Beta
বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪

কলঙ্ক আর বিতর্কে জেরবার ফুটবল

বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। (ফাইল ছবি)
বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। (ফাইল ছবি)
Picture of সনৎ বাবলা

সনৎ বাবলা

২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল, বাফুফে নির্বাচনের সেই আলোড়ন তোলা রাত। ফুটবলের মহাতারকা কাজী সালাউদ্দিনে রাঙানো সেই রাতে সবাই কত আকাশকুসুম ভেবে নিয়েছিল। মোটা দাগে ফুটবলের পুনর্জাগরণের স্বপ্নে চোখ রাঙিয়েছিল অনেকে। ১৫ বছরেরও বেশি সময় পার করে দেখি সেসব মিছে স্বপ্ন।

বরং সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে ১৫ বছরে ফুটবল যে তিমিরে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে। অনেক বিতর্ক আর কলঙ্ক মেখে আরও দীনহীন করেছেন ফুটবলের অবস্থা। জালিয়াতি ও অনিয়মের কারণে ফিফা বাফুফে সাধারণ সম্পদক আবু নাঈম সোহাগকে নিষিদ্ধ করে দেশের ফুটবলে কলঙ্ক লেপে দিয়েছে। একইসঙ্গে ফুটবল ফেডারেশনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশেও কি প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসিয়ে দেয়নি? 

নিষিদ্ধ সোহাগে জেরবার বাফুফে

বাফুফের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ফিফা তদন্ত করছিল, সেটাই কখনো স্বীকার করেননি কাজী সালাউদ্দিন। বাফুফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোহাগ তার পক্ষে সাফাই দিতে জুরিখে ফিফা সদর দপ্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন তিন সহকর্মীকে নিয়ে। সেটাও নাকি জানতেন না বাফুফে সভাপতি! পরে বাফুফের বিভিন্ন খরচে অনিয়ম, জালিয়াতি ও মিথ্যাচারের অভিযোগে ফিফা ২০২৩ সালে ১৪ এপ্রিল নিষিদ্ধ করে সোহাগকে।

বাফুফের নিষিদ্ধ সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগ। ছবি: সংগৃহীত

ফিফার ৫১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ফুটবল কেনা, জাতীয় দলের বিমান টিকিট ক্রয়সহ– এমন নানা খাতে অনিয়ম ও জালিয়াতির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়। ফিফার তদন্তে ভুয়া কোম্পানির নামে বাফুফের লোকজন দরপত্র দাখিল করেছে, সেটাও উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে ৬ কোটি টাকার মতো গরমিল খুঁজে পায় তারা। এরপর বাফুফে সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদের নেতৃত্বে আরেক দফা ‘অধিকতর’ তদন্তের নাটক করে বাফুফে। কেনাকাটার কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা না বলে ওই বাফুফে ভবনে বসেই নাবিলবাহিনী তদন্ত করেছে। যদিও তার ফল অজানা।

করার মধ্যে সোহাগকে আজীবন নিষিদ্ধ করেছে বাফুফে। যদিও নিষিদ্ধ সম্পাদকের সংবাদ সম্মেলন সম্প্রচার করা হয়েছিল বাফুফের ফেসবুক পেজ থেকে। তার নির্দেশনায় এখনও বাফুফে পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ আছে। অর্থাৎ সর্ষের মধ্যেই আছে ভূত।

সভাপতি ও সহ-সভাপতির আগ্রহ জুতা-অন্তর্বাসে!

২০২৩ সালের ২ মে। কাজী সালাউদ্দিন সেদিন আরেক বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিকদের ‘বাবার জুতা পরা’ ছবি চেয়ে। বাফুফে সভাপতি বলেছিলেন, “জার্নালিস্টরা এখানে ঢুকতে গেলে তাদের বাপের জুতা পরা ছবি পাঠাতে হবে আগে। এটা মেন্ডেটরি। বাপের জুতা পরা ছবি থাকতে হবে অবশ্যই।”

সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগে সাংবাদিকদের নিয়ে কটাক্ষের সুরে এসব কথা বলে নিজেরা হাস্যরস করছিলেন। তাদের সামনে রাখা সাংবাদিকদের ভয়েস রেকর্ডারে আলাপগুলো ধরা পড়ে। সেই আলাপে অংশ নেওয়া বাফুফে সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদের রুচির বিকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রেকর্ডে স্পষ্টভাবে আছে, “আমার আগ্রহ অন্য জায়গায়। সাংবাদিকদের কতজন জাঙ্গিয়া পরে আসে, সেটা আমি দেখতে চাই।”

বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ও সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

দুজনই পরে তাদের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু পিস্তলের গুলি একবার বেরিয়ে গেলে তো রক্ষা নেই। দুই ফুটবল কর্মকর্তা যে মানসিক বিকারগ্রস্ত সেটা সবাই বুঝেছে তাদের রুচিহীন কথাবার্তায়। তারা, বিশেষ করে নাবিল আহমেদ জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাধারণ মানুষকে কী চোখে দেখেন, সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন।

নারী ফুটবল দলকে নিয়ে ‘নাটক’

গত এপ্রিলে সাফজয়ী নারী ফুটবল দলকে মিয়ানমারে অলিম্পিক বাছাইয়ে খেলতে না পাঠিয়ে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়ে বাফুফে। এজন্য তারা ৯২ লাখ টাকা চেয়েছিল ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে। মিয়ানমার যাওয়ার জন্য এত টাকা শুনে অনেকে ভ্রু কুঁচকাবেন। এরপরও মন্ত্রণালয়ের জবাবের অপেক্ষা না করে টাকা চাওয়ার মাত্র একদিন বাদেই বাফুফে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেয়, অর্থাভাবে দল পাঠাতে পারছে না।

সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল বলেছিলেন, “আমি মনে করি, নারী ফুটবল দলকে বিদেশে পাঠানোর ইচ্ছাই ছিল না বাফুফের। এজন্যই এমন নাটক সাজিয়ে নিজেদের দোষটা অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।”

বসুন্ধরা গ্রুপ এগিয়ে গেলেও তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিল, বাফুফে দল না পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে বলে। আসলে এক ঢিলে তিন পাখি মারার চেষ্টা করেছিলেন কাজী সালাউদ্দিন ও বাফুফের মহিলা কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ। অলিম্পিক বাছাইয়ের আগে সভাপতির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেতন বাড়ানোর দাবি তুলেছিলেন মেয়ে ফুটবলাররা। ট্রেনিংও বয়কট করেছিলেন তারা। তাই তাদের খেলতে না পাঠিয়ে একটা চরম শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। দ্বিতীয়টা হলো, বাফুফের অর্থাভাবের জন্য দল বিদেশে পাঠাতে না পারার কথা চারদিকে চাউর করা। তৃতীয় হলো, টাকা চেয়ে না পাওয়ার কথা বলে প্রতিমন্ত্রীকে কাঠগড়ায় তোলা। কিন্তু খেলাটা খুব কাঁচা হাতের ছিল। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী যখন বাফুফের চিঠি পাঠানোর দিন-তারিখ উল্লেখ করে দেন তখনই সব ফাঁস হয়ে যায়। এরপর সবাই সালাউদ্দিন ও কিরণের সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে।

সালাউদ্দিনের খোঁচা বিসিবি সভাপতিকে

২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে নারী ফুটবল দলকে পাঠাতে না পারার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাফুফে সভাপতি খোঁচা মারেন বিসিবি সভাপতিকে, “সবার ব্যক্তিত্ব এক নয়। আমি সবাইকে দেখিয়ে বলব না যে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছি। আমি ফুটবল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছি।” এর কয়েকদিন বাদে সাফজয়ী নারী ফুটবলারদের হাতে বিসিবি তুলে দেয় প্রতিশ্রুত ৫১ লাখ টাকা পুরস্কার।

যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী নাজমুল হাসান পাপন। ছবি : বিসিবি

এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ওই খোঁচার জবাবে বলেন, “ফুটবল ব্যাকগ্রাউন্ড মানেই কি নির্লজ্জ, বেহায়া ও অহঙ্কারী হতে হবে! আপনারা টাকার হিসাব চান কেন? এটা চাইলেই উনার মাথা খারাপ হবে।” এরপর বিসিবি সভাপতি যোগ করেন, “আমরা বলছি, দেশ এগোচ্ছে। পুরো বিশ্বও বলছে, আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। এখন ২০ লাখ টাকার জন্য একটা দল খেলতে যেতে পারছে না, এর চেয়ে বদনাম আর হয় না।”

২০২২ বিশ্বকাপের দুঃস্বপ্ন ভুলে ১৫০

কাজী সালাউদ্দিনের মুখের কথার মতো স্বপ্নেও কোনও লাগাম নেই। মাঠের ফুটবল আছে তিমিরে আর এ নিয়েই বাফুফে সভাপতি দেখেছিলেন ২০২২ বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে এ কথা বলে তিনি লোক হাসিয়েছিলেন। আট বছর পর সেই হাসাহাসির লক্ষ্য থেকে খানিকটা বাস্তবে ফিরেছেন। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তার চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণায় সালাউদ্দিন বলেছেন, “বাংলাদেশকে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-এর নিচে নামিয়ে আনব আমরা।” তার চতুর্থ মেয়াদ শেষ হতে বাকি আছে মাত্র আট মাস, এখন ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ ১৮৩তম। এখানেও বড় গড়মিল !

চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর কোথায় ইশতেহার আর কোথায় কাজী সালাউদ্দিন, মেলানো মুশকিল। ওই ইশতেহারে জেলা ফুটবলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও সভাপতি সেই কমিটি নিজের হাতে রেখে একদম কর্মকাণ্ডহীন করে ফেলেছেন। একবারের জন্যও জেলাগুলোর সঙ্গে কোনও সভা করেননি। আসলে পঞ্চদশ বছরে তিনি কাজের চেয়ে অকাজ করেছেন বেশি। সাধারণ সম্পাদককে প্রশ্রয় দিতে দিতে শেষমেষ ফিফা নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে চুনকালি মাখিয়েছেন ফুটবলে। নিজে বিতর্কিত হয়েছেন কু-কথা বলে। একই সঙ্গে ফুটবলকেও করেছেন বিপথগামী।

তার অধীনে বড় কোনও সাফল্য নেই খেলার মাঠে। ১৫ বছরে সালাউদ্দিন একটি শিরোপাও দিতে পারেননি ফুটবলকে। দিয়েছেন কলঙ্ক আর বিতর্ক।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত