Beta
মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৪

‘শহীদ’ শব্দ নিয়ে মেটার গাত্রদাহ কেন   

Meta

‘শহীদ’ শব্দ নিয়ে বছরখানেক ধরে কঠোর অবস্থানে আছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের স্বত্বাধিকারী সোশাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটা। আরবী এই শব্দযুক্ত কোনও কন্টেন্ট দেখলে সঙ্গে সঙ্গেই নিজেদের প্ল্যাটফর্ম থেকে তা সরিয়ে ফেলছে তারা।

আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি মেটার এই তৎপরতা নিয়ে স্বভাবতই সমালোচনার ঝড় ওঠে, যা ইসরায়েল ও হামাসের চলমান সংঘাতে বেড়ে যায়।

‘শহীদ’ শব্দ নিয়ে অস্বস্তি ও এর জেরে অনলাইনে-অফলাইনে সমালোচনার একপর্যায়ে নীতিগত পরামর্শ চাইতে নিজেদেরই ওভারইসাইট বোর্ড বা তদারকি বোর্ডের দ্বারস্থ হয় মেটা।

প্রায় এক বছর ধরে নিজেদের মধ্যে গবেষণা ও আলাপ-আলোচনা শেষে ‘শহীদ’ শব্দে মেটার গাত্রদাহ নিয়ে সম্প্রতি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে বোর্ড। তাদের অবস্থান মেটার বিতর্কিত নীতিকে সমর্থন জানায়নি। বরং বলেছে, মেটার এই নীতি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে।                        

একই সঙ্গে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামকে ‘শহীদ’ শব্দ ব্যবহারের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ারও আহ্বান জানায় মেটার তদারকি বোর্ড।

মেটা অবশ্য স্বীকার করে বলেছে, ‘শহীদ’ শব্দ থাকায় যে পরিমাণ কন্টেন্ট কোম্পানির নীতি মেনে সরাতে হয়েছে, তা অন্য কোনও একক শব্দ বা বাক্যাংশের ক্ষেত্রে ঘটেনি।       

মেটার তদারকি বোর্ড ২৬ মার্চ জানিয়েছে, “মেটার নীতি অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে, যার কোনও প্রয়োজন নেই। মেটার উচিত এই সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।”      

২০২০ সালে মেটার তদারকি বোর্ড গঠন করা হয়। এটি মেটার অর্থায়নে চললেও কাজ করে স্বাধীনভাবে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে নির্দিষ্ট কন্টেন্ট সরানোর ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিলে মেটা তার তদারকি বোর্ডকে ওই সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করার আহ্বান জানাতে পারে; বিশেষ করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নেওয়া সিদ্ধান্ত যখন বিতর্কের জন্ম দেয়।

কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যক্তির অভিযোগ তদন্তে নিয়োগকৃত কর্মকর্তার মতো মেটার তদারকি বোর্ড তখন করণীয় বিষয়ে সুপারিশ করে বা পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে মেটার সিদ্ধান্তের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে বা বাতিল করে মতামতও দেয় তারা। 

‘শহীদের’ ওপর বিরাগ কেন? 

সমাজের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে এমন ব্যক্তি ও সংগঠন নিয়ে একটি তালিকা করেছে মেটা। ডেঞ্জারাস অর্গানাইজেশনস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়ালস (ডিওআই) নামের ওই তালিকায় যেসব সংগঠন বা ব্যক্তির নাম আছে, তাদের সঙ্গে ‘শহীদ’ শব্দ যুক্ত করা হলে মানুষ শব্দটিকে ইতিবাচক বা প্রশংসাসূচক হিসেবে দেখে বলে মনে করে মেটা। তাই তাদের কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ নীতিতে ‘শহীদ’ শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। 

মেটার ওই ডিওআই তালিকার উপরের দিকে সেইসব সংগঠন আছে, যাদেরকে সংস্থাটি বিদ্বেষ ছড়ানো সংগঠন, অপরাধমূলক সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যেসব সংগঠনকে তাদের ‘অপরাধমূলক’ কর্মকাণ্ডের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করেছে, সেসব সংগঠনও মেটার ডিওআই তালিকায় আছে।            

মেটা মনে করে, এসব সংগঠন ও ব্যক্তি বাস্তব জীবনে গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত।       

২০২১ সালে পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে ফেসবুকে সেন্সরশিপের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন ফিলিস্তিনি অ্যাক্টিভিস্ট ও সাংবাদিকরা। ছবি: এএফপি

বোর্ডের কাছে যাওয়া হয়েছিল কেন? 

ফিলিস্তিন ও আরব অঞ্চলের মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘শহীদ’ শব্দযুক্ত পোস্ট দিলেই সেসব সরিয়ে নিচ্ছে মেটা। এর প্রতিবাদ জানায় সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট থেকে শুরু করে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।  

গত বছরের ডিসেম্বরে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সেখানে বলা হয়, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান সংঘাতসংক্রান্ত কনটেন্ট মেটার কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ নীতির রোষানলে পড়েছে।  

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের ৫১ পৃষ্ঠা দীর্ঘ প্রতিবেদনটিতে বলে, “ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যকার লড়াইকে ঘিরে ন্যায্য বক্তব্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের মধ্য দিয়ে মেটা তাদের ডিওআই নীতির অপব্যবহার করছে।”               

সমালোচনার একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘শহীদ’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে ২০২০ সালে নিজেদের অভ্যন্তরেই আলোচনা শুরু করে মেটা। তবে সে সময় তারা এ নিয়ে ঐক্যমতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।    

পরের বছর ২০২১ সালে মেটা ‘শহীদ’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি পরে এক প্রতিবেদনে জানায়, মেটার কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ নীতি ফিলিস্তিনি ব্যবহারকারীদের অধিকারের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা জানানো থেকে শুরু করে তথ্য আদান-প্রদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।                  

তদন্ত কমিটির ওই প্রতিবেদনের পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেটা তাদের তদারকি বোর্ডের কাছে যায়। ডিওআই নীতি মেনে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম থেকে বিপজ্জনক ব্যক্তি বা সংগঠনের সঙ্গে ‘শহীদ’ শব্দযুক্ত কন্টেন্ট সরানো অব্যাহত রাখা হবে কি না-এ বিষয়ে বোর্ডের কাছে পরামর্শ চায় তারা।                     

তদারকি বোর্ড কীভাবে এগোয়?

মেটার তদারকি বোর্ডের একজন সদস্য পাকিস্তানের আইনজীবী ও ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট নিঘাত দাদ। তিনি আল জাজিরাকে জানান, বোর্ডকে বিবেচনা করার জন্য বেশ কয়েকটি বিকল্প পরামর্শ দেয় মেটা। এগুলোর মধ্যে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার পরামর্শও ছিল।

তবে তদারকি বোর্ড কেবল মেটা উত্থাপিত বিকল্পের মধ্যে আটকে থাকতে বাধ্য নয়। ‘শহীদ’ শব্দ নিয়ে দীর্ঘ এক বছর ধরে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা শেষে তদারকি বোর্ড নিজেও আরও বিকল্পের সন্ধান পায়।

পাকিস্তানের আইনজীবী ও ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট নিঘাত দাদ।

নিঘাত বলেন, “২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর পর বাস্তব পরিস্থিতি ঘিরে আমাদের দেওয়া সুপারিশ যাচাই করা হয়। আমরা দেখতে চেয়েছিলাম, আমাদের সুপারিশের পর মানুষ কীভাবে মেটার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। এ নিয়ে আমরা গবেষণাও করি। একপর্যায়ে আমরা দেখি, ইসরায়েল-হামাসের চলমান সংঘাতের মধ্যেও আমাদের সুপারিশ কার্যকারিতা হারায়নি।”                            

তদারকি বোর্ড কী সুপারিশ করে?

মেটার তদারকি বোর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘শহীদ’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে মঙ্গলবার প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বলা হয়, আরবী এই শব্দ নিয়ে মেটার বর্তমান অবস্থান অতিরিক্ত বিস্তৃত এবং উল্লেখযোগ্য ও অসামঞ্জস্যভাবে এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করছে।               

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘শহীদ’ শব্দের ভাষাগত জটিলতা বুঝতে মেটা ব্যর্থ হয়েছে। তাদের কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা শব্দটিকে কেবল ইংরেজি শব্দ ‘মারটারের’ সমতুল্য হিসেবে দেখে আসছে।               

তদারকি বোর্ডের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, বিপজ্জনক ব্যক্তি বা সংগঠনের সঙ্গে ‘শহীদ’ শব্দ জুড়ে দিলেই তা ‘প্রশংসাসূচক’- মেটার এই ধারণা বদ্ধমূল। এ কারণে আরবী শব্দটির ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা জারি করে তারা।

“এর মধ্য দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এছাড়া এর মাধ্যমে অযৌক্তিকভাবে নাগরিক আলোচনা সীমাবদ্ধ করা হয় এবং সমতা ও বৈষম্যহীনতার ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলা হয়,” মত তদারকি বোর্ডের।  

বোর্ডের সুপারিশ মানতে কি মেটা বাধ্য?

তদারকি বোর্ডের সাম্প্রতিক সুপারিশের বিষয়ে মেটা বলেছে, তারা সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে দুই মাসের মধ্যে জবাব দেবে।

অবশ্য তদারকি বোর্ডের সুপারিশ মেনে চলা মেটার জন্য বাধ্যতামূলক নয়।           

এ বিষয়ে পাকিস্তানি আইনজীবী নিঘাত বলেন, “মেটা সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক। তবে মেটা যখন নিজে নীতিগত পরামর্শ চায়, তখন তাদের সেগুলো মানা বাধ্যতামূলক থাকে না।”

তিনি অবশ্য এও জানান, বোর্ডের একটি ‘শক্তিশালী পদ্ধতি’ আছে, যার মাধ্যমে সুপারিশের বাস্তবায়ন বিবেচনা করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা হয়। 

“আমাদের একটি বাস্তবায়ন কমিটি আছে। আমাদের পরামর্শমূলক মতামতের ওপর ভিত্তি করে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে আমরা মেটার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি,” বলেন নিঘাত।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist