Beta
রবিবার, ৩ মার্চ, ২০২৪

এক মৃত্যুতে বের হলো ইউনাইটেড মেডিকেলের গলদ

ইউনাইটেড
বাড্ডার সাঁতারকুলে নির্মাণাধীন ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভবন

খৎনা করার জন্য ঢাকার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চেতনানাশক দেওয়া হয়েছিল ৫ বছর ৮ মাস বয়সী আয়ান আহমেদকে। এরপর আর জ্ঞান ফেরেনি তার। সাতদিন লাইফ সাপোর্টে রাখার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আয়ানের পরিবারের অভিযোগ, ‘ভুল বা মাত্রাতিরিক্ত’ চেতনানাশক প্রয়োগ করা হয়েছিল তার শরীরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন শিশুটির বাবা শামীম আহমেদ। একই ঘটনায় উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছেন এক আইনজীবী।

এই মৃত্যু নিয়ে যখন গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব, সেই সময় জানা গেল অনুমোদন ছাড়াই চলছিল হাসপাতালটির কার্যক্রম। অথচ তার আগ পর্যন্ত রোগী ভর্তি ও চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কাজ চালিয়ে নিচ্ছিল হাসপাতালটি।

কেবল আয়ানের ঘটনাই নয়, এর আগে ঢাকার গ্রীন রোডে সেন্ট্রাল হাসপাতালে অস্ত্রোপচার টেবিলেই মৃত্যু হয় এক নবজাতকের। গুরুতর অসুস্থ মা মাহবুবা রহমান আঁখিকে আরেকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। গর্ভকালীন অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহার তত্ত্বাবধানে ছিলেন ওই নারী।

আঁখির মৃত্যু নিয়ে আলোচনা শুরু হলে জানা যায়, লাইসেন্স নবায়ন না করেই চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছিলেন খ্যাতনামা এই চিকিৎসক।

মাঝে মাঝেই রোগীর মৃত্যু বা ‘ভুল চিকিৎসা’র অভিযোগ ওঠে অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। তখন ধরা পড়ে লাইসেন্স না থাকা, অনুমোদনহীনভাবে দেদারসে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি।

চিকিৎসা সেবা যারা দেবে তাদের যদি লাইসেন্স না থাকে তাহলে সেটির সঙ্গে ‘মাছের বাজারে’র আর কোনও পার্থক্য থাকে না বলে মনে করেন স্বাস্থ্য সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুব।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “মাত্র তো একটি ঘটনা। এমন অহরহ ঘটনা ঘটে চলেছে। যে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে, তার পরিবার সচেতন বলে ঘটনাটি সামনে এসেছে। কিন্তু আরও কত কিছু ঘটে আমরা জানিই না।”

তিনি বলেন, “কারও কোনও দায়িত্ব নেই, কর্তব্য নেই-এটা কি মুখের কথা নাকি? এ ধরনের ঘটনা ঘটার পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টনক নড়ে। তাহলে যেসব ঘটনা গণমাধ্যমে আসে না, সেসব হাসপাতালের কী হবে?”

ঘটনার পুনরাবৃত্তি

২০২০ সালে ঢাকার আদাবরে মাইন্ড এইড নামে একটি হাসপাতালে সহকারি পুলিশ সুপার আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যা অভিযোগ করেন তার স্বজনরা। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নজরে আসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। এরপর সেখানে অভিযান চালানো হয়।

অভিযানের পর তখনকার ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন ও বর্তমান পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান জানিয়েছিলেন, লাইসেন্স ছাড়াই চলছিল রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতাল। স্বাস্থ্য অধিদফতরে তারা আবেদন করলেও  সেটির সুরাহা হয়নি।

একই ঘটনা ঘটে কামরাঙ্গীরচরের এসপিএ রিভার সাইড মেডিকেল সেন্টারের বেলাতেও। এটিও ছিল নিবন্ধনহীন। ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো সেখানে।

২০২২ সালের ৯ আগস্ট বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নম্বর জালিয়াতি করে হাসপাতালটিতে একাধিক ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক হাসান মিসবাহ ও তার সহকর্মীরা। এর দুইদিন পর ১১ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মেডিকেল সেন্টারটি বন্ধের নির্দেশ দেয়।

তখনই জানা যায়, এসপিএ রিভার সাইড মেডিকেল সেন্টারটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধিত নয়।

এ বিষয়ে সাংবাদিক হাসান মিসবাহ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “সারা দেশে এখনও অনেক অনুমোদনহীন ক্লিনিক-হাসপাতাল আছে। আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ করার পরে স্বাস্থ্য বিভাগ সেই প্রতিষ্ঠান ও ভুয়া ডাক্তার নিয়ে নড়ে-চড়ে বসে। কিন্তু এই কাজটি তো স্বাস্থ্য বিভাগেরই করার কথা। তারা ঠিক মতো কাজ করলে অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতো, দৌরাত্ম কমে যেত ভুয়া ডাক্তারদের।”

গভীর ঘুম আর ভাঙেনি আয়ানের

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের  ২৬ মে থেকে পরবর্তী এক মাসে সারাদেশে প্রায় ১ হাজার ৬৪১টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দ্বিতীয় ধাপে ২৯ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ করা হয় ৬৪৬টি।

অর্থাৎ এই তিন মাস সময়ের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবাধে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছিল দুই হাজার ২৮৭টি প্রতিষ্ঠান।

শিশু আয়ানের মৃত্যুর পরও একই ধরনের দৃশ্য সামনে আসে।

তার বাবার অভিযোগের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইউনাইডেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরির্দশন করে এবং নিবন্ধন ও লাইসেন্স না থাকায় কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়।

বুধবার (১০ জানুয়ারি) এক আদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিদর্শনের সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স দেখাতে পারেনি। অথচ তারা চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছে। এটি সরকারের প্রচলিত আইনের পরিপন্থি। এমনকি নিবন্ধন বা লাইসেন্স পেতে প্রতিষ্ঠানটি কখনো আবেদনই করেনি।

তাই ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স ১৯৮২’ অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনলাইন ডেটাবেজ পর্যালোচনা এবং পরিদর্শনের সময় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে পরিদর্শক দলের সদস্যরা দেখতে পান, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নামে কোনও প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নিবন্ধন বা লাইসেন্সের জন্য কখনোই আবেদন করেনি। কোনো নিবন্ধন ছাড়াই নির্মানাধীন ভবনে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছিল।

এ বিষয়ে দেশের বর্ষীয়ান চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, “একটা হাসপাতালের লাইসেন্সই নেই, সে কিভাবে চিকিৎসা দেয়? এগুলো যাদের দেখার দায়িত্ব তাদের খুব ভালো করে দায়িত্ব পালন করা উচিত।”

শিশু আয়ানের মৃত্যু না হলে হাসপাতালটি যথা নিয়মে কার্যক্রম চালিয়ে যেত কিনা, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

এতদিন ধরে কীভাবে এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ওরা তো আবেদনই করেনি। আর আবেদন না হলে আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করতে পারি না, খোঁজ নিতে পারি না।”

হাসপাতালটির জন্য ‘ভুল’ নামে নিবন্ধনের আবেদন করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ইউনাইটেড হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড নাম ছিল আবেদনপত্রে। হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ যাই হবে, নিয়ম অনুযায়ী সেটাতো এই নামে হবে। কিন্তু তা তো আমরা দেখতে পাচ্ছি না।”

তবে, ইউনাইটেড হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা আরিফুল হক সকাল সন্ধ্যাকে জানিয়েছেন, ইউনাইটেড হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের নামে নিবন্ধিত আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেটি মেডিক্স হেলথকেয়ার নামে পরিচিত।

তিনি জানান, মেডিক্সে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিস দেওয়া হয়। অনেকটা হাসপাতালের বহির্বিভাগের মতো।

মেডিক্সের ফেইসবুক পেইজে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি ইউনাইটেড হাসপাতালের সহ প্রতিষ্ঠান।

আরিফুল হক বলেন, “ইউনাইটেড হেলথ কেয়ার সার্ভিসেসের অধীনে মোট চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো হলো জামালপুরের এম এ রশীদ হাসপাতাল, গুলশান-২ এলাকায় অবস্থিত ইউনাইটেড হাসপাতাল, ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের মেডিক্স এবং বাড্ডার সাঁতারকুলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

“এম এ রশীদ হাসপাতাল ও গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতাল নিজ নামে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধিত। বাকি দুটির জন্য ইউনাইটেড হেলথ কেয়ার সার্ভিসের নামে নিবন্ধনের আবেদন করা হয়েছে।”

মেডিক্স নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বলেও জানান তিনি।  

নিবন্ধন ছাড়াই কেন কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল তা জানতে চাইলে জনসংযোগ কর্মকর্তা আরিফুল হক বলেন, “গত জুনে আবেদন করা হয়েছে মাদার কোম্পানির নামে। যখন আবেদন করা হয়েছিল তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আমাদের কিছু বলেনি। তারা যদি শুরুতেই এই ত্রুটির কথা বলত, তাহলে আমরা এতদিনে সেটা শুধরে নিতাম।”

তবে এখন ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নামে নতুন করে নিবন্ধনের আবেদন করা হবে বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist