Beta
শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

কলাম

কবিতা আর কবিরাই যখন ছিল সম্রাট

আফসান চৌধুরী। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার

গুণ’দা, সাবদার ভাই, হেলাল ভাই, আবুল হাসান ভাইদের কালের কথা। এখন কী অবস্থা জানিনা, তবে সত্তর দশকের ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে যখন প্রবেশ করি তখন কবি ও কবিতাই ছিল সবচেয়ে দাপুটে। এদের ওপর কেউ নাই সাহিত্যের দুনিয়ায়। আজকাল অনেকেই সাহিত্যিক, কবিও বটে, তখন এমন ছিল না। এখন কবি ও কবিতার সমাদর সেই তুলনায় কম। অবশ্য আহমদ শরীফ স্যার বলতেন, রাস্তায় হাঁটা যায়না কবিদের জন্য, একটু গেলেই পায়ের সাথে ধাক্কা লাগে, এতো কবি ক্যাম্পাসে।

২.
ক্যাম্পাস চত্বরের বাইরে ছিল বড় মুরুব্বি কবিকূল— শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, হক ভাই ও আরও অনেকে। সব মিলিয়ে ইনারাই ছিলেন সমাজপতি, কোনও ডাঁটিয়াল বড়লোকরা নয়। কবিদের প্রতি একটু বাড়তি স্নেহ ভালোবাসা ছিল সবারই। তবে তাদের নিজের ছেলেরা কবি না হলেই হলো। আফটার অল কবিদের পকেটে কিছু নাই, ‘পাড়ায়’ যায়, অনেকের নানা রোগ আছে, গাঞ্জা, মদ সব খায়! ছিঃ ছিঃ। তবে খবর নিলে হয়ত জানত নিজেদের সন্তানদের অনেকেরও একই হাল।

৩.
তৎকালীন রাজনীতি এখনকার চেয়ে অনেক সহিংস ছিল। কারণ স্বাধীনতার প্রথম কয়েক বছর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল ভীষণ নাজুক। তাছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ছিল যাদের কার্যক্রম ছিল সরাসরি জঙ্গি। তার বিরোধিতাও ছিল তেমনি কঠিন হাতে। আমাদের অনেকেরই কেউ না কেউ গেছে মাটির নিচে সেই সব দিনে, সেসব কারণে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কবি সাহিত্যিকও ছিল। আজকালও কি তাই?

৪.
সাবদার সিদ্দিকি ভাইয়ের সাথে ইন্ডিয়া থেকে আগত বেশ কিছু নকশালের যোগাযোগ ছিল। তিনি নিজে করতেন কিনা জানিনা, তবে কোলকাতার সাথে একটা যোগাযোগ ছিল তার। তবে একজন আমাকে বলে যে সাবদার ভাই শ্রেণি-সংগ্রামের চেয়ে কবিতা বেশি পছন্দ করেন। যে মানুষ বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া বর্ডার পার হতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তাদের কবিতা শোনায়, সেই মানুষ কী পছন্দ করবে?

৫.
নির্মলেন্দু গুণ’দা রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন যেটা তার লেখা পড়লেই বোঝা যায়, ‘হুলিয়া’ কবিতা হয়ত তার সবচেয়ে বেশি পরিচিত উদাহরণ। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এক কবিতা পাঠের আসরে তিনি শেখ মুজিবকে হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে কবিতা পাঠ করেন। তখন মার্শাল ল’ চলছে, অতএব যেকোনও কিছু হতে পারত। তার কিছু হয়নি, হয়ত কবি বলেই। সেই কাল ছিল রক্তের। আগস্ট ও নভেম্বর দুটোই ছিল রক্তাক্ত সময়। আজকাল দেশে বা বিদেশে বসে ফেইসবুকে মন্তব্য করা অনেক নিরাপদ। এই কঠিন সময়টা চলে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এরশাদ-এর ক্ষমতা দখল পর্যন্ত। এরশাদ আমল থেকে কবিদের অবস্থা বেটার হতে থাকে।

বিপ্লবের ডাক ছিল কারও কারও জন্য কবিতার চেয়েও তীব্র। তেমনি একজন ছিলেন রাজীব। উত্তরবঙ্গের চরমপন্থী এক ঘাঁটি পতনের পর তারা জেলে যায়। ১৯৭৫-এর নভেম্বরের পর অনেকে ছাড়া পায়, যেহেতু তারা আগের সরকারের বিরোধী ছিল। কিন্তু রাজীবের কোনও লাভ হয়নি। যে বিপ্লবের টানে লেখাপড়া বাদ দিয়ে সে বিপ্লব করতে চলে যায় তার দিন শেষ, পার্টির দিনও শেষ।

৬.
আবুল হাসান ভাই ছিলেন অনেক বেশি কবিতার প্রতি নিমগ্ন। খুব সিরিয়াস— কবিতা আর প্রেমের ব্যাপারে। শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে ছিলেন নিয়মিত, রাতে কই যেতেন জানিনা। একটু লাজুক লাগত আমার কাছে। আমরা তখন ‘পূর্বপত্র’ বলে একটা লিটল ম্যাগাজিন বের করতাম। কবিতা পাঠের আয়োজন করি একবার। শিরোনাম ‘মৃত্যু’। ভাবুন ২০-২১ বছরের মানুষ যারা তাদের কবিতার বিষয় ‘মৃত্যু’। তবে অনুষ্ঠান জমে গিয়েছিল। গুণ’দা পড়েছিলেন তিনটি কবিতা— যেগুলো ‘কবিতা : অমীমাংসিত রমণী’ বইতে ছাপা হয়। আবুল হাসান ভাই আসেননি, কী কাজ ছিল। কিন্তু পরে তার ওপরই অকাল মৃত্যুর ছায়া পড়ল সবচেয়ে দীর্ঘ করে।

৭.
তিনি অসুস্থ হয়ে একসময় জার্মানিতে গেলেন চিকিৎসা নিতে। ফেরত এলেন, বললেন ভালো আছেন। একদিন সন্ধ্যার দিকে ক্যাম্পাসে দেখা হয়। তিনি পেড্রোর ক্যান্টিনে আসেন শেষ বিকেলে। কথা বললেন, শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে। অর্ডার দিলেন তেল ছাড়া ডিম পোচ। মানে লবণ পরিহার করছেন অথচ সারাদিন তিনি খাননি। মোটেও স্বাস্থ্য সচেতন কাজ নয়। বললেন, নতুন কবিতার বই বের হচ্ছে। শিরোনাম, ‘সুন্দর বেদনা সবখানে’। এই নামে বোধহয় কোনও বই আর বের হয়নি। এর কদিন পর হাসপাতালে ভর্তি হন। আর ভালো হয়ে ফেরেননি। আজকাল তাকে নিয়ে অনেক রোমান্টিসিজম চালু আছে। তবে আমি দেখেছি একজন সহজ সাধারণ, ভালোমানুষ, যে নিজের দেহ মন সামাল দিতে জানেন না। তার শেষকালের দিকে লেখা কবিতার লাইন:

‘‘বনভূমিকে বলো, বনভূমি ওকে আর শুইয়ে রেখো না !
ওকে ঘরে ফিরে যেতে দাও। যে যাবার

সে চলে যাক,তাকে আর বসিয়ে রেখো না।’’

অপূর্ব লাগে আমার, ছায়ার মতো থাকে মনের সাথে।

৮.
কিন্তু হারিয়ে যাওয়া কবি আর বিপ্লবীদের সংখ্যা কম নয়। গুণ’দার বইটার শিরোনাম ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ এমনি এমনি হয়নি। ওইটা ছিল নিত্যদিনের আলাপ। বিপ্লবের ডাক ছিল কারও কারও জন্য কবিতার চেয়েও তীব্র। তেমনি একজন ছিলেন রাজীব। উত্তরবঙ্গের চরমপন্থী এক ঘাঁটি পতনের পর তারা জেলে যায়। ১৯৭৫-এর নভেম্বরের পর অনেকে ছাড়া পায়, যেহেতু তারা আগের সরকারের বিরোধী ছিল। কিন্তু রাজীবের কোনও লাভ হয়নি। যে বিপ্লবের টানে লেখাপড়া বাদ দিয়ে সে বিপ্লব করতে চলে যায় তার দিন শেষ, পার্টির দিনও শেষ।

জেলে থাকতে না আগে তার মানসিক বৈকল্য শুরু হয় জানিনা। তবে জেল থেকে বের হয়ে সে সামাজিক উন্মূল হয়ে যায়। শেষে একটা জায়গা হয়, কয়েক দিনের জন্য হলেও শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনের কাছে যেখানে সবার জায়গা হতো। সে বসে থাকত সারাদিন, আর কেউ কথা বললে বলত, কেউ খাওয়ালে খেত, যার দুটোই ছিল অনিয়মিত। আমার সাথে খাতির হয়। আমি লক্ষ্য করেছি এমন মানুষদের সাথে আমার খাতির হয় সহজে। তার অনেকগুলা কবিতা আমাকে পড়তে দেয়। এর মধ্যে ‘কমিউন’ নামে একটি কবিতা ছিল যার প্রশংসা করি। সুন্দর ছোট্ট একটি গেরিলা যুদ্ধের ক্যাম্পের বিবরণ— সামনে পুকুর, তাতে হাঁস সাঁতরাচ্ছে, পাখি, গাছ, হাওয়া, আলো, বাতাস। একদিন বুঝেছিলাম সে ভাবে বিপ্লবে সফল হয়েছে, সবাই সুখে আছে।

সালাম কবি ও কবিতার কাল।

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, লেখক ও শিক্ষক।
ইমেইল: afsan.c@gmail.com

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist