Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪

আবার কেন মাথাচাড়া দিচ্ছে সোমালি জলদস্যুরা

হর্ন অব আফ্রিকায় গত তিন মাসে হামলার মাত্রা বাড়ায় সোমালি জলদস্যুরা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
হর্ন অব আফ্রিকায় গত তিন মাসে হামলার মাত্রা বাড়ায় সোমালি জলদস্যুরা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
Picture of সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

ভারত মহাসাগরের আফ্রিকা উপকূলে এক যুগ আগে বড় আতঙ্ক হয়ে ছিল সোমালি জলদস্যুরা। একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে তারা হানা দিচ্ছিল, নাবিকদের জিম্মি করে আদায় করছিল মুক্তিপণ।

বিভিন্ন রাষ্ট্রের নানা তৎপরতায় গত কয়েক বছর জলদস্যুদের উৎপাত কমে এলেও এখন আবার বাড়ছে। গত তিন মাসে সোমালিয়া উপকূলে জাহাজ ছিনতাই গত ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউট (আরইউএসআই)।

মাস খানেকের মধ্যৌ অন্তত দুটি জাহাজ ছিনতাই হওয়ার পর সোমালি জলদস্যুদের কবলে পড়েছে এবার বাংলাদেশের একটি জাহাজ।

চট্টগ্রামের কবির গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের শিপিং প্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ কয়লা নিয়ে আফ্রিকার মোজাম্বিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত যাচ্ছিল। ২৩ জন নাবিকসহ জাহাজটি এখন জলদস্যুদের কবলে।

অস্ত্রসজ্জিত সোমালি দস্যুরা রশি বেয়ে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে উঠে নিয়ন্ত্রণ নেয়।

২০১০ সালে কবির গ্রুপেরই আরেকটি জাহাজ জাহান মনি ছিনতাই করেছিল সোমালি জলদস্যুরা। পরে মুক্তিপণ দিয়ে নাবিকসহ জাহাজটি ছাড়িয়ে আনা হয়েছিল।

ওই সময় সোমালি উপকূলে জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা অহরহই ঘটত। ২০১১ সালের দিকে ২১২টির মতো জাহাজ জলদস্যুদের হামলার শিকার হয়।

হর্ন অব আফ্রিকা (যা সোমালি উপদ্বীপ নামেও পরিচিত) অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এই জলদস্যুদের উৎপাত। তারা ছোট ছোট জাহাজ কিংবা ট্রলারে এসে সশস্ত্র দস্যুরা বাণিজ্যক জাহাজে উঠে নাবিকদের জিম্মি করে সোমালিয়া উপকূলে নিয়ে যায়। পরে অর্থের বিনিময়ে ছাড়া হয় জিম্মিদের।

২০১৩ সালে বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছিল সাগরে জলদস্যুতা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলে। তাতে বলা হয়, জলদস্যুদের দাপটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

গত ১৫ বছরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সোমালি জলদস্যুদের দাপট কখনও বাড়ে, আবার কখনও কমে। এটা নির্ভর করে তাদের মোকাবেলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তার ওপর।

সোমালি জলদস্যুদের দমনে বিদেশে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে পূর্ব আফ্রিকার দেশটির জলসীমায় ঢোকার জন্য ২০১০ থেকে ২০২২ সাল অবধি সাতটি প্রস্তাব পাস হয় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে।

ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া ও জিবুতি নিয়ে গঠিত হর্ন অব আফ্রিকার উপকূল ও ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চলে জলদস্যুতাবিরোধী সামরিক অভিযানে সে সময় নেতৃত্বে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। অভিযানের নাম দেওয়া হয় অপারেশন আটালান্টা।

তাদের লক্ষ্য ছিল সাগরে জলদস্যুতা ও সশস্ত্র ডাকাতি দমনে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এই সামরিক অভিযানের ফলে হর্ন অব আফ্রিকার উপকূল ও ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ছয় বছর জলদস্যুদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

পূর্ব আফ্রিকায় অপারেশন আটালান্টার মহড়া। ছবি: নেভাল নিউজ

তবে জলদস্যুতাবিরোধী পদক্ষেপের মেয়াদ ২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যাওয়ার পর এখন আবার হানা দিচ্ছে সোমালি জলদস্যুরা।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পাল্টায় লোহিত সাগরে চলাচলরত বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার মধ্যে পাশের সাগরে ফের সোমালি জলদস্যুদের উৎপাত দুশ্চিন্তায় ফেলেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে।

মধ্যপ্রাচ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা আমব্রে’র প্রধান বিশ্লেষক ড্যান মিউলার জানান, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২০ শতাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ সোমালি জলদস্যুদের কবলে পড়ে।

২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর হর্ন অব আফ্রিকার কাছে হ্যান্ডিম্যাক্স বাল্ক ক্যারিয়ার নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজ ছিনতাইয়ের খবর দেয় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিং। ২০১৭ সালের পর জলদস্যুদের সফল জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা সেটাই প্রথম।

কেবল বড় মালবাহী জাহাজ নয়, মাছ ধরার জাহাজ (যেগুলোর বেশিরভাগই ইরানের) থেকে শুরু করে ছোট নৌকাও জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

২০২৩ সালের নভেম্বরে আলমেরাজ ১ নামের ইরানের একটি মাছ ধরার ছোট জাহাজ ছিনতাই করেছিল জলদস্যুরা। জাহাজটি ছাড়তে ৪ লাখ ডলার মুক্তিপণ চেয়েছিল তারা। শ্রীলঙ্কার একটি মাছ ধরার জাহাজও তখন জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল। তবে পরে দুটি জাহাজই উদ্ধার পায়।

তখন ইয়েমেন উপকূলের কাছে একটি ট্যাঙ্কারে হামলা চালায় জলদস্যুরা। তাদের দেখে বিপদ সংকেত পাঠায় এর নাবিকরা। কাছেই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজ। সংকেত পেয়ে জাহাজটির সেনারা ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছায়। সেনাদের দেখে জলদস্যুরা ছোট নৌকায় করে পালানোর চেষ্টা করে। তবে তার আগেই তাদের ধরে ফেলা হয়।

সোমালি জলদস্যুদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ছবি: আনাদোলু এজেন্সি

দস্যুদের জঙ্গি-যোগ

হর্ন অব আফ্রিকার ও ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের উৎপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ খোঁজার চেষ্টা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত কয়েক মাসে জলদস্যুদের তৎপরতাবেড়ে যাওয়ার পেছনে হুতিদের ভূমিকা আছে বলে মনে করা হচ্ছে।

গত বছরের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরে চলাচলরত বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এর মাধ্যমে তারা গাজায় হামলা বন্ধে ইসরায়েলকে চাপ দিতে চাইছে।

লোহিত সাগরে হুতিদের আক্রমণ মোকাবেলায় এ বছরের শুরু থেকে তৎপর হয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ। তারা ভারত মহাসাগর থেকে তাদের নৌবাহিনীর জাহাজ ও সরঞ্জাম স্থানান্তর করে লোহিত সাগরে মোতায়েন করে।

লোহিত সাগরে হুতিদের ঠেকাতে আন্তর্জাতিক বাহিনীর ব্যস্ত থাকায় আরব সাগর অঞ্চলে সোমালি জলদস্যুরা তৎপরতা বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আবার অনেকের ধারণা, জাহাজ ছিনতাই বা মুক্তিপণ আদায়ে জলদস্যুদের সহায়তা করছে আল-কায়েদার অনুগত সোমালিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক সংগঠন আল-শাবাব। সংগঠনটি শুধু সোমালিয়া নয়, পূর্ব আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও বেশ সক্রিয়।

সোমালিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধে আল-শাবাবের সক্রিয় ভূমিকা আছে। দেশটির উত্তর-পূর্বের পান্টল্যান্ড অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণও সংগঠনটির হাতে। ধারণা করা হয়, মুক্তিপণের ভাগ পেতে জলদস্যুদের নিরাপত্তা দেয় আল-শাবাব।

জলদস্যু আর আল-শাবাবের মধ্যে যে যোগসাজশ রয়েছে, সে সন্দেহ আরও পোক্ত হয় যখন জলদস্যুদের উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যায়।

ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া ও জিবুতি নিয়ে গঠিত হর্ন অব আফ্রিকা।

বিশ্বজুড়েই বাড়ছে জলদস্যুদের উপদ্রব

২০২৩ সালের এক পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথে জলদস্যুদের উপদ্রব বেড়ে চলেছে। এটি যে ক্রমবর্ধমান তা দুই বছরের চিত্রের দিকে তাকালে স্পষ্ট হবে।

২০২২ সালে সমুদ্রপথে ১১৫টি সশস্ত্র ডাকাতি ও জলদস্যুতার ঘটনা ঘটে। পরের বছরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২০। এই তথ্য দিয়েছে ইংল্যান্ডের আইসিসি ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো (আইএমবি)। তারা তাদের পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রবারির প্রতিবেদনে বলে, জাহাজের নাবিকদের নিরাপত্তা দিনকে দিন হুমকির মুখে পড়ছে।

২০২২ সালে ৪১ জন নাবিককে জিম্মি করেছিল সোমালি জলদস্যুরা। পরের বছর তাদের হাতে জিম্মি হয় ৭৩ জন। নাবিক অপহরণের ঘটনাও এই দুই বছরে ২ থেকে বেড়ে ১৪ হয়।                             

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) এক মুখপাত্র বলেন, “পুরো বিশ্ব শিপিং ও নাবিকের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে জাহাজ ও মালবাহী জাহাজ কোনোভাবেই হামলার লক্ষ্য হওয়া উচিৎ নয়।”

নাবিকদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টেনে ওই মুখপাত্র বলেন, “বৈরী পরিস্থিতিতে এই নিরাপরাধ নাবিকরা কাজ করে যাচ্ছেন এবং তা করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন। তাদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।”

লন্ডনভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ড্রায়াড গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, হর্ন অব আফ্রিকা বা সোমালি উপদ্বীপের উপকূল থেকে ভারতের উপকূল পর্যন্ত অঞ্চল ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এই অঞ্চলে ২৫টি দেশ আছে। এই দেশগুলোর প্রতিটিরই নিজস্ব নৌবাহিনী থাকলেও অঞ্চলটি এতটাই বিশাল যে তাদের পক্ষে সাগরে জাহাজের পুরোপুরি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।

কেবল হর্ন অব আফ্রিকা বা ভারতের উপকূল নয়, আফ্রিকার পশ্চিমে গিনি উপসাগরেও সম্প্রতি জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। ২০২৩ সালে ওই উপসাগরে ২২টি জাহাজ আক্রান্ত হয়।

এর আগের বছর তাদের হাতে আক্রান্ত জাহাজের সংখ্যা ছিল ১৯। অবশ্য ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল এই চার বছরে জলদস্যুরা সবচেয়ে বেশি সফল হয় ২০২০ সালে। সে বছর তারা গিনি উপসাগরে ৮১টি জাহাজে ডাকাতি করে।

জলদস্যুদের কবলে পড়ছে সিঙ্গাপুর প্রণালীতে চলাচলরত জাহাজগুলোও। তবে এই প্রণালীতে সংঘটিত অপরাধকে ‘ছোটখাটো সুযোগসন্ধানী অপরাধ’ বলে মনে করে আইসিসি ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো (আইএমবি)।

সোমালিয়া উপকূলে দস্যুদের একটি নৌকাকে তাড়া করে ধরছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ সেনারা। ছবিটি ২০১১ সালে দিয়েছিল ইউএস নেভি।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পদক্ষেপ

সাগরে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়াতে এ বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতকে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার মূল্যের ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

সোমালি জলদস্যুদের মোকাবেলায় গঠিত অপারেশন আটালান্টার এক মুখপাত্র জানান, হর্ন অব আফ্রিকায় জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য দমনে নিয়োজিত নৌবাহিনীর জোটকে আরও শক্তিশালী করা হবে। 

ওই মুখপাত্র বলেন, “পূর্ব আফ্রিকায় আমরা শিগগিরই আরও জাহাজ ও সেনা মোতায়েন করব। সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আমরা একযোগে কাজ করা অব্যাহত রাখব।”

তথ্যসূত্র: সিএনবিসি, টিআরটি, কনভারসেশন

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত