Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

‘তুষার বিলাস’ বাস্তব হলে কী পরিবর্তন আসবে

খুব ভোরে ঘুম ভাঙলো ফাহিমের। হাত-পা জমে যাওয়া অবস্থা। চারিদিক এখনও অন্ধকার। পা-মোজাটা কই যেন? বিছানার এদিক ওদিক হাতরে পাওয়া গেলো। এতো শীত! চেয়ারের কাপড়ের স্তুপ থেকে জ্যাকেটটা খুঁজে নিয়ে পড়ে আবার লেপের নিচে চালান করে দিল নিজেকে। ফোনে টেম্পারেচার চেক করতেই চোখ উঠে গেলো কপালে! ০ ডিগ্রি তাপমাত্রা! একটু কি জানালা দিয়ে দেখবে? নাহ! লেপ ছেড়ে আপাতত জানালার কাছে যাওয়ার ইচ্ছা কিংবা সাহস কোনটাই হলোনা ফাহিমের। “এই ঠাণ্ডায় অফিস যেতে হবে?” ভাবতে ভাবতে আবারও নিদ্রা আলিঙ্গন! 

৮টা নাগাদ ঘুম ভাঙলো। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে দাঁড়াতেই মনে হলো ‘স্বপ্ন টপ্ন দেখছিনাতো’!। ঘুম ঘুম চোখ কচলাচ্ছে ফাহিম আর বার বার দেখছে বাইরের দশা। গত বছর নানা ঝুট ঝামেলায় বন্ধুদের সঙ্গে মানালি যাওয়াটা মিস করেছিলো সে। আর এ বছর বাড়ির সামনে ‘মানালি’ এসে হাজির হবে এ-তো কল্পনার অতীত। 

পাঁচ তলার জানালা দিয়ে দেখছিলো- নিচু দালানের ছাদগুলোর এদিক ওদিক বরফের কুঁচি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সানসেটগুলো সাদা হয়ে গেছে বরফে।  চোখ চলে গেলো নিচের বস্তিতে। টিনের চালগুলো তো বরফ জমে সাদা হয়ে আছে! নাহ শিলা বৃষ্টি না। বরফ। যাকে বলে তুষার পাত!

উপরের ঘটনাটি কাল্পনিক। এই দেশে আজতক এমন কিছু ঘটেনি।

ঢাকা দূরে থাক, খোদ বাংলাদেশের তাপমাত্রাই কষ্মিনকালে শূন্যের নিচে নামেনি। দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিলো ২০১৮ সালে তেঁতুলিয়ায়, ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি। যেহেতু দেশের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির নিচে নামে না, তাই তুষারপাত বা বরফ পড়া দূরের কথা।

কাল্পনিক এই গল্পে ঢাকা শহরের কথা বলা হচ্ছিল। আর এই ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিলো সেই ১৯৫৩ সালে। সেবার ঢাকার তাপমাত্রা নেমে এসেছিলো ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। 

কোন অঞ্চলে তুষারপাত হবে আর কোন অঞ্চলে হবেনা তা নির্ভর করে তাপমাত্রার ওপর। তাপমাত্রার সাথে বরফ বা তুষারপাতের আছে ঘনিষ্ঠ যোগ। যে দেশে তাপমাত্রা শুন্যের নিচে নেমে যায়, সে দেশে তুষারকণা ভূপৃষ্ঠে বরফ আকারেই পরে। যেমন- সুইজারল্যান্ড। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাভাবিক তাপমাত্রাই যেহেতু ২০ ডিগ্রির ওপরে তাই তুষারকণা গলে পানি হয়ে ঝরে। অর্থাৎ হয় বৃষ্টি। 

তবে পৃথিবীতে যেহেতু দীর্ঘকাল বরফ যুগ রাজত্ব করেছে, সে বিচারে আমাদের এ অঞ্চল নিশ্চয়ই বরফে ঢেকে ছিল। নিকটতম বরফ যুগটি পৃথিবীতে এসেছিলো ২০০ কোটি বছর আগে। 

বাংলাদেশে তুষারপাত না হলেও মাঝে মাঝে গ্রীষ্মকালে শিলা বৃষ্টি হয়। 

তবে বৈশ্বিক জলবায়ূর পরিবর্তনের ঝাঁপটা এসে লেগেছে এদেশের প্রকৃতিতেও। তাই আজকাল চৈত্র মাসেও শিলা বৃষ্টি হতে দেখা যায়। 

কিন্তু পাঠক, যদি বাংলাদেশে তুষারপাত হয়েই যায় তবে বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে আমাদের। বিশেষত দেশের বয়স্ক নাগরিক, শিশু এবং দরিদ্র শ্রেণির মানুষ নানান অসুখ বিসুখে যে ভুগবে এতে কোন সন্দেহ নেই। শুধু কি তাই? আমাদের কৃষির হবে ভয়াবহ ক্ষতি।  

চলুন জেনে নিই ক্ষতিগুলো-

বিপর্যস্ত জনজীবন

রাস্তায় হাঁটা-চলার সমস্যা তো হবেই, এমনকি আহত হবার ঘটনাও বেড়ে যেতে আশঙ্কাজনক হারে। পিচ্ছিলো রাস্তায় গাড়ি চলাচল হয়ে যেতে বাড়ে বন্ধ। আন্তঃজেলা যানবাহনগুলো হয়তো একটিও ছেড়ে যাবেনা। কৃষিপণ্য বহন করে এমন যানবাহনগুলো না চললে, এর প্রভাব পড়বে সরাসরি অর্থনীতির ওপর।

হাইপোথার্মিয়া

শরীরের তাপমাত্রা ৯৫ ডিগ্রীর তাপমাত্রার নিচে নেমে গেলেই আপনি আক্রান্ত হবেন হাইপোথার্মিয়ায়। তুষারপাতে অনভ্যস্ত এই দেশে হঠাৎ বরফ পড়লে বহু লোক গুরুতর হাইপোথার্মিয়ায় মৃত্যুবরন করতে পারে। বিশেষত ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী হতদরিদ্র মানুষের ক্ষেত্রে এমন ঘটাই স্বাভাবিক। 

ফ্রস্টবাইট

ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত হয়ে খোলা আকাশের নিচে দিনযাপন করা দরিদ্র মানুষের অনেকেরই হতে পারে অঙ্গহানি। 

দুর্ঘটনা

রাস্তাঘাট পিছল হয়ে যাবে। কেননা আমাদের রাস্তাঘাট তুষারপাতের উপযোগী করে তৈরিই হয়নি। 

বিদ্যুৎ বিভ্রাট

বরফ জমে দেশের বহু স্থানে বিদ্যুতের তার যাবে ছিঁড়ে। নেমে আসতে পারে বিপর্যয়। 

কৃষির ক্ষতি

বরফ যদি পড়েই যায়, তবে নিশ্চিত থাকুন, আমাদের কৃষিজমির হবে ভয়াবহ ক্ষতি। রাতারাতি নষ্ট হবে হবে বিপুল পরিমাণ ফসল। 

কী বুঝলেন? যদি বুঝেই থাকেন, তবে ‘দেশে যদি বরফ পড়তো’ এমন কল্পনাবিলাস থেকে দূরে থাকায় শ্রেয়।

তবে আমাদের বরফপ্রীতির প্রতি খানিক পক্ষপাত করেই কিনা গবেষকরা মত দিচ্ছেন, ২০৩০ সাল নাগাদ পঞ্চগড়ের দিকে তুষারপাত হবার একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা আছে। তবে তা সাইবেরিয়ার মতো ভারী তুষারপাত নয় একেবারেই। 

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist