Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪

কলাম

ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় রেস্তোরাঁর শ্রেণি নেই কেন

তাসলিহা মওলা। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিল ৪৬ জনের প্রাণ। কেউ জীবন্ত দগ্ধ হলেন, বেশিরভাগই মারা গেলেন ধোঁয়ায় দম আটকে শ্বাসনালি পুড়ে। এখনও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন অনেকেই।

দুঃখজনক হলো এর মাঝে বেশিরভাগ মৃত্যুই হয়েছে আগুনের মাঝে আটকা পড়ে— সময় মতো বেরিয়ে যেতে না পেরে। আগুনের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া অত্যন্ত বিষাক্ত ও উচ্চতাপ তৈরি করে। আগুনে পুড়ে যতজন মারা গেছেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে, শ্বাসনালি পুড়ে গিয়ে।

ফায়াস সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে দুই লাখ ৯ নয় হাজার ৯২৫টি। এসব ঘটনায় আর্থিক মানদণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার ৭৮০ কোটি ৩২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৩০ টাকা। একই প্রতিষ্ঠানের আরেক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালের আগের আট বছরে দেশে এক লাখ ৩০ হাজার ২১৫টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় এক হাজার ৯২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

অন্য আরেক সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশে ১৯৯৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। আর্থিক মানদণ্ডে যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সাত হাজার পাঁচশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অফিস, কলকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা আবাসিক ভবনে আগুন লেগে ২০০৪ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দুই হাজার ৩০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডে এমন গণমৃত্যুর ঘটনা রাজধানীতেই বেশি ঘটেছে। সেই তাজরিন গার্মেন্টস, বসুন্ধরা সিটি, বনানীর এফ আর টাওয়ার, নিমতলী, চকবাজার। এছাড়া অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোর বেশ কিছু বস্তি এলাকা, কেমিক্যাল ডিপো, কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেই চলেছে নিয়মিত।

বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা ছিল বিশাল। গত বছর বঙ্গবাজার ও ঢাকা নিউমার্কেটের আগুনে প্রাণহানি না হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ব্যাপক। এসব অগ্নিকাণ্ড ছাড়াও ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ছোট-বড় অনেক অগ্নিকাণ্ড ঘটছে প্রতিনিয়ত। তবে বেশিরভাগ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাই ঘটে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে। এ সময়ে আবহাওয়া থাকে অত্যাধিক শুষ্ক ও কিছুটা উষ্ণ। বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা হ্রাসের সঙ্গে থাকে দক্ষিণ দিক থেকে বয়ে আসা তীব্র গতির বাতাস। এ কারণে বড় বড় অগ্নিদুর্ঘটনাগুলো এ সময়েই বেশি ঘটতে দেখা যায়।

অগ্নি দুর্ঘটনার চারটি ধাপ রয়েছে। ইনসিপিয়েন্ট স্টেজ বা প্রাথমিক পর্যায়, গ্রোথ স্টেজ বা আগুনের ছড়িয়ে পড়ার আগের মুহূর্ত, ডেভেলপড স্টেজ অর্থাৎ আগুন যখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ে এবং ডিকে স্টেজ বা ধ্বংস পর্যায়। অর্থাৎ আগুন জ্বলতে জ্বলতে সব ধ্বংস করে নেভার পর্যায়ে চলে যায় বা আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

গ্রোথ স্টেজ বা ছড়িয়ে পড়ার আগেই তাই যত দ্রুত সম্ভব আগুন নিভিয়ে ফেলতে পারলে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি এড়াতে পারা যায়। কিন্তু যখনই আগুন ডেভেলপড স্টেজে চলে যায় তা নেভানো কঠিন হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ ২০১৭ সালে লণ্ডনে গ্রিনফেল টাওয়ারে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের কথা এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে।

এ ঘটনায় খুব দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল এবং দমকল বাহিনীর কিছুই করার ছিল না। এর পেছনে কারণ হিসেবে যা সামনে আসে তা হলো, পুরো ভবনের বাইরের দিকটা যাকে স্থাপত্যেরে ভাষায় এলিভেশন বলা হয়, সেখানে দাহ্য বস্তুর ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যার ফলে ভবনের একটি ফ্লোরে আগুন লাগবার দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তা পুরো দশতলা ভবনে ছড়িয়ে পড়েছিল।

বেইলি রোডের ভবনটিতে ছিল রেস্তোরাঁ, খাবারের ও ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান। ঢাকা শহরের অন্যান্য রেস্তোরাঁর মতো এখানেও মজুদ ছিল গ্যাস সিলিন্ডার, যেগুলো নিচে নামবার একমাত্র সিঁড়িটির ল্যান্ডিংয়ে রাখা হয়েছিল।

গত বছর বঙ্গবাজারের ক্ষেত্রেও ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছে। বিশাল পরিসরের এ মার্কেটটি তৈরির মূল উপকরণ হলো বাঁশ ও টিন। এখানে দোকানগুলোর মধ্যে বড় অংশ ছিল কাপড়ের দোকান, কসমেটিক্সের দোকান আর ছিল গোডাউন। আগুন ছড়িয়ে পড়তে এর চেয়ে সুবিধাজনক আর কোনও অবস্থাই হতে পারে না।

বনানী এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডেও আমরা দেখেছি, মানুষ নিরাপদে নিচে নেমে যেতে পারেনি। কারণ সিঁড়িতে মালামাল রেখে সে জায়গা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল অনেক জায়গায়। এ সময় যারা বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে, তারা ধোঁয়ার কারণে নিচে নামতে পারেনি। ভবনটির সিঁড়িও অগ্নি নিরাপত্তার কথা ভেবে নকশা করা হয়নি।

চকবাজার ও নিমতলীর মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে গোটা এলাকা ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সেসব এলাকায় ছিল নানান ধরনের বিপজ্জনক কেমিক্যাল সামগ্রীর গুদাম। যার দরুণ অতি দ্রুত সময়ে আগুন লেগে বিস্ফোরণের সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এভাবেই প্রায় প্রতি বছরই ভয়াবহ আগুনে প্রাণহানি যেমন হচ্ছে, তেমনি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিও হচ্ছে।

প্রতিবছর এই ব্যাপক প্রাণহানির পরও আমাদের মাঝে সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করা যায় ব্যাপকভাবে। বছরের এ সময়টাতেই আগুন নিয়ে তৎপরতা চললেও বাকি সময়টা আমরা আগুনের বিষয়টা যেন ভুলেই থাকি এক প্রকার। কিন্তু অগ্নি নিরাপত্তার বিষয়টি সারা বছর ধরেই মেনে চলার মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, আগুন লাগলে কী করতে হবে তা প্রতিটি মানুষের, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মানুষের একেবারে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলা উচিত।

উন্নত দেশগুলোতে, এমনকি এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক উন্নয়নশীল দেশেও স্কুলের বাচ্চাদের অগ্নি নিরাপত্তা সম্পর্কে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শুধু আগুন লাগা না, যে কোনও দুর্যোগের সময় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী হবে সে বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয় তাদের। আমাদের দেশে এমনটা হয় না।

তবে আশার কথা, নতুন শিক্ষাক্রমে এই বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখনও আমরা এই দুর্যোগকালীন সময়ে কী করণীয় সে বিষয়গুলো সম্পর্কে একেবারেই ওয়াকিবহাল নই। এখন সময় এসেছে এসব বিষয়ে জানবার, সচেতন হবার। শুধু সাধারণের সচেতনতাই পারে এই বিপুল প্রাণহানি থেকে আমাদের রক্ষা করতে।

সাধারণ মানুষ যদি নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হয়, তাদের জানা দরকার কী করা উচিত আর কী উচিত নয়। তাহলে কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে ভবন সংশ্লিষ্ট সকল পেশাজীবী এবং ভবন মালিকও বাধ্য হবেন আইনকানুন, নীতিমালা, কোড ইত্যাদি মেনে চলতে। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন আইনকানুন, বিধিবিধান ইত্যাদি সম্পর্কে যতবেশি সম্ভব প্রচার প্রচারণা করা। কারণ এসব আইনকানুন সম্পর্কে আমাদের দেশের জনসাধারণ ব্যাপকভাবে অবগত নন।

ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় স্থাপনার শ্রেণিবিন্যাসে রেস্তোরাঁর মতো বহু মানুষের সমাগম স্থানকে কোনও শ্রেণিতে পরিষ্কারভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সমাবেশ ভবনকে E শ্রেণিভুক্ত করা হলেও সেখানে কোথাও রেস্তোরাঁর কথা উল্লেখ করা নেই। আবার F শ্রেণিভুক্ত বাণিজ্যিক ভবনের তালিকাতেও নেই রেস্তোরাঁর কথা। সুতরাং অকুপেন্সি সার্টিফিকেটে ব্যবহার বদলের যে বিষয়টা বলা হচ্ছে, তা এক্ষেত্রে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করছে। বিধিমালার এই জায়গাটা পর্যালোচনা করে সংশোধন করা একান্ত প্রয়োজন।

আইন ও বিধিমালার দিক থেকে দেখলে ‘‘ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮’’-এ রেস্তোরাঁকে কোথাও শ্রেণিবিন্যস্ত করা হয়নি। এ নিয়ে আইন, বিধিমালা ও কোড সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে মাত্র।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে রয়েছে অনেক গলদ। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশ সংক্রান্ত যথাযথ সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ভবন তৈরি হচ্ছে। ডেভেলপাররা মালিক পক্ষকে বিশাল অংকের অর্থ প্রদান করছেন জমির বদলে। নির্দিষ্ট সময় পর বুঝিয়েও দিচ্ছেন মহামূল্যবান ভবন। অথচ সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সেই ভবন হয়ে উঠছে মৃত্যুকূপ।

এখানে উল্লেখ্য “Bangladesh National Building Code, BNBC 2022”, এর সঙ্গে “ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮” এবং অন্যান্য নগরের জন্য প্রণীত বিধিমালার কোনও রূপ সংঘর্ষ নেই। যদিও ‘‘ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০২২-২০৩৫’’ এ ‘‘BNBC 2022’’ থেকে কিছুটা বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যায়। এসব বিধিমালায় “Building Construction Act, 1952” এর অধীনে নিয়মের ব্যতয় ঘটলে প্রয়োজনীয় ও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবার কথাও বলা হয়েছে।

‘‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২২’’, ‘‘ঢাকা  মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮’’ এবং অন্যান্য বিভাগীয় শহর, পৌরসভা ও জেলা শহরগুলোর জন্য প্রণীত বিধিমালা সমূহে  ‘অগ্নিনিরাপত্তা’ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আলোকপাত করা হয়েছে। এছাড়া সকল বৃহদায়তন প্রকল্পের জন্য সেটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে উন্নত দেশে এ ধরনের বিধিবিধানসমূহ প্রতি দুই বা তিন বছর পর পর হালনাগাদ করা হয়। এ চর্চা আমাদের দেশে নেই।

‘‘ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮’’ এর ৫৯ নং বিধির অনুচ্ছেদ ‘চ’-এর প্রথমেই ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্যে একটি বিস্তারিত নির্দেশনা অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। চ (২) বলছে, “সকল ইমারতে (প্রযোজ্য ক্ষেত্র) জরুরী প্রস্থান প্রদর্শনকারী দিকচিহ্ন থাকিতে হইবে” এবং চ (৩) এ আছে “যন্ত্রচালিত উঠানামার ব্যবস্থা ফায়ার এক্সিট হিসাবে ব্যবহৃত হইবে না”। পরিশিষ্ট– ১ এ বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে ভবনের অগ্নি নিরাপত্তার নকশা সম্পর্কে।

ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় স্থাপনার শ্রেণিবিন্যাসে রেস্তোরাঁর মতো বহু মানুষের সমাগম স্থানকে কোনও শ্রেণিতে পরিষ্কারভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সমাবেশ ভবনকে E শ্রেণিভুক্ত করা হলেও সেখানে কোথাও রেস্তোরাঁর কথা উল্লেখ করা নেই। আবার F শ্রেণিভুক্ত বাণিজ্যিক ভবনের তালিকাতেও নেই রেস্তোরাঁর কথা। সুতরাং অকুপেন্সি সার্টিফিকেটে ব্যবহার বদলের যে বিষয়টা বলা হচ্ছে, তা এক্ষেত্রে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করছে। বিধিমালার এই জায়গাটা পর্যালোচনা করে সংশোধন করা একান্ত প্রয়োজন।

বাংলাদেশের উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রা বহমান তার সঙ্গে এই মৃত্যু মিছিল কি আদৌও সামাঞ্জস্যপূর্ণ? প্রকৃত অর্থে অগ্নি দুর্ঘটনা প্রশমনের জন্য প্রয়োজন একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কবে অগ্নি দুর্ঘটনারোধে সবার একসঙ্গে যথাযথভাবে উদ্যোগী হওয়ার সময় হবে?

লেখক: স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ।
ইমেইল:taslihamowla@gmail.com

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত