Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

মোদীর সিনেমা রাজনীতি

অযোধ্যায় রাম মন্দির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া তারকারা।
অযোধ্যায় রাম মন্দির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া তারকারা।

দৃশ্য ১ : ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। হাতে উদ্যত পিস্তল। জনসমক্ষে জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির (জেএনইউ) ‘বামপন্থিদের’ গুলি করতে চাইছেন ওই পুলিশ।

দৃশ্য ২ : মাথার খুলির টুপি পরা এক ব্যক্তি। রোহিঙ্গা মুসলিমরা শিগগিরই হিন্দুদের বাস্তুচ্যুত করবে এবং ভারতের জনসংখ্যার অর্ধেক তৈরি করবে, এমন ঘোষণা দিচ্ছেন তিনি। আর একজন নিরাশ হিন্দু নারী বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করতে চান।

দৃশ্য ৩ : বিংশ শতাব্দীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ওপর নির্মিত বায়োপিকে একটি ভয়েসওভার চলছে। সেখানে বলা হচ্ছে, যদি মহাত্মা গান্ধী না থাকতেন, তাহলে ভারত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ৩০ বছর আগেই মুক্তি পেত।

এই দৃশ্যগুলো আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মুক্তি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা হিন্দি চলচ্চিত্রগুলোর।

ভারতের প্রায় এক বিলিয়ন ভোটার মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চলছে ব্যাপক প্রচার। এক্ষেত্রে মোদী ও তার দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ‘সমর্থন জোগাচ্ছে’ সিনেমা।

কিন্তু কীভাবে

নির্বাচনের প্রচারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মুক্তি পাচ্ছে বেশ কিছু সিনেমা। এসব সিনেমা নির্মাণ করেছে ভারতের বড় বড় প্রযোজনা সংস্থাগুলো।

এসব সিনেমায় খোলাখুলি মোদী ও তার সরকারের বিভিন্ন নীতির গুণগান গাওয়া হচ্ছে। আবার কিছু সিনেমায় মোদীর প্রতিপক্ষ রাজনীতিকদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। এমনকি জাতীয় আইকন গান্ধীজী ও জেএনইউর মতো শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও রেহাই পাচ্ছে না।

ঐতিহ্যগতভাবেই জেএনইউ উদারপন্থী শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে অনেকটাই বামঘেঁষা। বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে।

এসব নতুন সিনেমার অধিকাংশই বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিন্দু জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী নেটওয়ার্কগুলিতে প্রচলিত ইসলাম-বিদ্বেষী ষড়যন্ত্রের গল্প ছড়াচ্ছে। নির্বাচনী মৌসুমে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১০টি এমন ছবি মুক্তি পেয়েছে অথবা থিয়েটার ও টেলিভিশনে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

অ্যাক্সিডেন্ট অর কন্সপিরেসি : গোধরা

জেএনইউর অবসরপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র বিভাগের অধ্যাপক ও ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের সেন্সর বোর্ডের সদস্য থাকা ইরা ভাস্কর বলেন, “এটি হিন্দি চলচ্চিত্র জগতকে ‘অধিগ্রহণ’ করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার একটি অংশ। ঠিক যেমন অন্য ধরনের জনপ্রিয় সংস্কৃতি ইতিমধ্যেই দখল হয়েছে।”

ভাস্কর ইঙ্গিত করছিলেন- গান, কবিতা আর বইয়ের মতো জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যমে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আখ্যানের আধিপত্য ক্রমেই বাড়ছে।

সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত কিছু সিনেমা হিন্দু জাতীয়তাবাদী নায়ক ও বিজেপি নেতাদের বিতর্কিত জীবনীকে মহিমান্বিত করে তুলে ধরেছে। এর মধ্যে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের জীবনীও রয়েছে। তিনি একজন বিতর্কিত ঔপনিবেশিকবিরোধী হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন। ঐতিহাসিক ভুলের প্রতিশোধ হিসেবে মুসলিম নারীদের ধর্ষণকে সমর্থন করেছিলেন।

আসন্ন দুটি চলচ্চিত্র, ‘অ্যাক্সিডেন্ট অর কন্সপিরেসি : গোধরা’ ও ‘দ্য সাবারমতী রিপোর্ট’ ২০০২ সালের গোধরা ট্রেন পোড়ানোর ‘আসল ঘটনা’ প্রকাশের দাবি করছে। ওই ট্রেনে আগুনে পুড়ে ৫৯ হিন্দু তীর্থযাত্রীর মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার জেরে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর হাতে দাঙ্গার সূত্রপাত হয়েছিল। এতে ১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই মুসলিম। উল্লেখ্য, এই দাঙ্গার সময় মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

আরেকটি সিনেমা ‘আখির পলায়ন কব তক?’ (কতদিন আর পালিয়ে বেড়াতে হবে?) মুসলিমদের কারণে হিন্দুদের ‘দলগতভাবে স্থানচ্যুতি’ ঘটেছে, এমনটাই দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

এছাড়া ‘রাজাকার’ নামের একটি সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। এতে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার আগে ও পরে রাজাকারদের হাতে হিন্দুদের উপর চালানো ‘নীরব গণহত্যার’ কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এই সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন বিজেপির একজন নেতা।

গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মোদী নিজেই ‘আর্টিকেল ৩৭০’ নামের একটি নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার প্রশংসা করেন। এই সিনেমায় তার সরকারের ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে বিশেষ মর্যাদা বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করা হয়।

মোদী সরকারের ওই সিদ্ধান্তের জেরে তখন কাশ্মীরে শতাধিক মানুষকে গৃহবন্দী ও লকডাউন জারি করা হয়। সমালোচকরা এই সিনেমাটিকে মোদী সরকারের পক্ষে ‘চাটুকারিতা’ ও ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে অভিহিত করেছেন। সিনেমাটিতে সরকারের সমালোচক এবং বিরোধী দলের নেতাদের ‘বিদ্রুপ’ করা হয়েছে।

আখির পলায়ন কব তক?

ক্রমবর্ধমান প্রবণতা

এই ধরণের সিনেমার ঢল ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগেও দেখা গিয়েছিল। তখন মোদী দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসেন। সেই নির্বাচনের আগে বেশ কিছু সিনেমায় বিজেপির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হয়েছিল।

কিছু সিনেমা ক্ষমতাসীন দলের সমালোচকদের দমনের চেষ্টা করেছে। এর উদাহরণ ‘অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’। মোদীর পূর্বসূরী মনমোহন সিংহকে সমালোচনা করে সিনেমাটি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে কিছু সিনেমা জাতীয়তাবাদী আবেগে উত্তেজনা দিয়েছে। এর মধ্যে ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ উল্লেখযোগ্য। এই সিনেমা ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে কাশ্মীরের উরি অঞ্চলে একটি ভারতীয় সামরিক শিবিরে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিশোধে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর পরিচালিত সামরিক আক্রমণকে ফুটিয়ে তোলে।

কিন্তু অধ্যাপক ভাস্করের মতে, এই প্রবণতা ২০১৪ সাল থেকেই বেড়েছে। তখন মোদী ক্ষমতায় ছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে উপস্থাপন করা তখন থেকেই ব্যাপক পরিসরে শুরু হয়।

তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরে আমরা মুসলিম শাসকদের চিত্রায়নে একটা পরিবর্তন দেখেছি। এখন তাদের সবাইকেই বর্বর ও মন্দির ধ্বংসকারী হিসেবে দেখানো হয়। এটাও একধরণের প্রচার, যদিও তা সরাসরি না। এই সব চিত্রায়নের বার্তা হলো – মুসলিমরা ভারতের অন্তর্গত নয়, তারা আক্রমণকারী ছিল।”

এই অবস্থানগুলি হিন্দু ডানপন্থিদের প্রকাশ্যে ঘোষিত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জনগণের মন থেকে মুঘল ইতিহাসকে মুছে ফেলার প্রয়াস।

এই ধরনের সিনেমাগুলো অতীতে সামাজিক বিভাজন আর ঘৃণা বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েছিল। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯০ এর দশকে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের পলায়নের ঘটনাকে তুলে ধরে নির্মিত ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ এর মতো সিনেমার কথা বলা যায়।

একইভাবে ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ নামের আরেকটি সিনেমা সমালোচনার মুখে পড়ে। এতে খ্রিস্টান ও হিন্দু মেয়েদের ইসলামিক স্টেটে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করার একটি কথিত চক্রান্তকে ভুলভাবে দেখানো হয়েছে। এই সিনেমার ফলে ভারতের মহারাষ্ট্রের আকোলা অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।

দ্য সাবারমতী রিপোর্ট

ভয় ও সুবিধাবাদ

সিনেমা শিল্পের অন্দরের লোকেরা এই নতুন ধরনের সিনেমাগুলোর জন্য বেশ কিছু কারণ দায়ী বলে মনে করেন। এর মধ্যে রয়েছে – অস্বস্তি, সুযোগসন্ধানী মনোভাব ও প্রতিষ্ঠিত শক্তির পক্ষ থেকে প্ররোচনা।

এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকেই এনিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু ভয়ের কারণে তারা কেউই পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি।

গত কয়েক বছরে বলিউড একাধিকবার কট্টর সমালোচনার শিকার হয়েছে। আর একে সমর্থন জুগিয়েছে বিজেপি নেতারা। এই সমালোচনাগুলো সিনেমা বয়কট থেকে শুরু করে নিষিদ্ধের দাবি পর্যন্ত বিস্তৃত। হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলি প্রায়শই এমন অভিযোগ তুলে সিনেমা ও সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানকে ‘হিন্দুবিরোধী’ আখ্যা দিয়েছে।

২০২১ সালে একটি ওয়েব সিরিজ ‘তাণ্ডব’ নিয়ে বেশ হাঙ্গামা হয়। বিজেপি নেতারা এই সিরিজের পরিচালক ও অ্যামাজন প্রাইম স্ট্রিমিং পরিষেবার কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তাদের মতে, এই সিরিজের কয়েকটি দৃশ্যে হিন্দু দেবতাদের অপমান করা হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্থগিতাদেশ দেওয়ার আগে ছয়টি ভিন্ন শহরে পুলিশের কাছে এদের গ্রেপ্তারের আবেদন জানিয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়।

এই ঘটনাগুলো অন্য সৃষ্টিশীল মানুষের উপরও প্রভাব ফেলেছে বলে অনেকেই মনে করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিনেমা প্রযোজক বলেন, “অনেক সময়ই সিনেমার স্ক্রিপ্টগুলো বাতিল করা হয়, অথবা স্ক্রিপ্টের আগেই তা ধারনা পর্যায়েই খারিজ হয়ে যায়। এর কারণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নিজেদের ওপর আরোপিত সেন্সরশিপ। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়বস্তু নির্বাচনে কী ধরণের সমস্যা হতে পারে, সেটা আগে থেকেই তারা আঁচ করার চেষ্টা করেন।”

আল জাজিরা ‘দ্য কেরালা স্টোরি’র পরিচালক সুদীপ্ত সেনের মন্তব্য চেয়েছিল। সেন জানান, তিনি সাড়া দেবেন, কিন্তু প্রকাশের সময় পর্যন্ত তা করেননি।

আরও এক সিনেমা প্রযোজক জানান, নির্বাচনী প্রচারের সুযোগ নিতেই অনেকে সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে আসছেন এই সময়ে।

তথ্যসূত্র : আল জাজিরা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist