Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

রুশ মগজধোলাই রোধে ইউক্রেনে শিশুদের গোপন ক্লাস

রাশিয়ার দখলকৃত ইউক্রেনের একটি স্কুলে শিশুরা রাশিয়ান সৈন্যদের সমর্থনের চিঠি লিখছে। ছবি: বিবিসি।
রাশিয়ার দখলকৃত ইউক্রেনের একটি স্কুলে শিশুরা রাশিয়ান সৈন্যদের সমর্থনের চিঠি লিখছে। ছবি: বিবিসি।

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসনের প্রথম সপ্তাহে লাখ লাখ ইউক্রেনীয়র মতো নাটালিয়াও (ছদ্মনাম) বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। তিনি ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মেলিটোপোলের বাসিন্দা।

নিজ শহরটির রাশিয়ার দখলে চলে যাওয়া সহ্য করতে পারেননি নাটালিয়া। তবে তিনি অনুভব করেন, এখনও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে আছে এমন অঞ্চলে চলে গেলেই তিনি দেশের জন্য কিছু করতে পারবেন।

নাটালিয়া শুধু তার বাড়ি ও আত্মীয়স্বজনদেরই ছেড়ে যাননি, তিনি তার প্রিয় পেশাকেও ছেড়ে এসেছিলেন। সে সময় তার ২০ বছরের শিক্ষকতার চাকরি ছাড়তে হয়েছিল তাকে। তবে এখন তিনি তার শত শত সাবেক শিক্ষার্থীকে অনলাইনে ক্লাস করান, যদিও কাজটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

বিবিসিকে নাটালিয়া বলেন, “এর আগে আর কেউ এটা করেনি। রাশিয়ার দখলে চলে যাওয়া ক্রিমিয়া বা দোনবাস, খেরসন বা জাপোরিঝিয়া অঞ্চল- কোথাও নয়।”

মেলিটোপোলে নাটালিয়ার স্কুলের পুরোনো ক্লাসরুমের দেয়ালে এখন ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিকৃতি ঝুলছে। শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে রাশিয়ার জাতীয় সঙ্গীত শিখতে ও গাইতে হয়। এমনকি তাদের রাশিয়ান সেনাদের ‘অনুপ্রেরণামূলক চিঠি’ লিখতেও বাধ্য করা হয়।

রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চলে এখন এভাবেই ইউক্রেনীয় শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তাদের শেখানো হয়, ইউক্রেন আসলে কোনও দেশ নয়, তাদের দেশ রাশিয়া। নাটালিয়া বলেন, যদি কোনও শিশু এই পাঠ্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করে, তাহলে তাদের বাবা-মাকে মারধর বা নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়।

এই রুশ ‘মগজধোলাই’ থেকে শিশুদের রক্ষার জন্যই নাটালিয়া তার সাবেক সহকর্মীদের নিয়ে একটি অনলাইন শিক্ষার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। ইউক্রেনীয় শিশুদের মনটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তারা।

নাটালিয়া বলেন, “প্ল্যাটফর্মটি চালু করার পর আমি স্কুল শিক্ষার্থীদের সমস্ত অভিভাবকদের একটি চিঠি লিখে ক্লাসের প্রস্তাব দেই। আমি জানতাম না কে ইউক্রেনপন্থী বা রুশপন্থী। আর তারা আমার বাড়ির ঠিকানা ও আমার আত্মীয়দেরও চেনেন।”

তিনি বলেন, এমনকি ‘দখল’ শব্দটি উচ্চারণ করলেও রাশিয়ান সেনারা বাড়িতে হাজির হয়ে যায়। যদি ইউক্রেনের প্রতি আনুগত্যের কোনও প্রমাণ থাকে, যেমন কোনও শিশুর হোমওয়ার্ক রাশিয়ার পরিবর্তে ইউক্রেনীয় ভাষায় লেখা হয়, তাহলেও পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।

তথাপি শত শত পরিবার ইউক্রেনীয় পাঠ্যক্রম শেখানোর জন্য নাটালিয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে এবং এই সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।

শিক্ষার্থীরা সকালে রুশ স্কুলে যায় আর বিকালে বা সন্ধ্যায় ইউক্রেনীয় শিক্ষকদের সঙ্গে গোপনে অনলাইনে ক্লাস করে।

নাটালিয়া বলেন, “এখন জ্ঞানের চেয়ে নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সব শিক্ষার্থী তাদের ক্যামেরা বন্ধ রেখে ক্লাসে যোগদান করে এবং ছদ্মনাম ব্যবহার করে। যাদের অনলাইন সংযোগ বা বিদ্যুৎ নেই তাদের জন্য রেকর্ড করা ক্লাস সরবরাহ করা হয়।”

তিনি বলেন, “বিখ্যাত ইউক্রেনীয় কবি তারাস শেভচেঙ্কো কোন বছরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বা জ্যামিতির নিয়মগুলো এখন শিশুদের শেখানো অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার চেয়ে তাদের এখন ইউক্রেনীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত রাখাটা জরুরি।

“স্কুলে রাশিয়ান পাঠের পর এক শিক্ষার্থী একদিন ঘরে এসে কেঁদেছিল। একটি শিশুর জন্য এটি খুব বেশি মানসিক চাপ। সারা জীবন তারা ইউক্রেনীয় পরিবেশে বাস করেছে এবং হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে গেল।”

ভ্যালেরা (ছদ্মনাম) নামের এক শিক্ষার্থী একটি রাশিয়ান স্কুলে যায়, পাশাপাশি অনলাইনে ইউক্রেনীয় ক্লাসও করে। ১৪ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী জানায়, তার ৩১ সহপাঠীর মধ্যে মাত্র ৬ জন এখনও ইউক্রেনকে সমর্থন করে। এছাড়া প্রায়ই সে রুশ মগজধোলাই প্রতিহতের চেষ্টা করে বলেও জানায়।

ভ্যালেরার ভাষায়, “একবার আমরা আমাদের পাঠের সময় ফোনে ইউক্রেনের জাতীয় সঙ্গীত চালু করেছিলাম। তারপর তারা সবাইকে সার্চ করা শুরু করে। আমি আমার ফোন লুকিয়ে রেখেছিলাম। এরপর তারা রুশ জাতীয় সঙ্গীত বাজায়। তখন সবাই উঠে দাঁড়ালেও আমরা বসে রইলাম।”

এই শিক্ষার্থী আরও জানায়, সে সবসময় অনলাইনের এই অতিরিক্ত ইউক্রেনীয় শিক্ষা চেয়েছিল। কিন্তু তার আশঙ্কা, তাকে হয়তো জোরপূর্বক রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগদানে বাধ্য করা হবে।

নাটালিয়া স্বীকার করেন, তার শিক্ষার উদ্দেশ্য ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। মেলিটোপোল যত বেশি সময় ধরে রাশিয়ার দখলে থাকবে, সেখানে বসবাসকারী শিশুরা তত বেশি ঝুঁকিতে পড়ে যাবে।

তিনি বলেন, “আমি তাদের বাড়ির কাজ দেখতে পারি না। আমি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে ভয়ে আছি। এই শিশুদের বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত রাখাটা খুবই জরুরি। কিন্তু এটা করা খুবই কঠিন।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist