Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

কমিউনিজম, ভ্যালেন্টাইনস ডে ও অন্যান্য

বিপ্লবের রঙ লাল। আর ভালোবাসার রঙ? সে-ও নাকি লাল। ভালোবাসা দিবসে যুগলরা একে অপরকে উপহার দেন  লাল ফুল। অনেক যুগলই নিজেদের মধ্যে মিলিয়ে পরেন লাল রঙের পোশাক। সারাবিশ্বেই ভালোবাসা দিবসের চিত্রটি কমবেশি এরকম বলেই আমরা জানি। তবে কি ভালোবাসা দিবস একটি কমিউনিস্ট ‘ষড়যন্ত্র’? এমন কথা শুনে যে কেউই বলবেন, আরে পাগলে বলে কী!

আপনি ঠিকই পড়েছেন। ঠাট্টার ছলে কত কী-ই তো লোকে বলে। তবে এ নিয়ে পশ্চিমের কট্টর সমাজতন্ত্র-বিরোধীদের রয়েছে ‘সিরিয়াস’ ধরনের লেখাও।

সেইসব লেখার সারমর্ম অনেকটা এরকম- পশ্চিমের মানুষ ভালোবাসা দিবস এলেই প্রিয়জনকে নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত হয়ে পড়েন, এ নাকি সোভিয়েত ষড়যন্ত্র! কারণ এই দিনে ‘পশ্চিমারা’ ভালোবাসা নিয়ে এতোই ব্যস্ত থাকে যে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ একদিনেই ভয়াবহ দুর্বল হয়ে পড়ে! সেই সুযোগে সোভিয়েত চররা পশ্চিমের দেশগুলোর ঘটায় সাড়ে সর্বনাশ। 

একই ধরনের প্রচারণা রয়েছে বাংলাদেশেও। তবে এখানে বামপন্থিরা দোষ দেন পুঁজিবাদীদের। প্রগতিশীল এবং স্বৈরাচারবিরোধি চেতনাকে লালন করাদের কেউ কেউ এই দিনে থাকেন দোটানায়। অনেকেই আবার ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’-কে দেখছেন বাজার সংস্কৃতির আগ্রাসন হিসেবে।      

নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশের বামধারার ছাত্রসংগঠনগুলো ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি মজিদ কমিশনের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ ও বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্মারকলিপি দেয়ার কর্মসূচিতে স্বৈরাচারের নির্দেশে শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি চালানো হয়। সেদিন জয়নাল, দিপালিসহ আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

‘ভ্যালেনটাইনস ডে’র প্রচলনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের আবেদন ছিল অনেক বেশি। কিন্তু ১৯৯৩ সালের পর এই দেশে ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ভালোবাসা দিবস। 

‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’-কে বাংলাদেশে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে সে সময়ের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘যায়যায়দিন’।

‘যায়যায়দিন’ ১৯৯৩ সালে ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে বের ‘ভালোবাসা সংখ্যা’। ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’কে বাংলায় ‘ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে নামকরণের পেছনেও কেউ কেউ এ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক শফিক রেহমানের কথা বলেন। সেই অর্থে তার কাঁধেই বর্তায় স্বৈরাচারবিরোধী দিবসটি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ। অথচ, সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে অন্যতম সোচ্চার পত্রিকাই ছিল শফিক রেহমান সম্পাদিত ‘যায়যায়দিন’।

ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস এখন আর আমাদের কাছে অজানা নয়। এর বিপুল বাণিজ্যের প্রসঙ্গটিও বহুল চর্চিত। তবে একটি প্রশ্ন থাকতেই পারে- পুঁজিবাদি দেশগুলোতে জনপ্রিয়তা পাওয়া ভালোবাসা দিবস কি কোন কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত দেশে উদযাপিত হয়?

কমিউনিস্টদের দেশে ভালোবাসা দিবস

সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশ রাশিয়া এবং কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত দেশ চীনে ভালোবাসা দিবসের জনপ্রিয়তা দিনকেদিন বাড়ছে। তবে সোশালিস্ট পরিচয়ধারী উত্তর কোরিয়া সচেতনভাবেই এড়িয়ে যায় ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’। কেননা ঠিক দুইদিন পর, ১৬ ফেব্রুয়ারি সেখানে মহাসমারোহে উদযাপিত হয় তাদের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান প্রয়াত কিম জং ইলের জন্মদিন। মনে হতে পারে রাষ্ট্রপ্রধানের জন্মদিন উদযাপন কী এমন ব্যতিক্রম হবে! 

কিন্তু এই দিনে যে ফোটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে এক বিশেষ ফুল। তাও আবার কিম জং ইলের জন্যই। কিম জং ইলের জীবদ্দশাতেই এক জাপানি বোটানিস্টকে দিয়ে উদ্ভাবন করানো হয় ‘কিমজংগিলিয়া’ নামের এ ফুল। যেটা প্রতিবছর ঠিক তার জন্মদিনেই ফোটে।

কিউবাতে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ বেশ সাড়ম্বরে ‘দিয়া দে লস এনামোরাদোস’ নামে পালিত হয়। ‘এনামোরাদোস’ শব্দের অর্থ প্রেমিক/প্রেমিকা। এই দিনে বহু যুগলের আঙুলে শোভা পায় বাগদানের আংটি। ভালোবাসা দিবস উদযাপনের জন্য পর্যটকদের কাছে হাভানা আকর্ষণীয় স্থান।

দেশে দেশে অন্য নামে একই স্পন্দনে

মজার ব্যাপার হলো, ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ কোনও কোনও দেশে পালিত হয় ভিন্ন ভিন্ন দিবসের নামে। আয়োজনে ভিন্নতা থাকলেও মূল সুরটি একই- ছড়িয়ে যাক ভালোবাসার বার্তা।

তবে ফিনল্যান্ড এবং এস্তোনিয়ায় ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় ‘ফ্রেন্ডস ডে’। এইদিন এ দেশের মানুষ তাদের প্রিয়জন, বন্ধু এবং প্রতিবেশিদের কার্ড দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করেন। 

বুলগেরিয়ায় ১৪ ফেব্রুয়ারি খুবই মজার একটি দিবস উদযাপন করা হয়। বুলগেরিয়ানরা ‘সান ট্রিফন জারেজান’ বা ‘ওয়াইন মেকার’ ডে হিসেবে দিনটি পালন করেন। এই দিনে তারা বন্ধু এবং পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে ওয়াইন ভাগাভাগি করে খান।

আফ্রিকা মহাদেশের ঘানায় ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় জাতীয় চকলেট দিবস। ২০০৭ সাল থেকে এই দিবস তারা উদযাপন করে আসছেন। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ কোকো উৎপাদনকারি দেশ ঘানা, দেশে এবং বিদেশে নিজেদের উৎপাদিত কোকোর কাটতি বাড়াতেই নেয় এই উদ্যোগ।

আর আমাদের বাংলাদেশে ১৪ ফেব্রুয়ারি একইসাথে দুটো উৎসব উদযাপন করা হয়। পহেলা ফাল্গুন এবং ভালোবাসা দিবস। বাংলা বর্ষপঞ্জিতে বসন্তের প্রথম দিন অর্থাৎ পয়লা ফাল্গুন পড়তো ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখ। সংশোধনের পর বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী গত ৩ বছর ধরেই একই দিনে বসন্ত উৎসব আর ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হচ্ছে। 

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist