Beta
সোমবার, ১৭ জুন, ২০২৪
Beta
সোমবার, ১৭ জুন, ২০২৪

মোহামেডান আইলো…

বসুন্ধরা কিংসকে হারানোর পর মোহামেডান খেলোয়াড়দের উল্লাস। ছবি: বাফুফে
বসুন্ধরা কিংসকে হারানোর পর মোহামেডান খেলোয়াড়দের উল্লাস। ছবি: বাফুফে
Picture of সনৎ বাবলা

সনৎ বাবলা

> বসুন্ধরা কিংসের ব্রাজিলিয়ান রবসন রোবিনহোর দামের সমান মোহামেডানের চার বিদেশি।
>
মৌসুমে সাদাকালোর ১২ কোটি টাকা ফুটবল বাজেটের সাত-আট গুণ খরচ করে কিংস।

দুই দলের ফুটবলীয় খরচ কখনও কাছাকাছি হবে না। দুই তরফের শক্তিতে তাই লঘু-গুরু তফাৎ স্পষ্ট। মিলবে না দুই ক্লাবের ফুটবল মানসিকতাও। ঐতিহ্য হারিয়ে নিজেদের খুঁজে ফিরছে সাদাকালোরা। বসুন্ধরা কিংস গড়ছে ঐতিহ্যের ভিত।

এমন যোজন যোজন ব্যবধান ঘুচিয়ে মোহামেডান কী করে চ্যালেঞ্জ জানায় বসুন্ধরা কিংসকে! শুধু সমানে সমান লড়াই নয়, সাদাকালোর স্মরণীয় জয় রাঙিয়ে যায় মিনহাজের দুর্দান্ত গোলে। এরকম কঠিন ম্যাচে এত সুন্দর গোলই মানায়। শক্তিতে পিছিয়ে থাকা মোহামেডান কী চমৎকারভাবে উতরে গেছে মাঠের খেলায়। ৩১ ম্যাচ পর বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় স্বাগতিকদের অপরাজিত থাকার দম্ভ চূর্ণ করেছে।

চোখের সামনে দুর্গ ভেঙে যেতে দেখে মর্মাহত বসুন্ধরা কিংস সভাপতি ইমরুল হাসান। তবে সান্ত্বনা খুঁজে নেন অন্যভাবে, “একটা না একটা সময় তো এখানে (কিংস অ্যারেনায়) আমাদের হারতেই হতো। মোহামেডানের মতো ঐতিহ্যবাহী দলের কাছে হেরেছি…।” ১-০ গোলের হারে কিংস অ্যারেনায় বিষাদের ছায়া নেমেছে, আত্মসম্মানে ঘা লেগেছে তবে জমে উঠেছে প্রিমিয়ার লিগ। ১৪ পয়েন্ট নিয়ে মোহামেডান নিঃশ্বাস ফেলছে ১ পয়েন্টে এগিয়ে থাকা কিংসের ঘাড়ে।

১২ কোটির সাদাকালো চমক

১৭ বছরের পেশাদার ফুটবল অধ্যায়ে লিগ শিরোপাহীন মোহামেডান দারুণভাবে আছে শিরোপা দৌড়ে। এর নেপথ্য কারিগর সাদাকালোর সাবেক তারকা আলফাজ আহমেদ। দলের কোচিংয়ে দায়িত্ব নিয়ে তিনি গত বছর ফেডারেশন কাপ জিতিয়েছেন।

এবার লিগে কিংসকে হারিয়ে চমক উপহার দিয়ে তিনি বলছেন, “শিরোপা অনেক দূরের চিন্তা। আমাদের পুরো মৌসুমের বাজেট ১২ কোটি টাকার মতো, এর সঙ্গে কিংসের তুলনা চলে না। তাছাড়া আমাদের দলে জাতীয় দলের কোনও ফুটবলার নেই। তরুণদের নিয়ে গড়া এই দল প্রতি ম্যাচে নিজেদের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করে। কোচিং স্টাফরা সাধ্যমতো কাজ করে তাদের মধ্যে ম্যাচ জয়ের ক্ষুধাটা জাগিয়ে রাখতে। বড় ম্যাচগুলো জিতলে ক্লাব ম্যানেজমেন্টও খুশি হয়, ভালো দল গড়ায় উৎসাহী হয়। আশা করি, এই ম্যাচ জেতার পর তাদের আস্থা আরও বাড়বে আমাদের ওপর।”

অথচ একসময় মোহামেডানের ফুটবলার ছাড়া জাতীয় দল কল্পনাও করা যেত না। তারা ছিলেন ঘরোয়া ফুটবলের একেক কীর্তিমান, নিজেদের পজিশনে ছিলেন সেরা। লাল-সবুজের মান যেমন তাদের হাতে ছিল তেমনি সাদাকালোর সুবিশাল ঐতিহ্যের রচয়িতাও তারা। ওই সময় জয় বিনা অন্য চিন্তা করারও সুযোগ ছিল না কায়সার হামিদ-সাব্বিরদের। সেই দল এখন জাতীয় ফুটবলারহীন! মাঝে মাঝে চমকে দিলেও তারকাহীন এই দল বড় স্বপ্ন দেখায় না, তাই সমর্থকদেরও বিশেষ মাতামাতি নেই। ঐতিহ্যবাহী সাদাকালো এভাবেই হয়ে গেল রঙচটা।

সাদাকালোর সাফল্যের রসায়ন

এই ক্ষয়ে যাওয়া দলও মাঝে মাঝে চমক দিয়ে যায়। সমর্থকদের চোখে স্বপ্নের আবির মাখিয়ে দেয়। তখন সাদাকালোকে নিয়ে ক্ষণিকের হুল্লোড় শুরু হয়। মোহামেডানের কোচ আলফাজ আহমেদ কিংস জয়ের পর দুই দলের তুলনার পাশাপাশি নিজেদের পারফরমেন্সকে ব্যাখ্যা করছেন এভাবে, “কিংস রবসনকে যা দেয়, সেই পরিমাণ অর্থ খরচ হয় আমাদের চার বিদেশির জন্য। দেশিরা বেশিরভাগই তরুণ। তারা এটাকে একটা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে। বড় ম্যাচে পারফর্ম করতে পারলে তারা পরের মৌসুমে বড় চুক্তি পাবে, হয়তো-বা কিংস থেকেই তারা বড় অফার পাবে। জাতীয় দলে ডাক পাবে। এজন্য কোনও চাপ না নিয়ে তারা নিজেদের উজাড় করে দেয় মাঠে।” এরপর কোচের অকপট স্বীকারোক্তি, “এটা স্বীকার করতে হবে, আমাদের দল ব্যালান্সড নয়। যা কিছু অর্জন খেলোয়াড়দের সর্বাত্মক চেষ্টা ও ক্লাবের অনুপ্রেরণার ফসল।”

কিংস অ্যারেনা জয়ের নায়ক মিনহাজুর আবেদীন রাকিব। ছবি: বাফুফে

এটা ক্ষয়ে যাওয়া মোহামেডান, খুঁজলে হয়তো তার অনেক খামতিই পাওয়া যাবে। তবে এই আক্ষেপ নিয়ে বসে না থেকে খেলোয়াড়রা যা আছে তা নিয়ে মাঠে নেমে সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে অসম্ভব সম্ভবের গল্প রচনা করছেন। তাদেরকে সাধুবাদ জানিয়ে ক্লাবের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ও সাবেক ফুটবল তারকা ইমতিয়াজ সুলতান জনি বলছেন, “আমরা তো ওরকম শক্তশালী দলও গড়তে পারিনি। বসুন্ধরা কিংস ও আবাহনীর কথা বাদ দিন, অন্য অনেক দলের চেয়েও শক্তিতে আমরা পিছিয়ে। এরপরও কোচ-খেলোয়াড়রা মিলে বিগ ম্যাচ জিতে আমাদের জন্য বড় আনন্দ বয়ে আনে।”

প্রতিপক্ষ কিংস হলেই বাড়তি অনুপ্রেরণা 

তাই বসুন্ধরা কিংসের বিপক্ষে সাদাকালোর জয়োল্লাস সপ্তমে ছুঁইয়ে যাওয়ার মতো। এক বছরে তারা দু-দুবার হারিয়েছে কিংসকে। গত বছর ৪ ফেব্রুয়ারি টানা চারবারের লিগ চ্যাম্পিয়নদের সেমিফাইনালে হারিয়ে  ফেডারেশন কাপের ফাইনালে ওঠেছিল তারা। এবার ৩ ফেব্রুয়ারি তাদের হারিয়েছে লিগে। চারবারের লিগ চ্যাম্পিয়নদের মুখোমুখি হলেই কি সাদাকালো শিবির বিশেষভাবে জেগে ওঠে?

মোহামেডান কোচের জবাব, “প্রত্যেক খেলোয়াড়ই চায় সব ম্যাচ জিততে। বড় দলের বিপক্ষে হলে সাধারণত তাদের বিশেষ মানসিক প্রস্তুতি থাকে। কারণ তখন ভালো খেললে সবার নজরে পড়া যায়।” সাদাকালোর এই বিশেষ প্রস্তুতিতেই ধরাশায়ী হয়েছে কিংস।

মোহামেডান কর্মকর্তা ইমতিয়াজ সুলতান জনির কাছেও কিংস ও আবাহনীর ম্যাচ সবসময় বিশেষ কিছু, “আমাদের দলের অবস্থা যা-ই হোক, মোহামেডান সবসময় কিংস ও আবাহনীর সঙ্গে দুটো ম্যাচকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। এই দুটো ম্যাচে ভালো করলে খেলোয়াড়রা যেমন আত্মবিশ্বাসী হয় পাশাপাশি ক্লাব ম্যানেজমেন্টও মনে করে, তাদের চেষ্টা বৃথা যায়নি।” ওই দুটো ম্যাচে মাঠে ও মাঠের বাইরে সবাই নিজেদের মতো করে সফল হতে চান।

মোহামেডানের ফেডারেশন কাপ জয়ের আনন্দ। ছবি: বাফুফে

বসুন্ধরা কিংস জন্মের পর থেকেই ঘরোয়া ফুটবলে অন্যতম সেরা দল। আর টানা চারবার লিগ জিতে একরকম একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের আগমনীতে ৬ বারের লিগ চ্যাম্পিয়ন আবাহনীর কর্তৃত্ব খর্ব হয়েছে ভীষণভাবে, লিগে কিংসের বিপক্ষে সাফল্য বলতে আছে মাত্র দুটো ড্র। অনেক ভালো দল নিয়েও তারা জিততে পারেনি কোনও ম্যাচ।

অন্যদিকে শক্তির তুল্যমূল্য বিচারে আধমরা মোহামেডানের দাঁড়াতে পারারই কথা নয় কিংসের সামনে। বাস্তবে কিন্তু চোখে চোখ রেখে লড়াই করে তারা। লিগে ৯ বারের মুখোমুখিতে তাদের একটি জয় ছাড়া দুটো ড্র আছে। এই রেকর্ড সাদাকালোর অমন দাপটের সাক্ষ্য না দিলেও মোহামেডানের বিপক্ষে বেশ বেগ পেতে হয় অস্কার ব্রুজনের কিংসকে।

পরিশেষে

বেগ আর আবেগ যাই বলুন, ঘরোয়া ফুটবলে একটা আকর্ষণীয় মোড়কে দাঁড়িয়ে গেছে এই কিংস-মোহামেডান ম্যাচ। এ প্রসঙ্গে ইমতিয়াজ সুলতান জনি নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করেন এভাবে, “ফুটবলে একেকটা প্রতিপক্ষের প্রতি একেক রকম দুর্বলতা কাজ করে প্রত্যেক দলের। যেমন একটা সময় মোহামেডান বেশ ভয় পেত ওয়ান্ডারার্স ও রহমতগঞ্জকে। সেরকম আবাহনীর বেলায় ছিল দিলকুশা ও ওয়ারি। ওয়ারির সঙ্গে খেলা পড়লেই ঘাম ছুটে যেত আবাহনীর। বলাই হতো ‘ওয়ারি আইলো’। মোহামেডান-কিংসে অমন কিছু হলে খারাপ কী!”

মোটেও খারাপ নয়। চ্যাম্পিয়নরা কোনও এক জায়গায় ঠেকবে। চাপে পড়বে। সুবাদে ফুটবলটা মোহনীয় হবে। হালের নতুন রব হতে পারে ‘মোহামেডান আইলো…।’

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত