Beta
সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৪

ত্বকী হত্যার বিচার শুরু হবে কবে

তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী খুন হয়েছেন ১১ বছর হলো।
তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী খুন হয়েছেন ১১ বছর হলো।

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলায় বিচার শুরু হয়ে রায়ও হয়ে গেছে। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সাবেক মন্ত্রীর জামাতা র‌্যাব কর্মকর্তারও। তার এক বছর আগে তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী খুন হলেও সেই মামলাটি এখনও বিচারের জন্য ওঠেনি আদালতে।

এই কিশোরকে হত্যায় জড়িত সন্দেহভাজনদের নাম সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ করলেও এখনও তদন্ত প্রতিবেদন দেয়নি র‌্যাব। ফলে বিচারও শুরু হয়নি।

ছেলে হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি নিয়ে ১১ বছর ধরে ঘুরছেন ত্বকীর বাবা নারায়ণগঞ্জের নাগরিক আন্দোলনের নেতা, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক রফিউর রাব্বি।

তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “র‌্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিল, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। এখন আর এটি নিয়ে তদন্তের কিছু নেই।

“র‌্যাব যদি মনে করে, তারা এমন একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করবে, যা থেকে ওসমান পরিবারের নাম বাদ দেবে, তাহলে মানুষ তাদের ওই প্রতিবেদন মানবে না, বরং চুনকালি দেবে।”

আজমেরী ওসমান নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সন্তান। তার বাবা প্রয়াত এ কে এম নাসিম ওসমান ছিলেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য। আজমেরির দুই চাচা এখনও সংসদ সদস্য। একজন শামীম ওসমান আওয়ামী লীগের এবং অন্যজন সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টির।

অভিযোগের তীর বরাবর আজমেরীর দিকে গেলেও তা প্রত্যাখ্যান করে শামীম দুই বছর আগে এক সভায় বলেছিলেন, ত্বকী হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করা হোক, সেটা তিনিও চান।

এদিকে ১১ বছরেও ছেলে খুনের বিচার না পেয়ে ত্বকীর মা রওনক রেহানা কথা বলার ভাষাই হারিয়ে ফেলেছেন।

এত বছরেও বিচার শুরু করতে না পারাটাকে ‘বিচারহীনতার উদাহরণ’ আখ্যায়িত করে রফিউর রাব্বি বলছেন, “প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ না দিলে এ হত্যার বিচার হবে না। এ বিচার হতে হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশই প্রয়োজন।”

এ লেভেলের ছাত্র ত্বকী ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ নগরীর শায়েস্তা খাঁ রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। এ লেভেলের পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে (২৯৭/৩০০) সারাবিশ্বে সর্বোচ্চ এবং রসায়নে (২৯৪/৩০০) বাংলাদেশে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু সেই ফল দেখতে পারেননি তিনি। নিখোঁজের দুদিন পর ৮ মার্চ সকালে শহরের পাঁচ নম্বর ঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর শাখা কুমুদিনী খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়।

এই হত্যাকাণ্ড তখন দেশজুড়ে ছিল আলোচনার বিষয়। বিচার দাবিতে নারায়ণগঞ্জে পালিত হয় হরতাল-মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি।

ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। তারা পাঁচজনকে গ্রেপ্তারও করে।

গ্রেপ্তার ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাতে আজমেরী ওসমানের নাম আসে।

এরপর আজমেরীর অফিসে অভিযান চালিয়ে ত্বকীর রক্তমাখা প্যান্ট উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল র‌্যাব।

হত্যাকাণ্ডের পরের বছর ২০১৪ সালে ৮ মার্চ র‌্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান সংবাদ সম্মেলন করে আজমেরী ওসমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ তুলে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিবেদন এখনও আদালতে জমা পড়েনি।

গত ১০ বছরে আদালতে ৭০টি শুনানির দিন পেরিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বাদীর আইনজীবী প্রদীপ ঘোষ।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, বিচারক তদন্ত কর্মকর্তাকে বার বার তাগিদ দিলেও অভিযোগপত্র জমা দিতে পারেনি র‌্যাবের কর্মকর্তা। এমনকি প্রতিবেদন জমার সম্ভাব্য সময়ও জানাতে পারেননি।

র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক তানভীর মোহাম্মদ পাশার কাছে সকাল সন্ধ্যা জানতে চাইলে তিনিও তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কোনও সময়ের কথা জানাতে পারেননি।

তিনি বলেন, র‌্যাব সদর দপ্তর এ মামলার তদন্তে সংযুক্ত হয়েছে, নানা নির্দেশনাও দিচ্ছে।

ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন ৮ মার্চ নানা কর্মসূচি পালন করে। এবারও সাংস্কৃতিক জোট ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের কর্মসূচি থাকছে। বুধবার সকালে ত্বকীর কবর জিয়ারতও করেন সংগঠনগুলোর নেতারা।

আজমেরী বারবার আলোচনায়

২০১৪ সালে ত্বকী হত্যাকাণ্ডে আজমেরীর নাম আসার পর আত্মগোপন করেন তিনি। তাকে ধরে এনে বিচারের মুখোমুখি করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

আজমেরী ওসমান।

তবে আজমেরীকে আর ধরা হয়নি; যদিও নারায়ণগঞ্জে এখনও তাকে দেখার কথা জানিয়েছেন অনেকেই।

সুশাসন জন্য নাগরিক-সুজনের জেলা সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আজমেরী গভীর রাতে শহরে বিকট শব্দে গাড়ি চালিয়ে মহড়া দেন, এটা পুলিশও দেখে। তার গাড়ির সঙ্গে থাকে বিশাল হোন্ডা বাহিনী।”

দিনের বেলায় প্রকাশ্যে না এলেও আজমেরীর নামে তার অনুসারীরা চাঁদাবাজি চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

“আজমেরীকে তার অনুসারীরা ‘হাজী সাহেব’ বলে ডাকে। আর ‘হাজী সাহেব’ পাঠিয়েছে বলেই সম্বোধন হয়। তার অনুসারীদের দখলে পোশাক কারখানার ঝুট সেক্টর,” বলেন ধীমান সাহা৷

২০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর হারুন অর রশীদ (বর্তমানে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার) নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেওয়ার পর আজমেরীকে প্রায় এক বছর দেখা যায়নি। ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর হারুন বদলি হওয়ার পর তিনি আবার ফিরে আসেন।

দেড় বছর আগে নারায়ণগঞ্জের একটি স্থানীয় দৈনিকে ত্বকী হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে আজমেরীর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেই পত্রিকা অফিসে হামলা হয়েছিল।

সেই ঘটনায় মামলা হলে কিছুদিন নীরব ছিল আজমেরীর অনুসারীরা। তবে গত বছর বন্দর উপজেলায় জমি দখল নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে আবার আলোচনায় আসে তারা।

এরপর নির্বাচনের আগে প্রায় প্রতিদিনই অনুসারীদের নিয়ে মোটরসাইকেলে আজমেরীকে দাপিয়ে বেড়াতে দেখেছেন শহরবাসী।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist