Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট শুরু, চলবে তিন দিন

রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শুক্রবার শুরু হওয়া ভোট চলবে রবিবার পর্যন্ত। ছবি : আল জাজিরা
রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শুক্রবার শুরু হওয়া ভোট চলবে রবিবার পর্যন্ত। ছবি : আল জাজিরা

রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট শুরু হয়েছে। প্রথমবারের মতো রাশিয়ার নাগরিকরা তিন দিন ধরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেবেন। শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত চলবে এই ভোটগ্রহণ। এ ছাড়া ইউক্রেনে রাশিয়ার দখল করা অঞ্চলগুলোর ভোটাররাও প্রথমবারের মতো রুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন।

ভোটগ্রহণের পর কয়েকদিনের মধ্যেই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। আর বিজয়ী প্রার্থী আগামী মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনই নির্বাচনে জয়ী হবেন এবং পঞ্চমবারের মতো দেশটির নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন।

বাকি যে তিনজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন তারাও মূলত পুতিন সরকারেরই ঘনিষ্ঠ দলের নেতা। এরা হলেন- কমিউনিস্ট পার্টির নিকোলাই খারিটোনভ, জাতীয়তাবাদী উদার গণতান্ত্রিক দলের লিওনিড স্লুটস্কি ও নিউ পিপল পার্টির ভ্লাদিস্লাভ দাভানকভ।

দাভানকভ রাশিয়ার সংসদের নিম্নকক্ষ দুমার বর্তমান উপ প্রধান। তিনটি দলই ইউক্রেন যুদ্ধসহ পুতিন সরকারের নীতিগুলোকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছে।

২০২০ সালে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করে রাশিয়ায় একাধিক দিনে ভোটগ্রহণ পদ্ধতি চালু করা হয়। তবে এবারই প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একাধিক দিনে ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে।

নির্বাচনে জয়ী হতে একজন প্রার্থীকে অর্ধেকের বেশি ভোট পেতে হবে। যদি কোনও প্রার্থী অর্ধেকের বেশি ভোট না পান তাহলে প্রায় তিন সপ্তাহ পরে দ্বিতীয় দফায় ভোট হবে।

এখন শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট হচ্ছে। পার্লামেন্ট সদস্যদের নির্বাচনের জন্য ভোট হবে ২০২৬ সালে।

রাশিয়ায় প্রায় ১১ কোটি ভোটার রয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে পুতিন সরকার নিয়ন্ত্রিত জরিপ সংস্থা ভিটিএসআইওএম’র এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৯ শতাংশ ভোটার পুতিনকেই ফের প্রেসিডেন্ট হিসেবে চান।

পুতিন কতদিন ধরে ক্ষমতায়

২০০০ সাল থেকে পুতিন রাশিয়ার ক্ষমতায় রয়েছেন এবং ২০০৪, ২০১২ ও ২০১৮ সালে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। দুটি চার বছরের মেয়াদ ও দুটি ছয় বছরের মেয়াদে পুতিন দেশটির ক্ষমতায় ছিলেন।

২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত পুতিন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন দিমিত্রি মেদভেদেভ। তবে সেই সময়কালেও পুতিনই কার্যত রাশিয়ার শাসক ছিলেন।

২০২১ সালে পুতিন একটি ডিক্রি জারি করে আরও দুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রার্থিতার পথ পরিষ্কার করেন। এতে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত পুতিনের রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি হয়।

ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনই নির্বাচনে জয়ী হবেন এবং পঞ্চমবারের মতো দেশটির নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন

এবারের নির্বাচনে জয়ী হলে ৭১ বছর বয়সী পুতিন হবেন জোসেফ স্ট্যালিনের পর রাশিয়ার দীর্ঘতম শাসক। স্ট্যালিন ১৯২২ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত টানা ৩০ বছর সোভিয়েত রাশিয়ার শাসক ছিলেন।

১৯৯০ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়র আনাতোলি সোবচাকের হাত ধরে পুতিন রাজনীতিতে আসেন। সোবচাক ছিলেন পুতিনের সাবেক শিক্ষক। সোভিয়েত আমলে পুতিন কমিউনিস্ট রাশিয়ার গোপন গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির কর্মকর্তা ছিলেন।

গত শতকের নব্বইয়ের দশক জুড়ে পুতিন পদমর্যাদায় উপরে উঠতে থাকেন। ১৯৯৮ সাল নাগাদ তিনি কেজিবির উত্তরসূরি গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের (এফএসকে) প্রধান হন, যা এখন ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) নামে পরিচিত।

তার পরের বছরই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন পুতিনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেন।

১৯৯৯ সালে ইয়েলৎসিন পদত্যাগ করলে পুতিন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তার কয়েক মাস পরে ২০০০ সালের মে মাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়ে পুতিন তার প্রথম চার বছরের মেয়াদ শুরু করেন।

গণতন্ত্র নাকি একনায়কতন্ত্র

পুতিন দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকায় পশ্চিমারা (ইউরোপ-আমেরিকা) তাকে স্বৈরশাসক হিসেবে অভিহিত করে। এছাড়া তারা তাকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ ও ‘খুনি’র তকমাও দেয়। কিন্তু রাশিয়ার জনমত জরিপ দেখা গেছে, বর্তমানে দেশটির প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ পুতিনের শাসনের পক্ষে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে।

রাশিয়ার পেসিডেন্ট দপ্তর ক্রেমলিন বলেছে, পুতিনের প্রতি সমর্থন অপ্রতিরোধ্য। আর গণতন্ত্র সম্পর্কে পশ্চিমাদের কোনও লেকচার রাশিয়া শুনতে চায় না। পশ্চিমারা নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে অহেতুক সন্দেহ সৃষ্টি করে রাশিয়াকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

কট্টর কমিউনিস্ট থেকে শুরু করে উগ্র জাতীয়তাবাদী পর্যন্ত রাশিয়ার বিরোধী দলগুলোর বেশিরভাগই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক নিয়ম মেনে চলে। এমনকি পার্লামেন্টে আসন থাকা সত্ত্বেও প্রধান কোনও ইস্যুতে পুতিন সরকারের বিরোধিতা করে না। পশ্চিমাপন্থী উদারপন্থীদের রুশ পার্লামেন্টে কোনও আসন নেই।

তার সমর্থকরা মনে করেন, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পুতিন রাশিয়াকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।

বুধবার রাতে এক ভিডিও ভাষণে পুতিন রাশিয়ার নাগরিকদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

পুতিন বলেন, “আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, জনগণই আমাদের দেশের ক্ষমতার একমাত্র উৎস। এই মূল আইনি বিধানটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মানে হল যে শুধুমাত্র আপনারা, রাশিয়ার নাগরিকরা, পিতৃভূমির ভবিষ্যত নির্ধারণ করবেন।”

পুতিন আরও বলেন, “দেশ আজ এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং তা কাটিয়ে উঠতে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী থাকতে হবে।”

যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনাবাহিনীও ভোট দেবে উল্লেখ করে পুতিন বলেন, “তারা সাহস ও বীরত্ব দেখায়, আমাদের পিতৃভূমিকে রক্ষা করে এবং আমাদের সকলের জন্য নজির স্থাপন করার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

“সুতরাং, আমি আপনাকে আগামী তিন দিনের মধ্যে আপনার ভোটের অধিকার প্রয়োগ করার আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের এই বিশাল দেশের প্রতিটি শহর, নগর ও গ্রাম সর্বত্র ভোট কেন্দ্র খোলা হবে।”

পুতিন বিরোধীরা কোথায়

পুতিন বিরোধী রাজনীতিবিদ বরিস নাদেজদিন এবার পুতিনের বিরুদ্ধে লড়াই করার চেষ্টা করেছিলেন। ইউক্রেনে হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি জনগণের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন (সিইসি) তার সমর্থকদের স্বাক্ষরের তালিকায় অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে। এতে তার আশাভঙ্গ হয়। কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি জানিয়ে দেন, তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন না।

ইউক্রেনে হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়েকাতেরিনা দুতসোভাকেও গত ডিসেম্বরে সিইসি প্রত্যাখ্যান করেছে। পরে তিনি তার সমর্থকদের নাদেজদিনকে সমর্থন করার আহ্বান জানান।

রাশিয়ার সবচেয়ে পরিচিত বিরোধী নেতা ও কট্টর পুতিন সমালোচক আলেক্সি নাভালনি গত মাসে কারাগারে হঠাৎ করেই মারা যান। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে পুতিনের বিরুদ্ধে লড়ার চেষ্টা করেছিলেন।

পুতিনকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো বাকি বিরোধদের বেশিরভাগই হয় জেলে আছেন বা বিদেশে থাকেন।

আলেক্সি নাভালনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় তার বিধবা স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া নির্বাচনের দিনে পুতিনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তেমন কোনও লক্ষণ এখনও দেখা যায়নি।

অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দপ্তর ক্রেমলিন বলেছে, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার যেকোনও দেশি-বিদেশি প্রচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, “আমরা কখনোই কাউকে বলি না কীভাবে জীবন-যাপন করতে হয়। তাই আমরাও চাই না কেউ আমাদের উপদেশ দিতে আসুক। সুতরাং অবশ্যই আমরা আমাদের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার যে কোনও প্রচেষ্টাকে দমন করব।”

পেসভক বলেন, অনেক দেশ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করার উপায় নিয়ে আলোচনা করছে। কিন্তু আমরা তাদের সিদ্ধান্ত ও মূল্যায়ন শুনতে রাজি নই। আমাদের জন্য, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের নিজেদের মূল্যায়ন। আর আমাদের জন্য, আমাদের প্রত্যেকের জন্য, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের ভোট।”

গত সপ্তাহে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মস্কোতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত লিন ট্রেসিকে তলব করে সতর্ক করেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তিনি বলেন, রাশিয়া তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে বলে মনে করা কূটনীতিকদের বহিষ্কার করবে।

এবারের নির্বাচনের প্রধান ইস্যুগুলো কী

অর্থনীতি

ইউক্রেনে হামলার পর ইউরোপ-আমেরিকাসহ অস্ট্রেলিয়া ও জাপান রাশিয়ার ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে দেশটির ওপর।

এতে রাশিয়া প্রথম দিকে কিছুটা বিপাকে পড়লেও দেশটির অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েনি। ২০২২ অর্থবছরে রাশিয়ার জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে গেলেও পরের বছরই আবার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়ে। রাশিয়ার অর্থনীতি চলতি বছরে বিশ্বের শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট গ্রুপ অব সেভেন (জি-৭) এর দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০২৩ সালে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বহির্ভূত আয়ও ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তবুও ফেব্রুয়ারিতে একটি বক্তৃতায় পুতিন অর্থনীতিকে আরও পুনরুজ্জীবিত করার এবং প্রাকৃতিক সম্পদ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের উপরও নির্ভর করে রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

বেকারত্ব

ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রে বেলোসভ জানিয়েছিলেন, দেশটিতে বেকারত্বের মাত্রা রেকর্ড ২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। কোম্পানিগুলো শ্রমিকের ঘাটতিতে পড়ায় রাশিয়ার সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে।

কর্মীদের ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ ও ধীর গতির প্রবৃদ্ধির কারণে কিছু কোম্পানি স্বেচ্ছায় চলে যাওয়া কর্মীদের জায়গায় নতুন কর্মীও নিয়োগ দিতে পারছে না। ফলে গত সাত মাস ধরে সবচেয়ে অনেক কম কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist