যুদ্ধের ধাক্কায় প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে নামবে : বিশ্ব ব্যাংক
বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ২২:৪৯:০০
চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও কমিয়েছে বৈশ্বিক আর্থিক খাতের মোড়ল সংস্থা বিশ্ব ব্যাংক।
সংস্থাটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের ধাক্কায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি (অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি) ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
এর মানে হলো—চলতি অর্থবছরে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়বে।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনের এপ্রিল সংস্করণে এই পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বুধবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশ্ব ব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা।
এ নিয়ে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দুই বার কমালো বিশ্ব ব্যাংক। গত বছরের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের অক্টোবর সংস্করণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের ৪ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল সংস্থাটি।
পরে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেই পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এখন ইরান যুদ্ধের কারণে সেই পূর্বাভাস আরও কমানো হলো।
বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের কত মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠতে পারবেন না, এর একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন) ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ওই অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছিল ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনে অন্তর্বর্তী সরকার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তিন প্রান্তিক (নয় মাস, জুলাই-সেপ্টেম্বর, অক্টোবর-ডিসেম্বর ও জানুয়ারি-মার্চ) শেষ হয়েছে। গত সোমবার (৬ এপ্রিল) দ্বিতীয় প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) সাময়িক হিসাব ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সংশোধিত জিডিপির তথ্য প্রকাশ করেছে পরিসংখ্যান ব্যুরো।
সাময়িক হিসাবে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেশ খানিকটা কমেছে; নেমে এসেছে ৩ দশমিক শূন্য তিন শতাংশে।
সাময়িক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তথ্য দিয়েছিল বিবিএস। সংশোধিত (রিভাইজড) হিসাবে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস।
কৃষি, শিল্প ও সেবা—এই তিন খাতের উপাত্ত নিয়ে জিডিপির তথ্য প্রকাশ করা হয়। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়লেও শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকার অবশ্য এখনও জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেনি।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ৪ দশমিক ২২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়।
বুধবার প্রকাশিত প্রকিববেদনে বলা হয়, আগের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চারটি চ্যালেঞ্জ আছে। এগুলো হলো—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন রাজস্ব আয়, আর্থিক খাতের ঝুঁকি ও বহিঃখাতের চাপ। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এসব চ্যালেঞ্জ আরও পাকাপোক্ত হয়েছে।
“বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। জরুরি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ কম। কারণ, দুর্বল রাজস্ব খাতে আদায় বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা আছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিতে সীমিত সুযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকিং খাত এবং অপর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত।”
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অর্জনের খাত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বরাবরই দেখিয়ে এসেছে।
২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা সর্বপ্রথম ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়; পরে সংশোধিত হিসাবে তা অবশ্য ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশে নেমে আসে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ওটাই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।
তার পরের বছর কোভিড মহামারির ধাক্কায় তা ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশে উঠেছিল। পরের বছর ৭ শতাংশ ছাড়ালেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবার ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমে আসে।
মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে
বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি খরচ বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এখনো এ দেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের মতো, যা সীমিত আয়ের মানুষকে ভোগাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক মনে করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি কঠোর এবং ব্যাংক খাত ভঙ্গুর থাকায় দীর্ঘস্থায়ী ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের কম। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।
২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং কাঠামোগত সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি হলে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি। সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জরুরি সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে
বিশ্ব ব্যাংক সংস্কারে মনোযোগ দিতে বলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে স্বল্পমেয়াদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে। কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করতে হবে। নতুন শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে, তা হলো সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো শক্তিশালী করা। যখন আমদানি খরচ বেড়ে যায়, তখন ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে চাহিদার বিষয়টি নজরে রাখতে হবে। আবার পর্যাপ্ত সরবরাহ, দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে সরবরাহের দিকটি ঠিক রাখতে হবে। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তৈরি পোশাকসহ কিছু বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা উচ্চ ব্যয়, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতায় ভুগছেন। বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল, প্রতিযোগিতা নীতি জোরদার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সমতা নিশ্চিত, বাণিজ্যনীতি সহজ করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ৬ খাতে
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অন্তত ছয়টি খাতে পড়তে পারে।
>> চলতি হিসাবের ভারসাম্যের স্থিতিশীলতা নস্ট হতে পারে। কারণ, আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয়, টাকার অবমূল্যায়নে প্রভাব পড়তে পারে।
>> ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে টান পড়তে পারে।
>> জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
>> ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যেতে পারেন।
>> আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। যেমন—সার ও জ্বালানিতে ভর্তুকি খরচ বৃদ্ধি।
এবং
>> বৈষম্য বাড়তে পারে। ২০২৬ সালে গিনি সূচক দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
দ্রুত স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে দারিদ্র্য কমার গতি কমেছে।
শোভন কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
জ্যঁ পেম বলেন, “বিগত দিনে প্রয়োজনীয় যেসব সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এই সংস্কার যেন অব্যাহত থাকে। যদিও সংস্কার খুব কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে দ্রুত স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।”
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মনীতির অনিশ্চয়তা কমানো, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।