Beta
Logo

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

আর্চারির স্নেহধন্য রাকিব

আর্চারির স্নেহধন্য রাকিব
রাহেনুর ইসলাম
বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৯:৩৫:০০

৪০০ আর্চার, ৭১টা দল! এবারের জাতীয় আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে দুটি সংখ্যাই চোখ কপালে তোলার মতো। আগের ১৫টি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে এত বেশি আর্চার আর ক্লাব অংশ নেয়নি কখনও। আজ (২১ জানুয়ারি) মাঠে গড়ানো এবারের আসর তাই শুরুই হলো রেকর্ড দিয়ে।

এত খেলোয়াড় আর দলের ভিড়ে একটা নাম কৌতূহল জাগানিয়া রীতিমতো, বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশন! খোদ আর্চারির অভিভাবক সংস্থাই নিজেদের নামে দল গড়ে অংশ নিচ্ছে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে। পাড়া-মহল্লার টুর্নামেন্টে ‘কমিটির টিম’ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শোনা যায় প্রায়ই। তাই বলে আর্চারির মতো মর্যাদার জাতীয় ইভেন্টে ‘কমিটিই’ নেমে পড়ছে পদক জয়ের লড়াইয়ে!

এভাবে ভাবলে ভ্রূ কুঁচকাতেই পারে। তবে আর্চারি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ফেডারেশনের যে দলটা নেওয়া হয়েছে এটা নতুন মাইলফলক দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। এই দলের খেলোয়াড় মাত্র একজন, তিনি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নেওয়াজ আহমেদ রাকিব।

জাতীয় দলে কম্পাউন্ড ইভেন্টের পরিচিত মুখ রাকিব। দেশী খেলোয়াড়দের র‌্যাঙ্কিংয়ে তিনি রয়েছেন দুইয়ে। এবারের চ্যাম্পিয়নশিপে জাতীয় নির্বাচনের কারণে বিজিবি অংশ না নেওয়ায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল রাকিবের খেলা। অথচ জাতীয় দলের জন্য তৈরি থাকতে তাঁর খেলাটা জরুরি। আবার অন্য ক্লাবের হয়ে রাকিবের অংশ নেওয়ারও উপায় ছিল না। তাই বিরল এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর্চারি ফেডারেশন। রাকিবের জন্য ফেডারেশনের নামেই দল গড়েছে সংস্থাটি।

এ নিয়ে আর্চারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ সকাল সন্ধ্যাকে বললেন,‘‘রাকিব আমাদের র‌্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় স্থানে থাকা খেলোয়াড়। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সুযোগ না দিলে দেখা যাবে ওকে নিরাপত্তার জন্য রাঙ্গামাটি বা অন্য শহরে পাঠিয়ে দিয়েছে বিজিবি। এটা আমাদের জাতীয় দলের জন্য ক্ষতির কারণ হতো। এজন্য অলিম্পিকে আইওসি যেমন রিফিউজি দল গড়ে, আমরাও তেমনি নিজেদের পতাকায় সুযোগ দিয়েছি রাকিবকে।’’

অনুশীলনে নেওয়াজ আহমেদ রাকিব। ছবি : সংগৃহীত

অলিম্পিকের পতাকায় অ্যাথলেটরা

১৯৯২ বার্সেলোনা অলিম্পিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫ দেশের মধ্যে ১২টি একসঙ্গে খেলেছিল ‘ইউনিফাইড টিম’ নামে। আইওসির পতাকা নিয়ে খেলা এই দলই সেবার ৪৫টি সোনাসহ জিতেছিল সর্বোচ্চ ১১২ পদক।

২০১৬ রিও অলিম্পিকে প্রথমবার অংশ নেয় ‘রিফিউজি অলিম্পিক টিম’। চার দেশ-ইথিওপিয়া, সাউথ সুদান, সিরিয়া আর কঙ্গোর ১০ অ্যাথলেট খেলেছিলেন এই দলে।

এরপরের দুই অলিম্পিকে ‘রিফিউজি অলিম্পিক টিম’-এর দেশ আর অ্যাথলেট সংখ্যা আরও বেড়েছে। ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে এই দলের খেলোয়াড় ছিলেন ২৯ জন। সর্বশেষ ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে ১১ দেশের ৩৭ অ্যাথলেট খেলেছেন এই দলের হয়ে।

লিগে বাংলাদেশ ও ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের দল

২০১০ সালে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ) তরুণ ভারতীয় প্রতিভাবানদের নিয়ে গঠন করেছিল ‘ইন্ডিয়ান এরোস’ দল। ভারতের দ্বিতীয় বিভাগ লিগ ‘আই-লিগে’ নিয়মিতই খেলত এই দল। তবে ২০২২ সালে এআইএফএফ-এর কারিগরি কমিটি এএফসি লাইসেন্সিংয়ের সমস্যার জন্য আই-লিগে ‘ইন্ডিয়ান এরোস’-এর অংশ নেওয়া বন্ধ করে দেয়।

ভারত বন্ধ করলেও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের গড়া ‘এলিট ফুটবল একাডেমি’ নিয়মিতই অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে (বিসিএল)। তরুণদের আরও পরিণত করতেই এমন ব্যবস্থা, তাই লিগ থেকে অবনমন বা উত্তরণের নিয়ম রাখা হয়নি এই দলের জন্য।

এবারের বিপিএলেও চট্টগ্রাম রয়্যালসের ফ্র্যাঞ্চাইজি সরে দাঁড়িয়েছিল শেষ দিকে। তাই দলটির দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। এজন্য মোহাম্মদ নাঈম, মেহেদী হাসানদের দলকে ‘কমিটির টিম’ নামে মজাও করতেন প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা।

রাকিব যেখানে অনন্য

বাংলাদেশের যে কোনো খেলারই জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে কেবল একজনের জন্য ফেডারেশনের নামে দল গড়ার নজির নেই। সেই দিক দিয়ে নাওয়াজ আহমেদ রাকিব অনন্য ইতিহাসই তৈরি করলেন। আর্চারি ফেডারেশনের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়ে আর্চারির পাশাপাশি বিজিবির কর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি, ‘‘বিজিবি এবার দল গড়তে পারেনি। আমিও ছুটিতে ছিলাম। হঠাৎ জানতে পারি ফেডারেশনের দলের হয়ে খেলতে পারব আমি। বিজিবির কর্তারা ভীষণ সাহায্য করেছেন আমাকে। তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ থাকব। আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি ফেডারেশনের কর্তাদের প্রতিও।’’

ওয়ার্ল্ড আর্চারি এশিয়ার সভাপতি কাজী রাজিব উদ্দিন আহমেদ চপল ও জাতীয় দলের জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখের সঙ্গে রাকিব। ছবি : সংগৃহীত

এভাবে নেওয়াজ আহমেদ রাকিবকে ফেডারেশনের দলে জায়গা দেওয়ায় খুশি জাতীয় দলে তাঁর সতীর্থ রাকিব মিয়া। টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে ২০২২ সালের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ছেলেদের রিকার্ভ এককের কোয়ার্টার ফাইনালে রোমান সানাকে হারানো রাকিব মিয়া সকাল সন্ধ্যাকে বললেন, ‘‘ফেডারেশনের এটি সাহসী ও ইতিবাচক উদ্যোগ। তাতে একজন আর্চার সুযোগ পেল এত বড় একটা আসরে খেলার। আশা করছি ভবিষ্যতে কেউ সমস্যায় পড়লে তখনও এভাবে এগিয়ে আসবে ফেডারেশন।’’

শুটিং থেকে আর্চারিতে

কিশোরগঞ্জে জন্ম নেওয়া নেওয়াজ আহমেদ রাকিব ২০১৪ সালে বিজিবিতে যোগ দিয়ে নাম লিখিয়েছিলেন শুটিংয়ে। বিজিবি-বিএসএফের ‘আগ্নেয়াস্ত্র শুটিংয়ে’ ২০১৬ সালে জিতেছিলেন পদকও। এরপর হঠাৎ শুটিং ছেড়ে আর্চারিতে যোগ দেন রাকিব। বিজিবির সিনিয়র অফিসাররা সাহায্যও করেছেন তাঁকে। ২০১৮ সাল থেকে বিজিবির হয়ে নিয়মিত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিচ্ছেন রাকিব। দলীয় ও ব্যক্তিগতভাবে একাধিক পদক জিতে রাকিব জায়গা করে নেন আর্চারির জাতীয় দলে।

২০২২ সালে ইরাকে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র‍্যাঙ্কিং টুর্নামেন্টে (স্টেজ-২) কম্পাউন্ড পুরুষ দলগত ইভেন্টে মোহাম্মদ আশিকুজ্জামান ও মিঠু রহমানকে নিয়ে রুপা জিতেছিলেন নেওয়াজ আহমেদ রাকিব। একই বছর শারজায় রাকিব এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র‍্যাঙ্কিং টুর্নামেন্টে একক, মিশ্র ও দলগত কম্পাউন্ড ইভেন্টে জিতেন তিনটি ব্রোঞ্জ।

এমন একজন পারফর্মারকে এবারের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সুযোগ করে দিয়ে খুশি আর্চারি ফেডারেশনের সভাপতি ড. মোখলেস উর রহমানও,‘‘এটা একটা ভিন্নধর্মী উদ্যোগ। একজন খেলোয়াড়ও যেন খেলা থেকে বঞ্চিত না হন, সেই ব্যবস্থা করেছি আমরা। শুরুটা হলো রাকিবকে দিয়ে। ভবিষ্যতেও এটা চালু থাকবে।’’

ওয়ার্ল্ড আর্চারি এশিয়ার সভাপতি কাজী রাজিব উদ্দিন আহমেদ চপলও সাধুবাদ জানালেন এমন উদ্যোগকে। সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বললেন, ‘‘সাধুবাদ পাওয়ার মতোই উদ্যোগ এটা। আশা করছি অন্য খেলার জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টে রাকিবের মতো কেউ দল না পেলে এগিয়ে আসবে সেই নির্দিষ্ট ফেডারেশন। একটা ভালো উদ্যোগে অন্যদের অনুসরণ করাই যায়।’’

আরও