Beta
মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪
Beta
মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪

রাজস্ব আদায় সহজ করতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা : সিপিডি

ঢাকার একটি হোটেলে রবিবার সিপিডি ‘ডিজিটাল কর কাঠামো’ শীর্ষক আলোচনাসভা আয়োজন করে।
ঢাকার একটি হোটেলে রবিবার সিপিডি ‘ডিজিটাল কর কাঠামো’ শীর্ষক আলোচনাসভা আয়োজন করে।
Picture of প্রতিবেদক, সকাল সন্ধ্যা

প্রতিবেদক, সকাল সন্ধ্যা

রাজস্ব আদায় পদ্ধতিকে সহজ ও স্বচ্ছ করতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার প্রয়োজন, তবে শেষ পর্যন্ত এটা  রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়।

ঢাকার একটি হোটেলে রবিবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘ডিজিটাল কর কাঠামো’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

আলোচনা সভায় একটি গবেষণাপত্রও প্রকাশ করা হয় সিপিডির পক্ষ থেকে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে গবেষণাপত্র উত্থাপন করেন সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আপনি একজন ঋণ খেলাপি বা বিদেশে টাকা পাচার করছেন। আমি বাজেটে ঘোষণা দিলাম আপনি সেই টাকা ফেরত নিয়ে আসতে পারবেন মাত্র ৭-৮ শতাংশ ইন্টারেস্ট রেটে। এবং আপনাকে কেউ প্রশ্ন করবে না, কোনও শাস্তির মুখোমুখি আপনি হবেন না। তখন একজন নিয়মিত করদাতা নিরুৎসাহিত হয়। এ ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ঠিকমতো না নিলে রাজস্ব আদায়ে আমরা ব্যর্থ হবই।

“এখন আমরা যেই অর্থনৈতিক অবস্থায় রয়েছি তাতে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় না বাড়ানো খুব বিপজ্জনক। আমরা পরনির্ভরশীল দেশে পরিণত হব। আমাদের উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো ঋণের উপর নির্ভরশীল। সরকার হয় বিদেশ থেকে বা দেশের ভিতর থেকে এই ঋণ নিচ্ছে।”

সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২০ সালে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ হওয়ার কথা জিডিপির ১৬ শতাংশ। কিন্তু ২০২০ এর পর আরও ৪ বছর চলে গেছে, কিন্তু আমাদের এখনও রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আমাদের লক্ষ্যের মাত্র অর্ধেক। এই ব্যর্থতা দূর করতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের কোনও বিকল্প নেই।”

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন উদ্যোগগুলো খুবই বিচ্ছিন্নভাবে হচ্ছে; এটা সমন্বিত পদ্ধতিতে নিতে হবে, তাহলে সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি।

সিপিডির গবেষণাপত্র অনুযায়ী, গত ১৪ বছরে রাজস্ব আদায় কমেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল জিডিপির ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ। সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মাত্র, কিন্তু তাও অর্জন হবে না। এবারের আদায়ের পরিমাণ ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরে থাকবে।

সিপিডি বলছে, শ্রীলংকা বাদে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের চেয়ে রাজস্ব আদায়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় হয় ভূটানে, যা জিডিপির প্রায় ৩১ শতাংশ। ভারতে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ জিডিপির ২০ শতাংশ, মালদ্বীপে ২৫ শতাংশ, নেপালে ২৩ শতাংশ ও পাকিস্তানে ১২.৪ শতাংশ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের থেকে কর আদায়ে বাংলাদেশের খরচ অনেক কম। ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে বাংলাদেশের খরচ মাত্র ২২ পয়সা। যেখানে ভারতে খরচ হয় ৬০ পয়সা, থাইল্যান্ডে ৭১ পয়সা ও জাপানে ১ টাকা ৭০ পয়সা।

বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ে খরচ কম হওয়ার কারণে এখানে সরকারের বিনিয়োগ করা নিরাপদ। সরকারের তাই মনোযোগ দিতে হবে কিভাবে এই সুবিধা কাজে লাগানো যায়।

সিপিডি মনে করছে, রাজস্ব আদায় পদ্ধতিতে যদি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় তাহলে ২০৩০ সালে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ১৬ হাজার ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে, যা জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ হবে।

আলোচনাসভায় অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসেকা আয়েশা খানম বলেন, “সকল পরিকল্পনা স্মার্ট হতে হবে, যা পরিমাণযোগ্য, প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী হবে।

“গত বছর আমরা বলেছিলাম যেসব কোম্পানি ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করবে, তাদের করছাড় দেওয়া হবে। কিন্তু তাতে বড় ব্যবসায়ীরা রাজি নন। এখনও যদি তারা হাতে টাকা নিয়ে লেনদেন করতে চান, তাহলে আমাদের এসব ডিজিটালাইজ করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যাবে।”

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালন বৃদ্ধি না করে আমাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা কঠিন হয়ে যাবে। আমাদের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাচ্ছে, সাথে চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় সেই তুলনায় বাড়ছে না। এখন আমরা যেভাবে ঋণ নিতে পারছি, কিন্তু এলডিসি গ্র‍্যাডুয়েশনের পর এভাবে পারব না। তখন অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালনাই মূল ভরসার জায়গা হবে।

“জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আরও অত্যাধুনিক করতে হবে। সমগ্র পদ্ধতিকে সহজ এবং স্বচ্চ কর‍তে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের কর দেওয়া নিয়ে যেই হয়রানির ভয় আছে তা কমাবে এবং কর দেওয়ার ব্যাপারে মানুষের ভরসা ফিরিয়ে আনবে।”

সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “সম্ভাব্য করদাতাদের বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে।  একপ্রকার হয়রানির ভয় রয়েছে। এজন্যই তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ।”

মানুষকে কর দিতে উৎসাহিত করতে হবে মন্তব্য করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “মানুষ কখন কর দিতে আগ্রহী হবে- যখন সে দেখবে কর দিলে সে ভালো রাস্তা পাচ্ছে, ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা পাচ্ছে, ভালো চিকিৎসা পাচ্ছে, তার জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে, তখন সে তো আগ্রহী হবেই। না হলে কেন সে কর দিতে উৎসাহ পাবে?

“আন্তঃমন্ত্রণালয় সংযোগ বাড়াতে হবে, যাতে শুধু কর নয় এর সাথে যুক্ত সবকিছু একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির মধ্যে আনা যায়।”

তিনিও রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, “যারা টাকা পাচার করছে, তারা বেশ শক্তিশালী। রাজনৈতিকভাবেও সক্রিয়। ফলে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এদের কাছ থেকে কর আদায় করতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। ফলে সরকারকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেকে রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষা দিতে হবে ও সমর্থন দিতে হবে। তাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তা নাহলে হবে না।”

নিজেদের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করে নেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমুতাল্লাহ মুনিম।

তিনি বলেন, “প্রতিবার বাজেটে রাজস্ব বোর্ডকে একটি টার্গেট দিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের সক্ষমতা বিচার করা হয় না। সেসময় আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। কারণ, এই টার্গেট ঠিক হয় আগের বাজেটের টার্গেটের সাথে তুলনা করে। কিন্তু আগের বাজেটে টার্গেট যাই থাকুক আমরা আদায় করতে কত পেরেছি তা তুলনা হয় না। ফলে কখনোই লক্ষ্যের আশে পাশেও আমরা পৌঁছাতে পারি না।”

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ বলেন, “কর দেওয়ার সাথে একটি জিনিস সম্পর্কযুক্ত, তা হলো সামাজিক ন্যায়বিচার। এটি নিশ্চিত হবে স্বচ্ছতার মাধ্যমে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আমাদেরও সেই পথে হাটতে হবে।”

শুধু কর বা রাজস্ব আদায় না সব নাগরিকসেবা পদ্ধতি ডিজিটালাইজেশন করা হচ্ছে জানান তিনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত