Beta
শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

এই ধর্ষণ শুধু সেই নারীরই নয়, রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করেছে

নোয়াখালীতে ভোটের রাতে দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় জমায় অনেকে। ছবি : সকাল সন্ধ্যা

নোয়াখালীতে ভোটের রাতে দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলার আসামিরা শুধু ওই নারীরই ক্ষতি করেনি, রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করেছে বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।

আলোচিত এ মামলায় সোমবার নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক ফাতেমা ফেরদৌস রায় দেন। মামলায় ১০ আসামি মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। একইসঙ্গে প্রত্যেকের ৫০ হাজার টাকা করে হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, “আসামিরা শুধু ভিকটিমের ক্ষতি করেনি বরং রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করেছে। এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা বেড়ে গেলে, বিচারে আসামিরা যদি খালাস পায় তাতে বিচারক ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়।

“তাই আসামিরা বিচারকের কোনও ক্ষমা অথবা করুণা পেতে পারে না। বরং তারা তাদের প্রকৃত অপরাধের সাজা পেলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে কোনও ব্যক্তি এ ধরনের অপরাধ করা কিংবা এ ধরনের অপরাধে সহযোগিতা করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকবে।”

এ রায়কে দৃষ্টান্তমূলক হিসেবে তুলে ধরে বিচারক বলেন, “অত্র মামলার আসামিরা এবং এজাহাকারী ও ভিকটিম পূর্বপরিচিত। এজাহাকারী ও ভুক্তভোগীর স্বামী হিসেবে তাদের বসতঘরে এজাহারে বর্ণিত তারিখে থাকা অবস্থায় ১৬ জন আসামি পূর্বশত্রুতার জের ধরে ৪০ বছর বয়ষ্ক গৃহবধূকে জোরপূর্বক দলবদ্ধ ধর্ষণ ও মারধর করে অত্যন্ত অমানবিক ও জঘন্য অপরাধ করেছে।”

নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ধারা উল্লেখ করে রায়ে বিচারক বলেন, “যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনও নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে নারী বা শিশু আহত হন তাহলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।”

রায়ে খুশি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

পাঁচ বছর এক মাস পাঁচ প্রতীক্ষা শেষে নিজ কানে মামলার রায় শুনতে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে সোমবার আদালতে হাজির হন ভুক্তভোগেী সেই নারী। রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়র পাশে অপেক্ষায় ছিলেন তারা। দুপুর পৌনে ১টার দিকে রায় ঘোষণা শেষ হলে আইনজীবীদের সঙ্গে বেরিয়ে আসেন তারা।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই দম্পতি রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান। রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিও জানান তারা।

ভুক্তভোগেী সেই নারী বলেন, “আমি আদালতকে বিশ্বাস করি। আজকের রায়ে আমি খুশি হয়েছি, এলাকাবাসী সবাই খুশি হয়েছে। যে রায় দিয়েছে সরকার যেন তা কার্যকর করে। আর আমার ছেলে-মেয়ে আছে, আমার নিরাপত্তা চাই। আমি তো আসামি ১৬ জনের ভেতরেই থাকি। চারপাশে আসামিরা, আমি নিরাপত্তা চাই। এ রায় কার্যকর হোক।”

মামলার বাদী ভুক্তভোগীর স্বামী বলেন, “আমি আইনে বিচার পামু, ন্যায়বিচার হইব আমার পক্ষে- আমার এটা বিশ্বাস ছিল। আজকের রায় আমি আমার বিশ্বাস মতো পেয়েছি। আমি এটাতে খুবই আনন্দিত। আর আমার কোনও নিরাপত্তা নাই, আমি এটাই চাই। আজেকের বিচারের জন্য আমি খুবই আনন্দিত।”

রাষ্ট্রপক্ষও সন্তুষ্ট

রায়ে খুশি মামলার রাষ্ট্রপক্ষ। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছালেহ আহম্মদ সোহেল খান বলেন, “এ মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত আদর্শিক ও আন্তরিক ছিল। রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপিত ২৩ জন সাক্ষী এবং আসামিপক্ষ উপস্থাপিত ৫ জন সাক্ষী এবং জেরা বিশ্লেষণ করে মাননীয় আদালত আজকে রায় ঘোষণা করেন। আমরা এ রায়ে খুশি।”

বাদীপক্ষের আইনজীবী মোল্লা হাবিবুর রাছুল মামুন বলেন, “এ মামলার রায়ে বিজ্ঞ আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, মামলাটি কেবল কোনও ব্যক্তির ক্ষতি নয়, এটা রাষ্ট্র এবং মানবিকতার ক্ষতি এবং এ জাতীয় ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের যদি বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেওয়া হয় তাহলে রাষ্ট্রে পরবর্তীতে একই ধরনের অপরাধ সংগঠিত হবে।

“সুতরাং এ ধরনের অপরাধ আর যেন সংঘঠিত না হয় সেক্ষেত্রে রায়টি একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমি বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে এ রায়ে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট।”

উচ্চ আদালতে যাবে আসামিপক্ষ

রায়ে খুশি নয় আসামিপক্ষ। আসামিপক্ষের আইনজীবী হারুনুর রশিদ হাওলাদার জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন উচ্চ আদালতে এ রায় টিকবে না।

তিনি বলেন, মামলার এজাহারে ও অভিযোগপত্রে রুহুল আমিনসহ অন্যান্য আসামি যারা আছেন তাদের বিষয়ে সহযোগিতার অপরাধের কথা বলা হয়েছে। অথচ এ মামলায় সাজার ক্ষেত্রে সবাইকেই ৯ এর ৩ ধারায় সাজা দেওয়া হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে সহযোগিতার বিষয়টি আনে নাই। এমনকি এ মামলায় সহযোগিতার অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি।

আসামিপক্ষের আইনজীবী হারুনুর রশিদ বলেন, এছাড়া মামলায় ২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮ জন সরকারি সাক্ষী, আর ১৫ জনের মধ্যে ৯ জন সাক্ষী যারা ঘটনার ২/১ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে গেছে। এ ৯ জন সাক্ষীকে রাষ্ট্রপক্ষ বৈরী ঘোষণা করে। কেবল বাদী, ভিকটিম, তাদের ছেলেমেয়ে, মা ও ভাই- এ ৬ জনের সাক্ষ্যর ওপর ভিত্তি করে এ সাজা দেওয়া হয়েছে।

“রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পরে আমরা উচ্চ আদালতে যাব। আমরা আশাবাদী উচ্চ আদালতে এ সাজা টিকবে না”, বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist