Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪

মিস্টার বিস্টের বানানো ইউটিউব ভিডিও কতটা আজব?

ছবি: রোলিংস্টোন ডটকম থেকে নেওয়া
ছবি: রোলিংস্টোন ডটকম থেকে নেওয়া
Picture of সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

সাগরের পাশে জঙ্গলা এলাকায় শুধু পাখি আর বালুতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ। এখানে হাওয়ার ফিসফাস আনাগোনা করে পরিত্যক্ত বাড়িগুলোর হা করে খোলা দরজা-জানালা আর সিঁড়ি ঘর দিয়ে।

এরকম জনশূন্য এলাকায় এক মুহূর্ত থাকার কথা ভাবতেই নিশ্চয়ই গা ছমছম করে উঠবে যে কারোর।

অথচ মিস্টার বিস্ট এবং তার বন্ধুরা টানা সাতদিন কাটিয়ে দিলেন এখানে।

বছরের পর বছর পরিত্যক্ত থাকা এক হোটেলের ছাদে হেলিকপ্টার নামিয়ে দিয়ে গেলো তাদের; এখানে বেঁচে-বর্তে থাকতে হবে সাতদিন।

এই শহর এক সময় রঙিন ছিল; ব্যস্ত ছিল।

“এক যুদ্ধে বোমা হামলায় ধ্বংসযজ্ঞ হয়ে যায় এই শহর।”

কোন যুদ্ধ? এই শহরের নামই বা কী?

১৭ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের ভিডিওতে সেসব কিছুই খোলাসা করে জানালেন না মিস্টার বিস্ট। আসলে এটাই তার ইউটিউব চ্যানেলের ধরন।

‘আই সারভাইভড সেভেন ডেজ ইন অ্যান অ্যাবানডান্ড সিটি’ শিরোনামে এই ভিডিও নিজের চ্যানেলে গত ২ মার্চ প্রকাশ করেন মিস্টার বিস্ট।

মিস্টার বিস্ট ও তার বন্ধুরা গিয়েছিলেন কুপারি শহরে।

যুগোস্লাভের সেনাবাহিনী জেএনএ ক্রোয়েশিয়াকে দখলে রাখার চেষ্টা করেছিল। ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে নব্বই দশকে কুপারি শহরের সৈকত পাড়ে হোটেলগুলোতেও আঘাত আসে। পরে এখানে মালামাল-আসবাব চুরি হলে ২০০০ সালের গোড়ায় এই ভবনগুলো পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

ইউটিউবে ভিডিওর বর্ণনায় মিস্টার বিস্ট লিখেছেন, “আমাদের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল এই কাজটি।”


মিস্টার বিস্ট ও তার বন্ধুদের এই রোমাঞ্চকর অভিযানের ভিডিওটি এরিমধ্যে দেখা হয়েছে ১৪ কোটি ১১ লাখ ৯৩ হাজারেরও বেশি বার।

কে এই মিস্টার বিস্ট?

২৫ বছরের এই যুবকের আসল নাম জিমি ডোনাল্ডসন। ইউটিউবে নিজের চ্যানেলে এখন পর্যন্ত ৭৮২টি ভিডিও তুলেছেন তিনি। তার চ্যানেলের ফলোয়ার ২৪ কোটি ৫০ লাখ।

অসুখের কারণে থমকে গিয়েছিল ডোনাল্ডসনের বেইসবল ক্যারিয়ার; যা তাকে ইউটিউবমুখী করে। এই ইউটিউব ক্রিয়েটর ২০১২ সাল থেকে ভিডিও তোলা শুরু করেন। তখন তার বয়স মোটে ১৩ বছর।

একজন ভালো শিক্ষার্থীর মতো ভাইরাল হওয়ার সব কৌশল দ্রুত শিখে নেন ডোনাল্ডসন। ইউটিউব অ্যালগরিদম বুঝতে জীবনের আর সব সাধ-আহ্লাদ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখেন দূরে।

তার সাধনা বৃথা যায়নি। ইউটিউবে জনপ্রিয় চ্যানেলের তালিকায় ভারতের রেকর্ডিং কোম্পানি টি-সিরিজ প্রথম স্থানে রয়েছে। এর ঠিক পরেই অর্থাৎ দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে ডোনাল্ডসনের মি.বিস্ট চ্যানেলটি।

‘কেমন করে আইফোন আনলক করা যায়?’ এ ধরনের চটকদার শিরোনামের ভিডিও তুলে নিরীক্ষা চালিয়েছেন ডোনাল্ডসন। মাঝপথে কলেজ ছেড়ে দেওয়ার কারণে বাসা থেকে তাকে বের করে দেওয়াও হয়েছিল। ঠিক ওই সময় প্রথম একটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি হয় ডোনাল্ডসনের। ‘গৃহহীনকে ১০ হাজার ডলার দান’ শিরোনামে ভিডিও করে ওই অর্থ সত্যি সত্যি এক অসহায় দিয়ে দেন তিনি।

দেখা গেলো যত বেশি অর্থ তিনি বিলিয়ে দেবেন, তত বেশি লোক ভিডিও দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আর তাতে করে আরও বেশি পৃষ্ঠপোষকতা জুটলো ডোনাল্ডসনের। সেই সঙ্গে বাড়লো উপার্জন এবং আরও অর্থ বিলিয়ে দেওয়ার ধারাবাহিকতা।

অনুদানমূলক কাজকর্ম নিয়ে ডোনাল্ডসনের ‘বিস্ট ফিলোসফি’ নামে আরেকটি চ্যানেল আছে। নিজের টিম নিয়ে ক্যামেরুনে বিদ্যালয় নির্মাণের ভিডিও রয়েছে এই চ্যানেলে। আরও রয়েছে তিন কোটি ডলার খরচ করে খাবার বিতরণের ভিডিও।

ডোনাল্ডসন খুব একটা মজার মানুষ নন কিংবা তিনি খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না; অথবা দেখতে খুব আকর্ষণীয়ও নন; নিউ ইয়র্ক টাইমসের ভাষায় ডোনাল্ডসনের অনুসারীরা এসব নিয়ে ভাবেন না।

এই চ্যানেলের অধিকাংশ অনুসারী শিশু ও কিশোর বয়সী। তাদের কাছে ডোনাল্ডসন অন্তর্মুখী না কি অথবা বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ তাও দেখার বিষয় নয়।

ডোনাল্ডসন জানেন, ইউটিউবে তোলার জন্য সঠিক ভিডিও কেমন করে বানাতে হয়। তিনি তরুণদের নজর কাড়ে এমন ঘটনা স্ক্রিনে জুড়ে দেন একের পর এক। আর তাতে মিশিয়ে দেন নাটকীয় আবেশ; যা দেখতে স্বপ্নের মতো মনে হয়। এ কারণেই অনুসারীরা ডোনাল্ডসনের ভিডিও দেখেন।

ইউটিউব চ্যানেল থেকে হলিউড

ডিজিটাল মাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সারদের দীর্ঘ তালিকা থেকে হালে হলিউড যাত্রার সুযোগ এসেছে ডোনাল্ডসনের।

আজকাল কানাকানি চলছে, একশ মিলিয়ন অর্থাৎ ১০ কোটি ডলারের চুক্তি সই করেছেন ডোনাল্ডসন। অ্যামাজনের একটি রিয়ালিটি শো উপস্থাপনা করার ডাক পেয়েছেন এই তরুণ। টেলিভিশনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অংকের পুরস্কার দেওয়া হবে এই আয়োজনে; ৫০ লাখ ডলার।

ডোনাল্ডসনের ভিডিও বিতর্ক

গত বছর এক হাজার দৃষ্টিহীনের প্রথমবার দেখতে পারা নিয়ে নিজের বানানো ভিডিওর প্রচার করেছিলেন ডোনাল্ডসন। এতে আইনজীবী এবং টিকটক ব্যবহারকারী অ্যালেক্স ক্লেভারিং টুইট করে বলেন, “এখানে কিছু একটা শয়তানি আছে। যদিও আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না সেটা কী হতে পারে।”

একাশি হাজার মানুষ ওই টুইটে লাইক দিয়েছিলেন। তাতে মিস্টার বিস্ট অনুসারী এবং টুইটার বা এক্সের তুলনামূলক বয়স্ক অনুসারীদের মধ্যে পার্থক্য যেন স্পষ্ট হয়ে উঠলো। অন্যের দারিদ্র পুঁজি করছেন ডোনাল্ডসন এমন অভিযোগও ওঠে টুইটারে।

ক্লেভারিং বিষয়টা আরেকটু খোলাসা করেন। তার কাছে ডোনাল্ডসনের ব্যক্তিগত দাতব্য কাজ অস্বাভাবিক লেগেছে তা নয়; তবে এর প্রভাব নিয়ে ভাবার আছে; “একজন ধনী ব্যক্তি আমাদের জীবন বদলে দেওয়া অস্ত্রোপচারের জন্য অর্থ দিচ্ছেন এবং এমন কাজ খুবই সহজ।”

এসব বিতর্ক অবশ্য পাত্তা দিতে চান না ডোনাল্ডসন। তিনিও টুইট করে বলেন, “আমি জানতাম আমাকে বাতিলের খাতায় ফেলা হবে। কারণ আমি কাউকে সহায়তা করার ভিডিও তুলেছিলাম। বিষয়টা শতভাগ পরিস্কার করে নিতে চাই; আমার এসবে কিছু যায় আসে না।”

ডোনাল্ডসনের ভিডিও দেখতে ভালো লাগছে মানে হলো আকর্ষণ ধরে রাখার মতো ভিডিও বানাতে প্রচুর ব্যয়ও করতে হচ্ছে। স্কুইড গেম ভিডিও নির্মাণে খরচ হয়েছিল ৩৫ লাখ ডলার।

তবে ভিডিওর বিষয়বস্তু নিয়ে এক সাবেক কর্মী অভিযোগ তুলে বলেন, মিস্টার বিস্ট বিপদজনক এবং নিপীড়নমূলক বিষয় নিয়ে কাজ করছেন।

ডোনাল্ডসনের অনেক ভিডিওতে দেখানো হয়, তিনি ৫০ ঘণ্টা কবরে কাটাচ্ছেন, ৫০ ঘণ্টা অ্যান্টার্কটিকাতে কাটাচ্ছেন, ২৪ ঘণ্টা বরফে বন্দি থাকছেন, ৩০ দিন খাবার ছাড়া বেঁচে থাকছেন, আবার কখনও সাত দিনের জন্য একা একটি সাদা রঙের ঘরে বন্দি হয়ে থাকছেন।

একজন এডিটর বলেন, ডোনাল্ডসন তাকে প্রায় প্রতিদিনই গালিগালাজ করেন। তাকে আপত্তিকর নামেও ডাকেন। ডোনাল্ডসনের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ বিষময় বলেও অভিমত তার।

কাজের সময় নিরাপত্তার সব নিয়ম একমাত্র তিনিই মানতেন বলে চাকরি থেকে তাকে ছাঁটাই করে ডোনাল্ডসনের প্রতিষ্ঠান, এমন অভিযোগ জানালেন আরেকজন সাবেক কর্মী।

এসব নিয়ে মিস্টার বিস্টের একজন মুখপাত্র বলেন, “এই প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন অন্য পর্যাযের। সবাই এই কাজের ধারা অনুযাযী দক্ষ নয়।”

২০২১ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রচারণা চালিয়ে অনুসারীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগও উঠেছিল ডোনাল্ডসনের বিরুদ্ধে।

প্রতি বছর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি ডলার আয় করার পরও ডোনাল্ডসনের প্রযোজনা সংস্থাটি নাকি লাভের মুখ দেখে না। এ বছরও নাকি তাদের আয়-রোজগারে লাভ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ডোনাল্ডসন অবশ্য ভাবছেন তিনি তার দাতব্য চ্যানেল, অন্যান্য ভিডিও এবং বাকি ব্যবসায়িক উদ্যোগে আবারও বিনিয়োগ করবেন। আজকাল মিস্টার বিস্ট নামে গেম ও অ্যাপ নিয়েও ভাবছেন ডোনাল্ডসন।

৫০০ জন কর্মী পরিচালনা করেন ডোনাল্ডসন। এরমধ্যে ৩০০ জন তার প্রোডাকশন টিমে কাজ করে। আর ২০০ জন কাজ করে তার ‘ফিস্টেবলস’ নামে খাবারের প্রতিষ্ঠানে।ডোনাল্ডসনের মোট উপার্জনের ৭০ শতাংশ আসে এখান থেকে। নর্থ ক্যারোলিনায় ‘বিস্টভিল’ হলো তার শুটিংয়ের জায়গা। এই শহরে রীতিমত নায়ক বনে গেছেন ডোনাল্ডসন। যেখানেই যাচ্ছেন, শিশুরা পিছু নিচ্ছে তার। সবার মনে স্বপ্ন, যদি ডোনাল্ডসনের ভিডিওতে সুযোগ হয় তাদেরও।

মিস্টার বিস্ট চ্যানেলের ভিডিও দেখে অনেকের মনে হবে, শিশুদের জন্য এসব অরুচিকর। তবু তাদের এসবে আসক্ত করে ফেলার মতো করে বানানো হয় এই ভিডিওগুলো। তবে ভক্স ডটকম বলছে, মিস্টার বিস্টের পেছনের মানুষটি অর্থাৎ ডোনাল্ডসন কিন্তু নিজের বিনোদনের জন্য এসব করছেন না।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত