Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

জন্ম একসঙ্গে, এখন তিনজনই পড়বেন মেডিকেলে

নিজেদের বাড়ির উঠানে মো. মাফিউল হাসান, মো. সাফিউল ইসলাম ও মো. রাফিউল হাসান। ছবি: সকাল সন্ধ্যা

বাবা মারা গেছেন প্রায় এক যুগ আগে। একসঙ্গে জন্ম নেওয়া তিন ভাইয়ের জগত বলতে কেবল মা।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যে মা তাদের বড় করেছেন। সন্তানদের জন্য বাবা ও শ্বশুর বাড়ির জমি বিক্রি করা এই মায়ের মুখে এখন বিজয়ের হাসি। তিন জনই মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন।

বিরল এই ঘটনা ঘটেছে বগুড়ার ধুনট উপজেলার বথুয়াবাড়ী গ্রামে। তিন ভাই হলেন মো. মাফিউল হাসান, মো. সাফিউল ইসলাম ও মো. রাফিউল হাসান।

তাদের বাবা গোলাম মোস্তফা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। ২০০৯ সালে মারা যান তিনি। এরপর মা আর্জিনা বেগম তাদের আগলে রাখেন। তিন ছেলের জন্য সংগ্রামে নামেন। সর্বস্ব দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা করান।

মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নিজেদের চেষ্টা ও উদ্যম নিয়ে সকাল সন্ধ্যা প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেছেন তিন ভাই।

তাদের তিন জনেরই স্কুল ‍ছিল ধুনট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। ২০২০ সালে সেখান থেকে তারা এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস নিয়ে পাস করেন। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য তিন ভাই ভর্তি হন বগুড়ার সরকারি শাহ সুলতান কলেজে। ২০২২ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় তারা একই ফল করেন।

২০২৩ সালে প্রথমবারের চেষ্টায় তিন ভাইয়ের মধ্যে কেবল মাফিউল এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ভর্তি হন ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে। সাফিউল ও রাফিউল সে বছর কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলেও হতাশ হননি। মনোবল হারাননি। পরের বার অর্থাৎ এ বছর ফের পরীক্ষায় বসেন এবং দুজনই সফল হন। সাফিউল দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ এবং রাফিউল নোয়াখালীর আব্দুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পান।

উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় প্রথম চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন রাফিউল। বলেন, “মূলত ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার জন্য বগুড়ায় থাকা শুরু। গণিত তেমন একটা পছন্দ করতাম না। এ কারণে ইঞ্জিয়ানিয়ারিংয়ে পড়ার ইচ্ছা সেভাবে ছিল না। জীববিজ্ঞান পড়তে গিয়ে দেখলাম, খারাপ লাগছে না তো! বরং ভালোই লাগছে। চিকিৎসক হওয়ার সাধ জাগে। ভাবতাম, চিকিৎসক হতে পারলে মানুষকে সরাসরি সেবা করতে পারব।”

মেডিকেলে ভর্তির জন্য পরিশ্রমের পাশাপাশি ভাগ্যও লাগে বলে মনে করেন রাফিউল। বলেন, এক পরিবারের একাধিক সন্তান প্রায় একই সময়ে মেডিকেলে পড়ছে, এমনটা সাধারণত দেখা যায় না। গোটা গ্রামে একজন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় টিকেছে, এমনটাই সচরাচর ঘটে। সে জায়গায় একই মায়ের তিন সন্তানের চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়তে পারা বিরল ঘটনা।”

মা আর্জিনা বেগমের সঙ্গে তিন ভাই। ছবি : সকাল সন্ধ্যা

প্রথমবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের দন্ত বিভাগে পড়ার সুযোগ পেয়ে খুশি হয়েছিলেন মাফিউল। তবে দুই ভাইয়ের জন্য মন খারাপও ছিল। বলেন, “প্রথমবার আমি চান্স পেলেও দু’ভাইয়ের অল্পের জন্য মিস হয়। পরের বার তারা ফের আদাজল খেয়ে লাগে। তাদের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। দুজনই সরকারি মেডিকেল কলেজে এবার চান্স পেয়েছে। যারা আমাদের দুঃসময়ে পাশে থেকেছেন, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।”

রাফিউল-মাফিউলের আরেক ভাই সাফিউল বলেন, “আমার গ্রামের গরীব, দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, হুজুরদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে। আমি যখন ভালো ডাক্তার হব, ছুটিতে এলে তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিব।”

এই তিন ভাইয়ের চাচা গোলাম ফারুক ধুনট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ভাতিজাদের সম্পর্কে তিনি বলেন, “ওদের বাবা ২০০৯ সালে মারা যাওয়ার পর আর্জিনা বেগম সংসারের হাল ধরেন। তিনি অনেক কষ্টে সন্তানদের পড়ালেখা করান। বিভিন্ন সময়ে অর্থনৈতিকসহ নানা সমস্যার মধ্যে পড়লেও ছেলেদের পড়াশোনা বন্ধ করেননি, চালিয়ে যান। আমরাও তাদের উৎসাহ দেই।”

ছেলেদের নিয়ে আর্জিনা বেগম বলেন, “তারা ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখায় ভালো ছিল। বরাবরই ভালো রেজাল্ট করত। আলাদা কোনও গাইড দেওয়া লাগেনি। নিজের ইচ্ছায় পড়ালেখা করেছে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার পর ঠিক করি, লেখাপড়া তাদের ভালোই মতো করাবো। ত্রুটি রাখব না। শিক্ষকের ছেলে, তার নাম যেন থাকে।”

তিন ছেলেকে পড়ালেখা করাতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে জমি বিক্রি করতে হয় আর্জিনা বেগমকে। তিনি এখন চাইছেন, সরকার যাতে তার ছেলেদের উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতা করে। বলেন, “আমার শেরপুরে জমি ছিল সেটা বিক্রি করেছি। বাপের বাড়ির জমি ছিল, সেটাও বিক্রি করেছি। জমি বিক্রি করেই তাদের এতদূর পড়াতে পেরেছি। এখন সরকার যদি আমার ছেলেদের পড়ালেখার খরচটা দেখে, তাহলে উপকার হয়।”       

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist