভাব্য বাজার পরিস্থিতি ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এই প্রতিবেদনে বিজ্ঞাপনের বাজার ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ২০২৭ সালে বিজ্ঞাপন বাজার ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ‘Approaching a trillion dollar market’ শিরোনামে বিজ্ঞাপন বাজার ২০২৭ সালে কনজিউমার স্পেন্ডিং এবং ইন্টারনেট এক্সেসকে ছড়িয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

প্রাইস ওয়াটার কুপারের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে বিনোদন-গণমাধ্যম এ সময় অনেক বেশি ডিজিটাল নির্ভর হয়ে উঠবে ফলে অনুষ্ঠান নির্মাণ ব্যয় ও ডিস্ট্রিবিউশন খরচ কমে আসবে। এর ফলে অনেক বেশি কন্টেন্ট তৈরি হবে। মানুষ হয়তো আরও বেশি সময় ব্যয় করবে কিন্তু এসব অনুষ্ঠান দেখতে কম টাকা খরচ করবে।

এই অবস্থা গণমাধ্যমের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এমনিতেই কন্টেন্ট ডিজিটাইজেশনের ফলে গণমাধ্যমের সাথে বিজ্ঞাপনের সম্পর্ক নতুন বাঁক নিয়েছে। যার ফলে বিজ্ঞাপন এখন আর গণমাধ্যমের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। সোশ্যাল মিডিয়া বিস্তারের ফলে বিজ্ঞাপন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার অবস্থান সুসংহত করে নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কন্টেন্ট কঞ্জাম্পশন যত বেড়েছে বিজ্ঞাপন তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে পণ্যের চাহিদা অনুসারে বয়স, লিঙ্গ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা অনুসারে নির্দিষ্ট দর্শককে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন দেখানো যায়। যেকোনো সময় বিজ্ঞাপন প্রচারের গতিপথ পরিবর্তন করা যায় ও ফলাফল বিশ্লেষণ করা যায়। তাই বিজ্ঞাপনদাতারা অনেক বেশি ডিজিটালমাধ্যম নির্ভর হয়ে উঠছে। তবু এটা উল্লেখ করা দরকার যে,

‘‘ভারতে অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে সরাসরি খেলা দেখায়নি এমন গণমাধ্যমগুলোর চেয়ে ব্যক্তিগত কন্টেন্ট ক্রিয়েটাররা অনেক বেশি বিজ্ঞাপনের বাজেট পেয়েছে।’’

ট্র্যাডিশনাল মিডিয়া এখনো সারা পৃথিবীর বিজ্ঞাপন দাতাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে আছে। বহুজাতিক শীর্ষ বিজ্ঞাপন সংস্থা গ্রুপ এম ‘ইউ এস এডভার্টাইজিং মার্কেট আপডেট’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যদিও দর্শক সংখ্যা ডাবল ডিজিটে কমছে তবুও টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে প্রবৃদ্ধি বজায় আছে। কারণ লিনিয়ার টেলিভিশন সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপনবান্ধব।

এখন কথা হচ্ছে, বিজ্ঞাপন যেখানে সংবাদ ও বিনোদন মাধ্যমের আয়ের অন্যতম উৎস বা প্রধান উৎস বা কখনো কখনো আয়ের একমাত্র উৎস, সেখানে কর্পোরেট কোম্পানির বিজ্ঞাপন দাতারা কি সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতির উপর প্রভাব ফেলতে পেরেছে? এর উত্তর সম্ভবত ‘হ্যাঁ’ বা  ‘না’ এর মতো করে দেওয়া সম্ভব নয়। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থা মানুষকে যেমন প্রভাবিত করে সংবাদমাধ্যমকেও করে বৈকি। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলা যায়। দেশটিতে যেখানে ‘রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন’ গণমাধ্যমের অন্যতম উৎস সেখানে সংবাদ মাধ্যম কি রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট— এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে? উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ অনেকটাই।


তবে কন্টেন্ট ডিজিটাইজেশনের ফলে গণমাধ্যম বিজ্ঞাপনের সাথে তাদের সম্পর্ক নতুনভাবে নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছে। কোনো কোনো মাধ্যম পাঠক/দর্শকের কাছ থেকে সরাসরি গ্রাহক চাঁদা বা অন্য কোনোভাবে কন্ট্রিবিউশন নিতে পারছে। আবার ছোট ও মাঝারি বিজ্ঞাপনদাতাদের সাথে সহজেই সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে নিতে পারছে। এর ফলে তাদের সম্পাদকীয় নীতির উপর কম চাপ পড়ছে।

একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে, বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের বাজার অনিয়ন্ত্রিত। এখানে ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থাই নেই। এমন রেগুলেটরি অথরিটির অনুপস্থিতির কারণে সংবাদমাধ্যমকে আরো অনেক প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। ৯০-দশকের পর পর স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন সফল হবার পর বাংলাদেশে মোড়কজাত ভোগ্যপণ্যের বাজার বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে বিজ্ঞাপনের বাজার বড় হতে থাকে। বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সাথে দেশীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় হতে থাকে। একইসঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল প্রভাব প্রতিপত্তি সংবাদমাধ্যমকে মোকাবেলা করতে হয়। সেই সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রভাবও যুক্ত হতে থাকে।

বাংলাদেশের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার বিজ্ঞাপন (এটিএল) বাজারে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর রয়েছে সবচেয়ে বেশি শেয়ার। অন্যদিকে, সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে টেলিভিশনের আয়ের একমাত্র উৎস বিজ্ঞাপন। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অনেক বেশি বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল। যেহেতু বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বাজারে কোনো নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নাই তাই টেলিভিশনগুলোর নিউজ রুম অনেক বেশি নাজুক।

বিশ্বের অন্যান্য জায়গার মতো বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বাজারও দ্রুত ডিজিটাল মাধ্যমে চলে যাচ্ছে। সেখানে বিনোদন ও সংবাদমাধ্যমকে তাদের আয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে ভাগ করে নিতে হচ্ছে। ফলে সংবাদমাধ্যমগুলো প্রত্যাশিত আয় করতে পারছেনা।

যদিও বছর বছর বিজ্ঞাপনের প্রবৃদ্ধির হার মোটামুটি দুই সংখ্যার উপরই আছে। তবুও সংবাদমাধ্যমগুলোর আয় তুলনামূলকভাবে বাড়ছে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমছে। বিশেষ করে মুদ্রিত সংবাদমাধ্যম দৈনিক পত্রিকা এবং কোনো রকমে টিকে থাকা সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পত্রিকাগুলোর রেভিনিউ ক্রমাগত কমছে। দেশি-বিদেশি রেডিও স্টেশন গুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথবা কোনোরকমে চলছে।

এই বাস্তবার নিরীখে একথা বলা যায় যে, এই ডিজিটাল ট্রানজিশন বা প্রাযুক্তিক রূপান্তরের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার ফলে বাংলাদেশের সব ধরনের বিনোদন এবং সংবাদভিত্তিক গণমাধ্যম অভিনব এক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যথাযথ গবেষণা ও অনুসন্ধানের অভাবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন বাজারের মতো বাংলাদেশি বিজ্ঞাপন বাজারের তথ্য-উপাত্ত খুব বেশি পাওয়া যায় না। তবু বলা যায় বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনের বাজার দ্রুত বর্ধনশীল এবং ডিজিটাল মাধ্যমে চলে যাচ্ছে।

সম্প্রতি বহুজাতিক বাজার গবেষণা সংস্থা ‘কান্তার’-এর পরিচালিত জরিপে দেখা যাচ্ছে, প্রচলিত গণমাধ্যমে মানুষ আগের মতো সময় ব্যায় করছে না। যদিও এসব প্রচলিত মাধ্যম এখনো তাদেরকে অনেক বেশি প্রভাবিত করে। গবেষণায় দেখা যায়, দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশনের পাঠক ও শ্রোতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে টেলিভিশনের দর্শক ১৫ শতাংশ কমেছে।

প্রশ্ন আসতে পারে নতুন এই পরিস্থিতিতে প্রচলিত বিনোদন ও গণমাধ্যমগুলো কি টিকে থাকবে? নাকি নতুন ধরনের গণমাধ্যম তৈরি হবে? খেয়াল করা দরকার যে, এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ের অনুষ্ঠান নির্মাতারাও প্রাতিষ্ঠানিক বিনোদন ও সংবাদ মাধ্যমগুলোকে প্রতিযোগিতায় ফেলছে। ব্র্যান্ডগুলো এসব ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটার’দের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিনোদন ও ক্রীড়া সাংবাদিকরা এক্ষেত্রে অনেক বেশি সফলতা পাচ্ছে। এবছরের শেষ প্রান্তিকে ভারতে অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে সরাসরি খেলা দেখায়নি এমন গণমাধ্যমগুলোর চেয়ে ব্যক্তিগত কন্টেন্ট ক্রিয়েটাররা অনেক বেশি বিজ্ঞাপনের বাজেট পেয়েছে।

বিশ্বজুড়ে যে সংবাদমাধ্যম ও বিজ্ঞাপন জগতের যে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন ঘটছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোকেও সেই রূপান্তরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে আরও দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। এই প্রাযুক্তিক রূপান্তরের সঙ্গে অভিযোজন ঘটাতে না পারলে, খাপ খাইয়ে নিতে না পারলে প্রথাগত সংবাদমাধ্যমগুলো বিজ্ঞাপনের বাজারে নিজেদের হিস্যা ধরে রাখতে ব্যর্থ হতে পারে।

লেখক: মহাব্যাবস্থাপক,বিক্রয় ও বিপনণ, একাত্তর টেলিভিশন।

ইমেইল:  rashed.ahsan@gmail.com

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist