Beta
সোমবার, ৪ মার্চ, ২০২৪

কলাম

ট্রান্সজেন্ডার বিতর্কে ঔপনিবেশিক চিন্তা থেকে বের হতে হবে

স্নিগ্ধা রেজওয়ানা। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সূত্রে জানতে পেরেছি যে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক খণ্ডকালীন শিক্ষক সপ্তম শ্রেণির বইয়ের দুটি পাতা টেনে ছিঁড়ে ফেলছেন। তিনি ট্রান্সজেন্ডারদের ‘সমকামী’ আখ্যা দিয়ে, সকলকে সপ্তম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞানের বই ক্রয় করে ‘শরীফার গল্প’ এই দুই পাতা ছিঁড়ে ফেলতে আহ্বানও করছেন।

আহ্বান এখানেই সীমিত না, তার সাথে জড়িত আছে বিভেদ ও বিভাজনের অপচেষ্টা এবং বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার উসকানি।

উদ্ভূত এই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে কিছু অস্পষ্টতাকে স্পষ্ট করার সুযোগ পাওয়া গেছে। এ আলাপের সূত্রপাত হতে পারে কয়েকটি প্রশ্নের মাধ্যমে।

জেন্ডার আর সেক্সের মধ্যে পার্থক্য কী? ট্রান্সজেন্ডার আর হিজড়ার মধ্যেই কী তফাৎ? সমকামিতা কাকে বলে? ট্রান্সজেন্ডার কি সমকামী? হিজড়ারা কি কেবল ত্রুটিপূর্ণ ক্রোমোজোমের ধারক? অথবা নারী আর পুরুষের পার্থক্য কি কেবলই যৌনাঙ্গের ভিন্নতা?

বাংলাতে ‘সেক্স’ এবং ‘জেন্ডার’ উভয়ের অনুবাদ ‘লিঙ্গ’। এখানে একটি ভাষাগত বোঝাপড়ার জটিলতা তৈরি হয়। অর্থাৎ এখানে একটা ভাষাগত সংকট রয়েছে, যার ফলে লিঙ্গ পরিচয় বললেই আপনার মাথায় আসতে পারে যে, তার কি পিনাস আছে নাকি তার ভ্যাজাইনা আছে? নাকি তার জেনিটিক্যাল আইডেন্টিটি নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ মোটা দাগে আমাদের মাথার মধ্যে কাজ করে নারী, পুরুষ ও আন্তঃলিঙ্গ বা ইন্টারসেক্সের ধারণা।

নারী বা পুরুষ কি কেবল দুটি ভিন্ন ‘এক্স’ ‘এক্স’ অথবা ‘এক্স’ ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোমের ধারক বলেই নারী বা পুরুষ হিসেবে সমাজে পরিচিত? আর ক্রোমোজোমগত জটিলতা থাকলেই কি তারা হিজড়া?

সাধারণত যখন ব্যক্তির যৌনাঙ্গ বিবেচনা করে তাকে নারী বা পুরুষ হিসেবে শনাক্ত করা হয়, তখন সেটিকে বলা হয় ব্যক্তির সেক্স আইডেন্টিটি। ব্যক্তির এই সেক্স আইডেন্টিটির যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বহিঃপ্রকাশ ও নির্মাণ সেটিকে আমরা জেন্ডার বলি।

সংকট হচ্ছে, বাংলাতে ‘সেক্স’ এবং ‘জেন্ডার’ উভয়ের অনুবাদ ‘লিঙ্গ’। এখানে একটি ভাষাগত বোঝাপড়ার জটিলতা তৈরি হয়। অর্থাৎ এখানে একটা ভাষাগত সংকট রয়েছে, যার ফলে লিঙ্গ পরিচয় বললেই আপনার মাথায় আসতে পারে যে, তার কি পিনাস আছে নাকি তার ভ্যাজাইনা আছে? নাকি তার জেনিটিক্যাল আইডেন্টিটি নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ মোটা দাগে আমাদের মাথার মধ্যে কাজ করে নারী, পুরুষ ও আন্তঃলিঙ্গ বা ইন্টারসেক্সের ধারণা।

এটি তো গেল কেবলই জৈবিক ভিন্নতার আলাপ। কিন্তু যখন প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় লিঙ্গের আলাপ হয়, তখন আমরা অবচেতনভাবে ‘লিঙ্গীয় সম্পর্কে’ একটি হায়ারারকিকাল সম্পর্ক স্থাপন করি। যেখানে সচেতনভাবে পুরুষকে ‘প্রথম লিঙ্গ’, নারীকে ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ এবং অপরাপর লিঙ্গীয় পরিচিতির মানুষকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

বলা বাহুল্য, এই লিঙ্গীয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া ‘ক্রোমোজোম ভিত্তিক’ নয়, বরং সামাজিক ক্রম-উচ্চতার বা সোশ্যাল হায়ারারকির ধারণা বহন করে। তাহলে প্রশ্ন আসে, এ তো জৈবিক সত্তা, হঠাৎ করে তা সামাজিক ক্ষমতা সম্পর্কের হায়ারারকিকাল ধারণা দ্বারা কীভাবে আক্রান্ত হলো?


১৯৪৯ সালে প্রকাশিত Simone de Beauvoir এর বিখ্যাত বই ‘‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’’ আমাদের ‘আমি’ কীভাবে দ্বিতীয় লিঙ্গের বহনকারী সামাজিক সত্তা সে বিষয়ে ধারণা দেয়। আর আমাদের অঞ্চলের যৌন বিষয়ক সবচেয়ে আলোচিত যে গ্রন্থ ‘‘কামসূত্র’’, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষের যৌনতা তিন প্রকৃতির— পুরুষ প্রকৃতি, নারী প্রকৃতি ও তৃতীয় প্রকৃতি।

কোনও অজানা ও দুর্বোধ্যতার কারণে, এই তৃতীয় প্রকৃতির যৌন প্রবৃত্তি আমাদের কাগজে কলমে ও ভাষায় প্রকাশ পায় ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, ভাষাগত জটিলতা ও হায়ারারকিকাল সামাজিক ক্ষমতা সম্পর্কের পাটাতনে এই তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে পরিচিতি পায় আমাদের দেশের হিজড়া জনগোষ্ঠী।


আমাদের এই অঞ্চলের হিজড়া জনগোষ্ঠী কারা? এ উপমহাদেশে নারী ও পুরুষ ভিন্ন ঐতিহাসিকভাবে দৃশ্যত ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এক লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী হচ্ছে হিজড়া জনগোষ্ঠী। ক্রোমোজোম বা জন্মগত ত্রুটি নিয়ে যারা জন্মগ্রহণ করেন তারাই কেবল হিজড়া, এই ধারণা ভীষণ রকমের একপেশে এবং ভ্রান্ত। হিজড়া এই উপমহাদেশীয় লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর একটি ‘আমব্রেলা টার্ম’।

তাহলে ট্রান্সজেন্ডার কারা? ট্রান্সজেন্ডার একটি পশ্চিমা ‘আমব্রেলা টার্ম’, যার বাংলা ‘রূপান্তরিত’ জনগোষ্ঠী। সহজ করে বললে, যারা জন্মগত বৈশিষ্ট্য বা আইডেন্টিটির বিপরীতে অন্য কোনও ধরনের আইডেন্টিটিকে ধারণ করতে চান, তারা ‘ট্রান্স’ আইডেন্টিটির মধ্যে নিজেকে শনাক্ত করতে পারেন। ট্রান্সজেন্ডার এর মধ্যে দুটি ভাগ আছে— ট্রান্সম্যান ও ট্রান্সওমেন।

ধরা যাক, একজন ‘এক্স এক্স ক্রোমোজোম নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তার একটি ভ্যাজাইনা আছে, তিনি জৈবিকভাবে একজন নারী। কিন্তু পিরিয়ডের সময় তিনি আবিষ্কার করলেন— তিনি একজন পুরুষ।

এক্ষেত্রে হতে পারে, বয়ঃসন্ধিকালের সময়ে তার মাসিক হওয়ার কথা, কিন্তু সেটি কোনও কারণে বা হরমোনাল ব্যালেন্সের কারণে হয়নি। অথবা এ ব্যক্তি সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নারীত্বকে গ্রহণে অনাগ্রহী। এমনকি তার শারীরিক পরিবর্তন, তাকে মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রতিফলিত করে। হয়ত তিনি নিজেকে একজন পুরুষ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

অন্যদিকে ট্রান্সওমেন, শারীরিকভাবে পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেও তার যৌনাঙ্গ সক্ষমভাবে ক্রিয়াশীল নাও হতে পারে। যৌনাঙ্গের গঠন কাঠামোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি নাও হতে পারে। আবার যৌনাঙ্গ পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পরও পুরুষ হিসেবে নিজ শরীর অথবা মন নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। এরকম অবস্থায় তিনি নিজেকে নারীর প্রতিষ্ঠিত শরীরী অবয়বে আত্মপ্রকাশের সচেষ্ট হয়ে ট্রান্সওমেন হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।

রূপান্তরিত নারী এবং রূপান্তরিত পুরুষের এই মানসিক ও শারীরিক রূপান্তরের মনো-তাত্ত্বিক পরিসর হতে পারে প্রাকৃতিক, কৃত্রিম অথবা ট্রমাটিক অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

বলা বাহুল্য, এই রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি শারীরিক এবং মানসিক। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা হরমোন গ্রহণের মধ্য দিয়ে শারীরিক ট্রান্সফরমেশনের মধ্য দিয়ে যান অথবা সেক্সচুয়াল রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি করেন। এই সেক্সসুয়াল রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি একই সাথে সময় সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। এর পাশাপাশি তাদের হরমোনাল থেরাপির প্রক্রিয়াটি সময় সাপেক্ষ ও জটিল।

ফলে জৈবিকভাবে জন্মসূত্রে পাওয়া পিনাস/ভ্যাজাইনা সমূলে উৎপাটনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে জৈবিক ও মানসিকভাবে ভিন্ন জেন্ডার আইডেন্টিটিতে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস নেন। এটি যে কেবল ট্রান্সজেন্ডাররাই করেন তা কিন্তু নয়, আমাদের এই অঞ্চলের হিজড়া জনগোষ্ঠীর এটি একটি ‘আমব্রেলা টার্ম’।

হিজড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্য। এর মধ্যে আছে জানকা, জানানা, ছিবড়ি, ভাবরাজের হিজড়া, কোতিসহ আরও নানা ধরনের বৈচিত্র্য। হিজড়া সংস্কৃতির সাথে যুক্ত রয়েছে নানা ধরনের আচার।

‘হিজড়া’ লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মধ্যে রূপান্তকামী মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তারা বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল প্রসেসের মধ্য দিয়ে, হরমোন গ্রহণের মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত নারী তথা ছিবড়িতে পরিণত হয়।

এই প্রক্রিয়াতে যুক্ত রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট চিকিৎসকগণ। বলাবাহুল্য এই চিকিৎসা গ্রহণ প্রক্রিয়াটি ভীষণভাবে গোপনীয়। এমনকি যারা এই চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত তাদেরকে প্রয়াশই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মিডিয়াতে ও আইনের চোখে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়। অথচ এই চিকিৎসা গ্রহণ প্রক্রিয়াটি লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর জন্য তথা হিজড়া জনগোষ্ঠীর বা ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য ভীষণ স্বাভাবিক একটি বিষয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইরানে রূপান্তরকামী জনগোষ্ঠীর লিঙ্গ পরিবর্তনের বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত এবং রাষ্ট্রীয় খরচে তা বহন করা হয়। অর্থাৎ সেখানে সেক্সুয়াল রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি রাষ্ট্রীয় খরচে সম্পাদন করা হয়। কারণ ওখানে বিশ্বাস করা হয় এমন ব্যক্তি  ‘‘Trapped in a wrong body’’।

শুধু ইরানেই এমনটা হচ্ছে তা নয়, পাকিস্তান ট্রান্সজেন্ডারদের স্বীকৃতি দিয়েছে ২০০৯ সালে। আর পুরো বিশ্বকে চমক দেখিয়ে পাকিস্তানে ২০১৮ সালে পাস হয়েছে ‘‘Transgender protection Act’’। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘে পাকিস্তানের দূত হিসেবে পাঠানো হয়েছে ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটির একজন সদস্যকে।


ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলের হিজড়া জনগোষ্ঠীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে লক্ষ্য করা যায়, এই অঞ্চলে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় মানুষের উপস্থিতি এবং ‘সেক্সুয়াল ফ্লুয়েডিটি’ বা ‘যৌন তারল্য’র ধারণা সামাজিকভাবে বৈধ। এছাড়া সনাতন ধর্মালম্বীদের মহাভারত, রামায়ণ ও মনুসংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্যভাবে হিজড়া, শিখণ্ডী লিঙ্গর মতো বৈচিত্র্যময় মানুষের উপস্থিতি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।

মোগল শাসনকালে, সম্রাট বাবরের সময় ‘নাজির’ হিসেবে রাজদরবারে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ছিল এই লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। তাছাড়া তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় এলিট জনগোষ্ঠীর হয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজেও তারা নিযুক্ত ছিল।

কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকালে, তৎকালীন ব্রিটেনের লিঙ্গ বৈচিত্র্যের ধারণা ছিল ভীষণভাবে ‘বাইনারি’ ভিত্তিক। তাই ব্রিটিশ অনুশাসনকালে এই অঞ্চলের লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপ করা হয় ‘‘ব্রিটিশ ক্রিমিনাল ট্রাইবস এ্যাক্ট ১৮৭১’’। এই এ্যাক্ট এর ২৪, ২৬, ও ২৯ ধারা অনুসারে বলা হয়, যদি কোনও পুরুষ ‘মেয়েলি আচরণ’ করে, মেয়েদের মতো পোশাক পরিধান করে, প্রকাশ্যে মেয়েদের পোশাক পরে নাচ-গান করে তবে তাকে ক্রিমিনাল হিসেবে গণ্য করা হবে।

এরই মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় মানুষকে বা জনগোষ্ঠীকে ‘সামাজিক ক্যাটাগরি’ থেকে পরিণত করা হয় ‘লিগ্যাল ক্যাটাগরিতে’। বাধ্যতামূলকভাবে তাদের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ারও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

এইরূপ ধারাই অব্যাহত থাকে ১৯৪৮ সাল পরবর্তী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে। আইয়ুব খানের শাসনামলে, ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার হেজমনিক ধারণার সূত্র ধরে তৎকালীন পাকিস্তানের লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে ‘ট্যাবু’ বিবেচনা করা হয় এবং তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অবৈধ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত ‘হিজড়া’ নেতৃবৃন্দ, ‘খোজাছাড়া’ এবং ‘খোজাছাড়াছিস’ নেতৃবৃন্দ আইয়ুব খানের বাসার সামনে অবস্থান ধর্মঘট করেন। তারা আইয়ুব খানের মায়ের কাছে আবেদন করেন, যাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদেরকে অবৈধ ঘোষণা করা না হয়।

তারা এও বলেন, আইয়ুব যখন ছোট ছিল তখন তারা তাদের বাড়িতে এসেছিল। তাকে আশীর্বাদ করার প্রেক্ষিতেই আজকে আইয়ুব খান পাকিস্তানের রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাদের এই আবেদনের প্রেক্ষিতে আইয়ুব খানের মা তাকে অনুরোধ করেন সামাজিকভাবে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় এই জনগোষ্ঠীকে যেন অবৈধ ঘোষণা না করা হয়।

এই সূত্র ধরে আইয়ুব খান তার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। যার ফলশ্রুতিতে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী তৎকালীন পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সাল পরবর্তী সময় বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্রে টিকে থাকে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ১৯৭১ সাল পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের এই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস বা তৎপরতা সম্পর্কিত কোনও তথ্য সেইভাবে দৃষ্টিগোচর হয় না।

পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে পৃথক বা স্বতন্ত্র স্বীকৃতি প্রদান না করা হলেও বেসরকারি সংস্থাগুলো ও পশ্চিমা দাতা সংস্থাগুলোর আগ্রহে এইচআইভি ডিসকোর্সে, এই জনগোষ্ঠীকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী’ হিসেবে চিত্রায়ন করা হয়। যার প্রেক্ষিতে এই জনগোষ্ঠী আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ে।

তথাপি ২০০০ সাল পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণায়, হিজড়াদের যৌন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে নির্দেশ করার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তাদের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ক্ষুদ্র পর্যায়ে আলাপ শুরু হয়। কিন্তু হিজড়াদের অথবা রূপান্তরিত ট্রান্সদের সামাজিক অবস্থার সেরকম উল্লেখযোগ্য কোনও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। ২০১৪ সাল পরবর্তী সময়ে, হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

ট্রান্সম্যান অথবা ট্রান্সওমেনের দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ সময় তাদের কেউ নিজেকে যদি নারীতে রূপান্তরিত করে তাহলে সে সেক্সুয়াল রি-এসাইনমেন্ট সার্জারি করে নিয়ে একটি কৃত্রিম যোনি ইমপ্লান্টেশন করে এবং যৌন সঙ্গমের জন্য একজন পুরুষ সঙ্গীকে বেছে নেয়; অন্যদিকে দিকে কেউ যদি ট্রান্সম্যান হয় সে তার পুরুষ যৌনাঙ্গ অর্থাৎ শিশ্ন এমাসকুলেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত হয় এবং একটি যোনি ইমপ্লান্টেশন করেন, সে ক্ষেত্রে তার যৌনতার আকর্ষণ হন একজন পুরুষ।

তাহলে প্রশ্ন করা যেতেই পারে যে, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এদেরকে সমকামী বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে? কেনইবা তাদের মানসিক ও শারীরিক চাহিদাকে সেই পুরনো পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার আলোকে ক্রিমিনালাইজ করা হচ্ছে?  

এও বলে রাখা প্রয়োজন যে, সমকামী হওয়ার জন্য, রূপান্তরকামী হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। জৈবিক বাইনারি নারী বা পুরুষ যে কোনও সময় যে কোনও ধরনের যৌন প্রবৃত্তি গ্রহণ করতে পারে এবং সমকামী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কেবল রূপান্তরকামীদের ওপরে সমকামীদের ট্যাগ বসিয়ে দেওয়া উসকানি নয় কি?

যদি ‘শরীফ এবং শরীফা’র গল্প পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা সমসাময়িক সমস্যার মৌলিক সঙ্কট হয়, তাহলে বিনয়ের সাথে বলতে চাই, আমার কাছে সেটি মনে হয় না। আলোচিত ‘‘শরীফ শরীফার গল্প’’ নিয়ে এখন যে তদন্ত কমিটি হয়েছে সেটিও একপাক্ষিক মতাদর্শের এবং আধিপত্যশীল পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত হয় কেন?

এই কমিটি গঠনের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি কী? কেন পাঠ্যপুস্তক লেখার সময় থেকে শুরু করে ট্রান্সজেন্ডার বিষয়ক খসড়া আইন প্রণয়নসহ সরকারি-বেসরকারি সকল মহলের আলাপে কেন কখনও জেন্ডার বিশেষজ্ঞ বা এই বিষয়ে যারা গবেষণা করেছেন, তাদেরকে যুক্ত করা হয়নি?

এমনকি মিডিয়াও যখন এ বিষয়ক কোনও অনুষ্ঠান বা প্রতিবেদন করে, সেখানেও কেন অনুপস্থিত থাকে আলোচ্য বিষয়ের বিশেষজ্ঞগণ? তবে কি ধরে নিব— বিশেষায়িত জ্ঞানের গুরুত্ব সম্পর্কে কোনও মহলই সচেতন নয়। সকলে কেবলই একটি একক রাজনৈতিক মতাদর্শিক আধিপত্যশীল প্রতিষ্ঠিত জনগণের প্রতিনিধিত্বকে নিশ্চিত করতে সক্রিয়?

আমাদের চাওয়া বা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কি মস্তিষ্ক, শিশ্ন, জরায়ু বা অণ্ডকোষ দিয়ে তৈরি হয়? আমাদের সবারই তো মস্তিষ্ক আছে, আমরা সবাই কি একইভাবে চিন্তা করি? আমার এবং আপনার শারীরিক বৈশিষ্ট্য কমবেশি একই রকম। তাহলে কী এমন আছে যা আমার এবং আপনাকে ভিন্ন করে তোলে?

সহজ করে বলি, মনে করেন জগতের সকল জৈবিক নারীর ক্রোমোজোমগত বৈশিষ্ট্য একই। সকলের জরায়ু, ওভারি, যোনিপথ একই রকম। সকলের মস্তিষ্ক কম-বেশি একই রকম। কিন্তু সকলের মনটা কি একই রকম? আপনি কি সত্যিই মনে করেন— মন বলে কিছু নেই? কারণ মন দেখা যায় না। তাহলে কেবল শারীরিক বা জৈবিক বাস্তবতাই কি একমাত্র সত্য?

আমরা যে মানুষ-সমাজে বসবাস করি, আমাদের জৈবিক যে গঠন কাঠামো তা এক অর্থে কমবেশি সকলের একই রকম। আমাদের যে মন, যার কোনও জৈবিক অস্তিত্ব বিরাজ করে না, কিন্তু তার ভিন্নতা আমরা সকলেই অনুভব করি।

সেই মনকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন? নাকি এর পিছনে লুকায়িত আছে কোনও রাজনৈতিক ও উগ্রবাদী ধর্মীয় উসকানি? স্বাভাবিক মনে এ প্রশ্নও আসে— নারী বনাম পুরুষ, প্রগতিশীল বনাম অপ্রগতিশীল, আস্তিক বনাম নাস্তিক অথবা হিজড়া বনাম ট্রান্সজেন্ডার, সমকামী বনাম বিসমকামী— এইরূপ ‘বনাম’ কেন্দ্রিক নির্মাণের রাজনীতির সুবিধা কারা ভোগ করে? কী তাদের উদ্দেশ্য?

আমার নৃবিজ্ঞানী মন এও প্রশ্ন করে যে, নারী-পুরুষ বাইনারি ক্ষমতা সম্পর্ক পুনরায় একটি ‘বাইনারি’-‘নন বাইনারি’ যৌন সম্পর্কের পুনরুৎপাদনে— সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পাটাতনে, কে বা কারা কোন অভীষ্ট লক্ষ্যে সমাজের বৈচিত্র্য নিশ্চিহ্ন করে একটি একক সাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের অন্তরালে বিভেদ বিভাজন প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টায় সক্রিয়?

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist