Beta
রবিবার, ৩ মার্চ, ২০২৪

কলাম

মোনালিসার জন্য মিষ্টি কুমড়োর স্যুপ

২৮ জানুয়ারি ২০২৪ মোনালিসার দিকে মিস্টি কুমড়োর স্যুপ ছুড়ে মারেন দুই প্রতিবাদকারী।

ছবির মানুষ চাইলেই কি ফ্রেম থেকে বেরিয়ে দেয়াল বেয়ে নেমে এসে বলতে পারে— স্যুপ খেতে ইচ্ছে করছে, মিষ্টি কুমড়োর স্যুপ!

পারে না বলেই তো স্যুপ নিয়ে ছবির কাছে যেতে হয়। প্যারিসের তরুণ বিপ্লবীরা তাই তো করেছেন। লক্ষীন্দরের লোহার বাসরঘরে তো একটি ফুটো ছিল, মোনালিসার বুলেটপ্রুফ ঘরে যে তাও নেই।

বহুদিন পর মিষ্টি কুমড়োর স্যুপ ছুড়ে দিয়ে বরং মোনালিসার কষ্টটাকে আরও বাড়িয়ে দিল। পাথরের চোখ থেকে অশ্রু নেমে আসার মতো বুলেটপ্রুফ ঢাকনা বেয়ে স্যুপ গড়িয়ে পড়বে, মোনালিসা দেখবে কিন্তু একটু চাটতেও পারবে না। ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ মোনালিসার দিকে স্যুপ ছুড়ে মারেন দুই প্রতিবাদকারী। তারা ‘স্বাস্থ্যকর ও টেকসই খাদ্য অধিকার’-এর দাবি জানাতে এই পথটি বেছে নিয়েছেন। তারা বলেছেন, তাদের কৃষি ব্যবস্থা অসুস্থ। ২০২২-এর অক্টোবরে এক প্রতিবাদকারী মোনালিসার দিকে কেক ছুঁড়ে মেরেছিলেন। এটাও সত্য যে মোনালিসা কেক খান না কতো বছর! তিনি মানুষকে ‘পৃথিবীর কথা ভাবার’ আহ্বান জানাতে কেক নিক্ষেপ পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন।

১৯৫০ এর দশকে একজন ক্ষুব্ধ মোনালিসা দর্শক চিত্রকর্মটির দিকে কেন যে অ্যাসিড ছুড়েছেন তিনিই ভালো জানেন। স্যুপ, কেক চাওয়ার একটা যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু মোনালিসা কেন এসিড চাইতে যাবেন। ১৯৫৬ সালে এই দুষ্কৃতকারী মোনালিসার গায়ে এসিড নিক্ষেপ করে, একই বছর ডিসেম্বরে কেউ একজন পাথর ছুড়ে ছবির মোনালিসার গায়ে। মোনালিসার কনুইর দিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসিড নিক্ষেপের কারণেও ছবিটির ক্ষতি হয়। সেবার মোনালিসা আঘাত পেয়েছেন, ভাগ্যিস সে এসিডের তীব্রতা তেমন বেশি ছিল না। তারপরই মোনালিসাকে আরও সুরক্ষিত করার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটতে থাকে।

জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ১৯৭৪-এর এপ্রিলে মোনালিসাকে বুলেট প্রুফ কাচের আস্তরণে ঢেকে দেয়। অভিযোগ ছিল,  মোনালিসাকে অস্বচ্ছ দেখাচ্ছে। ২০১৯-এ কোভিডের বিশ্ব-সংক্রমণের আগে অধিকতর স্বচ্ছ বুলেটব্রুপ গ্লাস পুরোনোটাকে প্রতিস্থাপন করে। আর ২০০৫ সালে মোনালিসাকে জাদুঘরের বর্তমান অবস্থানে আনা হয়। মোনালিসার এই আবাসটিকে  কেউ কেউ বলে থাকেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ক্ষুদ্র কারাগার।

অবশ্য, এসিড, কেক বা মিষ্টি কুমড়োর স্যুপ ছুড়ে মারা কাণ্ডই কেবল নয় মোনালিসাকে সাক্ষী রেখে হননকাণ্ডও ঘটেছে। ১৮৫২ সালে ছবির মোনালিসার প্রেমে পড়ে এক যুবক উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। ১৯১০ সালে একজন মোনালিসার ছবির দিকে তাকিয়ে নিজেকে গুলি করে।

মোনালিসা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রকর্ম কিনা এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে কিন্তু ছবির যে বীমামূল্যের হিসেব তাতে পৃথিবীর কোনও জাদুঘরে আর কোনও শিল্পীর গ্যালারিতে থাকা কোনও ছবি একে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা

মোনালিসা কিন্তু ক্যানভাসে আঁকা তেলরঙ  ছবি নয়। দ্য ভিঞ্চি মোনালিসা ছবিটি এঁকেছেন ৭৭ সেন্টিমিটার/৫৩ সেন্টিমিটার মাপের একটি পপলার কাঠের তক্তার উপর। তখন চিত্রশিল্পে ক্যানভাসের যথেষ্ট ব্যাবহার থাকলেও ছোট মাপের কাজের জন্য রেনেসাঁ গুরুদের অনেকেই কাঠের আশ্রয় নিয়েছেন।

লিওনার্দো তাঁর আঁকা ছবিটির কোনও নাম দেন নি। ইতালিতে এটি পরিচিত হলো ‘লা গিয়োকোন্দা’ নামে, ফ্রান্সে ‘লাই ইয়োকেন্দে’ এবং ইংরেজিভাষী পৃথিবীতে ‘মোনা লিসা’ নামে।

ছবি আঁকার সময় এই নারীকে প্রফুল্ল রাখতে লিওনার্দো বাদকদল নিয়োজিত করেছিলেন। এমন ভাষ্যও রয়েছে যে শিল্পী তার এই মডেলকে এতটাই ভালোবেসে ফেলেছিলেন যে ছবিটি হাতছাড়া করতে চান নি। মোনালিসার হাসি নিয়েও অভিসন্দর্ভ রচিত হয়েছে। শিল্পবোদ্ধা এক চিকিৎসক জানিয়েছেন এই হাসিতে প্রকাশ পাচ্ছে এই নারী অন্তঃসত্ত্বা।

১৯১১ সালে যখন মোনালিসা চুরি হয়ে যায়, ল্যুভ মিউজিয়ামে মোনালিসার শূন্যস্থানটি  দেখার জন্য প্যারিসে দেশি ও বিদেশি মানুষের ঢল নামে।

মোনালিসা নেই

মানুষ ভাবতে শুরু করে ছবি না থাকলেও  মোনালিসার আত্মা তখনও সেখানে বিরাজমান। মোনালিসার সাথে বিচ্ছেদ ফ্রান্সকে শোকগ্রস্ত করে তোলে। প্রায় দু’বছর প্যারিস রয়ে যায় শোকের শহর। একজন নারীর ছবির জন্য প্যারিস কাঁদছে, যে নারী আদৌ ফ্রান্সের নয়, ইতালির।

এই ছবিটি ১৯১১-র ২১ আগস্ট জাদুঘর থেকে চুরি হয়, সন্দেহভাজন চোরদের মধ্যে কবি গিওম আপোলিনেয়ারের নামও আসে, তিনি গ্রেফতার হন। তাঁর জবানবন্দির  রেশ ধরে বন্ধু পাবলো পিকাসোকেও গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁদের দুজনকেই অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

৪ জানুয়ারি ১৯১৪-তে উদ্ধার হওয়া ছবিটি আবার ল্যুভ মিউজিয়ামে ফিরে আসে। এই চুরির পরই বিশ্বব্যাপী মোনালিসা ঝড় ওঠে, পরিচিতি বাড়তে থাকে। এই চুরি ও বিশ্বব্যাপী অনুসন্ধান এবং মোনলিসার জন্য দীর্ঘশ্বাস ছবিটির খ্যাতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

মোনালিসার সন্দেহভাজন দুই চোর: গিওম আপোলিনেয়ার এবং পাবলো পিকাসো

১১ আগস্ট ১৯১১ প্যারিসের ল্যুভ জাদুঘরের গ্যালারি থেকে গায়েব হয়ে গেল মোনালিসা। সেদিন কেউ জানলই না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকতা গার্ডদের সঙ্গে কথা বললেন। জানতে চাইলেন ফটোগ্রাফির জন্য কখন ছবি নামানো হয়। গার্ডদের সঙ্গে কথা বলে তার মনে হলো, ছবিটি ফটোগ্রাফারদের কাছে। কয়েক ঘণ্টা পর তিনি আবার এলেন, ছবিটি না দেখে তিনি শাখাপ্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখলেন, মোনালিসা ফটোগ্রাফারদের কাছে নেই। সঙ্গে সঙ্গে খোঁজ শুরু হয়ে গেল, কিন্তু কোথাও নেই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা।

ল্যুভ পরিচালক তখন ছুটিতে, দ্বিতীয় প্রধান মিসরীয় অ্যান্টিক বিভাগের কিউরেটর ঘটনাটি জানলেন। তিনি পুলিশ ডাকলেন। প্রায় ৬০ জন অনুসন্ধানকারীকে পুরো জাদুঘর তল্লাশির হুকুম দেওয়া হলো। সেদিনের দর্শকরা জেনে গেল, মোনালিসা সত্যিই চুরি হয়ে গেছে।

সবার আগে ফরাসিরা দোষ দিল জার্মানদের। তাদের নৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য জার্মানরা চুরি করিয়েছে। জার্মানরা বলল, কাজটা ফরাসিদেরই; আন্তর্জাতিক বিষয় থেকে দৃষ্টি সরাতে নিজেরাই করেছে। প্যারিসের পুলিশের তিনটি অভিমত: এটি রাজনৈতিক নয়, তবে ল্যুভের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে নাশকতামূলক হতে পারে; অসন্তুষ্ট কোনও ল্যুভ কর্মচারী কিংবা কোনও বাতিকগ্রস্ত কেউ কাজটা করেছেন। অথবা আর্থিক লাভের জন্য সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায়ের জন্য মোনালিসা চুরি করা হয়েছে।

তারপর দুই বছর কেটে যায়। মোনালিসার কোনও খবর মেলে না।

ভিনসেনজোর জবানবন্দি

আমার নাম ভিনসেনজো পেরুজ্জিয়া, জন্ম ৮ অক্টোবর ১৮৮১, দুমেনজা (কোমো)-তে …আমি লিখতে ও পড়তে জানি, আমি এলিমেন্টারি স্কুলে থার্ড গ্রেড পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি।  আমি দুবার ল্যুভ জাদুঘরে কাজ করেছি। প্রথমবার ১৯০৯ এবং দ্বিতীয়বার ১৯১০ সালে। প্রতিবারই তিন-চার মাস করে কাজ করেছি। আমি ক্যানভাস পরিষ্কার করে কাচের নিচে ছবি রাখতে সাহায্য করতাম।

সে সময় জানতে পারি, ল্যুভ জাদুঘরের অনেক পেইন্টিং ইতালি থেকে চুরি করা। সেই মুহূর্ত থেকেই আমার মধ্যে একটি বাসনার জন্ম হয়, আমি ক্ষুব্ধ ও বঞ্চিত বোধ করতে থাকি— ইতালিতে প্রোথিত আমার অহংকার, আমার মনে হয় এমন একটি পেইন্টিংও আমি যদি ইতালিকে ফিরিয়ে দিতে পারতাম!

আগস্ট মাসের এক সকালে শ্রমিকের সাদা ঢিলা আলখাল্লা পরে, আমি ল্যুভে আসি;  পেছনে সিন নদীর দিক থেকে খোলা দরজা দিয়ে আমি শ্রমিকদের সঙ্গে ভেতরে ঢুকে যাই। আমি ভেতরে যেতে থাকি। তারপর দেখি, আমি বর্গাকার একটি হলরুমে (স্যালন ক্যারে), কোনও রকম পূর্ব-পরিকল্পনা ছাড়াই আমার নজর পড়ে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা গিয়োকোন্দার ওপর।

গিয়োকোন্দার ছবিটি দুটি হুকের ওপর বসানো ছিল। ছবিটি ওপরের দিকে তুলতেই  দেয়াল থেকে সরে আসে। তারপর আমি সাত মিটার কক্ষ সংলগ্ন সিঁড়িঘরে লুকিয়ে স্ক্রুগুলো খুলে ছবিটা বের করে নিই। ফ্রেমটা সেখানে ফেলে রেখে ছবিটা আমার ঢিলা  পোশাকের ভেতর ঢুকিয়ে বাইরের আঙিনায় চলে আসি। প্রহরী কক্ষ থেকে বেরোনোর দরজায় অন্যদের নিয়ে ব্যস্ত ছিল, আমাকে লক্ষ করেনি। আমি তখন বাড়ি চলে আসি।   কোথাও না লুকিয়ে ছবিটি বাড়িতে রেখে রাস্তায় অন্য একটি বাড়িতে কাজে চলে আসি।

কুরিয়ার দেল্লা মেরা কাগজে ফ্লোরেন্সের অ্যান্টিক ব্যবসায়ী জেরি সাহেবের ঠিকানা পেয়ে আমি তাকে লিখলাম, উফিজি জাদুঘর গিয়োকোন্দা কিনতে পারে, তিনি যোগাযোগ করে দেখতে পারেন। তিনি বললেন, আমি যদি ছবিটাকে ফ্লোরেন্সে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে আমার প্রস্তাব গৃহীত হতে পারে। লিখে আমি জানালাম,  ফ্লোরেন্সে আসতে পারি। যদি কাজটা তাড়াতাড়ি সারতে চাই, সে ক্ষেত্রে ফ্লোরেন্স ছাড়া অন্য কোনও শহর পছন্দ করলেও তার আপত্তি নেই বলে জেরি জানালেন। আমি জানালাম, প্রথমে আমি মিলান যাচ্ছি, সেখানে গিয়েছি; কিন্তু সেখানে থাকাটা আমার পছন্দ হয়নি, আমি জেরিকে টেলিগ্রাম করে জানালাম, ফ্লোরেন্সেই আসছি। ঘণ্টা দুয়েক মিলানে থেকে আমি বুধবার সকাল ১১টায় পৌঁছি।

ফ্লোরেন্সে ঢুকে ত্রিপোলি হোটেলটা দেখতে পাই, সেখানে রুম নিই; জেরি সাহেবকে  পেতে একটু তাড়াহুড়ো করি। আমি তাকে পাই এবং বলি যে ছবিটি আমার কাছে আছে। যিনি ছবিটি কিনবেন, তার সঙ্গে কথা বলার জন্য সময় চেয়ে পরদিনের জন্য আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করা হয়। ইতালিকে গিয়োকোন্দা ফিরিয়ে দেওয়ার কারণে আমি পুরস্কৃত হওয়ার কথা বলি, কিন্তু টাকার অঙ্কে আমি তা স্থির করিনি।  জেরি আমাকে পাঁচ লাখ লিরা (প্রায় পাঁচ হাজার পাউন্ড) চাওয়ার পরামর্শ দিলেন। কারণ যিনি ছবিটি কিনবেন, বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে পাবেন। কাজেই আমার পুরস্কারটি পেতে পারি। তারা ছবিটি দেখতে চান, আমি তাদের হোটেল ত্রিপোলিতে নিয়ে আসি, তখনও যেহেতু বাইরে পর্যাপ্ত আলো, ছবিটি নিয়ে উফিজি গ্যালারিতে আসতে বললেন। আমি তা-ই করি, আমরা তিনজন সরাসরি উফিজিতে চলে আসি।

সেখানে অধ্যাপক পোজ্জি ও বিশেষজ্ঞ ফটোগ্রাফার সম্মত হন যে এটা সত্যিকারের  মোনালিসা। আমি ছবি সেখানে রেখে আসি এবং সম্মত হই, পোজ্জি রোমে তার বস রিক্কিকে লিখবেন। তিনি এসে আমার পুরস্কার ঠিক করবেন। এসব ঘটেছে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় (১২ ডিসেম্বর), ততক্ষণে রাত হয়ে যায়।

পরদিন আমি দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করি, আমি আবার জেরির সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করি। আমি তাকে বাড়িতে পাইনি। জেরির পক্ষে তার ছেলে আমাকে জানায়, তার বাবা ফিরেছে; কিন্তু এখন দেখা করা যাবে না। আমাকে ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত হোটেলে থাকতে বলেছেন, আমাকে ফোন করা হবে।

৫টা বেজে গেল; কিন্তু কেউ না আসায় আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এ সময় আমি গ্রেপ্তার হই।

জেরির বর্ণনায় মোনালিসা উদ্ধারের ঘটনা

জেরির বর্ণনা অনুযায়ী কাঠের ট্রাংকের নিচের ডেকে লাল সিল্কের আস্তরণে অত্যন্ত যত্ন করে মোনালিসাকে রাখা হয়েছিল। কয়েক দফা পত্রালাপের পর ছবিটি দেখে যথার্যতা যাচাই করে উফিজি জাদুঘরের জন্য কিনতে সম্মত হন। নির্ধারিত তারিখের আগেই জেরির ফ্লোরেন্সের অফিসে হাজির হন সেই কথিত ‘লিওনার্দো’।

জেরি বললেন, এক যুবক, সরু কালো গোফ ভদ্রোজনিত পোশাক পরণে আমার অফিসে এসে হাজির হলেন এবং বললেন, গিয়োকোন্দা তার কাছে আছে। তার সাথে হোটেলে গেলে ছবিটা দেখাতে পাব।

তিনি খুব নিশ্চয়তার সাথে আমার প্রশ্নগুলোর জবাব দিলেন এবং ছবির জন্য ৫ লক্ষ লিরা দাবি করলেন। আমি তাকে জানালাম যে আমি তার চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে প্রস্তুত এবং তাকে পরের দিন বিকেল ৩.০০টায় আসতে অনুরোধ করলাম।

পরদিন তিনটার মধ্যে উফিজি পরিচালক জিওভান্নি পোজ্জি আমার অফিসে হাজির। ৩টা ১০ মিনিটেও তিনি এলেন না। ব্যবসাটা কি হাতছাড়া হয়ে গেল? আমরা অধৈর্য হয়ে উঠলাম। শেষ পর্যন্ত ৩টা ১৫ মিনিটে ‘লিওনার্দো’ এলেন। আমি পোজ্জিকে ‘লিওনার্দো’র সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। দু’জন খুব উৎসাহের সাথে হাত মেলালেন। ‘লিওনার্দো’ তাকে বললেন, ফ্লোরেন্সের শিল্প গৌরব পিতার মতো যিনি রক্ষা করে চলেছেন এমন একজন মানুষের সাথে হাত মেলাতে পেরে তিনি অনেক খুশি হয়েছেন।

এ ঘটনায় ভিনসেনজো পেরুজ্জিয়ার এক বছর ১৫ দিন কারাদণ্ড হলে আপিল করার পর তা কমিয়ে সাত মাস করা হয়। 

ভিনসেনজো পেরুজ্জিয়া (জন্ম ৮ অক্টোবর ১৮৮১-মৃত্যু ৮ অক্টোবর ১৯২৫)। মোনালিসা চুরি করার দুই বছর আগে পুলিশের তোলা ভিনসেনজোর ছবি।

পেশাগত জীবনে ভিনসেনজোও শিল্পী— পেইন্টার ডেকোরেটর। কারামুক্তির পর প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ইতালির সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধ শেষ হলে বিয়ে করেন, ক্যালেস্তিনা নামের এক কন্যার জনক হন। সপরিবার ফ্রান্সে এসে জন্মকালীন নাম পিয়েত্রো পেরুজ্জিয়া হিসেবে বসতি স্থাপন করেন। পেইন্টার ডেকোরেটর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। ৪৪তম জন্ম দিনে তার মৃত্যু হয়।

ইতালিয়দের কাছে ভিনসেনজো পেরুজ্জিয়া এখনো দেশপ্রেমিক হিসেবেই সমাদৃত।

যাকে নিয়ে এত এত কাণ্ড সেই মোনালিসা আজকাল স্যুপ আর কেক খাচ্ছে! চিন্তা হয়— কোনও অতিন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী কেউ বুলেটপ্রুফ কাঁচের বাধা ডিঙ্গিয়ে মোনালিসাকে না আবার প্রেগন্যান্ট বানিয়ে ফেলে!

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক।
ইমেইল: momen98765@gmail.com

আন্দালিব রাশদী। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার
ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist