Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

কলাম

‘তোমার মাপে হয়নি সবাই তুমিও হওনি সবার মাপে’

হেলাল উদ্দিন আহমেদ। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার

স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে কী থাকবে আর কী থাকবে না, কোনটি থাকা উচিত আর কোনটি থাকা উচিত না তা নিয়ে সম্প্রতি বিস্তর তর্ক-বিতর্ক চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম। সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বই এর একটি অংশ যেখানে  নানা ধরনের ‘সম্প্রদায়’ এর পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

সেখানে শরীফা নামে একজন ‘ট্রান্সজেন্ডার’ এর সংক্ষিপ্ত জীবন কাহিনী আলোচনা  করা হয়েছে। যেখানে তিনি শারীরিকভাবে পুরুষ হিসেবে জন্ম নিলেও মনের গড়নের দিক থেকে নারী। যা ‘ট্রান্সজেন্ডার’-এর বৈশিষ্ট্য।

মনের গড়নের দিক থেকে নারী হওয়ার কারণে সে শৈশবে নারীদের মত পোশাক পরত, নারীদের মত সাজতো আর খেলা করত— যার কারণে সে সমাজে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মুখোমুখি হতো। সেজন্য সে কষ্ট পেত, নিজেকে তার একা লাগত। পরে সে তার মত আরও মানুষের দেখা পেল— বুঝতে পারল যে সে একা নয়।

এই গদ্যাংশটি নিয়ে নিয়ে বই এর পাতা ছেড়া থেকে শুরু করে, বহিষ্কার, আন্দোলন পর্যালোচনা কমিটি, কমিটির সমালোচনা কত কিছু হয়ে যাচ্ছে। পাঠ্যক্রমে জেন্ডার ও ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু থাকাটা কি জরুরি? গদ্যাংশে যা আছে তা কি সঠিক? কীভাবে থাকলে এড়ানো যেত বিতর্ক ?

পাঠক্রমে জেন্ডার ইস্যু

পাঠক্রমে জেন্ডার ইস্যু থাকা অবশ্যই জরুরি। কেউ স্বীকার করুক বা নাই করুক মনে রাখতে হবে, নারী-পুরুষ ছাড়াও নন-বাইনারি জেন্ডার বা তৃতীয় লিঙ্গ বা genderqueer  বা জেন্ডার ডাইভার্স জনগোষ্ঠী রয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের ২০২১ সালের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের প্রায় এক শতাংশ মানুষ নন-বাইনারি জেন্ডার বহন করে।

সামাজিক বিজ্ঞান একটি বিজ্ঞান। সমাজকে বিজ্ঞানের লেন্সে দেখাই সমাজ বিজ্ঞানের কাজ। তাই সামাজিক বিজ্ঞানের এই বইতে চারপাশের সম্প্রদায় সম্পর্কে জানতে হলে অবশ্যই এই ধরনের মানুষদের সম্পর্কে জানতে হবে। তাই যারা বলছেন, পাঠ্যপুস্তকে এটা থাকার দরকার নাই– তারা সমাজ ও বিজ্ঞান দুই দিকেই আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে অন্ধ করে রাখতে চান।

এখন কোনও কোনও মধ্যপন্থাবলম্বী সুশীল ইনিয়ে বিনিয়ে বলছেন, ‘থাকতে পারে, কিন্তু ক্লাস সেভেনে নয়, আরও পরে’। তারাও শিশুর বিকাশের পর্যায়গুলো সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখেন না।

শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ (কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট) এর গুরুত্বপূর্ণ সময় হচ্ছে ৭-১৪ বছর বয়স। এই সময়ে শিশু চারপাশ সম্পর্কে যা শেখে, নিজের চিন্তা ও আচরণে সেটা শক্তভাবে প্রেথিত হয়ে যায়। তাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জ্ঞানীয় বিকাশ হওয়ার জন্য এই বয়স গুরুত্বপূর্ণ, ক্লাস সেভেন এই বয়সের মধ্যে পড়ে।

গদ্যাংশে যা আছে তা কি সঠিক?

যা আছে তা সঠিক কিন্তু খানিকটা তালগোল পাকিয়ে ফেলা হয়েছে। এই গদ্যাংশ যুক্ত করার উদ্দেশ্য সমাজে পরম সহিষ্ণুতা তৈরি করা। রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, ‘তোমার মাপে হয়নি সবাই / তুমিও হওনি সবার মাপে’। নিজের চাইতে যারা আলাদা, নিজের মতের বাইরেও যে অপরের মত থাকতে পারে, সমাজে  রয়েছে নানা বৈচিত্র্য এই বিষয়গুলো সকলের জানা উচিত, শিশুদের তো বটেই। কারণ শৈশবের এই শিক্ষা তাকে পরিণত বয়সে ঘৃণার চর্চা করা থেকে বিরত রাখবে।

শরিফার এই গদ্যাংশ বাংলা ভার্সন আর ইংরেজি ভার্সন বাক্য গঠনের দিক থেকে আর শব্দ চয়নের দিক থেকে খানিকটা আলাদা। বাংলা ভার্সনে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ আর ‘হিজড়া’ শব্দের উল্লেখ থাকলেও ইংরেজিতে কিন্তু এই দুটি শব্দের কোনোটাই গদ্যাংশে নেই! অর্থাৎ যে শব্দযুগল নিয়ে বিতর্ক ইংরেজিতে সেগুলো প্রায় অনুপস্থিত। ইংরেজি ভাষায় ব্যবহার করা হয়েছে ‘থার্ড জেন্ডার’। প্রায় বললাম এই কারণে যে, একজন হিজড়া জনগোষ্ঠীর ছবির নিচে তার পরিচয়ে ‘hijra’ শব্দটি আছে। তবে আরেকটু তালগোল পেকে গেছে।

‘গেল, গেল’ রব তুলে যে বাবা মায়েরা আহাজারি করছেন—তারা কি ভেবেছেন তাদের সন্তান এই বিষয়গুলো না জেনেই বড় হবে? অর্ধশিক্ষিত কারও কাছ থেকে ভুল জানার চেয়ে স্কুলের বই থেকে সঠিকটা জানলেই ভাল।

ট্রান্সজেন্ডার, হিজড়া বা জেন্ডার ডাইভার্স পপুলেশনের পরিষ্কার সংজ্ঞা এখানে অনুপস্থিত। বলে দেওয়া উচিত ছিল,  ট্রান্সজেন্ডার হচ্ছে  যাদের সেক্স (বায়োলজিক্যাল লিঙ্গ পরিচয়) আর জেন্ডার আইডেন্টিটি (সামাজিক লিঙ্গ পরিচয়) আলাদা [সূত্র: দ্য সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন, যুক্তরাষ্ট্র]।

অর্থাৎ যিনি শারীরিক গড়নে একজন পুরুষ কিন্তু মনের গড়নের দিক থেকে নারী। কিংবা শারীরিক গড়নে একজন নারী কিন্তু মনের গড়নের দিক থেকে পুরুষ। আরও এক জায়গায় ভাষাগত দুর্বলতা আছে যেখানে বলা হয়েছে, “আমার শরীরটা ছেলেদের মতো হলেও আমি মনে মনে একজন মেয়ে”।

বিষয়টি কিন্তু ‘মনে মনে’ ভাবার মতো এত সরল নয়— এটা এক ধরনের তীব্র অনুভুতি— এটি পরিপূর্ণভাবে মনের গড়ন। ছেলের দৈহিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও শরীফা মনের গড়নের দিক থেকে মেয়ে। পুরুষ শরীরে নারীর মন। এটাই ট্রান্সজেন্ডার।

এখন রব উঠেছে— ট্রান্সজেন্ডাররা মানসিক রোগী– ধরে বেঁধে চিকিৎসা করে তার মনের গড়ন পরিবর্তন করে ফেলতে হবে। বিভিন্ন বাতিল হয়ে যাওয়া পুরানো রেফারেন্স সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে– ট্রান্সজেন্ডারগণ– জেন্ডার ডাইভার্স পপুলেশনের অন্তর্গত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজের একাদশ সংস্করণে ট্রান্সজেন্ডারকে কোনও রোগ হিসেবে অভিহিত করা হয়নি, জেন্ডার ডিসফোরিয়ারও কোনও উল্লেখ নেই। নতুন ১১তম সংস্করণে এগুলোকে বাতিল (deprecated) করা হয়েছে— যা পুরানো সংস্করণে ছিল।

আবার এমনভাবে লেখা হয়েছে যেন ‘হিজড়া’ আর ‘ট্রান্সজেন্ডার’ এক। বস্তুত হিজড়া একটি কালচারাল কমিউনিটি (সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়)। সকল ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি হিজড়া বলে পরিচয় দেন না বা তারা এই জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত নয়— আবার সকল হিজড়া ট্রান্সজেন্ডার নয়। ট্রান্সজেন্ডার আর হিজড়া উভয়েই নারী আর পুরুষের বাইরে যে নন-বাইনারি জেন্ডার বা তৃতীয় লিঙ্গ রয়েছে— তার অন্তর্গত।

কারা দেবেন সমাধান?

পাঠ্যপুস্তকের লেখা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। ভুল থাকতে পারে পাঠ্যপুস্তকেও। সেটি নিয়ে রয়েছে আলোচনার অবকাশ। কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে বিতর্ক হলে সেটা সমাধান করার জন্য বিশেষজ্ঞ পর্ষদের দারস্থ হলে অবশ্যই সেখানে সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতত্ববিদ থাকতে হবে।

বিতর্কের অংশ হিসেবে মানসিক বৈকল্যের প্রসঙ্গ এসেছে— তাই থাকতে হবে মনোবিজ্ঞানী (সাইকোলজিস্ট) আর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট)। আর যাদের নিয়ে বিতর্ক সেই সম্প্রদায়ের অর্থাৎ ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন। আমরা সবসময় ভুলে যাই– যাদের জন্য এই বই, যারা এটি পড়বে সেই শিক্ষার্থীরা আসলে কী ভাবছে— শুনতে হবে এই অংশ নিয়ে তাদের ভাবনা।

মনে রাখা জরুরি

সন্তান স্কুল থেকে শিখবে পরমসহিষ্ণুতা। শিখবে সমাজে সুনাগরিক হতে হলে বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করতে হবে। ঘৃণা নয়— সকলের প্রতি ভালবাসাবোধই মানবিক মানুষ তৈরি করতে পারে।

‘গেল, গেল’ রব তুলে যে বাবা মায়েরা আহাজারি করছেন—তারা কি ভেবেছেন তাদের সন্তান এই বিষয়গুলো না জেনেই বড় হবে? অর্ধশিক্ষিত কারও কাছ থেকে ভুল জানার চেয়ে স্কুলের বই থেকে সঠিকটা জানলেই ভাল।

বিজ্ঞান শিক্ষায় সার্টিফিকেটধারী কিছু মানুষ এবং চিকিৎসা পেশায় ডিগ্রি, উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারী অনেকেই নিজের বিশ্বাসের জায়গা থেকে ব্যাখা করছেন। যে বইগুলো পড়ে তিনি ডিগ্রি অর্জন করেছেন সেগুলো আর সমসাময়িক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা কী বলে, তার আলোকে ব্যাখা দেওয়া উচিত।

মনগড়া অন্ধকারময় ব্যাখা বিজ্ঞানমনস্কতার পরিপন্থী। বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে উপযুক্ত তথ্য প্রমাণের আলোকে যে কোনও বিষয়ের সমাধান করা প্রয়োজন— গোঁজামিল দিয়ে নয়।

লেখক: হেলাল উদ্দিন আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক, চাইল্ড এডোলেসেন্ট এন্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
ই-মেইল: soton73@yahoo.com

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist