Beta
শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪

গুলশানের বাড়ি ছাড়তে হবে সালাম মুর্শেদীকে

গুলশানে সালাম মুর্শেদীর এই বাড়ি এখন সরকারের হাতে যাবে।
গুলশানে সালাম মুর্শেদীর এই বাড়ি এখন সরকারের হাতে যাবে।

ঢাকার গুলশানে দখলে রাখা বাড়িটি হারাতে হচ্ছে আব্দুস সালাম মুর্শেদীকে। পরিত্যক্ত সম্পত্তি হওয়ায় বাড়িটি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে বুঝিয়ে দিতে তাকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

এক সময়ের ফুটবলার, বর্তমানে ব্যবসায়ী ও সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদীদের এই বাড়ি বেহাত হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকাটি সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের, ফুটবল পাগল এই আইনজীবীও এখন একজন সংসদ সদস্য। দুজনে এক দল করলেও সুমন সংসদে আছেন স্বতন্ত্র পরিচয়ে।

গুলশান আবাসিক এলাকার ১০৪ ও ১০৩ নম্বর সড়কের সংযোগস্থলের (কর্নার প্লট) ৪০০ কোটি টাকা দামের ২০ কাঠাজমিসহ বাড়িটি সালাম মুর্শেদী তিন দশক ধরে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন দাবি করে একটি রিট আবেদন করেন সুমন।

সেই আবেদনে কয়েক দফা শুনানি শেষে মঙ্গলবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী ইবাদত হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ বাড়িটি তিন মাসের মধ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়।

আদালতের নির্দেশকে ‘জনগণের বিজয়’ হিসাবে দেখছেন রিট আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী অনীক আর হক।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আদালত বলেছেন, এটা একটা পরিত্যক্ত সম্পত্তি। যেহেতু পরিত্যক্ত সম্পত্তি, তাই এ রায়ের তিন মাসের মধ্যে আব্দুস সালাম মুর্শেদীকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এ সম্পত্তি বুঝিয়ে দিতে হবে।

“সম্পত্তি বুঝে নিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে সচিব আদালতকে হলফনামা দাখিল করবেন। একই সঙ্গে দুদক সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যেন সঠিকভাবে তদন্ত করে, তারও নির্দেশ দেওয়া হয়।”

এদিকে এই রায়কে ‘বিরল’ বলছেন সালাম মুর্শেদীর আইনজীবী সাঈদ আহমেদ। তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “পরিত্যক্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের রায় ছাড়া বা সরাসরি সরকারের কাছে রয়েছে, এমন সম্পত্তি ছাড়া আদালত এভাবে আদেশ দিতে পারে না।”

হাই কোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে  তিনি বলেন, “দেওয়ানি মামলার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি যে এটি পরিত্যক্ত বা মুর্শেদীর সম্পত্তি নয়। হাইকোর্ট বিভাগ জনস্বার্থের মামলায় সরাসরি সম্পত্তি হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি বের হলে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে তারপর আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।”

এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাফুফের সহসভাপতি সালাম মুর্শেদী খুলনা-৪ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এনিয়ে দ্বিতীয়বার। অন্যদিকে সুমন হবিগঞ্জ-৪ আসনে এবারই প্রথম সংসদ সদস্য হন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে।

তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী সালাম মুর্শেদী ২০০৯ সালে বিজিএমইএর সভাপতি হওয়ার সময় থেকে আওয়ামী লীগে ঘেঁষতে শুরু করেন। ২০১৮ সালে খুলনা-৪ আসনে উপনির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য হন তিনি। অন্যদিকে যুবলীগের এক সময়ের নেতা সুমন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হন।

দুদক হয়ে হাইকোর্টে সুমন

সালাম মুর্শেদী বাড়িটি দখল করে আছেন, এমন অভিযোগ ২০২২ সালের ১১ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনে দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুমন। অভিযোগে তিনি ‘পরিত্যক্ত বাড়ি হিসেবে লিপিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে সালাম মুর্শেদী বাড়িটি দখল রেখেছেন, তার ব্যাখ্যা চান।

সেখানে সুরাহা না পেয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন সুমন। ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর ‘জনস্বার্থে’ করা ওই আবেদনে তিনি অভিযোগ করেন, গুলশান-২ এর বাড়িটি ১৯৮৬ সালের অতিরিক্ত গেজেটে ‘খ’ তালিকায় পরিত্যক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত। কিন্তু সালাম মুর্শেদী তা দখল করে বসবাস করছেন।

রিট আবেদনে ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল, ২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি এবং ২০২২ সালের ৪ জুলাই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যানকে দেওয়া গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তিনটি চিঠি যুক্ত করা হয়।

২০১৫ ও ২০১৬ সালে দেওয়া চিঠিতে পরিত্যক্ত বাড়ির তালিকা থেকে বাড়িটি অবমুক্ত না হওয়ার পরও সালাম মুর্শেদী কীভাবে বাড়িটি দখল করে আছেন, রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে এ ব্যাখ্যা চেয়েছিল পূর্ত মন্ত্রণালয়।

রাজউক চেয়ারম্যান সে চিঠি আমলে না নেওয়ায় ২০২২ সালের ৪ জুলাই আবার চিঠি দেওয়া হয়। পরিত্যক্ত বাড়ির তালিকা থেকে ভবনটি অবমুক্ত না হওয়ার পরও কীভাবে রাজউক চেয়ারম্যানের দপ্তর থেকে সেটির নামজারি ও দলিল করার অনুমতি দেওয়া হলো, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে ওই চিঠিতে অনুরোধ করা হয়।

সেবারও কোনও ব্যাখ্যা দেননি রাজউক চেয়ারম্যান।

রিট আবেদনের পর ২০২২ সালের ১ নভেম্বর রুল জারি করে আদালত। রুলে সরকারের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়ে বাড়ি বানানোর অভিযোগে সালাম মুর্শেদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি এ সম্পত্তি সম্পর্কিত সব কাগজপত্র ১০ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে রাজউক, গণপূর্ত বিভাগ ও সালাম মুর্শেদীকে নির্দেশ দেয় আদালত।

আদালতের নির্দেশে যথা সময়ে প্রতিবেদন দাখিল না করায় দুদককে কড়া হুঁশিয়ারি দেয় আদালত। পরে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি দুদক প্রতিবেদন দাখিল করে আদালতকে জানায়, অনুসন্ধানে বাড়িটির বিষয়ে জাল–জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন সর্বসম্মতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে যাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ পেয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ৫ ফেব্রুয়ারি মামলা করেছে। তদন্তও শুরু হয়েছে।

এরপর সবপক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত রুলের ওপর রায়ের জন্য প্রথমে ১০ মার্চ দিন ঠিক করে। এরপর কয়েকদফা পিছিয়ে ১৯ মার্চ রায় ঘোষণা করা হয়। আর তাতে গুলশানের ওই বাড়ি হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয় সালাম মুর্শেদীকে।

সুমন এর আগে সাংবাদিকদের বলেন, দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে একজন সংসদ সদস্য এখানে ‘দখলদার’ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন।

ব্যক্তি সালাম মুর্শেদীর সঙ্গে তার কোনও সমস্যা নেই জানিয়ে সুমন বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি অবৈধ দখল উচ্ছেদে তিনি আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।

গুলশানে আব্দুস সালাম মুর্শেদীর এই বাড়িটি এখন তাকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। ছবি : হারুন অর রশীদ

যেভাবে সালাম আসেন দখলে

সালাম মুর্শেদীর বাড়ির বিষয়ে দুদকের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

সেখানে উঠে আসে, সালাম মুর্শেদী গুলশানে যে প্লটটিতে বাস করছেন সেটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি। তবে এটি দখলে নিতে নানা ধরনের চাতুরির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে নানা নথিও।

২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, প্লটের সামনের বিভাজিত ২৭/বি অংশে একটি তিনতলা ইমারত রয়েছে। পেছনের বিভাজিত সিইএন(ডি)-২৭/এ প্লটটি বাউন্ডারি ওয়াল দ্বারা ঘেরা। প্লটটির উত্তরে সিইএন (ডি) ২৬ নং প্লট। দক্ষিণে ১০৩ নং রাস্তা, পশ্চিমে ১০২ নং রাস্তার ২ নং প্লট এবং পূর্বে ১০৪ নং রাস্তা বিদ্যমান। বর্ণিত প্লটটি পূর্বমুখী এবং প্লটের প্রবেশদ্বার ১০৪ নং রাস্তা সংলগ্ন পূর্ব দিকে অবস্থিত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এটি ১৯৮৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত ৯৭৬৪(১) নং পৃষ্ঠার ৪৬ নং ক্রমিকে ‘খ’ তালিকাভুক্ত পরিত্যক্ত বাড়ি।

সর্বশেষ জরিপে জমিটি গণপূর্ত নগর উন্নয়ন বিভাগ, ঢাকা এর নামে রেকর্ডভুক্ত উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সিইএন(ডি) ২৭ নম্বর প্লটের মূল নথি পাওয়া যায়নি। যেসব নথি রয়েছে, তার সবই ফটোকপি।

সেই কাগজপত্র পর্যালোচনা করে কমিটি দেখতে পায় যে প্লটটি ১৯৬০ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা রি-রোলিং মিলসকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। নথিতে থাকা কাগজে দেখা যায়, ১৯৬৯ সালের ২০ অক্টোবর বিক্রয় চুক্তিনামা অনুযায়ী প্লটটি মালেকা রহমান নামে একজনের সঙ্গে বিক্রয় চুক্তি সম্পাদিত হয়।

পরবর্তীকালে ১৯৯৫ সালে মালেকা রহমানের আবেদনে তার সন্তান মীর মোহাম্মদ হাসান ও মীর মোহাম্মদ নুরুল আফছার দানসূত্রে এই প্লটের যৌথ লিজ গ্রহীতা হন। পরে তাদের আবেদনে ১৯৯৭ সালে ৩১ মার্চ বিভাজিত প্লটের ২৭/বি সালাম মুর্শেদী বরাবর হস্তান্তরে অনুমোদন করা হয়।

ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর তার আবেদনে প্লটটি হাসান ও নুরুলের পরিবর্তে হস্তান্তরসূত্রে সালাম মুর্শেদীর নামে নামজারি ও হস্তান্তরগ্রহীতা হিসাবে গণ্য করা হয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, পরে তার আবেদনে ২০০৪ সালে রাজউক ইমারত নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদনের ছাড়পত্র দেয়।

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি বলেছে, ঢাকা রি রোলিং মিলসের কাছ থেকে মালেকা বেগম/রহমান নামের ব্যক্তি বা এই নামধারী ব্যক্তি হস্তান্তরসূত্রে/ক্রয়সূত্রে লিজ গ্রহীতা হিসাবে গণ্য করার সপক্ষে কোনও বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। পরবর্তীকালে দুই ছেলে দানপত্র ও দানপত্রে মালেকা রহমানের স্বাক্ষর সিআইডির তদন্তে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। ফলে একই সূত্রে সালাম মুর্শেদী ও ইফফাত আরা হকের অনুকূলে সংশ্লিষ্ট বিভাজিত প্লট হস্তান্তর/নামজারি বাতিল বলে বিবেচিত হয়।

সালাম
সালাম মুর্শেদী।

ফুটবলার থেকে ব্যবসায়ী হয়ে এমপি

সালাম মুর্শেদী বাড়ি খুলনার রূপসা উপজেলায়। নিজের জেলায় তরুণ বয়সেই পরিচিত পান ক্রীড়াবিদ হিসেবে। তিনি ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে খুলনা থেকে ঢাকায় আসেন। সে সময় তিনি হয়ে ওঠেন ঢাকার ফুটবলের তারকাদের একজন।

আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে ঢাকার ফুটবল লীগে তার খেলা শুরু। ১৯৮০ সালে ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন। সাদা-কালোর হয়ে ১৯৮০ এবং ১৯৮২ সালে লীগ শিরোপা এবং ১৯৮০ সাল থেকে টানা ৪ বার ফেডারেশন কাপ জেতেন তিনি।

মোহামেডানের হয়ে ১৯৮২ সালে জাতীয় ফুটবল লীগে ২৭ গোল করেছিলেন সালাম। এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের সেই রেকর্ড এখনও অমলিন।

ক্রীড়া ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০০৩ সালে সরকার তাকে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত করে।

ফুটবল ছাড়ার পর পোশাক ব্যবসায় নামেন সালাম। প্রথম দিকে একসঙ্গে ছিলেন এনভয়ের দুই কর্ণধার কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও সালাম মুর্শেদী।

১৯৮৪ সালে পোশাক খাতের মাধ্যমে যাত্রা করা এনভয় গ্রুপের আওতায় রয়েছে এখন ৪০টি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

এছাড়া তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতির পদে রয়েছেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist