উড়ছে বিসিবির টাকা
মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৯:৫৪:০০
আন্দ্রে অ্যাডামসের অধ্যায় শেষে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের পেস বোলিং কোচের দায়িত্ব নেন শন টেইট। গত বছরের মে মাসে হয় এই পালাবাদল। সেই মাসেই অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশ আসেন টেইট। গুলশানের ৪৩ নম্বর রোডের ২৯ নম্বর বাড়ি ইস্টার্ন মহানন্দায় উঠার কথা ছিল তাঁর।
সেখানে বিদেশি কোচিং স্টাফদের জন্য একাধিক ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে রেখেছে বিসিবি। আন্দ্রে অ্যাডামসও থাকতেন ইস্টার্ন মহানন্দায়। অথচ টেইট এই ফ্ল্যাটের বদলে উঠেন একটি পাঁচতারকা হোটেলে। সেই থেকে পাঁচতারকা হোটেলেই থাকেন তিনি। অথচ তাঁর নামে প্রতি মাসে এক লাখ টাকা বাড়ি ভাড়াও দিয়ে চলেছে বিসিবি!
হাজার কোটির বেশি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট আছে বলেই কী এমন অপব্যয় বিসিবির? শুধু খালি ফ্ল্যাটের বাড়ি ভাড়া পরিশোধই নয়, এমন আরও অনেক খাতে দেদার টাকা উড়াচ্ছে বিসিবি। যেমন হোটেল সোনারগাঁও থেকে মিরপুরে যাওয়ার একটি বাসের ভাড়াই গুণতে হয় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা! জমা দেওয়া হয়েছে একজন খেলোয়াড়ের দিনে ১৪টি ডাব খাওয়ার বিল!
হিসাবের নয়ছয়
• একজন খেলোয়াড়ের দিনে ১৪টি ডাব খাওয়ার বিল জমা।
• সোনারগাঁও থেকে মিরপুরে যাওয়ার বাস ভাড়া ৫৫-৬০ হাজার টাকা।
• পাঁচ তারকা হোটেলে থাকলেও শন টেইটের জন্য গুলশানের ফ্ল্যাটে মাসে ভাড়া দিতে হয় ১ লাখ টাকা।
• চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামের চাহিদাপত্র ছিল প্রতিদিন ৪ লাখ লিটার পানি। সেটা কমিয়ে করা হয়েছে ১ লাখ লিটার।
• তিন নির্বাচনি মেয়াদে ২৭৭০ কোটি টাকা খরচের ১০০০ কোটি টাকা গেছে জলে।
একজন ক্রিকেটারের জন্য একদিনে ১৪ ডাবের বিল
গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ এসেছিল বাংলাদেশ সফরে। সেই সিরিজে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ডাব খাওয়ার বিল দেখে চোখ কপালে উঠতে পারে যে কারও। প্রতি জন খেলোয়াড় নাকি দিনে ডাব খেয়েছিলেন ১৪টা করে! এই পরিমাণ ডাবের পানি দিয়ে তো গোসলই করা যায় অনায়াসে।
বিসিবির পরিচালক ও অর্থ কমিটির প্রধান এম নাজমুল ইসলাম যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি করেছিলেন তামিম ইকবালকে ভারতের দালাল বলে। ক্রিকেটারদের অনুশীলনে ডাব খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেও সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি। ক্রিকেটারদের বেতন নিয়ে অযাচিত মন্তব্য করেও সমালোচিত হয়েছিলেন এম নাজমুল ইসলাম। এর প্রতিবাদে বিপিএল বন্ধ ছিল একদিন। এজন্য বিসিবির অর্থ কমিটি থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলেও আজ আবারও ফিরে পেয়েছেন দায়িত্বটা।
সেই নাজমুল ইসলাম ডাবের বিল নিয়ে সকাল সন্ধ্যাকে বললেন,‘‘আমি খেলোয়াড়দের কম ডাব দেওয়ার কথা কখনও বলিনি। আমাদের কাছে বিভিন্ন বিলের কোটেশন আসে। ডাব নিয়েও এসেছিল। তখনই দেখি এক মৌসুমের জন্য কোটেশন দেওয়া হয়েছে ৫ লাখ টাকার ডাব। প্রতিটা ডাবের দাম ১৫০ টাকা করে। উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গত বছরের সিরিজের সময় ডাবের দামটা। আমি হিসাব করে দেখেছি, তারা যে বিল দিয়েছে তাতে একজন ক্রিকেটার প্রতিদিন ডাব খেয়েছেন ১৪টা করে। এটা কীভাবে সম্ভব? এই পরিমাণ ডাব দিয়ে তো গোসল করা যায়। কোনো অসুস্থ মানুষেকেও দিনে তিনটার বেশি ডাব খেতে বলবেন না ডাক্তাররা। কারণ এতে দেহের পটাসিয়াম বেড়ে যাবে বিপজ্জনকভাবে। আমি এখানে নজর দেওয়াতেই অপরাধী হয়ে গেছি। তবে তামিমসহ অন্য ক্রিকেটারদের বেতন নিয়ে মন্তব্য করায় দু:খ প্রকাশ করছি।’
এক লাখ টাকা ভাড়ার ফ্ল্যাট ছেড়ে টেইট থাকেন পাঁচ তারকা হোটেলে
শন টেইট পাঁচ তারকা হোটেলে থাকলেও তাঁর নামে ফ্ল্যাট ভাড়া করা আছে গুলশানে। মাসে এক লাখ টাকা করে ভাড়াও গুণছে বিসিবি। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলারের সঙ্গে বিসিবির চুক্তি ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত।

বাংলাদেশের সঙ্গে টেইটের সম্পর্ক অবশ্য পুরোনো। বিপিএলের দ্বিতীয় আসরে খেলে গেছেন তিনি চিটাগং কিংসে। এরপর গত বিপিএলে এই দলেরই প্রধান কোচ হয়ে ফেরেন তিনি। খুব তারকাবহুল দল না হয়েও তার কোচিংয়ে বিপিএলের ফাইনালে খেলে চিটাগং। সেই টেইট ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাংলাদেশে হয়তো থাকবেন পাঁচ তারকা হোটেলেই। তারপরও কী তাঁর জন্য বরাদ্দ ফ্ল্যাটের ভাড়া দিয়ে যাবে বিসিবি?
এ নিয়ে এম নাজমুল ইসলাম বললেন,‘‘বিদেশি কোচিং স্টাফদের জন্য গুলশান ও বনানীতে ১৪টা ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া আছে বিসিবির। টেইটের ব্যাপারটা আমাদের নজরে এসেছে। এভাবে তো চলতে পারে না। বিসিবির ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাট খালি থাকলে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় এ নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিব আমরা।’’
বোর্ডের লোকসান হলেও এ থেকে ফায়দা লুটেছেন লজিস্টিক ডিপার্টমেন্টের এক্সিকিউটিভের দায়িত্বে থাকা জিহাদুর রহমান সোহান। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে সোহান কাজ করছেন লজিস্টিক অ্যান্ড প্রটোকল বিভাগে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে বিসিবির ভাড়া করা বাসার দেখভালের দায়িত্ব নেন তিনি। এরপর ইস্টার্ন মহানন্দার ফাঁকা ফ্ল্যাটে হোটেল বাণিজ্য করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
ফাঁকা বাড়িতে প্রায়ই বিদেশিরা আনাগোনা করেন বলে সকাল সন্ধ্যাকে জানিয়েছেন ইস্টার্ন মহানন্দার কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম,‘‘এই অঞ্চলে ফাঁকা ফ্ল্যাটে এসব নিয়মিত ব্যাপার। দেখা গেল কোনো বিদেশি হোটেলে থাকলে যে বিল দিতেন, এ ধরনের বাড়িতে এর চেয়ে অনেক কমে তিন-চার দিন থেকে যান। সোহান সাহেবও প্রায় বিদেশি মেহমান পাঠান। অনেক সময় তাঁর বন্ধু-বান্ধবও আসেন। গত ছয়-সাত মাস ধরেই চলছে এটা। আমরাও না করতে পারি না।’’

গত সাত মাস ইস্টার্ন মহানন্দায় ফাঁকা পড়ে আছে বিসিবির তিনটি ফ্ল্যাট। যার একটি টাইগার পেস বোলিং কোচ শন টেইটের নামে বরাদ্দ। ফাঁকা থাকলেও চুক্তি মেনে ভাড়া পরিশোধ করে চলেছে বিসিবি।
এই তিনটি ফ্ল্যাটে যে হোটেল বাণিজ্য হচ্ছে সেটা মুঠোফোনে নিশ্চিত করলেন বাড়ির ম্যানেজার হারুনুর রশিদও,‘‘সোহান সাহেব প্রায়ই গেস্ট পাঠান ফ্ল্যাটে। বিদেশি মেহমান আসেন বেশি। নিশ্চয়ই টাকার বিনিময়েই থাকেন তাঁরা। সেই টাকা বিসিবি পায় নাকি সোহান সাহেব, আমি জানি না।’’
তিনটি ফ্ল্যাট ফাঁকা থাকার পরও বিসিবিতে আসা নতুন কোচদের জন্য বনানীর ৯ নম্বর রোডে নতুন করে বাসা ভাড়া নেন সোহান। একই সময়ে শন টেইটের জন্য বরাদ্দ ইস্টার্ন মহানন্দার ৩০১ নম্বর ফ্ল্যাটের চুক্তিও বাড়িয়ে নিয়েছেন তিনি।
সোহান অবশ্য অস্বীকার করলেন এই অভিযোগ,‘‘এসব বাজে কথা। আমি ফাঁকা ফ্ল্যাটে হোটেল বাণিজ্য করছি না। আপনি প্রমাণ পেলে লিখতে পারেন, আমার কোনো সমস্যা নেই।’’
সোনারগাঁও থেকে মিরপুরের বাস ভাড়া ৬০ হাজার টাকা
বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম অবশ্য সোহান নিয়ে তদন্তের আগে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে তিনি দিলেন বিসিবির অপব্যয়ের আরেক ফিরিস্তি,‘‘ফ্ল্যাটকে হোটেল বানানোর যে অভিযোগটা করলেন, আমরা এটার তদন্ত করব। তবে বিসিবিতে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে সেটা অস্বীকারের উপায় নেই। একটা বিল দেখলাম, সোনারগাঁও হোটেল থেকে মিরপুরের বাস ভাড়ার। ৭ কিলোমিটার দূরত্বের এক ট্রিপে বাস ভাড়া এসেছে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা করে। অথচ যাদের মাধ্যম বাস ভাড়া করা হয়েছে তাদের বাসই নেই! তারা এজেন্ট হয়ে দেশ ট্রাভেলসের কাছ থেকে বাস ভাড়া করেছে। পরে আমি বিল আটকে দেই।’’
একটা বিশ্বকাপ না খেললে কি হয়-এমন কথা বলে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন এম নাজমুল ইসলাম। ভারতে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ খেলতেও যায়নি বাংলাদেশ। তবে ভিসা করতে প্রতিজনের জন্য বিল চাওয়া হয়েছিল ৭ হাজার টাকা করে। এ নিয়ে নাজমুল ইসলাম জানালেন,‘‘ভারতের ভিসা ফি ১ হাজার টাকার মতো। অথচ প্রতিজনের জন্য বিল চাওয়া হয়েছিল ৭ হাজার টাকা করে। আমরা ৫০ জনের ভিসা করানোর কাজ করছিলাম। এত বেশি বিল দেখে সেটা কেটে দিয়েছিলাম।’’
৪ লাখ থেকে ১ লাখ লিটার পানি
চট্টগ্রামের সাগরিকা স্টেডিয়ামের আউট ফিল্ডের উন্নয়নে প্রায় ৩ কেটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পাস করিয়েছিল বিসিবির ফ্যাসিলিটজ বিভাগ। চাহিদাপত্র ছিল প্রতিদিন ৪ লাখ লিটার পানির। এটাই খতিয়ে দেখতে বিসিবির টার্ফ ম্যানেজমেন্ট উইংয়ের প্রধান টমি হেমিংকে নিয়ে চট্টগ্রামে যান এম নাজমুল ইসলাম।
সব দেখে টমি হেমিং জানান প্রতিদিন ৮০ হাজার লিটার পানি হলেই এই স্টেডিয়ামের আউট ফিল্ড ভালো থাকবে। এম নাজমুল ইসলাম সেটা আরও একটু বাড়িয়ে ছাড়পত্র দেন ১ লাখ লিটার পানির।
এ নিয়ে সকাল সন্ধ্যাকে এম নাজমুল ইসলাম জানালেন,‘কারও খারাপ উদ্দেশ্য ছিল কিনা জানি না। তবে ১ লাখ লিটার পানিতে প্রয়োজন মিটলে সেখানে আমি ৪ লাখ লিটার খরচ করব কেন? ৩ লাখ লিটার কমানোয় বিসিবির খরচ বেঁচেছে প্রায় ১ কেটি ২৫ লাখ টাকা।’
বীমাতেও অনৈতিক সুবিধা
বিসিবির স্টাফদের বীমা সুবিধা আছে স্বাভাবিকভাবে। গ্রিন ডেল্টার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বিসিবির প্রায় হাজারখানেক ক্রিকেটার ও স্টাফ। সেখানেও অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন কয়েকজন। এম নাজমুল ইসলাম জানালেন,‘‘বছরের পর বছর অনেক অনিয়মই হয়েছে বিসিবিতে। আমার চোখে পড়ল বিসিবির কর্তা আব্দুল মান্নান পরিবারসহ সুবিধা নিচ্ছেন ক্রিকেটার কোটায়। এটা কীভাবে সম্ভব? আমি তাঁর নাম ক্রিকেটার কোটা থেকে বাদ দিতে বলেছি। তারপরও তিনি ক্রিকেটার কোটাতেই আছেন, অদ্ভুত।’’
অপব্যয় হাজার কোটি টাকা
ডাবের বিল, নাস্তার বিল কিংবা ভিসা ফি’র মতো ছোটখাট ব্যাপার নিয়েই কি শুধু মাথা ঘামিয়েছেন আপনি? এই প্রশ্ন করলে এম নাজমুল ইসলাম জানালেন বিসিবির গত তিন মেয়াদে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা অপব্যয়ের কথা।
তিনি বললেন,‘‘সব দিকেই নজর দিচ্ছি আমি। গত তিন নির্বাচনি মেয়াদে ২৭৭০ কোটি টাকা খরচ করেছে বিসিবি। তাতে অন্তত ১০০০ কোটি টাকা জলে গেছে। এগুলো হয় কারও পকেটে গেছে বা অপব্যয় হয়েছে। দুদক ২৬টা শিরোনামে দেখিয়ে দিয়েছে দুর্নীতির প্রমাণগুলো। এসব নিয়েও কাজ করছি আমি। আসলে একের পর এক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বিসিবিতে, এটা হতাশার।’’
একটা উদাহরণ দিয়ে তিনি জানালেন,‘মুজিব শতবর্ষ অনুষ্ঠানে বিসিবির বাজেট ছিল ১৫ কোটি টাকা। অথচ খরচ করা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। দুদক তদন্তে এসে খরচের বিল দেখতে চান। বিসিবি জমা দিতে পেরেছে ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার বিলেল কাগজ।’
বিসিবির বর্তমান কমিটি কি পারবে এই সিন্ডিকেট ভাঙতে?