Beta
শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪

অনলাইনে ‘ব্রেডক্রামবিং’ আপদ

breadcrumbing

অনলাইন দুনিয়ায় আজকাল ‘ব্রেডক্রাম্বিং’ খুবই পরিচিত শব্দ। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকের পোস্টেই আজকাল এই শব্দের খোঁজ মেলে। বিশেষ করে ‘জেন-জি’দের মধ্যেই এই শব্দের প্রচলন বেশি।   

কিন্তু কারা এই জেন-জি? যাদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১৩’র মধ্যে তারাই জেন-জি।

‘ব্রেডক্রামবিং’ শব্দটির উৎস খুজতে ফিরে যেতে হয় সেই ১৮১২ সালে। সে বছর জার্মান লোকগল্পের সংকলন ‘গ্রিমস ফেইরি টেল’ প্রকাশ হয়।

এই লোকগল্প সংকলনের একটি গল্প ‘হ্যানসেল অ্যান্ড গ্রেটেল’। যে গল্পে হ্যানসেল এবং গ্রেটেলকে তাদের সৎ মায়ের প্ররোচনায় বাড়ি থেকে দূরের বনে রেখে আসা হয়।

তাদের যখন বনে নির্বাসিত করা হচ্ছিল তখন হ্যানসেল নুড়ি পাথর ফেলে ফেলে পথ চিনে রাখছিল। আর সেই নুড়ি পাথরের চিহ্ন অনুসরণ করেই হ্যানসেল আর গ্রেটেল তাদের বাড়ি ফিরে আসে। এতে তাদের সৎ মা যায় ভীষণ ক্ষেপে। ক্ষেপে গিয়ে সৎ মা তাদের একটি ঘরে বন্দি করে রাখলো।

বন্দি থাকায় হ্যানসেলের হলো মহাবিপত্তি। এবার নুড়ি পাথর পায় কই? বুদ্ধি করে হ্যানসেল তাই করলো কি এক টুকরো রুটি (ব্রেড) তার পকেটে লুকিয়ে রাখল।

পরদিন সকালে দুই ভাইকে বনে রেখে আসার সময় হ্যানসেল রুটির ছোট ছোট টুকরা দিয়ে পথের ওপর চিহ্ন দিয়ে রাখলো। যাতে রুটির টুকরো দেখে দেখে আবারও ফিরে আসা যায় বাড়ি।

যদিও হ্যানসেল আর গ্রেটেল রুটির টুকরো খুঁজে খুঁজে বাড়ি ফিরতে গিয়ে পড়ে যায় ডাইনির খপ্পরে। আর এই রুটির টুকরো দিয়ে পথ চিনে রাখতে গিয়ে ডাইনির খপ্পরে পড়ার ঘটনা থেকেই ‘ব্রেডক্রাম্বিং’ প্রবাদটির উদ্ভব।

সম্পর্কে ‘ব্রেডক্রামবিং’ এই রুটির টুকরো অল্প অল্প করে ছিটিয়ে দেওয়ার মতোন। যেখানে এক পক্ষ কখনোই তার আবেগের পুরোটা অন্য পক্ষকে দেখায় না। তার বদলে ঠিক রুটি ছিঁড়ে দেওয়ার মতোই অল্প অল্প করে আবেগের ছিটেফোটা অন্যপক্ষকে দেখাতে থাকে।

বিষয়টা অনেকটা- ছাড়ছি কিন্তু ছাড়ছিনা ধরনের।

সোজা বাংলায় নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো।       

এতে করে তার মনোযোগ প্রত্যাশি পক্ষের মাথায় ক্রমাগত ঘুরতে থাকে একটি প্রশ্ন।

সেটি হলো- ‘সে কি আমায় ভালোবাসে? নাকি বাসেনা?’

বাক্যটি যতটা নিষ্পাপ শোনাচ্ছে আদতে অতটা নিষ্পাপ নয়। বিশেষ করে ডেটিং অ্যাপ ভিত্তিক রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার এই যুগে, প্রেমপ্রত্যাশী অনেকের কণ্ঠে আজকাল শোনা যায় এই বাক্য। কিছুটা হতাশা আর কিছুটা যেন দ্বিধা জড়ানো।

অনেকেই মনে করেন, এ আর এমনকি, রোমান্টিক সম্পর্কে এমন টানাপড়েন তো থাকেই!

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেমপ্রত্যাশী কারও মনে তার সম্ভাব্য প্রেমিক অথবা প্রেমিকা নিয়ে এমন অনুভূতি যদি দীর্ঘ হয় তবে তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সাধারণত সম্ভাব্য প্রেমিক অথবা প্রেমিকার দোদুল্যমান এবং সন্দেহজনক আচরণের কারণেই অপরপক্ষের মনে এমন অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

রোমান্টিক সম্পর্কে একপক্ষের আচরণ যদি যথেষ্ট আন্তরিক না হয় এবং আন্তরিকতা যদি লোকদেখানো মৌখিক কথা বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তবে তাকে ‘ব্রেডক্রামবিং’ বলা হয়।

যারা এ কাজটি করেন তারা ভালোবাসার অথবা আন্তরিকতার এক মেকি অভিনয় করে যান মাত্র। তার মনোযোগ প্রত্যাশিদের তারা ক্রমাগত বলে যান- “আমি তোমারও সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ”। অথচ কাজে নৈব নৈব চ।

সোজা বাংলায় যাকে বলে ছলনা।

ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট ড. মণিকা ভারমানির ভাষায়, “এরা ভান করে যেন সম্পর্কে অনেক সময় আর মনোযোগ দিচ্ছে। আসলে এই সম্পর্কে এদের কোন আগ্রহই নেই”।

কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার ভাবা যায়?

কিন্তু কী কারণ এই ‘ব্রেডক্রাম্বিং’ বা ছলনার?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিছক অন্যের সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিতে অথবা স্রেফ অন্যেকে নিয়ন্ত্রণ করতেও কেউ কেউ ব্রেডক্রাম্বিং করেন।

সম্পর্কে জড়ানো অনেকের কাছেই স্রেফ ‘মজা’। তাদের কারও কারও মধ্যে থাকে এই প্রবণতা।

আর এমন মানুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে অনেকেই পড়ে যান বিপদে।

মনোচিকিৎসক ভারমানি জানাচ্ছেন, এমন মানুষের সাথে সম্পর্কে জড়ালে অনেকেই আর ‘স্বাভাবিক’ সম্পর্কে যেতে পারেন না। যেখানে আছে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, আশা, ভরসা এবং আন্তরিকতা।

এই ব্রেডকাম্বিং করে বেড়ানো মানুষদের কারও কারও নাকি প্রেমে থাকে ভীতি। ফলে সম্পর্কের কোন দায়-দায়িত্বে এরা জড়াতেই চায়না।  

সম্পর্ক নিয়ে শৈশবের কোন বাজে অভিজ্ঞতার ক্ষত দীর্ঘদিন বয়ে বেড়ালে গড়ে উঠতে পারে ব্রেডক্রাম্বিং প্রবণতা।

যাদের আছে এমন ছলের অভ্যাস তাদের সাথে দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কে জড়ালে যে কারও হতে পারে বিরাট মানসিক ক্ষতি।

ক্লিনিকাল সাইকলোজিস্ট ভারমানি জানাচ্ছেন, এদের খপ্পরে পড়া ব্যক্তি এক মিথ্যার চোরাবালিতে আটকে যায়। চাইলেও যে এই সম্পর্ক থেকে বেড়িয়ে আসবে সে সুযোগ তারা পায়না।

কারণ এদের আগ্রহ আর মনোযোগ কখন যে বেড়ে যায় তার ঠিক নেই। আর যখন তা বেড়ে যায়, তখন তাদের টেক্সট পাঠানো আর ফোনে কথা বলাও যায় বেড়ে। ফলে এদের হাতে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রতারিত হবার অনুভূতি নিয়েই এমন সম্পর্কে আটকে থাকে।

আর এতে করে তাদের পেয়ে বসে একাকীত্ব আর উদ্বেগ। এক চিরস্থায়ী দুঃখবোধে আক্রান্ত হয় তারা। নিজেদের মনে করতে থাকে পরিত্যাক্ত। দুলতে থাকে আশা নিরাশার দোলাচলে।

আর যে সম্পর্কে এমন নেতিবাচক অনুভূতির চাষাবাদ হয় তাকে ‘টক্সিক’ বলছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist