Beta
শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪

কলাম

যুদ্ধ, প্রেম, ছ্যাঁকা ও আরও কিছু স্মৃতি

আফসান চৌধুরী। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার

কেউ কি ভাবে না যে যারা যুদ্ধে গিয়েছিল তারা নরমাল মানুষ? কে তাদের মহামানব অথবা শয়তান বানায়? তাদের জীবনে যে প্রতিদিনের সুখ-দুঃখ, বোকামি, গাফিলতি সবই ছিল সেটা ঠিক মনে আসে না বা মনে করিনা আমরা। এর ফলে তারা আমাদের কাছে একমাত্রিক মানুষ হয়ে গেছে— যেন যোদ্ধা-ই তাদের একমাত্র পরিচয়, তারা রক্ত মাংসের কেউ না। কিন্তু আসলেই তাদের জীবনটা সরল, বোকা বোকা অনেক কেইসে এবং শেষপর্যন্ত আমার আপনার মতোই। তাই তাদের আমি মনে করি আমার বন্ধু হিসেবে, কেবল যোদ্ধা হিসেবে নয়।

২.

কিন্তু তাদের দুর্বলতাও নজরে আসে। সেটাও ঢাকিনা। আমি নিজেও তো দুর্বলতা সচেতন মানুষ, তাই হয়তো। তাই তাদের কথা বলি, বলছি আজকাল। অন্তত মানুষ জানুক বিশেষ করে নয়া প্রজন্মের মানুষ জানুক, তারা কেমন ছিল। কতটা তাদের ছিল। এবং পেছনে তাকিয়ে অংক কষলে অনেক কিছুর মধ্যে যেটা চোখে আসে সেটা হলো নেশার অভিশাপ। ওটা অনেকের জীবন থেকে অনেক কিছু নিয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে এসেছে প্রেমের ও ছ্যাঁকা খাওয়ার হাত ধরে।

৩.

আব্বাস সেক্টর-টু’র যোদ্ধা। অনেকেই চিনবে তাকে, তাই এর বেশি বলব না। সে সময়ে ঢাকার আজিমপুরের পোলা মানে নিখাদ মধ্যবিত্ত। যুদ্ধ থেকে ফেরে বীরের বেশে এবং এটাই কি স্বাভাবিক নয় যে কোনও রূপবতী তার প্রেমে পড়বে? কিন্তু ওটা প্রেম ছিল না ঘোর ছিল ? যা শুনেছি তার প্রেমিকা সম্পর্কে সেটা হচ্ছে, সেটা অসম সম্পর্ক, দুজন আলাদা দুনিয়ার মানুষ। আমার বন্ধু আজিমপুর আর তিনি গুলশান। ভাই, চলে না। একদিন ‘সরি’ বলে সব সম্পর্ক ভেঙে ওই মেয়ে চলে গেলেন বিদেশে। পরে এক বিদেশিকেই বিয়ে করেন শুনেছি। আর বাকি কিছু জানি না।

৪.

এর পর যা হয় অনেক সময় তাই হলো— নেশা। সারাদিন শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে বসে থাকত আর নেশা করত বিকালের দিকে। বড্ড সজ্জন ও ভালো মানুষ। একদিন, ৭৩/৭৪ সালের দিকে হবে, আমরা সন্ধ্যার দিকে যাই বই মেলায়, বাংলা একাডেমিতে। আমাকে হঠাৎ সব বলতে থাকে। কিন্তু এক অদ্ভুত ব্যপার ঘটে। সে সব কথা বলে ইংরেজিতে। যে ছেলে জীবনেও কোনওদিন ওই ভাষা বলেনি, সে পুরা কাহিনী বলে ওই ভাষায়। আমি কাঁদব না হাসব বুঝিনা। তবে দিনে দিনে নেশা আরও গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরে তাকে। আমরা পাশ করে রুজির দুনিয়ায় চলে যাই, ওকে ফেলে রেখে। বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল। ভাড়া তুলে সংসার চলে যায়। ট্যাবলেটের বদলে জায়গা নেয় মদ। ভালোই আছে বলব। বিয়ে শাদি করে পার করেছে জীবন। যুদ্ধে সে গিয়েছিল দেশ উদ্ধার করতে, পরিস্থিতি তাকে দিল— বিজয় ও ব্যর্থ প্রেম। নেশাটা কিন্তু তার নিজের ইচ্ছায়; মানুষ দুর্বল, এভাবেই তো ঘটে বিপদ।

এইসব কথাগুলা লিখি কারণ আমরা যুদ্ধের প্রজন্ম, আমরা জানি কি হয়েছিল, কি ঘটেছিল। খুবই সাধারণ, সরল মানুষরাই যুদ্ধে যায়। তারা অতিমানব কেউ না। খারাপ বা ভালো কেউ হয়না শুধু যুদ্ধের কারণে। খারাপ যুদ্ধে গেলে আরও খারাপ হয়, ভালো আরও ভালো। আবার উল্টোটাও হয়। সব মিলিয়েই আমরা সবাই।

৫.

অন্য এক বন্ধুর কথা বলি। ছেলেটা সম্মুখ যুদ্ধে ছিল, খুলনা বেতার কেন্দ্র যুদ্ধ, যেটাতে অনেক প্রাণহানি হয় সেটাতেও। ফিরে এসে ভালোই চলছিল, দারুণ স্মার্ট ছেলে, আমাদের সহপাঠী এবং একদিন যা হবার তাই হলো, প্রেমে পড়ল। তবে এর আগে থেকেই নেশাখোর ছিল, রাতে মাদকের এফেক্ট চালু রাখার জন্য মিষ্টি খেত। দোকানে কয়েকবার গেছিও এই জন্য ওর সাথে। কিন্তু প্রেম ঠিকই হলো এবং একদিন দুজন গোপনে বিয়ে করল। কিন্তু আমার বন্ধু মনের দিক থেকে দুর্বল, বাসায় ফিরে খেল মাদক, নেশার ঘোরে সিঁড়ি থেকে পরে গিয়ে অজ্ঞান, পরে হাসপাতালে। বাড়ি ফিরলে জানতে পারে মেয়েটিকে তার বাবা ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দিয়েছে। আর কিছুই করা যায়নি। মেয়েপক্ষ সবল পার্টি, তাছাড়া দুই ধর্মও একটা ইস্যু। আমার বন্ধুর জীবন আর কোনওদিন সুস্থির হয়নি। মদ, থেকে আরও অনেক কিছুই। বিয়ে শাদি করেছিল, কিন্তু জীবন ছিল হাজারো ঝামেলার। শেষে বিদেশে চলে যায়। একদিন শুনি আরও অনেক দূর চলে গেছে। কি লাভ হলো এই কষ্টের? বন্দুক হাতে নিল… মানে নিজের জীবনকে গুলি করে মারবে নেশার বুলেট দিয়ে ?

৬.

শেষের ঘটনাটা অন্য রকম। প্রেম নিয়ে, নেশা নয়। আমাদের বাড়িতে এক সবল দেহের তরুণ আসত, আমার খালাতো ভাই খোকন ভাইয়ার কাছে। তখন আন্দোলন চলছে। খোকন ভাইয়ার হাতের কাজে অসাধারণ ছিলেন, সেটা ছবি আঁকায় হোক, মাটির পুতুল বানানো অথবা জ্যাম হওয়া স্টেনগান বা বোমার সলতে ঠিক করা। একজন ইঞ্জিনিয়ার ও শিল্পী। সেই খোকন ভাই দেখতাম এক সুশ্রী নারীর ছবি আঁকছেন ফটো দেখে। আমরা চেপে ধরলাম জানতে। তিনি জানালেন এটা ওই ছেলের প্রেমিকা বা তখনকার ভাষায় ‘ডার্লিং’। আমরা বেশ মজা পেলাম। এরপর যুদ্ধ লেগে গেল। কত কিছু ঘটনা। একদিন দেখি সেই তরুণ খোকন ভাইয়ার সামনে বসে কাঁদছেন।

৭.

যুদ্ধকালে তরুণী মেয়েদের নিয়ে মা-বাবার অনেক চিন্তা ছিল, তাই বহু মেয়েকে তখন বিয়ে দিয়ে দেয়। পাত্র ‘ভালো’ হলে তো কথাই নেই। হবু জামাইদের বেশ দাম ছিল তখন। এই কেসেও তাই ঘটে। আমরা মন খারাপ করে সরে যাই। এর কয়দিন পর ছেলেটা আবার আসে। খোকন ভাইকে বিদায় জানিয়ে সেই ছবিটা নিয়ে সে চলে যায়। বলে, ‘‘ডার্লিং যখন আর নাই, তখন আর কি! যুদ্ধেই যামু গা।’’ দারুণ সাহসী যোদ্ধা ছিল। কয়েকবার আসে ঢাকায়। যুদ্ধের পর তার আরও সুনাম হয় অভিনেতা হিসেবে। তার জীবনে নেশার কথা শুনি নাই। কিন্তু অকাল বয়সেই মৃত্যু হয় অতিআহারী মানুষটার।

৮.

এইসব কথাগুলা লিখি কারণ আমরা যুদ্ধের প্রজন্ম, আমরা জানি কি হয়েছিল, কি ঘটেছিল। খুবই সাধারণ, সরল মানুষরাই যুদ্ধে যায়। তারা অতিমানব কেউ না। খারাপ বা ভালো কেউ হয়না শুধু যুদ্ধের কারণে। খারাপ যুদ্ধে গেলে আরও খারাপ হয়, ভালো আরও ভালো। আবার উল্টোটাও হয়। সব মিলিয়েই আমরা সবাই।

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, লেখক ও শিক্ষক।
ইমেইল: afsan.c@gmail.com

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist