Beta
শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪

বিরোধী দলও কি আমরা গড়ে তুলব : শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী
গণভবনে কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: পিএমও

ভোটের পরদিন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের সামনে এলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সব সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ।

পর্যবেক্ষক-সাংবাদিকদের নিয়ে সোমবার গণভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে একথা বলেন টানা চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে যাওয়া শেখ হাসিনা।

অনুষ্ঠানে বিদেশি এক সাংবাদিক নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাজার রায় নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আদালতের এই বিষয়ে সরকার প্রধান হিসেবে তার কিছু করার নেই।

বিরোধী দলকে অবাধে সুযোগ দেওয়া নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছোড়েন, বিরোধী দল কি সরকার গড়ে দিতে পারে?

রবিবার অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফের সরকার গঠন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ভোটে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণ না থাকা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন তুলে আসছে পশ্চিমা দেশগুলো।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসা পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে শুরুতেই শেখ হাসিনা বলেন, “আমি খুব আনন্দিত, আপনারা এসেছেন। আপনাদের আগমন আমাদের দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য এবং মানুষের অধিকার আরও সুরক্ষিত হয়েছে।

“দেখেছেন, আমাদের দেশের মানুষ কীভাবে ভোট দেয় এবং নির্বাচন যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারে, সেই দৃষ্টান্তও আমরা সৃষ্টি করতে পেরেছি।”

তিনি বলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটে আওয়ামী লীগ পুনরায় জয়ী হয়েছে।

“এবারের নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছে এবং অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছে, অন্যান্য দলেরও বেশ কিছু প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছে।”

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকারও সচেষ্ট ছিল বলে বিদেশিদের জানান তিনি।

“নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার সব ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি এবং আপনারাও দেখেছেন। আমরাও খুব আনন্দিত। কারণ এই বিজয়টি হচ্ছে জনগণের বিজয়, আমার বিজয় নয়।”

ভারত রাশিয়া চীনসহ ৭ দেশের অভিনন্দন শেখ হাসিনাকে

সরকার পরিচালনায় বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সহযোগিতা পাওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পররাষ্ট্রনীতিতে আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। কারণ আমরা দেশের উন্নয়ন চাই।”

এক সাংবাদিক ইন্দিরা গান্ধী, শ্রীমাভো বন্দরনায়েক, চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা, গোল্ডামায়ার, বেনজির ভুট্টো, মার্গারেট থ্যাচারের মতো নারী সরকারপ্রধানদের উদারহরণ দিয়ে প্রশ্ন রাখেন, “আপনি ৫ বারের মতো সরকার গঠনের যে রেকর্ড করেছেন, সেই বিষয়ে আপনার অনুভুতি কী? এই বিজয়ের খুশিতে কি ইউনূসের মতো লোককে ক্ষমা করে দিতে পারেন?”

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “আপনি যেসব নারী সরকার প্রধানদের কথা বলেছেন, তারা অনেক মহীয়সী নারী। আমি একজন সাধারণ নারী, অত শিক্ষা-দীক্ষাও নেই। তবে একটি বিষয়, আমি সব সময় অনুভব করি, আমার দেশের সাধারণ মানুষের জন্য আমার কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আমাকে তাদের সেবা করতে হবে। এটাকে আমি কখনও ক্ষমতায় থাকা মনে করি না। 

“ইউনূসের বিষয়ে বলবো এটা শ্রম আদালতের বিষয়। তার কোম্পানির লোকদেরকে বঞ্চিত করেছেন, তারা মামলা করেছে। আদালত তার রায় দিয়েছে। এখানে আমার কিছু করার নেই।”

ওয়াশিংটন থেকে আসা এক সাংবাদিক যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে শেখ হাসিনার পদক্ষেপ জানতে চান।

জবাবে তিনি বলেন, “আমাদের দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। এটা নির্ভর করছে আপনার এবং আপনার সরকারের ওপর। এটা আমার ভালো লেগেছে যে আপনি উল্লেখ করেছেন নির্বাচন অনেক ভালো হয়েছে।”  

একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ওই সাংবাদিককে প্রশ্ন করেন, “আপনার দেশের নির্বাচনের থেকেও কি বাংলাদেশের নির্বাচন ভালো হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?”

ওই সাংবাদিক বলেন, “ইট ডিপেন্ডস অন দ্য ইয়ার। নির্বাচনের দিন বিকালে কিছু প্রশ্ন উঠেছিল। এর পরে যুক্তরাষ্ট্রেও একই প্রশ্ন ছিল।”

শেখ হাসিনা তখন বলেন, “আপনি দেখছেন এখনও এটা ভালো এবং এটা চলতে থাকবে। প্রতিপক্ষরা অনেক কিছু বলবে। তবে আমরা প্রতিশোধপরায়ন না। এখানে দেখেন কত বেসরকারি টেলিভিশন সংবাদ সংগ্রহে এসেছে … আমাদের দেশে অনেক সংবাদপত্র আছে। তারা যে কোনো সমালোচনা করতে পারে। আমরা সেখান থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি।”

জো বাইডেনের সঙ্গে নিজের, বোন ও মেয়ের সেলফি তোলার কথাও বলেন তিনি।

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, “আপনি ২০১৮ সাল থেকে বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো সংলাপে বসেননি। আপনি জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতির মধ্যে দিয়ে, ৬০ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে আসেনি। মানবাধিকার গোষ্ঠী মনে করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ভেঙে পড়েছে। আপনি কি মনে করেন কোনো বিরোধী দল ছাড়াই এদেশে প্রাণবন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?”

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “যে কোনো রাজনৈতিক দলের তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। এখানে কোনো দল অংশ না নেওয়া মানে এই নয় যে এখানে গণতন্ত্র নেই।”

বিরোধী দলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি নাশকতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “কেবল এবারের নির্বাচনে নয়, গত বারের নির্বাচনেও তারা মানুষ মেরে নির্বাচন প্রতিহত করতে চেষ্টা করেছে। তারা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক দল হতে পারে না। তারা সন্ত্রাসী দল।”

ভারতের এক সাংবাদিক বিরোধী দলকে অবাধে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ করে দেওয়া হবে কি না, তা জানতে চান।

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা কি বিরোধী দলও গড়ে তুলব। আপনি কি এটা চান? তাহলে আমরা তাই করব। কিন্তু এটা তো প্রকৃত বিরোধী দল হবে না। আমি দীর্ঘদিন রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে দলকে সংঘবদ্ধকরে রাজনীতি করছি। সব দলকেই এভাবে রাজনীতি করতে হয়।”

জার্মানির এক পর্যবেক্ষক বলেন, “ইউরোপে আপনাদের দেশের নির্বাচনের ভালো সুনাম নেই। তবে আমি দেখে গেলাম ভালো অবস্থা।”

শেখ হাসিনা তখন বলেন, “সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে। আমি মনে করি, আমি যথাযথ কাজটি করেছি এবং নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে।”  

ভোট
ঢাকায় রবিবার দিনের প্রথম ভাগে কেরানীগঞ্জের একটি কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় ভোটাররা। ছবি : সকাল সন্ধ্যা

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “২০২৬ সাল থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের যাত্রা শুরু, সেই কাজটি আমাদের করতে হবে। সেখানে যেমন কিছু চ্যালেঞ্জ আছে, আবার কিছু সুযোগ-সুবিধাও আমরা পাব। ইতোমধ্যে সেই প্রস্তুতি আমরা নিয়েছি।”

গৃহহীন মানুষকে ঘর দেওয়া, সারা দেশে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সাফল্যগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এখন আমাদের লক্ষ্য হলো স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা। আমাদের তরুণ সমাজকে ডিজিটাল ডিভাইসে আরও বেশি প্রশিক্ষণ দেওয়া, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।”

এক সাংবাদিক প্রশ্ন রাখেন, “স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে সুশাসন নিশ্চিত করতে আপনার পরিকল্পনা কী?”

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “এদেশের মানুষ প্রকৃতগতভাবেই স্মার্ট। আমরা আশ্বস্ত করছি এই কাজটি আমরা সঠিকভাবে করতে পারব।

“টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অভিষ্ট অর্জনের জন্য আমরা ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় চেয়েছি। এই কাজগুলো আমরা তিন ধাপে করতে চেষ্টা করব। এই মুহূর্তে কী করতে হবে, মধ্য মেয়াদে কী করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কী করতে হবে, এভাবে ভাগ করে আমরা সমস্ত কর্মসূচি সাজাব। দেশের এই অগ্রযাত্রা যাতে অব্যাহত থাকে, সেই চেষ্টা আমরা করব। এরকমই আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।”

বিদেশিদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, “আপনারা যার যার দেশে ফিরে যাবেন, বাংলাদেশের কথা একটু বলবেন। আমাদের সুন্দর দেশ, খুব বেশি ঠান্ডাও না, আবার খুব বেশি গরমও না। সেই সুন্দর আবহাওয়া আপনারা দেখতে পেয়েছেন।

“এটুকু বলতে পারি, আপনাদের এই আগমন আমাদের দেশে গণতান্ত্রিকবিধি-ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করবে, শক্তিশালী করবে। সে জন্য আপনাদেরকে এদেশের মানুষের পক্ষ থেকে, আমার ও আমার পরিবারের পক্ষ থেকে এবং আমার দলের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist