Beta
শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪

‘ফুটবল খেলি বলে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন বাবা’

মাঠে বাবা মাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাগরিকা। বৃহস্পতিবার কমলাপুর স্টেডিয়ামে। ছবি: সকাল সন্ধ্যা

বাবার বকুনি, পড়শির চোখ রাঙানি, কটুকথা। এসব উপেক্ষা করে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ফুটবল খেলতে। নারী ফুটবল লিগে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে সুযোগ পান জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে। বৃহস্পতিবার কমলাপুর স্টেডিয়ামে শেষ হওয়া অনূর্ধ্ব-১৯ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ৪ গোল করেছেন মোসাম্মৎ সাগরিকা। উদীয়মান এই স্ট্রাইকার নিজের ক্যারিয়ার, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, ভবিষ্যত পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন সকাল সন্ধ্যার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বদিউজ্জামান মিলন  

প্রশ্ন: বৃহস্পতিবার রাতটা কেমন কাটল?

মোসাম্মৎ সাগরিকা: আলহামদুল্লিলাহ ভালো কেটেছে। এখনও হোটেলে (ইন্টারকন্টিনেন্টাল) আছি। একটু পর ভবনে (বাফুফে ভবন) যাব।

প্রশ্ন : রাতে নিশ্চয় আনন্দ করেছেন?

সাগরিকা : রাতে হোটেলে ফিরতেই আমাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান হোটেল কর্তৃপক্ষ। এরপর সবাই কেক কেটেছে। আমার রুমমেট পুজা ও আমি অনেক আনন্দ করেছি।

প্রশ্ন: ঠাকুরগাঁওয়ের রাঙ্গাটুঙ্গী থেকে পাঁচ তারকা হোটেল, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সব আলো আপনার ওপর। এই পর্যন্ত আসার পুরো ভ্রমণটা কেমন ছিল?  

সাগরিকা : সব কিছু অবিশ্বাস্য লাগছে। যেটা আমার স্বপ্নের বাইরে ছিল সেগুলো করতে পেরেছি।

প্রশ্ন : গত কয়েক দিনে মেয়েদের ফুটবল নিয়ে এত মাতামাতি। সবার মধ্যমণি আপনি। এতটা কি ভেবেছিলেন?

রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেলে সতীর্থ নুসরাত জাহান মিতুর সঙ্গে সাগরিকা। ছবি: সংগৃহীত।

সাগরিকা : (হাসি)। প্রথমে ভাবিনি আমাকে নিয়ে এত মাতামাতি হবে। তবে মনে জিদ ছিল একদিন না একদিন ইনশাল্লাহ ভালো কিছু করব। সেটা মনে হয় পেরেছি।

প্রশ্ন: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে আপনার ছবি, পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনেও আপনার সাক্ষাৎকার। নিজেকে কি তারকা ফুটবলার মনে হচ্ছে?

সাগরিকা : এখনও তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। এখনও তো সাবিনা আপুর (সাবিনা খাতুন) মতো জায়গায় যাইনি। বড় পর্যায়ে যাইনি। যখন সাবিনা আপুদের সঙ্গে খেলতে পারব, তখন মনে হবে বাংলাদেশের তারকা ফুটবলার হয়েছি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ-ভারতকে সাফের যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হল। এতে কি মন খারাপ?

সাগরিকা : একটু তো খারাপ লাগেই। যদি একক চ্যাম্পিয়ন হতে পারতাম আরও ভালো লাগতো।

প্রশ্ন : ম্যাচ শেষে কোচ সাইফুল বারী টিটু কি বলেছেন আপনাদের?

সাগরিকা : স্যারের সঙ্গে দেখা হয়নি এখনও।  শুধু কিরণ আপা (বাফুফের মহিলা কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার) ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

মোসাম্মৎ সাগরিকা হয়েছেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ছবি: বাফুফে।

প্রশ্ন : আপনার খেলা বাবা অন্যের টেলিভিশনে দেখেছেন। এই খবর সকাল সন্ধ্যায় প্রকাশিত হওয়ায় বাবাকে টেলিভিশন উপহার দিয়েছে ওয়ালটন। নিশ্চয় শুনেছেন?

সাগরিকা : এখন তো সতীর্থরা মজা করে বলছেন, একটা টুর্নামেন্টে খেলেই টিভি পেয়েছিস। সামনে তো আরও অনেক কিছু পাবি (হাসি)।

প্রশ্ন : বয়সভিত্তিক দলে প্রমাণ করেছেন। ভবিষ্যতে জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়ার ব্যাপারে কতটা আত্মবিশ্বাসী?

সাগরিকা : এখনও অনেক পথ বাকি। কঠিন হবে কাজটা। আমাদের চেয়ে অনেক সিনিয়র আপু আছেন আমার পজিশনে। উনারাও আমার চেয়ে অনেক ভালো খেলেন। আমি যেন নিজের সেরাটা দিয়ে জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে পারি সেই চেষ্টা থাকবে। জাতীয় দলে তো খেলতে চাই, স্বপ্ন দেখি বিশ্বকাপে খেলবে বাংলাদেশ।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের বেশিরভাগ মেয়ের গল্প একই। লড়াই সংগ্রাম করে উঠে আসা। আপনার বাবা নাকি খেলতেই দিতে চাইতেন না?

সাগরিকা : ফুটবল খেলি বলে বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। অনেক দিন কথা বলতেন না। আমি কতবার বাবাকে ফোন করেছি, ধরতেন না। গ্রামের লোকও অনেক বাজে কথা বলেছে।

প্রশ্ন : সেটা কেমন?

সাগরিকা : নারী ফুটবল লিগে খেলার সময় যখন ঢাকা আসি এলাকার অনেকে মায়ের কাছে এসে বলতেন, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই রাগ করবে না তো। মা বলতেন, কি কথা? উনারা বলতেন, শুনলাম তোমার মেয়ে নাকি এক ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় পালিয়ে গেছে। তখন নারী লিগ চলছিল। ইউটিউবে খেলা দেখাতো। মা ওই ম্যাচের ভিডিও দেখিয়ে বলত, আমার মেয়ে ছেলে নিয়ে পালিয়েছে নাকি অন্য কিছু করছে টাচ ফোনে তোমরা দেখে নিও। এই চ্যানেলে খেলা দেখায়।

প্রশ্ন : এখন তারা কি বলে?

সাগরিকা : সবাই এখন খুশি। শুনেছি গতকাল আমার খেলা দেখার জন্য বাবার চায়ের দোকানে বড় পর্দা টানিয়েছিল তারা। সবাই এখন আমার খেলা দেখে প্রশংসা করে।

সাগরিকার খেলা দেখতে মাঠে ছুটে আসেন ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তান অভিনেতা লিটু আনাম। ছবি: সকাল সন্ধ্যা।

প্রশ্ন : আপনার খেলা দেখতে বাবা মা কমলাপুর স্টেডিয়ামে এসেছিলেন। আপনি কি সেটা আগে থেকে জানতেন?

সাগরিকা: প্রথমে জানতাম না যে বাবা মা আসবে। হঠাৎ করে ওপরে গেছি তখন একজন বলল যে তোমার বাবা মা এসেছে। তুমি কি জানো? আমি তো পুরাই অবাক। তখন বাবা মার কাছে দৌড়ে গেছি। দেখি সত্যি আমার বাবা মা এসেছে। তখন কান্না আটকে রাখতে পারিনি। খুশি হয়েছি যে তারা এত দূর থেকে ছুটে এসেছে আমার খেলা দেখতে।

প্রশ্ন : আপনার মতো  অন্য লড়াকু মেয়েদের জন্য কোনও বার্তা।

সাগরিকা : আমি চাই তারাও ভালোভাবে খেলুক। আমাদের ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠে তাজুল স্যার, সুকা স্যারের একাডেমি আছে। তাদের যদি সহযোগিতা করা হতো, কিছু সরঞ্জাম দেওয়া হতো তাহলে আরও ফুটবলার ওখান থেকে উঠে আসতো। আমার মতোই অনেক গরিব পরিবারের মেয়ে খেলছে। আমি তো তাজুল স্যার, সুকা স্যারের জন্য এখানে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist