Beta
রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪
Beta
রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪

কলাম

পেনশনের টেনশন মুক্তি কঠিন নয়

সাব্বির আহমেদ। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার।

সর্বজনীন পেনশন একটি জাতির সামাজিক নিরাপত্তার প্রতীক। উন্নত ও মানবিক দেশগুলোতে এ ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের মতো অর্থনীতির প্রায় কোনও দেশেই এমন সামাজিক সুরক্ষা নেই। এমন দেশে এই পরিকল্পনা যুগান্তকারী ও সাহসী পদক্ষেপ।

আমাদের দেশে পেনশন ছিল শুধু সরকারি, স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩.১ শতাংশ। বেসরকারি খাতে নিযুক্ত মানুষেরা শেষ বয়সে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল।

২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন চালু করে কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর পড়ন্ত জীবন নিরাপদ করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করে এ পর্যন্ত ‘প্রবাস’, ‘প্রগতি’, ‘সুরক্ষা’, ‘সমতা’ ও ‘প্রত্যয়’ নামে পাঁচটি পেনশন স্কিম চালু করা হয়েছে। এর প্রথম চারটি বেসরকারি খাতের নাগরিকদের জন্য এবং ‘প্রত্যয়’ নামের পঞ্চমটি স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাগরিকদের জন্য। ২০২৫ সালের ১ জুলাই তারিখের পর সরকারের চাকরিতে যোগ দেওয়া সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী এই স্কিমের আওতায় চলে আসবেন। ধীরে ধীরে বিদ্যমান স্কিমগুলো বাতিল হয়ে দেশের সকল নাগরিক সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অন্তর্ভুক্ত হবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় মার্চ মাসে একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ‘প্রত্যয়’ স্কিমটি চালু করেছে। এই স্কিমের আওতায় ১ জুলাই ২০২৪ থেকে শুরু করে যারা স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে যোগদান করবেন তারা বিদ্যমান পেনশন নিয়মের পরিবর্তে প্রত্যয় স্কিমের অধীনে অবসর জীবনে পেনশন পাবেন। অন্যান্য স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এই স্কিম নিয়ে বিরোধিতা না করলেও সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই স্কিম প্রত্যাখ্যান করে একে বাতিল করার দাবিতে আন্দোলন করছেন। এই আন্দোলনের সমর্থনে তারা সব কয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল প্রকার শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন। যদিও আন্দোলনরত শিক্ষকরা প্রত্যয় স্কিমের আওতায় পড়বেন না। শিক্ষকরা নিজেদের জন্য নয় ভবিষ্যত শিক্ষকদের জন্য এই আন্দোলন করছেন।

প্রত্যয় পেনশন স্কিমে গ্র্যাচুইটি বা চাকরির অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। ১১ মার্চের অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে গ্র্যাচুইটি, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, অব্যবহৃত ছুটির পরিবর্তে অর্থ, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কোনও কথা বলা হয়নি। তার মানে, সার্ভিস রুল অনুসারে ওগুলো যথা নিয়মে বলবৎ থাকবে। তাই এগুলো নিয়ে জল ঘোলা করা অর্থহীন।

প্রত্যয় স্কিম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রধান সমালোচনাগুলো হলোঃ ১) বিদ্যমান ব্যবস্থায় চাকরিজীবীর বেতন থেকে টাকা কাটা হয় না, যা প্রত্যয় স্কিমে কাটা হবে; ২) বিদ্যমান ব্যবস্থায় অধ্যাপকরা এককালীন গ্র্যাচুইটি বা আনুতোষিক পান ৮০,৭৩,০০০ টাকা, এ বিষয়ে প্রত্যয় স্কিমে কিছু বলা হয়নি; ৩) বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্জিত ছুটির পরিবর্তে অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা থাকলেও প্রত্যয় স্কিমে এ বিষয়ে কোনও উল্লেখ নেই; ৪) বিদ্যমান ব্যবস্থায় পেনশনার ও নমিনি আজীবন পেনশনপ্রাপ্ত হন, প্রত্যয় স্কিমে পেনশনার যদিও আজীবন পেনশনপ্রাপ্ত হবেন কিন্তু পেনশনারের মৃত্যুর পর নমিনি পেনশনারের বয়স ৭৫ বৎসর পূর্তি পর্যন্ত পেনশনপ্রাপ্ত হবেন; ৫) বিদ্যমান ব্যবস্থায় নিট পেনশনের ওপর ৫ শতাংশ হারে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়, প্রত্যয় স্কিমে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা নেই; ৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের সময়সীমা ৬৫ হলেও তা প্রত্যয় স্কিমে বিবেচনা করা হয়নি; এবং ৭) বিদ্যমান পেনশন স্কিমে মাসিক পেনশনের সঙ্গে মাসিক চিকিৎসা ভাতা, বছরে দুটি উৎসব ভাতা ও ১টি বৈশাখী ভাতা প্রদান করা হয়, প্রত্যয় স্কিমে এসব বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

প্রত্যয় পেনশন স্কিমে গ্র্যাচুইটি বা চাকরির অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। ১১ মার্চের অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে গ্র্যাচুইটি, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, অব্যবহৃত ছুটির পরিবর্তে অর্থ, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কোনও কথা বলা হয়নি। তার মানে, সার্ভিস রুল অনুসারে ওগুলো যথা নিয়মে বলবৎ থাকবে। তাই এগুলো নিয়ে জল ঘোলা করা অর্থহীন।

আর বিদ্যমান ব্যবস্থায় নমিনি জীবিত থাকলে তিনি আমৃত্যু পেনশন পান, প্রত্যয় স্কিমে পেনশনারের মৃত্যু হলে নমিনির ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর থেকে বেশি সময় নমিনি বেঁচে থাকলে নমিনি বিপদে পড়বেন। এমন ব্যবস্থা অবশ্যই পেনশন স্কিমে থাকা উচিৎ নয়। এ ব্যবস্থা শুধু প্রত্যয় স্কিমেই নয়, সর্বজনীন পেনশনের সকল স্কিম থেকে বাদ দেওয়া উচিৎ।

আজকের ১০০ টাকার মূল্য ৬০ বছর পরের ১০০ টাকার মূল্যের সমান হবে না। মুদ্রাস্ফীতিসহ আরও অনেক কারণে টাকার মান দীর্ঘ মেয়াদে এক থাকে না। বাড়তে বা কমতে পারে। এ জন্য বাণিজ্যিক জগতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের লাভ-ক্ষতি মূল্যায়নের জন্য অর্থের সময় মূল্য বিবেচনা করা হয়। চাকরিজীবীর বেতন থেকে টাকা কাটা এবং পেনশনের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টের বিষয় দুটো আলাদা করে না দেখে অর্থের সময় মূল্যের বিচারে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখা উচিৎ।

এছাড়া প্রত্যয় স্কিমের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল যে ৬০ বছর বয়সের পর থেকে পেনশন পাওয়া শুরু হবে। বাস্তবতা হচ্ছে বিশ্ববদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসর গ্রহণের বয়স ৬৫ বছর। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ স্কিমটি ডিজাইন করার সময় এ কথা বোধ হয় ভুলে গিয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষের এমন ভুলে যাওয়া উচিৎ নয়। তাদের অবশ্যই যত্নের সঙ্গে এত গুরুত্বপূর্ণ একটা স্কিম ডিজাইন করা উচিৎ ছিল। ২ জুলাই কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমে যে ব্যাখ্যা দিয়েছে তাতে আইন সংশোধন করে বিশ্ববদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য পেনশনের বয়স ৬৫ করা হবে বলে জানিয়েছেন।

আজকের ১০০ টাকার মূল্য ৬০ বছর পরের ১০০ টাকার মূল্যের সমান হবে না। মুদ্রাস্ফীতিসহ আরও অনেক কারণে টাকার মান দীর্ঘ মেয়াদে এক থাকে না। বাড়তে বা কমতে পারে। এ জন্য বাণিজ্যিক জগতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের লাভ-ক্ষতি মূল্যায়নের জন্য অর্থের সময় মূল্য বিবেচনা করা হয়। চাকরিজীবীর বেতন থেকে টাকা কাটা এবং পেনশনের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টের বিষয় দুটো আলাদা করে না দেখে অর্থের সময় মূল্যের বিচারে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখা উচিৎ।

এ বিষয়গুলো এবং স্কিমে জমা দেওয়া অর্থ ও স্কিম থেকে প্রাপ্তি সবকিছু একত্র করে, অর্থের সময় মূল্য বিবেচনায় নিয়ে একটা তুলনামূলক অংক করেছি। অংকের প্রেক্ষাপটটা এরকমঃ মনে করি, জনাব ‘ক’ ২০২৪ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। তার বর্তমান বয়স ৩০ বছর এবং তিনি ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করে অবসর গ্রহণ করবেন। যদিও আমাদের দেশে বর্তমান গড় আয়ু ৭২ বছরের মতো, তবুও আশাবাদী হিসাবে জনাব ‘ক’ ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন বলে ধরে নিই।

গণমাধ্যমে দেওয়া পেনশন কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী অংকটিতে অবসরের বয়স ৬৫ বছর ধরে করেছি। উপরোক্ত পরিস্থিতিতে, জনাব ‘ক’ ৩৫ বছর ধরে প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা করে স্কিমে চাঁদা দিয়ে যাবেন (এই টাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের বেতন থেকে কেটে রাখবে)। এভাবে ৩৫ বছরে তিনি ২১ লক্ষ টাকা জমা দেবেন। ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থেকে তিনি প্রত্যয় স্কিম থেকে ৬৫ বছর ১ মাস বয়স থেকে প্রতি মাসে ১৯১,৮৭০ টাকা করে পাবেন যার মোট যোগফল ৫ কোটি ৭৫ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা। এখান থেকে তার দেওয়া ২১ লক্ষ টাকা বাদ দিলে জনাব ‘ক’ এর নিট পাওনা হয় ৫ কোটি ৫৪ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা।

বিদ্যমান পেনশন স্কিম থেকে জনাব ‘ক’ একই সময়ে ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি মাসে পাবেন ৪৫,৭৯০ টাকা করে যা প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ বিদ্যমান স্কিম থেকে তিনি মোট পাবেন ২ কোটি ৬২ লক্ষ ২৫ হাজার ০৮৬ টাকা। অর্থের সময় মূল্য বিবেচনা না করলে প্রত্যয় স্কিম (ইনক্রিমেন্টের বিবেচনাসহ) বিদ্যমান স্কিমের চেয়ে ৩ কোটি ১৩ লক্ষ ৩৫ হাজার ৯১৪ টাকা বেশি দেবে।

১০ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেটে অর্থের সময়ের মূল্য বিবেচনায় প্রত্যয় স্কিমের আজকের মূল্য ৬৫ হাজার ৮৫২ টাকা এবং বিদ্যমান পেনশন স্কিমের মূল্য ২ লক্ষ ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। অর্থাৎ, বর্তমান বাজার মূল্যে বিদ্যমান স্কিম মাত্র ১ লক্ষ ৬৭ হাজার ৭৮৬ টাকা বেশি দেবে। পার্থক্যটা তেমন কিছু নয়। পেনশন কর্তৃপক্ষ স্কিমটা আরেকটু মনোযোগের সঙ্গে নতুন করে ডিজাইন করলে এই পার্থক্যটুকু দূর করা যাবে।

অর্থের সময় মূল্য বিবেচনা না করলে আলোচনাটা যৌক্তিক হয় না। এই অংকে মূল্যস্ফীতিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। পেনশন কর্তৃপক্ষও মূল্যস্ফীতিকে বিবেচনা করেনি। এ জাতীয় অংকে মূল্যস্ফীতিকে বিবেচনা করার প্রচলন নেই। কারণ এই দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে কখন মূল্যস্ফীতি কত হবে তা প্রাক্কলন করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া ডিসকাউন্ট রেটের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ধরা থাকে। এই দীর্ঘ সময় ধরে ডিসকাউন্ট রেট আসলে এক জায়গায় থেমে থাকবে না, সুদের বাজার দরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেকবার পরিবর্তন হবে। ১০ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেটে অর্থের সময়ের মূল্য বিবেচনায় প্রত্যয় স্কিমের আজকের মূল্য ৬৫ হাজার ৮৫২ টাকা এবং বিদ্যমান পেনশন স্কিমের মূল্য ২ লক্ষ ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। অর্থাৎ, বর্তমান বাজার মূল্যে বিদ্যমান স্কিম মাত্র ১ লক্ষ ৬৭ হাজার ৭৮৬ টাকা বেশি দেবে। পার্থক্যটা তেমন কিছু নয়। পেনশন কর্তৃপক্ষ স্কিমটা আরেকটু মনোযোগের সঙ্গে নতুন করে ডিজাইন করলে এই পার্থক্যটুকু দূর করা যাবে।

প্রত্যয়সহ সর্বজনীন পেনশন স্কিমগুলোর সব কয়টিতে কিছু কিছু দুর্বলতা রয়েছে। উপরের আলোচনায় বোঝা যাচ্ছে যে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর সমাধান করা কঠিন কোনও কাজ হবে না। দরকার পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মনোযোগ এবং সমাধানের সদিচ্ছা।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দাবির প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে শিগগিরই আলোচনায় বসে এই আন্দোলনের অবসান করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাকার্যক্রম চালু করা দরকার।

লেখক: চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।
ইমেইল: sabbahmed@yahoo.com

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত