Beta
শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

এপারে মহানায়ক ওপারে ‘ঈশ্বর’

১৯৯৫ সালের সাফ গেমস শুরুর দিন কলকাতার জনপ্রিয় দৈনিক আনন্দবাজারের শিরোনাম, ‘শাহবাজ, ঊষা ও মুন্নার গেমস শুরু আজ’।

একজন ফুটবলারের খ্যাতি কোন পর্যায়ে গেলে ভিন দেশের বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক এরকম শিরোনাম করতে পারে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার থাকতে পারে। কিন্তু প্রসঙ্গ যখন ‘কিং ব্যাক মুন্না’ তখন ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মানে এক হয়ে যায় বাঙালি। স্বীকার করে নেয়, দুই বাংলার অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার মোনেম মুন্না।

মুন্নাকে নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের জার্মান সাবেক কোচ অটো ফিস্টার বলেছিলেন, ‘‘হি ওয়াজ মিসটেকেইনলি বর্ন ইন বাংলাদেশ’’।

ভুল বলেননি ফিস্টার। সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা মুন্না কখনও ছিলেন লেফট ব্যাক, কখনও রাইট ব্যাক, কখনও স্টপার তো কখনও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। ইস্টবেঙ্গলের কোচ নাইমুদ্দিন তাকে খেলিয়েছেন কখনও মাঝমাঠ তো কখনও জার্মান কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের লিবেরো পজিশনে। তবে স্ট্রাইকারদের মত সৃষ্টিশীলতা দিয়ে তারকা হননি মুন্না। ফুটবলে এটা সহজ ব্যাপার। তিনি মহাতারকা হয়েছেন রক্ষণে সৃষ্টিশীলতাকে ব্যর্থ করে। আস্থা ও নির্ভরতার অপর নাম হয়ে থাকা মুন্নার ট্যাকলিং ক্ষমতার জন্য ভয়ে থাকতেন প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডরাও।

পাশাপাশি বলের নিয়ন্ত্রণ, জোড়ালো হেড, দূরপাল্লার আগুনে শট, লম্বা পাস আর ওভারল্যাপিং করে আক্রমণকে জোরদার করায় ছিলেন অনন্য। ঢাকার মাঠে যারা মুন্নার খেলা দেখেছেন তাদের ভোলার কথা নয় লম্বা পাস বাড়িয়ে সেই চিৎকার, ‘‘আসলাম ভাই, গোল দেন।’’

নামি ডিফেন্ডারদের এসব গুণ থাকা সাধারণ ব্যাপার। তাতে তারকা হওয়া যায়, মহাতারকা নয়। এজন্য লাগে বাড়তি কিছু। মুন্নার সেই বাড়তি কিছুটা হচ্ছে দুর্জয় সাহস, সহজাত নেতৃত্বগুণ, রাফ এন্ড টাফ ভাবমূর্তি, পরিশ্রম, দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস আর প্রখর ব্যক্তিত্ব। মুখের ওপর বলে দিতেন অপ্রিয় সত্যিটা, যা তার চরিত্রকে দিয়েছিল ভিন্ন মাত্রা।

সিনেমা দেখে মোনেম থেকে মুন্না

মোনেম মুন্নার জন্ম ১৯৬৬ সালের ৯ জুন নারায়ণগঞ্জে। আশির দশকের শুরুতে পোস্ট অফিস দলের হয়ে পাইওনিয়র লিগ দিয়ে পা রাখেন ঢাকার ফুটবলে। ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় বিভাগে খেলেন শান্তিনগরের হয়ে। পরের বছর মুক্তিযোদ্ধাকে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে নিয়ে আসতে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রথম বিভাগে দুই মৌসুম মুক্তিযোদ্ধায় খেলার পর ১৯৮৬ সালে নাম লেখান ব্রাদার্স ইউনিয়নে। ১৯৮৭ সালে যোগ দেন আবাহনীতে। এরপর আকাশি-হলুদ জার্সিটা ছাড়েননি আর। ১৯৯৮ সালে ক্লাব ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত ছিলেন ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাবেই।

 ’৮০-এর দশকে ঢাকার ফুটবলে পা রাখা মুন্নার পারিবারিক নাম মোনেম। ১৯৭৭ সালে বন্ধুরা মিলে দেখতে গিয়েছিলেন ‘আগুন’ সিনেমা। নায়ক রাজ্জাক অভিনয় করেছিলেন ‘রাফ এন্ড টাফ’ চরিত্রে মুন্না নামে। সেই চরিত্রের সঙ্গে মিল থাকায় বন্ধুরা মোনেমকে ডাকা শুরু করেন মুন্না বলে। সেই থেকে মোনেম হয়ে যান মুন্না।

বিয়ের দিনে যত অঘটন

মুন্নার বিয়ের তারিখ ১৯৯৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। সুরভী মোনেমের সঙ্গে বিয়ের দিনটা রঙিন হয়ে থাকার কথা জীবনে। অথচ গায়ে হলুদের দিন হাতে যখন মুন্নার লাল মেহেদি পরা, সেদিনই লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছিল আবাহনী! শৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগে নিষিদ্ধ করেছিল এক বছর।

স্ত্রী ও দুই সন্তানের সঙ্গে মুন্না। ছবি : সংগৃহীত

ষড়যন্ত্র ছিল পুরো ব্যাপারটা, যা বুঝেছিলেন তখনকার বিরোধী দলের নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুন্নার এতটাই খ্যাতি যে শেখ হাসিনা পর্যন্ত মধ্যস্থতা করেছিলেন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে। এজন্য মেয়াদপূর্তির অনেক আগে উঠে যায় শাস্তিটা।

২০০৫ সালে ওই বিবাহবার্ষিকীর দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই কিংবদন্তি। কিডনি সমস্যায় ভুগেছেন দীর্ঘদিন। তাকে একটা কিডনি দান করেন বোন শামসুন নাহার আইভি। বোনের কিডনি নিয়ে বেঁচে ছিলেন কিছুদিন। শেষ রক্ষা আর হয়নি। ২০০৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মারা যান মুন্না।

ফেরান ৩০ লাখ টাকার প্রস্তাব

১৯৯১ সালে টানাটানি শুরু হয় মুন্নাকে নিয়ে। মোহামেডান আর ব্রাদার্স ইউনিয়ন-দুই দলই ৩০ লাখ টাকার চেক নিয়ে যায় তার বাড়িতে।

সেই সময়ের আর্থ সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় অঙ্কটা অবিশ্বাস্য। তখন ডলারের দাম ছিল ৪০ টাকার মত, এখন যা খোলা বাজারে ১২৪ টাকা। তারপরও মুন্না বিনয়ের সঙ্গে ফেরান দুই দলের প্রস্তাব। কারণ তিনি আবাহনী অন্তপ্রাণ। এই ক্লাবই তার যৌবনের তপোবন। আবাহনী সে বছর ২০ লাখ টাকা পারিশ্রমিক দেয় মুন্নাকে। সেই অঙ্কটাও অবিশ্বাস্য।

পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় এত বেশি টাকায় কোন ফুটবলারকে কেনার এই রেকর্ডটা বহুদিন ছিল মুন্নার দখলে। অথচ আবাহনীর প্রতি ভালোবাসা না দেখালে আরও ১০ লাখ টাকা বেশি পেতে পারতেন তিনি।

আবাহনীর আদর্শ নেতা

আবাহনী ছেড়ে সে সময়ের সেরা তারকারা যোগ দিয়েছিলেন নতুনভাবে শুরু করা মুক্তিযোদ্ধায় কিন্তু মুন্নাকে টাকার প্রলোভনে টলানো যায়নি। বরং ১৯৯৪ সালে আবাহনীর অধিনায়ক হয়ে এক ঝাঁক তরুণ নিয়ে খেলেন পুরো দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে।

মাঠে নামছেন আবাহনীর জার্সিতে। ছবি : সংগৃহীত

মুন্নার নেতৃত্বে সেবার আবাহনী জিতে ডামফা কাপ আর লীগে হয়েছিল অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। পাশাপাশি ফেডারেশন কাপে আবাহনী হয়েছিল রানার্সআপ।

১৯৯৫ সালেও মুন্নার নেতৃত্বে আবাহনী জিতে লীগ শিরোপা। প্রথম অধিনায়ক হিসেবে টানা দুবার আবাহনীকে লিগ জেতানোর রেকর্ড গড়েন তিনি।

খেলা ছাড়ার পর ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন আবাহনীর ম্যানেজার। ২০০৫ সালে তাঁকে করা হয় ফুটবল কমিটির টেকনিক্যাল উপদেষ্টা। অসুস্থ শরীরে এত বড় একটা ক্লাবের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন মৃত্যুর কোলে।

ইস্টবেঙ্গলে মহাকাব্য

১৯৯১ সালে মুন্না যোগ দিয়েছিলেন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইস্টবেঙ্গলে। সেবার মুন্নার নৈপুণ্যেই কলকাতা লিগে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। মাঝমাঠে খেলায় রক্ষণ আর আক্রমণে দারুণ সেতুবন্ধন গড়েছিলেন মুন্না। এজন্য পেয়ে যান আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা।

কলকাতার ফুটবলকে নাড়িয়ে দেওয়া মুন্না আবারও ১৯৯৩ সালে যোগ দেন পুরোনো ক্লাবটিতে। লিগে পিছিয়ে থাকা ইস্টবেঙ্গল সেবারও চ্যাম্পিয়ন মুন্নার হিমালয়সম দৃঢ়তায়। তাকে এক নজর দেখতে লাইন পড়ে যেত ইস্টবেঙ্গলে।

মুন্নার জনপ্রিয়তা বোঝাতে ইস্টবেঙ্গলে ‘হেড মালি’ পদে চাকরি করা শঙ্কর পিল্লাই বলেছিলেন এভাবে, ‘‘মানুষের বেশে স্বয়ং ঈশ্বর নেমে এসেছিলেন পৃথিবীতে।’’ সীমানার এপারের মহানায়ক এভাবেই ‘ঈশ্বর’ হয়ে গিয়েছিলেন ওপারে।

বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা

১৯৯৫ সালের অক্টোবর থেকে নভেম্বরে মিয়ানমারে হওয়া চার জাতি ফুটবলের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা সেটা যা এসেছিল মুন্নার নেতৃত্বে।

১৯৮৬ সালের সিউল দশম এশিয়ান গেমসে মুন্না ছিলেন বাংলাদেশের কনিষ্ঠতম ফুটবলার। দীর্ঘ এক যুগ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন সুনামের সঙ্গেই।

১৯৯৫ সালে মিয়নমারে বাংলাদেশের জেতা প্রথম শিরোপা। ছবি : সংগৃহীত

১৯৮৬ সালে করাচিতে প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপে ইরানের বিপক্ষে তার গোল স্মরণীয় হয়ে আছে বাংলাদেশ ফুটবলের ইতিহাসে। তার গোলেই এশিয়ার পরাশক্তিদের বিপক্ষে জিতেছিল বাংলাদেশ।

বাড়ি যেন জাদুঘর

খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন আজমান সালিদ। মুন্নার সেই ছেলে সযত্নে বাড়ির আলমারিতে রেখেছেন তার বিখ্যাত বাবার অনেক স্মারক।  

১৯৮৯ সালে বিএসপিএ’র (বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি) বর্ষসেরা ফুটবলারের ট্রফি, ১৯৯১ সালে জেতা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পুরস্কার কিংবা ২০০৫ সালে মরণোত্তর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার আছে সেখানে। আরও আছে দেয়ালে বড় বড় ফ্রেমে বাঁধানো মুন্নার খেলোয়াড়ি জীবনের অনেক ছবি।

ধানমন্ডির ৮ নম্বর সেতুর নামকরণ করা হয়েছে মুন্নার নামে। সেই স্মৃতিফলক আছে অযত্নে। ছবি : সকাল সন্ধ্যা

বিদেশের মাটিতে যেখানেই খেলতে যেতেন, প্রচুর ছবি তুলতেন মুন্না। ঘরোয়া লিগেও খেলা অনেক ছবি সংগ্রহ করেছিলেন ফটো সাংবাদিকদের কাছ থেকে। এই ছবিগুলোর পাশাপাশি বাবার অনেক জার্সিও সযত্নে আগলে রেখেছেন আজমান সালিদ।

করোনা মহামারি আসার বহু আগে থেকে মুখে মাস্ক পড়তেন মুন্না। করোনার সময় সেই মুন্নার দুটো জার্সি নিলামে বিক্রি হয়েছে ৫ লাখ ১০ হাজার টাকায়।

এমন একজন কিংবদন্তির স্মৃতি ধরে রাখতে ২০০৮ সালে ধানমন্ডির ৮ নম্বর সেতুটির নামকরণ হয়েছিল মুন্নার নামে। সেই স্মৃতিফলক প্রায়ই ঢাকা পড়ে বিজ্ঞাপনী পোস্টারে। সেই পোস্টার তোলাও হয়। এই ঢাকা আর তোলার যাঁতাকলে হারিয়ে গেছে মুন্না নামের ‘আকার’টা!

ফুটবলানুরাগীদের মনে মুন্না অবশ্য বেঁচে আছেন ক্ষণজন্মা মহানায়ক হয়ে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist