Beta
রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪
Beta
রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪

ভোটে জামানতের টাকা কেউ তোলে, কেউ যায় ভুলে

নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা জামানতের রসিদ দিতে হয়েছিল এনামুর রহমানকে। ফাইল ছবি
নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা জামানতের রসিদ দিতে হয়েছিল এনামুর রহমানকে। ফাইল ছবি
Picture of খাইরুল বাশার

খাইরুল বাশার

চিকিৎসক এনামুর রহমান দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৯ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন, প্রতিমন্ত্রীও হয়েছিলেন। এবার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী ছিলেন, তবে হেরেছেন।

নির্বাচনে প্রার্থী হতে গিয়ে তিনবারই বিধি অনুযায়ী জামানতের টাকা জমা দিতে হয়েছে এনামুরকে। প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে মোট ৬০ হাজার টাকা তার ফেরত পাওয়ার কথা।

তা কি ফেরত নিয়েছেন- সকাল সন্ধ্যার প্রশ্নে তিনি বললেন, “না, তুলি নাই তো।”

সময়-সুযোগের অভাবে তা তোলা হয়নি বলে জানালেন এনামুর; হাসতে হাসতে বললেন, “এবারেরটা তো তুলতে পারব।”

সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে ২০ হাজার টাকা জমা রাখতে হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। মোট ভোটের আট ভাগের এক ভাগের কম পেলে সেই প্রার্থীর জামানতের অর্থ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়। এই সীমার বেশি ভোট পেলে জমা দেওয়া অর্থ ফেরত নিতে পারেন প্রার্থী।

শুধু সংসদ নির্বাচন নয়, প্রতিটি ভোটেই প্রার্থীদের জামানত হিসেবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখতে হয়।

এনামুরের মতোই জামানতের অর্থ কখনও ফেরত নেননি এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তৃতীয়বার মেয়রের দায়িত্বে এখন তিনি।

ভোটে জেতার পর জামানতের টাকা তুলেছেন কি না- জানতে জানতে চাইলে লিটন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “যতদূর মনে পড়ে, তোলা হয় নাই।”

লিটন মেয়র পদে ভোট করেছেন মোট চারবার, সেই হিসাবে তার ৮০ হাজার টাকা ফেরত পাওয়ার কথা।

এনামুর ও লিটনের মতো অনেকই ভোটে জেতার পর জামানতের অর্থ ফেরত নিতে ভুলে গেছেন।

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া পৌরসভার মেয়র ফাইজুর রশিদও জামানতের টাকা তোলেননি বলে জানান। বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাহিদা সুলতানা তৃপ্তিও বললেন, ‘সময়-সুযোগের অভাবে’ অর্থ ফেরত নেওয়া হয়নি।

তবে সবাই যে তোলেন না, তেমন নয়। পাবনার বেড়া উপজেলার চেয়ারম্যান মো. রেজাউল হক ভোটে জিতে জামানতের অর্থ ফেরত নিয়েছেন।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ভোট শেষ হওয়ার পর আবেদন করে টাকাটা তুলেছি। যাদের জামানত বাতিল হয় না, তারা আবেদন করেই টাকা তুলতে পারেন, সমস্যা হয় না।”

৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থী ছিল ১ হাজার ৯৬৯ জন। তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় জামানতের টাকার রসিদ দিতে হয়েছিল রিটার্নিং কর্মকর্তাকে।

এই প্রার্থীদের প্রত্যেকের ২০ হাজার টাকা করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে মোট জমা হয়েছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৪১ জন আট ভাগের এক ভাগ ভোট পাননি।

অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন। বাকি ২৭ শতাংশ প্রার্থী জামানতের অর্থ ফেরত পেতে পারেন চাইলেই।

ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া কী

জামানতের টাকা কতদিনের মধ্যে তুলতে হবে, তার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তবে দুই বছরের বেশি হয়ে গেলে সে টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে ফেরত দিতে হয় বলে জানিয়েছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম।

বিজয়ী প্রার্থীরা সচরাচর জামানতের অর্থ তুলে নেন বলে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দাবি করেন তিনি। তবে একই সঙ্গে বলেন, প্রার্থী সেই অর্থ তুললেও নিজে নেন না।

“তারা একবার দেখা করতে এসে রিফান্ডের ফর্মে সিগনেচার দিয়ে চলে যান। আর বলে যান, এটা আপনাদের (রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা) মিষ্টি খাওয়ার জন্য। যারা হেরে গেছে, তারা কী করে মুখ দেখাবে, তাই যায় না।”

যারা টাকা ফেরত নেন না তাদের অর্থ কী হয়- জানতে চাইলে রফিকুল বলেন, “তাদের টাকা ২ বছর ট্রেজারি চালানের খাতেই থাকে। পরে রিফান্ড করার চেষ্টা করলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়।”

একাদশ সংসদ নির্বাচনে নিয়ে বিস্তারিত কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন ইসি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩ আসনে একমাত্র প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে মোট ৩৯০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৬৩ জন জামানত হারান।

সংসদ নির্বাচনে জামানত হারানো প্রার্থীদের তথ্য পাওয়া গেলেও স্থানীয় সরকারের ভোটে জামানত হারানোদের তথ্য সংরক্ষিত নেই কমিশনের কাছে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনারর রফিকুল মনে করেন, এসব তথ্য সংগ্রহে থাকলে কমিশনই সমৃদ্ধ হবে।

তিনি বলেন, “দায়িত্বটা রিটার্নিং কর্মকর্তার  কর্মবিধির মধ্যে পড়ে। এটা মনিটরিং করা হয় না। এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করলে নির্বাচন কমিশন আরও বেশি তথ্যসমৃদ্ধ হবে।”

কোন নির্বাচনে কত জামানত

বাংলাদেশে যে কোনও নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় জমা দিতে হয় ট্রেজারি চালান বা ব্যাংকের পে-অর্ডার । সংসদ নির্বাচনে জামানত ২০ হাজার টাকা। তবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে একেক ক্ষেত্রে একেক অঙ্ক।

সংসদ : গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর ১৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নগদ অথবা ব্যাংক ড্রাফট, পে- অর্ডার, ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। একটি নির্দিষ্ট কোডে ট্রেজারিতে টাকা জমা দিতে হয়।

সংসদ নির্বাচনের ম্যানুয়েল অনুযায়ী, জমা দেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন হলে রিটার্নিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিলমোহরে অনুমোদন নিতে হবে।

সিটি করপোরেশন : স্থানীয় সরকারের (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা অনুসারে, মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৫ লাখ ভোটার সম্বলিত নির্বাচনী এলাকার জন্য ২০ হাজার টাকা। ১০ লাখ ভোটার হলে ৩০ হাজার টাকা। ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ ভোটার হলে ৫০ হাজার টাকা। ২০ লাখের বেশি ভোটার হলে জমা দিতে হবে ১ লাখ টাকা।

কাউন্সিলর প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার ভোটারের ওয়ার্ডের জন্য ১০ হাজার টাকা, ৫০ হাজারের বেশি ভোটারের ওয়ার্ডের জন্য ৫০ হাজার টাকা। সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীকে দিতে হয় ১০ হাজার টাকা।

পৌরসভা : মেয়র পদে ২৫ হাজার ভোটার সম্বলিত পৌরসভায় জামানত সর্বনিম্ন ১৫ হাজার টাকা। ১ লাখের বেশি ভোটার হলে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা। কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হতে জামানত ৫ হাজার টাকা।

উপজেলা : চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে ভোট করতে হলে ১০ হাজার টাকা। নারী সদস্যদের ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা।

ইউনিয়ন পরিষদ : চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা, সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডে সদস্যদের জন্য ১ হাজার টাকা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত