Beta
শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪

শান্ত কেমন অধিনায়ক

“এভাবে আসলে সাফল্য আসে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা লাগে।”- দুই-এক সিরিজের জন্য অধিনায়ক হলে লাভ-ক্ষতির হিসাব বুঝিয়েছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। যদি ‘দীর্ঘমেয়াদি’ সুযোগ আসে, কী করবেন- প্রশ্নটা এড়িয়ে না গিয়ে বরং স্পষ্ট গলায় বলে দিয়েছিলেন, “অবশ্যই চাই”।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠের সিরিজের আগে বলা কথাগুলো কি এখন মনে পড়ছে শান্তর? আর ভারপ্রাপ্ত কিংবা খণ্ডকালীন অধিনায়ক তিনি নন। একেবারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে জানানো হয়েছে বাংলাদেশের অধিনায়ক এখন শান্ত। এবং সব ফরম্যাটে।

সাকিব আল হাসানের চেয়ারে বসার তাপ-চাপ কি টের পেতে শুরু করেছেন তিনি? প্রশ্নটা শুনলে হয়তো শান্ত বলে উঠবেন, “এ তো আর নতুন কিছু নয় আমার জন্য।” সত্যিই তো। যে তিন ফরম্যাটের দায়িত্বভার তাকে দেওয়া হলো, সেই পথটা তার পাড়ি দেওয়া।

বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সব ফরম্যাটেই খেলেছেন তিনি। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে তিনি বলতেও পারেন- “সব ফরম্যাটেই জয় আছে আমার।”

হঠাৎই অধিনায়কত্ব

বিশ্বকাপের ঠিক আগে। ৫০ ওভারের বিশ্ব আসরে নামার আগে বাংলাদেশের শেষ ‘প্রস্তুতি’। নিয়মিত অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ছিলেন না নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওই সিরিজে। অধিনায়ক করা হয় লিটন দাসকে। প্রথম দুই ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার। তবে অসুস্থতার কারণে মিরপুরে শেষ ওয়ানডে থেকে তিনি ‘বিশ্রাম’ নিলে নতুন অধিনায়ক খুঁজতে হয় বিসিবিকে। ওই প্রথমবার জাতীয় দলে নেতৃত্বের পরীক্ষা দেন শান্ত।

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩। দিনটি নিশ্চয়ই স্মরণীয় হয়ে আছে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে প্রতিভার দ্যুতি ছড়ানো এই ব্যাটারের। এদিনই তার নেতৃত্বে প্রথমবার নামে বাংলাদেশ দল। কিউইদের বিপক্ষে তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে দিয়ে নতুন দুনিয়ায় তার পা রাখা। যদিও দলীয় পারফরম্যান্সে ওই ‘অভিষেক’ হয়তো মনেও রাখতে চাইবেন না শান্ত। কিউই বোলারদের দাপট ও নিজেদের ব্যাটিং ব্যর্থতায় হেরেছিল ৭ উইকেটে। অবশ্য অধিনায়ক শান্ত লড়েছিলেন একাই। বাংলাদেশের ১৭১ রানের ৭৬-ই করেছিলেন তিনি।

অর্থাৎ, নেতৃত্বের চাপ-তাপ পারফরম্যান্সে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না তার। বরং দল উল্টোরথে হাঁটলেও চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় লড়ে যেতে পারেন নিজের সর্বস্ব দিয়ে।

বিশ্বকাপে স্বপ্নছোঁয়া

বিশ্বকাপেও হঠাৎ লাল-সবুজের নেতৃত্বের ব্যাটন ওঠে নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে । এবারও নিয়মিত অধিনায়কের অনুপস্থিতিতে। তবে একটা জায়গায় নিজেকে ভীষণ সৌভাগ্যবান ভাবতে পারেন তিনি। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়াই যে কোনও ক্রিকেটারের জন্য বিশাল পাওয়া। আর সেই নেতৃত্ব যদি বিশ্বকাপে হয়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা ব্যাপার। শান্তর ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটে।

চোটের কারণে ভারত ম্যাচ থেকে ছিটকে যান সাকিব। তার অনুপস্থিতিতে মাত্র এক ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়া শান্ত বিশ্বকাপে পেলেন গুরুদায়িত্ব। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ হলেই যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়ে যায়। শান্তর নেতৃত্বে অবশ্য স্বাগতিকদের হারানো যায়নি। বিরাট কোহলির দুর্দান্ত ইনিংসে ভারত জেতে ৭ উইকেটে। এবার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেও অধিানয়ক শান্ত ব্যর্থ। আউট হয়েছিলেন মাত্র ৮ রানে।

বিশ্বকাপ মঞ্চে আরেকবার টস করার সুযোগ আসে শান্তর। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজেদের শেষ ম্যাচের আগে চোটে টুর্নামেন্টই শেষ হয়ে যায় সাকিবের। ওই ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার ভার বর্তে শান্তর কাঁধে। রাউন্ড রবিন লিগের শেষ ম্যাচটি অবশ্য শেষ হয়ে চরম হতাশায়। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩০৬ রানের সংগ্রহ দাঁড় করিয়েও লাল-সবুজ জার্সিধারীরা হেরেছিল ৮ উইকেটে। শান্তর ব্যাট থেকে এসেছিল ৪৫ রান।

ঘরের মাঠে টেস্ট পরীক্ষা

বিশ্বকাপে ভরাডুবি। ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজতে থাকে বাংলাদেশ। কিন্তু অধিনায়কই নেই। চোট কাটিয়ে উঠতে না পারায় সাকিব খেলবেন না। তাহলে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে নেতৃত্ব দেবেন কে? বিসিবি জানায়, সাদা বলের ক্রিকেটে নেতৃত্বের স্বাদ নেওয়া নাজমুল হাসানে আস্থা রাখছে তারা লাল বলে। দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ দিয়ে এই ফরম্যাটেও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা হয়ে যায় তার।

এই যাত্রার শুরুটাও স্মৃতির মণিকোঠায় সাজানো আছে শান্তর। সিলেট টেস্ট দিয়ে তার দল প্রথমবার এই ফরম্যাটে ঘরের মাঠে হারায় কিউইদের। ১৫০ রানের জয়ে শান্ত দাবি জানিয়ে রাখেন- বিসিবি চাইলে টেস্টেও অধিনায়ক ভাবতে পারে তাকে। বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৫ রানের ইনিংসে খেলে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নেতৃত্ব বরং তার সেরাটা বের করে আনার মঞ্চ তৈরি করে দেয়!

যদিও ঢাকা টেস্টে পারেনি শান্তর বাংলাদেশ। দরুণ বোলিংয়ে জয়ের সম্ভবনা জাগিয়েও হারতে হয় ৪ উইকেটে। ফলে অধিনায়ক শান্তর প্র্রথম টেস্ট মিশন শেষ হয় ১-১ ড্রতে।

নিউজিল্যান্ডে বাজিমাত

ওই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই আবার ফেরেন ওয়ানডের অধিনায়ক হয়ে। সাকিব না থাকায় ‘ভারপ্রাপ্ত’ অধিনায়ক হয়ে শান্ত যাত্রা করেন সবচেয়ে কঠিন কন্ডিশনে। যে দুই ফরম্যাটে কখনও জিততে পারেনি বাংলাদেশ, সেই ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির চ্যালেঞ্জ নিয়ে তারুণ্যনির্ভর দলে নাবিকের ভূমিকায় তিনি। শুরুতে যা হওয়ার তা-ই হলো, প্রথম দুই ওয়ানডেতে হারে বাংলাদেশ। কিন্তু নেপিয়ারে লেখা হলো নতুন ইতিহাস। যা আগে কেউ করতে পারেননি, সেটিই রচিত হয় নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে। কিউইদের তাদেরই মাটিতে মাত্র ৯৮ রানে অলআউট করে ৯১ বলে বাংলাদেশ ৯ উইকেটে বিশাল জয় পায়। তাতে টেস্টের পর ওয়ানডেতেও নিউজিল্যান্ড-জয় বাংলাদেশের।

রইল বাকি টি-টোয়েন্টি। সেটাও-বা বাদ যাবে কেন! ওয়ানডে সিরিজ শেষ করেছিল যেখানে, সেখান থেকেই টি-টোয়েন্টি শুরু করে বাংলাদেশ। ওই নেপিয়ারেই কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে হারিয়ে দেয় লাল-সবুজের দল। অর্থাৎ, শান্তর নেতৃত্বেই প্রথমবার নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে জয়ের ইতিহাস লেখে বাংলাদেশ। যদিও দুটো সিরিজের একটিতেও জেতা হয়নি। ওয়ানডে ২-১ ব্যবধানে হারের পর একই ব্যবধানে হারে টি-টোয়েন্টি সিরিজ।

নিয়মিত অধিনায়কের চোট কিংবা ছুটিতে ‘প্রক্সি’ দেওয়া নাজমুল হোসেন শান্ত তিন ফরম্যাট মিলিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন ১১ ম্যাচে। ওয়ানডের ৬ ম্যাচে জয় একটি। দুই টেস্টে এক জয়, এক হার। আর তিন টি-টোয়েন্টিতে এক জয়ের বিপরীতে দুই হার।

সবশেষে

ম্যাচের সঙ্গে সঙ্গে জয়ের সংখ্যাও নিশ্চয় বাড়বে। এখন আর ‘প্রক্সি’ বা খণ্ডকালীন নন, অধিনায়কের পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে নাজমুল হোসেন শান্ত ছুটবেন লাল-সবুজের ক্রিকেট পতাকা নিয়ে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist