Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

টিকটকে কী ভয় পশ্চিমাদের

Tiktok_West

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে গত সপ্তাহে চীনা মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগের অ্যাপ টিকটক নিষিদ্ধে একটি বিল পাস করা হয়েছে। বিলটি এখন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সেনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও বলেছেন, বিলটি তার ডেস্ক পর্যন্ত পৌঁছালে তিনি এতে স্বাক্ষর করবেন।

চীনা কোম্পানি বাইট ড্যান্সের কাছ থেকে টিকটককে কিনে নিতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাইটড্যান্স তা বিক্রি করতে রাজি হচ্ছে না। বিক্রি না করলে টিকটককে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যেই এই বিলটি আনা হয়েছে। চীন বিলটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা ও আইনপ্রণেতারা দীর্ঘদিন ধরেই টিকটকের সম্ভাব্য জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। তাদের অভিযোগ, টিকটক চীন সরকারকে তথ্য দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে এমন কনটেন্ট প্রচার করে।

অনেক পশ্চিমা দেশে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ ও নিরাপত্তা কর্মীদের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফোনে অ্যাপটির ইনস্টল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

টিকটকের ব্যাপারে তিনটি বড় অভিযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের।

১. টিকটক ‘অতিরিক্ত’ তথ্য সংগ্রহ করে

পশ্চিমা সমালোচকদের অভিযোগ টিকটক এর ব্যবহারকারীদের প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করে। অস্ট্রেলিয়ার সাইবার কোম্পানি ইন্টারনেট ২.০ এর গবেষকরা ২০২২ সালের জুলাই মাসে সাইবার-নিরাপত্তা সম্পর্কিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে প্রথম এই দাবি করে। আর সেই প্রতিবেদনটিকেই প্রমাণ হিসাবে উদ্ধৃত করেন সমালোচকরা।

গবেষকরা অ্যাপটির সোর্স কোড নিয়ে গবেষণা করে জানিয়েছেন, এটি অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করে। তারা বলেছেন, টিকটক ব্যবহারকারীদের বিশদ তথ্য সংগ্রহ করে, যেমন- অবস্থান, কোন নির্দিষ্ট ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অন্য কোনও অ্যাপ এতে রয়েছে কিনা ইত্যাদি।

তবে সিটিজেন ল্যাবের পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, “অন্যান্য জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর মতোই টিকটক ব্যবহারকারীদের আচরণ বোঝার জন্য একই ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে।”

একইভাবে, গত বছর জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, “মূল ব্যাপারটি হলো অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল অ্যাপগুলোও একই কাজ করে।”

টিকটকেরও তাই দাবি। তারা বলে, তাদের তথ্যসংগ্রহ এই শিল্পের প্রচলিত চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

২. গুপ্তচরবৃত্তির জন্য চীন সরকার টিকটককে ব্যবহার করতে পারে

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিশেষজ্ঞরা বিরোধিতা করলেও ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই স্বীকার করে নেয় যে, ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা হলো সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গে করা একটি চুক্তির মতো।

অ্যাপগুলো বিনামূল্যে তাদের পরিষেবা দেওয়ার বিনিময়ে ব্যক্তির সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে এবং তা তাদের প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দিতে ব্যবহার করে। অথবা ইন্টারনেটে অন্য সংস্থার কাছে বিক্রি করে।

কিন্তু আসল সমস্যাটি হলো টিকটক চীনের রাজধানী বেইজিংভিত্তিক টেক জায়ান্ট বাইটড্যান্সের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। এটি একটি অ-আমেরিকান মূলধারার অ্যাপ হিসেবে অনন্য। ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ও ইউটিউব সবাই একই পরিমাণে তথ্য সংগ্রহ করে তবে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংস্থা।

বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতারা বিশ্বের বেশিরভাগ অংশের কাছে এই বিশ্বাস বজায় রেখেছেন যে, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সংগৃহীত ডেটা জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে এমন কোনও খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২০ এর নির্বাহী আদেশে অভিযোগ করা হয়, টিকটকের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের অবস্থান ট্র্যাক, ব্ল্যাকমেলের জন্য ব্যক্তিগত তথ্যের ভাণ্ডার তৈরি এবং কর্পোরেট গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনা করতে পারে।”

তবে এখনও পর্যন্ত টিকটকের তেমন কোনও কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পওয়া যায়নি। অবশ্য ২০১৭ সালে পাস করা চীনের গোয়েন্দা আইনের একটি অস্পষ্ট অংশ থেকে কিছু আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চীনের জাতীয় গোয়েন্দা আইনের সাত নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সমস্ত চীনা সংস্থা ও নাগরিকদের দেশের গোয়েন্দা প্রচেষ্টার প্রতি ‘সমর্থন, সহায়তা ও সহযোগিতা’ করা উচিৎ।

এই বাক্যটি শুধু টিকটক নয় বরং অন্যান্য চীনা সংস্থা সম্পর্কেও সন্দেহ প্রকাশ করতে উদ্ধৃত হয়।

তবে জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির গবেষকরা বলেন, এই বাক্যটিকে প্রেক্ষাপটের বাইরে ব্যবহার করা হয়েছে। আইনটিতে ব্যবহারকারী ও প্রাইভেট কোম্পানির অধিকার রক্ষার কথাও বলা হয়েছে।

২০২০ সাল থেকে টিকটক নির্বাহীরা বারবার মানুষকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন, তাদের চীনা কর্মীরা অ-চীনা ব্যবহারকারীদের তথ্যে প্রবেশ করতে পারে না।

তবে ২০২২ সালে বাইটড্যান্স স্বীকার করেছে, তাদের বেইজিং-ভিত্তিক বেশ কয়েকজন কর্মচারী যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কমপক্ষে দুজন সাংবাদিকের ডাটাবেজে প্রবেশ করেছে। তারা বিভিন্ন সময়ে তাদের অবস্থান ট্র্যাক করতে চেয়েছিলেন। ওই সাংবাদিকরা মিডিয়াতে তথ্য ফাঁসকারী টিকটক কর্মীদের সঙ্গে দেখা করেছেন কিনা সেটা জানার জন্যই তারা এই কাজ করেন।

টিকটকের মুখপাত্র জানান, টিকটক পরে ওই কর্মচারীদের বরখাস্ত করেছে।

টিকটক জোর দিয়ে বলে, তাদের ব্যবহারকারীদের ডেটা কখনোই চীনে সংরক্ষণ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের ডেটা সংরক্ষণের জন্য টেক্সাসে আর ইউরোপের ব্যবহারকারীদের ডেটার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে ডেটা সেন্টার তৈরি করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে কোম্পানিটি অন্য যে কোনও সামাজিক নেটওয়ার্কের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে গেছে। ইউরোপীয় ব্যবহারকারীদের ডেটা ব্যবহার তদারকির জন্য টিকটক একটি স্বাধীন সাইবার-নিরাপত্তা কোম্পানিকেও নিয়োগ করেছে।

টিকটক বলেছে, “আমাদের ইউরোপীয় ব্যবহারকারীদের ডেটা একটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা প্রতিরক্ষামূলক পরিবেশে সংরক্ষণ করা হয় এবং কঠোর স্বাধীন তত্ত্বাবধান ও যাচাইকরণ সাপেক্ষে শুধুমাত্র অনুমোদিত কর্মচারীরা সেই তথ্য দেখতে পারেন।”

টিকটক আরও বলেছে, “আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং চীনা সরকারকে ব্যবহারকারীদের ডেটা সরবরাহ করিনি, এমনকি তারা চাইলেও করব না।”

৩. টিকটক মগজধোলাইয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে পারে

টিকটক বলে যে, আমাদের কমিউনিটি গাইডলাইনগুলো “আমাদের কমিউনিটি বা বৃহত্তর জনসাধারণের ক্ষতি করতে পারে এমন ভুল তথ্যের প্রচার নিষিদ্ধ করে। যার মধ্যে সমন্বিত মনগড়া আচরণও অন্তর্ভুক্ত।”

২০২২ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) পরিচালক ক্রিস্টোফার ওয়ে দেশটির আইন প্রণেতাদের বলেছিলেন, “চীনের সরকার টিকটকের রিকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যা ব্যবহারকারীদের মগজধোলাইয়ের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।” দাবিটি বহুবার পুনরাবৃত্ত হয়েছে।

এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে টিকটকের সিস্টার অ্যাপ ডৌয়িন এর কর্মকাণ্ড থেকে। অ্যাপটি শুধু চীনে পাওয়া যায়। চীন সরকার অ্যাপটি ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এতে শুধু তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষামূলক ও উপকারী কনটেন্ট প্রচার করা যায়।

চীনের সব সামাজিক নেটওয়ার্কের ওপরই সরকার ব্যাপকভাবে নজরদারি করে। ইন্টারনেট পুলিশের একটি বাহিনী সরকারের সমালোচনামূলক বা রাজনৈতিক অস্থিরতা উস্কে দিতে পারে এমন কনটেন্ট ডিলিট করে দেয়।

টিকটকের জনপ্রিয়তার শুরুর দিকে অ্যাপটিতেও নিয়ন্ত্রণের একটি বড় ঘটনা ঘটেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের একজন ব্যবহারকারী চীনের শিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলমানদের প্রতি দেশটির সরকারের আচরণ নিয়ে সমালোচনায় করায় তার অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়। এই ঘটনায় জনসাধারণের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পরে টিকটক কর্তৃপক্ষ ক্ষমা চায় এবং অ্যাকাউন্টটি ফিরিয়ে দেয়।

এরপর থেকে অবশ্য তেমন ঘটনা আর ঘটেনি। তবে অন্য সব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ওপর যেসব নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে টিকটককেও তা মেনে চলতে হয়।

সিটিজেন ল্যাবের গবেষকরা টিকটক ও ডৌয়িনের মধ্যে তুলনা করে উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, টিকটকেও একই ধরনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় না।

গবেষকরা ২০২১ সালে বলেছিলেন, “প্ল্যাটফর্মটিতে সরাসরি কোনও পোস্টের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় না।”

জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির বিশ্লেষকরা তাইওয়ানের স্বাধীনতা বা চীনের প্রেসিডেন্টে শি জিনপিংকে নিয়ে রসিকতার মতো বিষয়গুলোও নিয়েও অনুসন্ধান চালিয়েছেন। তারা বলেছেন, “এই ধরনের ভিডিও টিকটকে সহজেই পাওয়া যায়। এমন অনেক ভিডিও বেশ জনপ্রিয় এবং ব্যাপকভাবে শেয়ারও করা হয়েছে।”

তাত্ত্বিক ঝুঁকি

সমালোচকরা বলেন, টিকটক হলো ‘ট্রোজান হর্স’। বাইরে থেকে দেখতে একে ক্ষতিকারক মনে না হলেও সংঘাতের সময় এটি একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।

অ্যাপটি ইতোমধ্যেই ভারতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২০ সালে ভারত টিকটকসহ কয়েক ডজন চীনা প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র টিকটকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে তার বিশাল প্রভাব পড়তে পারে। কারণ সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও তার দেখাদেখি প্রায়ই একই ধরনের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেয়।

যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনের টেলিকম জায়ান্ট হুয়াওয়েকে ফাইভ-জি অবকাঠামো স্থাপন করতে না দেওয়ার আহ্বান জানায়, তখন এমনটাই দেখা যায়। কিন্তু হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে তাত্ত্বিক ঝুঁকির ভিত্তিতেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

তবে লক্ষণীয় হলো, শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই এমন ঝুঁকি নিয়ে চিন্তিত হতে হচ্ছে। চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের স্যোশাল মিডিয়া অ্যাপগুলো নিয়ে কোনও চিন্তা করতে হয় না। কারণ চীন সেগুলো বহু বছর ধরেই ব্লক করে রেখেছে। দেশটির নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রের কোনও অ্যাপে প্রবেশ করতে পারে না।

তথ্যসূত্র: সিএনএন

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist