Beta
শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

রপ্তানি-রেমিটেন্স বাড়ছে, রিজার্ভ বাড়ছে না কেন

ডলার
মার্কিন ডলার

সাত মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছে গত জানুয়ারিতে, একই মাসে রপ্তানি আয়েও হয়েছে রেকর্ড। তারপরও রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচেই রয়ে গেছে। ফলে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ এখন ১৯ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার।  

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অনুসৃত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের এই হিসাব দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বলা হয়েছে, ‘গ্রস’ হিসাবে রিজার্ভ ২৫ দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলার।

আগের সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবারও (১ ফেব্রুয়ারি) এই দুই হিসাবেই রিজার্ভ ছিল প্রায় একই। বিপিএম-৬ হিসাবে ছিল ১৯ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। আর ‘গ্রস’ হিসাবে ২৫ দশমিক শূন্য আট বিলিয়ন ডলার।

তার আগের সপ্তাহের বৃহস্পতিবার (২৪ জানুয়ারি) বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক শূন্য দুই বিলিয়ন ডলার। ‘গ্রস’ হিসাবে ছিল ২৫ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভ সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে যে দুই খাতের ভূমিকা থাকে, তার উল্লম্ফনের তথ্য মাসের শুরুতেই এসেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে।

চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে প্রবাসীরা ২১০ কোটি (২.১০ বিলিয়ন) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। এই অঙ্ক সাত মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি, আগের মাস ডিসেম্বরের চেয়ে বেশি ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।

নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেও জানুয়ারি মাসে ৫৭২ কোটি ৪৩ লাখ (৫.৭২ বিলিয়ন) ডলারের রপ্তানি আয়ের রেকর্ডও হয়। যা গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেশি।

একক মাসের হিসাবে এই আয় অতীতের যে কোনও মাসের চেয়ে বেশি। এর আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫৩৬ কোটি ৫২ লাখ (৬.৩৬ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রেমিটেন্স বেড়েছে ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। রপ্তানি আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৫২ শতাংশ।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এর পরও রিজার্ভ বাড়ছে না কেন?

ডলার বিক্রির কারণেই কমছে রিজার্ভ

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলেছেন, রিজার্ভ থেকে অব্যাহতভাবে ডলার বিক্রির কারণেই বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বাড়ছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (গত বছরের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি) রিজার্ভ থেকে সব মিলিয়ে ৮০০ কোটি (৮ বিলিয়ন) ডলার বিক্রি করা হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত আড়াই বছরে বিক্রি করা হয়েছে ২৯ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে ব্যাংকগুলো ডলারের যে দর ঘোষণা করছে, তার চেয়ে বাস্তবে বেশি। ডলারের সংকট থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে তেমন কড়াকড়ি করছে না।

রিজার্ভ থেকে এখন আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের দরে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার আন্তঃব্যাংকে টাকা-ডলারের বিনিময় হার ছিল ১১০ টাকা।

আগে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের চেয়ে ২/৩ টাকা কম দামে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করত কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বছরের জুলাই থেকে আর কম দামে ডলার বিক্রি করা হচ্ছে না।

তবে সব ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করা হচ্ছে না। জ্বালানি তেল, সারসহ সরকারের প্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অন্য ব্যাংকগুলোকে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে ডলার কিনে আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।

গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে সব মিলিয়ে রিজার্ভ থেকে ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছিল। তার আগের অর্থবছরে (২০২১-২২) বিক্রি করা হয়েছিল ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।

করোনা মহামারির কারণে আমদানি কমে যাওয়ায় এবং রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজার থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালের মার্চ থেকে দেশে ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। তা মোকাবেলায় শুরুতে ডলারের দাম বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এতে সংকট আরও বেড়ে যায়।

পরে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায়। এ দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) ওপর।

 এর পর থেকে এই দুই সংগঠন মিলে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় এবং আমদানি দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের দাম নির্ধারণ করে আসছে। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে এই দুই সংগঠন।

তবে, এবিবি ও বাফেদার সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই মানেনি ব্যাংকগুলো। অনেক ব্যাংক এই দুই সংগঠনের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়েও বেশি দামে রেমিটেন্স সংগ্রহ করেছে। এজন্য কয়েক দফায় কয়েকটি ব্যাংককে সতর্ক করার পাশাপাশি জরিমানাও করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থনীতি গবেষক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সব দেশেই ডলারের দর ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। তবে অনেক দেশই মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশে উঠে গিয়েছিল; এখন ৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে তারা।

“কিন্তু আমাদের মূল্যস্ফীতি কমছে না। ডলার সংকট কাটছে না; ডলারের বাজারে অস্থিরতা যাচ্ছে না। রিজার্ভ কমছেই। তাহলে প্রশ্ন জাগে সব দেশ পারলে আমরা পারছি না কেন? আমাদের গলদ কোথায়? আমরা কী ঠিকঠাক মত ব্যবস্থাপনা করছি না?”

তিনি বলেন, “এখানে দুটি বিষয় আমি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করতে চাই। দীর্ঘদিন ডলারের দর ধরে রেখে আমরা ঠিক কাজটি করিনি। ওইটা ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত।

“আরেকটি ভুল ছিল আমাদের, মূল্যস্ফীতি বাড়ছিল, তারপরও আমরা ৯ শতাংশ সুদ হার দীর্ঘদিন ধরে রেখেছিলাম। এখন অবশ্য সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই দুই ভুলের মাশুলই আমাদের এখন দিতে হচ্ছে “

“কতদিন রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হবে, তাও কিছু বলা যাচ্ছে না,” বলেন দীর্ঘদিন আইএমএফের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসা আহসান মনসুর।

এখন যে রিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুত থাকতে হয়। সেই হিসাবে টানটান অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist