Beta
রবিবার, ৩ মার্চ, ২০২৪

মোতি মহল: বাটার চিকেন নিয়ে ভারতের রসুইঘরের লড়াই

মোতি মহল রেস্তোরায় তৈরি বাটার চিকেন

টমেটো-দইয়ের ঘন ঝোল, সঙ্গে মাখন ও মৃদু মসলার সুগন্ধে ভরা বাটার চিকেন। রহস্য উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী থেকে শুরু করে কোথায় নেই খাবারের এই পদের নাম। অসংখ্য রেস্তোরাঁর মেনু তালিকায় গ্রাহকদের পছন্দের শীর্ষেই আছে এর অবস্থান।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে পদটি বেশ পরিচিত। মজার বিষয় হলো- খাবারটি প্রথম কে তৈরি করেছেন, তা নিয়ে চলছে জটিল এক আইনি লড়াই।

গত সপ্তাহে জনপ্রিয় এই খাবারের উৎপত্তি নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে একটি মামলা হয়। মামলাটি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী রেস্তোরাঁ এবং পরিবারের মধ্যে চলমান। তারা প্রত্যেকে ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত মোতি মহল রেস্তোরাঁর উত্তরাধিকারী বলে দাবি করছেন। একই সঙ্গে তারা নিজেদের এই খাবারের উদ্ভাবক বলেও প্রমাণ করতে চাইছেন।

মূল রেস্তোরাঁর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন কুন্দন লাল গুজরালের পরিবার মামলাটি করেছে। তাদের দাবি, গুজরাল এই পদটি তৈরি করেছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী রেস্তোরাঁ চেইন দরিয়াগঞ্জকে মিথ্যাভাবে এর কৃতিত্ব নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।

মামলায় কুন্দন লালের পরিবার দরিয়াগঞ্জের কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার রুপি ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। পাশাপাশি পরিবারটি আরও দাবি করেছে, মাখন এবং ক্রিম দিয়ে ডাল মাখানি তৈরি করেনি দরিয়াগঞ্জ।

১৯৪৭ সালে মোতি মহল রেস্তোরাঁ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত মূল দল

কীভাবে বাটার চিকেনের উৎপত্তি, তা নিয়ে অসংখ্য গল্প চালু আছে। কিন্তু সব গল্পেই আছে মোখা সিং নামের একজন ব্যক্তির নাম। তিনি এবং তার তিন কর্মচারীর হাত ধরে উপমহাদেশে তিনটি রেস্তোরাঁর সৃষ্টি হয়েছে, এমন কথাও শোনা যায়।

বিশিষ্ট রন্ধনশিল্পী ও খাদ্য লেখক সাদাফ হুসেইনের মতে, স্বাধীনতাপূর্ব ভারতের পেশোয়ারের (বর্তমানে পাকিস্তানে) এক গলিতে মোতি মহল নামে একটি রেস্তোরাঁ চালাত মোখা সিং। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর সিং ও তার কয়েকজন হিন্দু কর্মচারী পেশোয়ার থেকে পালিয়ে দিল্লিতে চলে যান। তখনই সিংয়ের সঙ্গে তার পেশোয়ারের কর্মচারীদের যোগাযোগ ছিন্ন হয়।

দিল্লির এক মদের দোকানে একদিন কুন্দন লাল গুজরাল, তার চাচাতো ভাই কুন্দন লাল জাগ্গি এবং ঠাকুর দাস মাগো দেখা করেন মোখা সিংহের সঙ্গে। তারা তাকে দিল্লিতে নতুন করে মোতি মহল রেস্তোরাঁ খুলতে রাজি করান।

হুসেইনের মতে, পুরনো দিল্লির দরিয়াগঞ্জ এলাকার এক সরু গলিতে তখন জন্ম হয় নতুন মোতি মহলের।

কতটা সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে একটি খাবারের পদ তৈরি করা যায়, এটাই ছিল শুরুর দিকের চ্যালেঞ্জ। ফলে তারা উদ্বৃত্ত থাকা টিক্কার সঙ্গে টমেটোর গ্রেভি (রসা) ও মাখন মিশিয়ে তৈরি করলো নতুন একটি পদ। বিস্ময়করভাবে সেসময় পদটি মানুষের মন জয় করে নেয়।

মাত্র এক বছরের মধ্যে খাবারটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু হয়ে ওঠেন মোতি মহলের প্রতিদিনের খদ্দের। নিউ ইয়র্ক টাইমসে মোতি মহলকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, “বারান্দায় তখন শান্তি চুক্তির খসড়া তৈরি হচ্ছিল। আর মৌলানা আজাদ ইরানের শাহকে বলছিলেন, ভারতে থাকাকালীন তিনি যেন অবশ্যই দুটি স্থানে যান। একটি তাজমহল, অন্যটি মোতি মহল।”

মোতি মহল রেস্তোরাঁয় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কুন্দন লাল জাগ্গি

দীর্ঘদিন ধরেই কুন্দন লাল গুজরাল সফলতার সঙ্গে ব্যবসাটি চালাচ্ছিলেন। তৎকালীন পত্র-পত্রিকায় তাকে ‘স্থুলকায় শক্তিশালী শ্মশ্রুমণ্ডিত’ চেহারার মানুষ বলে প্রায়ই অভিহিত করা হতো।

কিন্তু তার মৃত্যুর পর সবকিছু বদলে যায়। আর্থিক সংকটের কারণে ১৯৬০ সালে গুজরাল পরিবার মোতি মহলকে লিজ দেন। তখন রেস্তোরাঁটি চলে যায় অন্য এক পরিবারের হাতে।

অবশ্য এর কয়েক বছর বাদে গুজরালরা নতুন এক চেইন রেস্তোরাঁ শুরু করে। নাম দেন মোতি মহল ডিলাক্স। গোটা দিল্লি শহরে তারা এই নামে রেস্তোরাঁ খোলেন।

কিন্তু ২০‍১৯ সালে তাদের জন্য আরও একটি ধাক্কা অপেক্ষা করছিল। সে বছর দ্বিতীয় অংশীদার কুন্দন লাল জাগ্গির নাতি ‘দরিয়াগঞ্জ’ নামে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী রেস্তোরাঁ চেইন শুরু করেন। তিনি ‘বাটার চিকেন’ এবং ‘ডাল মাখানির উদ্ভাবক’ বর্ণনা যোগ করে ট্রেডমার্ক করিয়ে নেন।

দরিয়াগঞ্জের মালিকরা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, গুজরাল যদিও মোতি মহলের সর্বেসর্বা ছিলেন, কিন্তু জাগ্গি রান্নাঘর সামলাতেন। বাটার চিকেনের সৃষ্টিও তার হাত ধরেই।

গুজরালরা এই দাবি অস্বীকার করে বলেন, জাগ্গি ছিলেন কণিষ্ঠ অংশীদার। রান্নার পদ তৈরির ক্ষেত্রে তার কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল না। পেশোয়ারে থাকাকালীনই গুজরাল বাটার চিকেন পদটি তৈরি করেছিলেন বলেও তারা দাবি করেন।

এই দ্বন্দ্ব বর্তমানে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। দরিয়াগঞ্জের বিরুদ্ধে মামলাকারী কুন্দন লাল গুজরালের নাতি সম্প্রতি রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, “আপনি চাইলেই কারো উত্তরাধিকার কেড়ে নিতে পারেন না।”

ডানে কুন্দন লাল গুজরাল, বায়ে কুন্দন লাল জাগ্গি

একটি খাবারের পদ নিয়ে আদালত পর্যন্ত যাওয়ার ঘটনা কিন্তু এটাই প্রথম নয়।

রসগোল্লার উৎপত্তি কোথায়, এনিয়ে উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে আইনি লড়াই হয়েছিল। ২০১৮ সালে ভারতের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর বাংলার পক্ষে রায় দিয়ে বিষয়টির মীমাংসা করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রন্ধনশিল্পীরা তাদের রেস্তোরাঁ ও উদ্ভাবিত পদকে মেধাস্বত্ত্ব আইনের আওতায় আনতে চাইছেন। অবশ্য এখন পর্যন্ত এমন কোনও মামলা আদালতে গড়ায়নি।

খাদ্য লেখক বীর সাংভির মতে, এ ধরনের ঝামেলা সাধারণত বাণিজ্যিক প্রকৃতির। এর সঙ্গে গ্রাহকদের খুব একটা সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, “মানুষ রেস্তোরাঁয় তাদের পছন্দসই খাবার খেতে আসে। কয়েক দশক আগে কে সেটা উদ্ভাবন করেছিল, সে সম্পর্কে তাদের তেমন কিছুই আসে যায় না।”

তিনি আরও বলেন, “কখনও কখনও খাবারগুলো এতো জনপ্রিয় হয়ে যায় যে তাদের উদ্ভাবক কে, তা ভুলে যাওয়া হয়। প্রথম মাসালা দোসা কে তৈরি করেছিলেন? কেউ বলেন উডল্যান্ডস রেস্তোরাঁ চেইন এটা তৈরি করেছিল। এবিষয়ে অন্যদের মতবিরোধ আছে। কিন্তু এসব নিয়ে কেউই গভীরভাবে খোঁজ করার মতো আগ্রহী নয়।”

খাদ্য লেখক হুসেইনও এবিষয়ে একমত। তার মতে, খাবার কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়, তা সত্যিই জাদুকরী ব্যাপার। মানুষ স্থানান্তরিত হয়, সঙ্গে নিয়ে যায় তাদের রেসিপি। সেগুলো আবার স্থানীয় খাবারের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

তিনি উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। সেখানে গ্লাসগোর এক পাকিস্তানি রেস্তোরাঁ মালিককে চিকেন টিক্কা মাসালার উদ্ভাবক হিসাবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু বিশেষ করে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর মালিকরা দাবি করে যে, তারাই ওই রেসিপি তৈরি করেছেন। আর অন্যরা বলছেন, মাসালা ব্রিটেনে উদ্ভাবিত নয়, হয়েছে পাঞ্জাবে।

তামিল নাড়ুতে মোতি মহল ডিলাক্স রেস্তোরাঁর একটি শাখা

আর এ কারণেই হুসেইন মনে করেন, বাটার চিকেন নিয়ে লড়াই করা নিরর্থক। কারণ খাবারটি এখন একটি নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁর গণ্ডি পেরিয়ে সবখানে পাওয়া যাচ্ছে। এর উদ্ভাবক অবশ্যই কৃতিত্বের দাবিদার। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কে ভালো মানের বাটার চিকেন পরিবেশন করে।

মোতি মহলের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্ভবত আরও জটিল। কারণ ঝামেলাটি এই রেস্তোরাঁ কি বাটার চিকেন তৈরি করেছে, সে বিষয়ে নয়। বরং এর মালিকদের মধ্যে কে এর উদ্ভাবনে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন সে বিষয়ে।

এবিষয়ে সাংভি বলেন, “এটি তাদের পিতামহের উত্তরাধিকারের জন্য লড়াইরত দুই ব্যক্তির গল্প। এসব বিরোধ নিষ্পত্তি করা অনেক কঠিন।”

আইনজীবীদের মতে, আদালতকে ‘পারিপার্শ্বিক তথ্য প্রমাণ’ এবং কয়েক দশক আগে খাবারটি খেয়েছিলেন এমন মানুষের সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু তারপরেও, বিচারকরা কীভাবে নির্ধারণ করবেন প্রথম কে এই খাবারটি তৈরি করেছিলেন?

এমন হতে পারে যে, অংশীদারদের মধ্যে কেউ রেসিপিটি হাতে লিখে রেখেছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাও প্রকাশ্যে আসেনি। দরিয়াগঞ্জের মালিকরা যদি বাটার চিকেন উদ্ভাবনের দাবি প্রত্যাহার করেও নেন, তবু তাদের ব্যবসায় কোনও প্রভাব পড়বে না। আর মোতি মহলও একইভাবে চলতে থাকবে বলে জানান সাংভি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist