Beta
শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪

কী হচ্ছে মিয়ানমারে

জান্তা বাহিনী

মিয়ানমারের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি উৎখাত করে সেনাবাহিনী। গ্রেপ্তার করা হয় অং সান সু চি ও তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির বহু নেতাকর্মীকে। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা দেশ। সেই থেকে দেশটিতে চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা।

সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে বেসামরিক নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য সরকার, জনগণের প্রতিরোধ বাহিনী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংঘাত বাধে।

অভ্যুত্থানের পরই জেনারেল মিন অং হ্লাইং নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা জারি করে। এত কিছু করে ক্ষমতা দখলের তিন বছর পরেও দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না জান্তা সরকার।

গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ

অভ্যুত্থানে পাল্টে গেল মিয়ানমার

গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাতের পর গোটা দেশে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও আন্দোলনে অংশ নেয়। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয়। ক্রমেই বিরোধীরা বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে একাট্টা হতে শুরু করে। 

কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থার মতে, অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর হাতে প্রায় সাড়ে চার হাজার নিহত ও ২৫ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে।

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে মিয়ানমারের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৯ এর তুলনায় ২০২৩ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ কমেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অং থু ন্যেইন বলছেন, শহরাঞ্চলে জীবন কিছুটা স্বাভাবিক মনে হলেও, বাকি মিয়ানমার অস্থির।

ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, “গ্রামাঞ্চলের অবস্থা খুব খারাপ। আমাদের বিদ্যুৎ নেই, কৃষি উৎপাদনও কমে গেছে। অস্থিরতার কারণে এবং পরবর্তীতে কী ঘটবে তা অনুমান করা কঠিন। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিচ্ছে।”

জাতিসংঘ জানিয়েছে, অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে ২০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গত বৃহস্পতিবার দেশটিতে সহিংসতা বন্ধ ও গণতন্ত্রে ফিরে আসার আহ্বান জানান।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক মিয়ানমারে বেসামরিক শাসন পুনরুদ্ধার, সামরিক বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং রাজবন্দীদের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন।

অনলাইনে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “বিশ্বজুড়ে নানা সংকটের মধ্যেও মিয়ানমারের মানুষদের ভুলে যাওয়া যাবে না। দীর্ঘদিন ধরে তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।”

মিয়ানমারের উত্তরের লাইজা এলাকায় সেনাবাহিনীর হামলায় বিধ্বস্ত বিরোধীদের ক্যাম্প

শান্তিপূর্ণ সমাধান কি সম্ভব

এ সপ্তাহের শুরুর দিকে জান্তা সরকার মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা আরও ছয় মাস বাড়িয়েছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে জরুরি অবস্থার মেয়াদ বাড়ানো।

দেশটির বিপ্লবী আন্দোলন ও আঞ্চলিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক সাই লাট বলেন, “যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

আসিয়ানের (অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস) কূটনৈতিক প্রচেষ্টা মিয়ানমারের সংঘাত নিরসনে ব্যর্থ হয়েছে। জোটের ১০ সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতিতে ৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা স্বাক্ষর করার পরেও খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। মিয়ানমার এই পরিকল্পনায় স্বাক্ষর করলেও বাস্তবায়ন করেনি।

ডয়চে ভেলেকে সাই বলেন, “মিন অং হ্লাইংয়ের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের কোনও ইচ্ছে নেই।

“সামরিক বাহিনী দেশের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে জনগণের সহযোগিতা চায়নি। উল্টো রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের ‘মিলিশিয়া’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে তারা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান চায় না।”

দেশটির সামরিক সরকার নিজেদের স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিল (এসএসি) হিসেবে পরিচয় দেয়। আর প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এসএসিকে পুরোপুরি উৎখাত না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এসএসি প্রায়ই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লড়াইরত গোষ্ঠীগুলোর ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছে।

বিরোধীদের কাছে আত্মসমর্পণ করা জান্তা বাহিনীর সদস্যরা

শক্তিশালী হয়ে উঠছে বিরোধীরা

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মিয়ানমারের পরিস্থিতি জান্তা সরকারের নাগালের বাইরে চলে গেছে। প্রতিরোধ বাহিনী দেশটির উত্তরাঞ্চলের শান রাজ্যে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে হামলায় সফল হয়েছে। বিরোধীরা ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের নামে এসব হামলা চালাচ্ছে। জান্তার নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু অঞ্চলও তারা দখল করে নিয়েছে। এতে বেকায়দায় পড়েছে জান্তা সরকার।

‘অপারেশন ১০২৭’ নামের অভিযানে বিরোধীরা গত তিন মাসে মিয়ানমারের কয়েকটি উপজেলা ও সামরিক ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে। এসময় সেনাবাহিনীর শত শত সদস্য আত্মসমর্পণ করে। বিরোধীরা অবশ্য আত্মসমর্পণকারীদের অস্ত্র রেখে মুক্তি দিয়েছে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক মিয়ানমারের নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ডেভিসের মতে, শান রাজ্যে বিরোধীদের কাছে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে সেনাবাহিনী।

তিনি বলেন, “দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণ চালাতে জান্তার কাছে পর্যাপ্ত জনবল ও সাংগঠনিক ক্ষমতা নেই।”

মিয়ানমার-চীন সীমান্তবর্তী স্বায়ত্তশাসিত কোকং অঞ্চলের রাজধানী লৌক্কাই এরইমধ্যে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই ঘটনা চীনের নজর কেড়েছে। কারণ ওই রুট অস্থিতিশীল হলে বাণিজ্য ব্যাহত এবং শরণার্থীদের চাপ বাড়তে পারে। ফলে বেইজিং প্রশাসন আবারও মধ্যস্থতার ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে। অবশ্য এর আগে দুবার ব্যর্থ হয়েছে তারা।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞ দাবি করছেন, অপারেশন ১০২৭ এর ব্যাপকতা দেখে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সকে পেছন থেকে সমর্থন দিচ্ছে চীন।

ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স উত্তরপূর্বে দখলকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ দক্ষিণ চিন রাজ্যে দ্রুত সরাতে পারলে আগামী কয়েক মাসে পালেটওয়া ও কালাদান নদী পথের গুরুত্ব আরও বাড়বে। কারণ এসব পথেও বাণিজ্য হয় চীনের সঙ্গে।

বাংলাদেশ সীমান্তের পাশে অবস্থিত মংডু, বুথিডং ও রাতেডং রয়েছে সিটওয়ের উত্তরে। পূর্ব দিকে রাখাইন থেকে বের হওয়ার প্রধান সড়কের পাশে রয়েছে ক্যুকতাও, ম্রাউক-ইউ ও মিনব্যা। এসব জায়গায় আক্রমণ করেছে বিরোধীরা। শান রাজ্যের মতো এখানে এক বা দুটি শহর বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে গেলে পুরো অঞ্চলে ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

কোকং অঞ্চলে সেনাবাহিনীর একটি ঘাঁটি থেকে জব্দ করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ

ব্রাদারহুডের নজর রাজধানীতে

আরাকান আর্মি (এএ) ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সদস্য সংগঠন। এই জোটে আরও রয়েছে মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং তা’ আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ)।

এএ ইতোমধ্যেই কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি (কেআইএ) ও পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফএস) সঙ্গে জোট গঠন করেছে। তারা এখন কাচিন রাজ্য ও উপর সাগাইং অঞ্চলে সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে আক্রমণ চালাচ্ছে।

অ্যালায়েন্সের দলগুলো ক্রমশ রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। রাজধানী দখলের আগে তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে।

বিলম্বিত নির্বাচন

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের বিরোধী জোট ও জান্তার প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার পর উভয়পক্ষই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।

কিন্তু কয়েকদিন পরেই জোটের ওপর জান্তা বাহিনী গুলি চালায়। এতে বিরোধীরা পাল্টা হামলা শুরু করে। ফলে ভেস্তে যায় শান্তি আলোচনা।

এ বিষয়ে ডেভিস বলেন, “শান রাজ্যে উভয়পক্ষই যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করে একাধিক স্থানে হামলা চালিয়েছে। অ্যালায়েন্স যখন আবার আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেবে, তখন যুদ্ধবিরতি তাদের কাছে কোনও বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।”

লৌক্কাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কারেন্নি ন্যাশনালিটিস ডিফেন্স ফোর্সের সদস্যরা

মিয়ানমারের অন্য অঞ্চলেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এখন উত্তর রাখাইন রাজ্যের প্রায় সবটাই নিয়ন্ত্রণ করছে। আগামী মাসগুলোতে পুরো রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে আরাকান আর্মি সমন্বিত অভিযান চালাতে পারে- এমন সম্ভাবনা রয়েছে।

অং থু ন্যেইন বলেন, “সাম্প্রতিক সংঘাতে ক্ষয়ক্ষতি সামরিক বাহিনীর জন্য ‘অপমানজনক’ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীতে দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

“আমি মনে করি দেশ এক ধরনের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে। সামরিক বাহিনীর এই ক্রমাগত পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীরাও গতি পাচ্ছে। ২০২৪ সালজুড়ে সংঘাত আরও বাড়বে। কিন্তু এখন সামরিক বাহিনী ২০২৫ সালে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।”

মিয়ানমারের জনগণ এখন রাজনৈতিক, সেনাবাহিনী ও অর্থনৈতিক খাতে আমূল পরিবর্তন চাইছে।

রাখাইনে আসন্ন যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, সামরিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়া এই শাসনব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকা অনিশ্চিত। তবে এই যুদ্ধ মিয়ানমারের দুর্দশা আর কতদিন চলবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন ডেভিস।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist