Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

কেন টেক জায়ান্টদের শূলে চড়তে হলো

মেটা, টিকটক, স্ন্যাপ, ডিসকর্ড ও এক্সের প্রধান নির্বাহীরা। ছবি: এএফপি।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় ডেকে নিয়ে রীতিমতো তোপ দাগানো হলো মেটা ও টিকটকসহ বিশ্বের শীর্ষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর প্রধান নির্বাহীদের। শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেসব ঝুঁকি তৈরি করে তা প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগ মেটা, টিকটক, স্ন্যাপ, ডিসকর্ড ও এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে।

অভিভাবক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো শিশুদের নিরাপত্তার চেয়ে তাদের ব্যবসায় মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যৌন হয়রানির শিকার হওয়া থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বুধবার সেই অভিযোগেরই শুনানির আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটের বিচার বিভাগীয় কমিটি। ‘বিগ টেক অ্যান্ড দ্য অনলাইন চাইল্ড সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন ক্রাইসিস’ বা বড় প্রযুক্তি ও অনলাইন শিশু যৌন নিপীড়ন সংকট’ শিরোনামে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

সেনেটের বিচার বিভাগীয় কমিটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, “অনলাইনে শিশুদের যৌন শোষণের মহামারি নিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করার জন্যই এই শুনানির আয়োজন করা হয়েছে।”

মেটার (ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রাম) সিইও মার্ক জাকারবার্গ, এক্সের (সাবেক টুইটার) লিন্ডা ইয়াক্যারিনো, স্ন্যাপের ইভান স্পিজেল, টিকটকের শৌ জি চিউ ও ডিসকর্ডের জেসন সাইট্রনকে এই শুনানিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

দুজন সিইওর ক্ষমা প্রার্থনা, সেনেটরদের কঠোর জেরা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের পরিবারগুলোর প্রতিক্রিয়ায় এদিন শুনানিতে মাঝেমধ্যেই নাটকীয় ও আবেগঘন দৃশ্য তৈরি হয়।

শুনানির উদ্বোধনী বিবৃতিতে সেনেটর ডিক ডারবিন বলেন, “কমিটির সভাপতি হিসেবে শিশুরা অনলাইনে যেসব বিপদের মুখোমুখি হয়, সেসবের বিরুদ্ধে লড়াই করাকেই আমি এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ হিসেবে গণ্য করি। অনলাইনে শিশুদের যৌন শোষণ আমেরিকার একটি বড় সংকট। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও মেসেজিং অ্যাপগুলো শিশুদের যৌন শোষণের জন্য দুর্বৃত্তদের হাতে শক্তিশালী নতুন হাতিয়ার তুলে দিয়েছে।”

ডারবিন বলেন, “তাদের ডিজাইন, আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্তভাবে বিনিয়োগ করায় ব্যর্থতা, মৌলিক নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসায় মুনাফাকে প্রাধান্য দেওয়া; এই সব কিছু আমাদের সন্তানদের ও নাতি-নাতনিদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।”

শুনানিতে বিশাল জনসমাগম

সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তরা ও তাদের পরিবারগুলোসহ শিশু অধিকারকর্মীরা বুধবারের শুনানিতে বড় শক্তি হিসেবে হাজির হয়। চার ঘণ্টা ধরে সিইওদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা কখনও হাততালি দিচ্ছিলেন, কখনও উচ্চস্বরে হেসে উঠছিলেন, কখনওবা চিৎকার বা ফিসফাস করছিলেন, আবার কখনও নীরব থাকছিলেন। জাকারবার্গের বক্তব্যের সময় কয়েকজন বাবা-মা তাকে তিরস্কার করেন। সবমিলিয়ে তারাই হয়ে ওঠেন এই গুরুত্বপূর্ণ শুনানির কেন্দ্র।

এদিন অভিভাবকরা শুনানিতে উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলেন এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় সিইওদের বিরুদ্ধে সেনেটরদের আক্রমণে ইন্ধন জোগান। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এর আগেও টেকজায়ান্ট সিইওদের বিরুদ্ধে শুনানি হয়েছে। কিন্তু এবারের শুনানির মতো আর কখনও এতো বেশি পরিবারের অভিভাবকদের উপস্থিতি দেখা যায়নি।

এতে বিষয়টি নিয়ে আশু পদক্ষেপ গ্রহণের এক অভূতপূর্ব তাগিদ ও চাপ অনুভূত হয়। রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেন, “জীবনে এই প্রথম আমি এই কক্ষে এত বেশি মানুষের উপস্থিতি দেখতে পেলাম।”

জাকারবার্গ ও স্পিজেলের ক্ষমাপ্রার্থনা

শুনানির এক পর্যায়ে সেনেটরদের পরামর্শে মেটা সিইও মার্ক জাকারবার্গ দাঁড়িয়ে উপস্থিত পরিবারগুলোর কাছে ক্ষমা চান।

জাকারবার্গ বলেন, “আপনারা যে বাজে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তার জন্য আমি দুঃখিত। আপনাদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, নতুন করে আর কারওরই তার শিকার হওয়া উচিৎ নয়। আপনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা বিনিয়োগ বাড়িয়েছি। আর কোনও পরিবারকে যেন কোনও ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হতে না হয়, সেজন্য আমাদের চেষ্টাগুলো আরও জোরদার করা হবে।”

এর জবাবে মিসৌরির রিপাবলিকান সেনেটের জোশ হাওলি যে পরিবারগুলো মেটার স্যোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ক্ষতির শিকার হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য মার্ক জাকারবার্গের প্রতি আহ্বান জানান।

ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট সেনেটর ল্যাফনজা বাটলারের অনুরোধের প্রতিক্রিয়ায় স্ন্যাপ সিইও ইভান স্পিজেলও সেই পরিবারগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, যাদের সন্তানরা স্ন্যাপচ্যাটে সার্চ করে ওষুধ কেনার পরে তা খেয়ে মারা গেছে।

স্পিজেল বলেন, “আমি খুবই দুঃখিত যে আমরা এই বিয়োগান্তক ঘটনাগুলো প্রতিরোধ করতে পারিনি। আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মে ওষুধ নিয়ে অনুসন্ধান সম্পর্কিত শব্দগুলো ব্লক করতে কঠোর পরিশ্রম করছি।”

৬০ জনেরও বেশি কিশোর-কিশোরীর অভিভাবক ২০২৩ সালের শেষদিকে স্ন্যাপের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাদের অভিযোগ, বাচ্চাদের এমন কিছু ওষুধ খুঁজে পেতে সহায়তা করেছে স্ন্যাপ যেগুলো অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করে ওই শিশুরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকজনের মৃত্যুও হয়।

সেনেটরদের ক্ষোভ

সেনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্ন মেটার একটি অভ্যন্তরীণ নথি নিয়ে জুকারবার্গের মুখোমুখি হন। ওই নথিতে দেখা যায়, কোম্পানিটি একজন কিশোর ব্যবহারকারীর জীবনকালের মূল্য ধরেছে মাত্র ২৭০ ডলার।

ব্ল্যাকবার্ন বলেন, “আপনারা কীভাবে এমনটা ভাবতে পারলেন?” এসময় তিনি শ্রোতাদের মধ্য থেকে একদল তরুণ অধিকারকর্মীকে দাঁড়ানোর জন্য আমন্ত্রণ জানান। তাদের গায়ে থাকা টি-শার্টে লেখা ছিল, ‘আমার মূল্য ২৭০ ডলারের বেশি’।

এসময় সেনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্ন উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলেন, “শিশুদের প্রতিও আপনাদের কোনও দয়া-মায়া নেই। শিশুদেরকেও আপনারা পণ্য হিসেবে দেখেন।”

লুইজিয়ানার রিপাবলিকান সেনেটর জন কেনেডি বলেন, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো ‘তথ্য হত্যার ক্ষেত্র’ হয়ে উঠেছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা ‘কোনও ইস্যুর শুধুমাত্র একটি দিক দেখতে পান। বাকী দিকগুলো অন্ধকারেই রয়ে যায়’।

কেনেডি বলেন, “আপনি ২০০ কোটিরও বেশি মানুষকে তাদের সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য শুধু তাদের হাই স্কুলের বন্ধুরা শনিবার রাতে ডিনারে কী খেয়েছে তা দেখার বিনিময়ে দিয়ে দিতে রাজি করিয়েছেন।”

ফেইসবুক কীভাবে ব্যবহারকারীদের তথ্য বেচে আয় করে, তা তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানানো হয় কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন কেনেডি। তিনি বলেন, “ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আপনাদের চুক্তি সব চিবিয়ে ফেলছে।”

এই প্রশ্নে শুনানি কক্ষে উপস্থিত সবার মধ্যে হাসির রোল পড়ে। জাকারবার্গ বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কীভাবে চলে মানুষকে সে সম্পর্কে মৌলিক ধারণা দেওয়া হয়।

কেনেডি বলেন, “আপনারা এতটাই ভয়ঙ্কর যে, আপনারা এমনকি এমন লোকদেরও তথ্যও নেন যারা ফেইসবুক ব্যবহার করেন না। আমি ভাবছি, প্রযুক্তি কি মানবতার চেয়ে বড় হয়ে উঠল কি না?”

মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট সেনেটর অ্যামি ক্লোবুচার অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষতির শিকার হওয়া শিশুদের বাবা-মায়েদের দুঃখের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের সন্তানদের অনেকে অনলাইনে হেনস্তা ও হুমকির শিকার হওয়ার পর আত্মহত্যা করে।

অ্যামি ক্লোবুচার বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হয়েছে আজ থেকে ২৮ বছর আগে। অথচ আমরা এখনও এই আইনগুলোর কোনওটিই পাস করাতে পারিনি। আর দেরি করা যাবে না, এবার আইনগুলো পাস করাতেই হবে।”

চীনসংযোগ নিয়ে তোপের মুখে টিকটক

টিকটকের সিইও শৌ জি চিউকে চীনের সঙ্গে তার কোম্পানির সংযোগ নিয়ে একাধিকবার জেরা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, টিকটকের মূল কোম্পানি বাইটড্যান্সে চীন সরকারের মালিকানা রয়েছে। এজন্য টিকটক চীন সরকারকে নজরদারির সুযোগ করে দেয় এবং কমিউনিস্ট সরকারবিরোধী কনটেন্ট সরিয়ে নেয়। টিকটকের বিরুদ্ধে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার অভিযোগও রয়েছে।

কড়া সমালোচনার মুখে এক্স

ইলোন মাস্ক টুইটার কেনার পর এর নাম পরিবর্তন করে এক্স রাখাসহ নিয়ন্ত্রণের নীতিমালাও শিথিল করেন। এতে তা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। এই শুনানির মাত্র কয়েকদিন আগেই পপ গায়িকা টেইলর সুইফটের কিছু নগ্ন ছবি এক্সে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে এক্সের সিইও লিন্ডা ইয়াক্যারিনোকে জেরা করা হয়।

স্যোশাল মিডিয়াগুলোর বিরুদ্ধে বিরল ঐকমত্য

বুধবারের এই শুনানিতে সোশাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এক বিরল ঐকমত্য দেখা যায়। রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের মধ্যে এমন ঐকমত্য এর আগে আর কখনও দেখা যায়নি।

রিপাবলিকান সেনেটর গ্রাহাম বলেন, “এর আগে একবার একটি ইস্যুতে আমার ডেমোক্রেটিক সহকর্মী সেনেটের এলিজাবেথ ওয়ারেনের সঙ্গে আমার ‘প্রায় কোনও কিছুতেই মিল ছিল না’। আরেক ডেমোক্রেটিক সেনেটর ডিক ডারবিনের সঙ্গেও আমার রাজনৈতিক দর্শন মেলে না। কিন্তু সমাজের ওপর প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি।”

তবে টেক জায়ান্টদের শূলে চড়ানো নিয়ে ঐকমত্য থাকলেও স্যোশাল মিডিয়া কম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য অর্থবহ কোনও আইন এখনও পাস করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস।

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ন্যূনতম বয়সসীমাসহ নতুন নীতিমালা সংক্রান্ত বেশিরভাগ পদক্ষেপ রাজ্য আইনসভা ও আদালতে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। সেগুলো আর জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়ায়নি।

গ্রাহাম বলেন, “আমি কথা বলতে বলতে ক্লান্ত। আমি আলোচনা করতে করতে ক্লান্ত। কঠোর আইন না করা পর্যন্ত কিছুই পরিবর্তন হবে না। যতক্ষণ না তাদের আইনের আওতায় আনা হবে ততক্ষণ কিছুই হবে না।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist