Beta
রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪
Beta
রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪

ফ্রান্সে বামদের জয়ে কী প্রভাব পড়বে ইউরোপে

ফ্রান্সের বামপন্থীদের জোট নিউ পপুলার ফ্রন্টের প্রধান দল কট্টর বামপন্থী লা ফ্রান্স আসুমিজের (এলএফআই) নেতা জঁ লুক মেলোশঁ।
ফ্রান্সের বামপন্থীদের জোট নিউ পপুলার ফ্রন্টের প্রধান দল কট্টর বামপন্থী লা ফ্রান্স আসুমিজের (এলএফআই) নেতা জঁ লুক মেলোশঁ।
Picture of সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

ফ্রান্সের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থীদের জয় ঠেকিয়ে দিয়েছে বামপন্থীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে বামরা ইউরোপীয় ব্লককে একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করেছে।

রবিবার দ্বিতীয় ধাপের ভোটের ফলে বামপন্থী জোট নিউ পপুলার ফ্রন্ট সবচেয়ে বেশি আসন জেতে। তাদের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ১৮২।

প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোর উদার ও মধ্যপন্থী দল রেনেসাঁ পার্টির নেতৃত্বাধীন অনসম্বল অ্যালায়েন্স জিতেছে ১৬৩ আসনে।

প্রথম ধাপে এগিয়ে থাকা কট্টর-ডানপন্থী দল ন্যশনাল র‌্যালি (আরএন) ও এর মিত্ররা ১৪৩টি আসন পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

গত ৩০ জুন প্রথম ধাপে অভূতপূর্ব জয় পেয়েছিল আরএন। মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি কট্টর ডানপন্থীদের কব্জায় যাচ্ছে ফ্রান্স এবং ইতিহাস গড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় ফিরবে তারা।

কিন্তু তা ঠেকাতে একাট্টা হয় মধ্যপন্থী ও বামপন্থী জোটগুলো। বামপন্থী ও মধ্যপন্থী দলগুলো দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে পরস্পরের জয় নিশ্চিত করতে শত শত আসনে প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেয়।

এতে ভোটের লড়াইটা ত্রিমুখী না হয়ে শুধু দ্বিমুখী তথা আরএন বনাম অন্য যে কোনও একটি দলের প্রার্থীর মধ্যে হয়। আরএন বিরোধীরা সবাই মিলে ওই প্রার্থীকেই ভোট দেয়। অতীতের মতো তাদের এই কৌশল এবারও বেশ কাজে লাগে।

তবে কট্টর ডানদের উত্থান ঠেকানো গেলেও সরকার গঠনের জন্য কেউ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে দেশটিতে এবার ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হতে যাচ্ছে।

ফ্রান্সের পার্লামেন্টে আসন সংখ্যা ৫৭৭টি। সরকার গঠন করতে দরকার ২৮৯টি আসন।

পার্লামেন্টের এই নির্বাচন অবশ্য ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর পদের ওপর আপাতত কোনও প্রভাব ফেলছে না। কারণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আলাদাভাবে হয়। প্রেসিডেন্ট পদে ম্যাক্রোঁর মেয়াদ আরও তিন বছর রয়েছে। ২০২৭ সালে হবে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

অর্থনীতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় জনপ্রিয়তা হারানো ম্যাক্রোঁকে বাকি তিন বছর সরকারের কোনও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পদে পদে জটিলতায় পড়তে হতে পারে।

ক্ষমতাসীন মধ্যপন্থীদের আশঙ্কা ছিল, ফ্রান্সের সরকারে কট্টর-ডানপন্থীদের উত্থান ঘটলে পুরো ইউরোপে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে। এছাড়া ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় জোটের সমর্থনেও ফাটল ধরবে। ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় শক্তিশালী অর্থনীতি হওয়ায় দেশটির প্রভাব বেশি।

কিন্তু একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট এবং নতুন শাসক জোট গড়ে উঠার কোনও সুস্পষ্ট পথ না থাকায় প্যারিস রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে পড়তে পারে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নেও ফ্রান্সের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে আসন হারালেও ম্যাক্রোঁ কৌশলে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষত রাখতে পেরেছেন।

ফরাসি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আইআরআইএসের পরিচালক ফেদেরিকো স্যান্টোপিন্টো ইউরোনিউজকে বলেছেন, “আমরা যতটা ভেবেছিলাম তিনি তার চেয়ে কম দুর্বল হবেন। ফ্রান্স আগের মতো আত্মবিশ্বাস নিয়েই তার আন্তর্জাতিক ভূমিকা পালন করতে পারবে।”

প্যারিসে একটি শক্তিশালী সরকার থাকাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য স্তম্ভ বলে মনে করা হয়। তবে ফ্রান্সে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ায় অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকরা ফ্রান্সকে আরও ‘বাস্তবসম্মত’ভাবে সামনে আগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কট্টর ডানপন্থীদের হুমকি মোকাবেলায় সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোতে আগে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কার্নেগি ইউরোপের ফেলো অলিভিয়া ল্যাজার্ডের মতে, কট্টর-ডানদের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের অর্থ ম্যাঁক্রো তার ‘বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে পারবেন’। ফ্রান্স ‘ইউরোপীয় ঐক্যের বিরোধী কোনও ধরণের অতি সার্বভৌমত্ববাদী এবং জাতীয়তাবাদী আখ্যানে ফিরে যাওয়া’ এড়াতে পারবে।”

ইউরোনিউজের রেডিও শুম্যানকে ল্যাজার্ড বলেছেন, “এই মুহূর্তে ফ্রান্স এখনও ইউরোপে উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান এবং রাশিয়ার প্রভাবের বিরুদ্ধে ইউরোপের মূল ঘাঁটিগুলোর মধ্যে একটি।

“এর মানে হলো, প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে ইউরোপ আরও কিছু সময়ের জন্য নিরাপদ থাকবে।”

কিয়েভে ‘স্বস্তি’

ফ্রান্সের পার্লামেন্টে আরএন এর জয় ইউক্রেনের প্রতি ইইউর সমর্থনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারত।

কারণ মেরিন লো পেনের দলটির রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। তারা ইউক্রেনে ফরাসি সহায়তা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। ক্রিমিয়া দখলের জন্য মস্কোর ওপর নিষধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দলটি ২০১৪ সালে একটি রাশিয়ান ব্যাংক থেকে বিতর্কিতভাবে ৯ বিলিয়ন ইউরো ঋণ নেয়।

বুথফেরত জরিপে ডানপন্থীদের পরাজয়ের আভাস পেয়েই পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ জন নেতার মধ্যে প্রথম প্রতিক্রিয়া জানান।

ইউরোপের নেতারা— বিশেষ করে পূবের নেতারা ভয় পেয়েছিলেন, পার্লামেন্টে কট্টর-ডানপন্থী সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে বাধ্য হলে পররাষ্ট্রনীতিতে প্রেসিডেন্ট ম্যাঁক্রোর হাত দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে ইউক্রেনের প্রতি ফ্রান্সের আর্থিক ও সামরিক সমর্থনেও ভাটা পড়বে।

যদিও জুনের ইউরোপীয় নির্বাচনের আগে লো পেনের দল উল্লেখযোগ্যভাবে যুদ্ধের বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল। দলটি বলেছিল, তারা সরকারে গেলে ইউক্রেনকে প্রতিরক্ষা সহায়তা অব্যাহত রাখবে। তবে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য অস্ত্র পাঠাবে না, যা ইউক্রেনকে রাশিয়ার ভূখণ্ডে আঘাত করার সক্ষমতা দিতে পারে।

তবে কট্টর-বাম দল লা ফ্রান্স আসুমিজে (এলএফআই) নেতা জ্যাঁ-লুক মেলোশেঁর বিরুদ্ধেও অতীতে রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান গ্রহণের অভিযোগ ছিল। দলটি নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া বামজোট নিউ পপুলার ফ্রন্ট অ্যালায়েন্সের অংশ।

ফ্রান্সের সামরিক নিরপেক্ষতার প্রবক্তা জ্যাঁ-লুক মেলোশেঁ ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধের জন্য শান্তি আলোচনার ডাক দেন। তিনি ক্রমাগতভাবে কিয়েভে অত্যাধুনিক অস্ত্র পাঠানোর বিরোধিতা করেছেন।

ইউক্রেনের জন্য সামরিক সমর্থন নিয়ে নিউ পপুলার ফ্রন্টের ঐক্যেও ফাটল ধরতে পারে। জোটটিতে নমনীয় থেকে কট্টর বাম পর্যন্ত নানান সমাজতান্ত্রিক দল রয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাঞ্জার্সের স্কলার লায়েটিশিয়া ল্যাংলোইসের মতে, মধ্য-বাম সোশালিস্ট পার্টি (পিএস) এবং এর নেতা রাফায়েল গ্লুকসম্যান জোটটিকে ইউক্রেনপন্থী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তিনি ইউরোপীয় পার্লামেন্টেরও সদস্য।

বামপন্থী জোট নিউ পপুলার ফ্রন্টের ৭৭টি আসনে মেলোশেঁর দল এলএফআই সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। আর মধ্য-বাম ও মধ্যপন্থী সমাজতান্ত্রিক দল পিএস ও এর মিত্ররা পেয়েছে ৫৯ আসন।

ল্যাংলোইস বলেন, “রাফায়েল গ্লুকসম্যান সম্ভবত লা ফ্রান্স আসুমিজের (এলএফআই) বক্তৃতাগুলোকে পরিমিত করার চেষ্টা করবেন।

“আমি মনে করি, ইউক্রেনের পক্ষে সমর্থন এবং একটি আগ্রাসী ও অত্যাচারী দেশের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের মূল্যবোধকে রক্ষা করার বিষয়ে দেশের ভেতরে একটি ঐকমত্য রয়েছে।

“আমি আরও মনে করি, বর্তমানে ইউক্রেনের প্রতি ফ্রান্সের সমর্থনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা লা ফ্রান্স আসুমিজের (এলএফআই) জন্যও কঠিন হবে।”

জলবায়ু রক্ষাকারীরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে

ন্যাশনাল র‌্যালির (আরএন) পরাজয়কে ইউরোপীয় সবুজ চুক্তির রক্ষকরাও স্বাগত জানিয়েছে।

ন্যাশনাল র‌্যালির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী জর্ডান বারদেলা এর আগে ফরাসি সরকারকে সবুজ চুক্তি ‘ত্যাগ’ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। চুক্তিটিকে তিনি ইইউর ‘শাস্তিমূলক’ পরিবেশ নীতি বলে আখ্যায়িত করে আক্রমণ করেছিলেন।

অন্যদিকে, বামপন্থী জোট ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতার লক্ষ্যে একটি জলবায়ু পরিকল্পনার আহ্বান জানিয়েছে। তারা ফ্রান্সকে অফশোর বা ভূভাগের বায়ু এবং জলবিদ্যুতের মতো পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে একটি পাওয়ার হাউসে পরিণত করতে চায়।

ইউরোপীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক স্ট্র্যাটেজিক প্রসপেক্টিভসের পরিচালক নীল মাকারফ বলেন, “ফ্রান্সের এই নির্বাচন ইউরোপীয় নেতাদের জন্য জেগে ওঠার ডাক। তেল, গ্যাস ও কয়লা আমদানি ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ কমেছে। পরিবারগুলোকে বাড়তি জ্বালানি বিল দিতে হয়। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।”

ন্যাশনাল র‌্যালি এবং এর ইউরোপীয় মিত্ররা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচনের আগে ইউরোপীয় সবুজ চুক্তিতে বিরতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ইউরোপের অনেক মধ্য-ডান দলও এই অবস্থান গ্রহণ করেছিল। এতে সমালোচনা হয়েছিল যে, ঐতিহ্যগত রক্ষণশীলরা কট্টর-ডান শক্তিকে মূলধারায় ভেড়াচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন, ম্যাঁক্রোর দুর্বল হাত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ফরাসি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক আইডিডিআরআইয়ের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা লোলা ভ্যালেজো বলেছেন, “দেশে জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপের ব্যাপারে ফ্রান্সের প্রতিশ্রুতির জন্য এই নির্বাচনের ফল একটি সুসংবাদ, যদি পার্লামেন্ট একটি শক্তিশালী জোটের সংস্কৃতি বিকশিত করতে পারে।

“আন্তর্জাতিক জলবায়ু এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে ম্যাঁক্রো দৃঢ়ভাবে তার ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধান চালিয়ে যেতে পারেন, যেমনটি তিনি প্রায়ই করেন। তবে এই রাজনৈতিক পরিণতির পরে তার অবস্থান কী হবে তা অনিশ্চিত, যার সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেরও ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত