Beta
Logo

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বিতর্ক চাই না, কারও ওপর রাগ নেই

বিতর্ক চাই না, কারও ওপর রাগ নেই
রাহেনুর ইসলাম
রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ২০:৪৫:০০

বাংলাদেশের নারী ফুটবলে সাবিনা খাতুন মানেই যেন ‘প্রথম’–এর গল্প। ২০১০ এসএ গেমসে নেপালের বিপক্ষে খেলা বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে ছিলেন তিনি। তাঁর অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ প্রথম সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ২০২২ সালে। ২০২৪ সালে সাবিনার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ধরে রাখে সাফের শিরোপা। প্রথমবার আয়োজিত সাফ নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপেও আজ (২৫ জানুয়ারি) সাবিনার অধিনায়কত্বে শিরোপা জিতল জাতীয় দল। অভিষেক আসরে সবচেয়ে বেশি ১৪ গোল করেছেন সাবিনা। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চ্যাম্পিয়ন  ট্রফি নিয়ে উৎসব শেষের ৩ মিনিট পরই মুঠোফোনে সকাল সন্ধ্যার রাহেনুর ইসলামকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাফল্যের গল্প, ফুটসাল নিয়ে স্বপ্নের পাশাপাশি জানালেন বিতর্ক ভুলে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও।

 

প্রশ্ন : আরেকটি ইতিহাস রচিত হলো আপনার হাত ধরে, অভিনন্দন।

সাবিনা খাতুন : আপনার মাধ্যমে দেশবাসীকেও অভিনন্দন জানাচ্ছি। এই শিরোপা জয়টা বিশেষ কিছু। ফুটসালের সাদামাটা দল হয়েই খেলতে গিয়েছিলাম ব্যাংককে। শিরোপা জয়টা তাই গর্ব করার মতো।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ নারী দল প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটসাল খেলেছিল ২০১৮ সালের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে। সেই দলে ছিলেন আপনিও। এরপর ৭ বছর জাতীয় দল ফুটসাল খেলেনি। এমন অনভিজ্ঞতার পরও বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হলো কীভাবে?

সাবিনা খাতুন : শুধু আমরা কেন, সাফের অন্য দলগুলোও ফুটসালে খুব বেশি অভিজ্ঞ নয়। টুর্নামেন্টটা সাফের হলেও এজন্য আয়োজন করতে হয়েছে সাফের বাইরে বা থাইল্যান্ডের ব্যাংককে। কারণ সেখানে ফুটসালের অবকাঠামো অনেক উন্নত। ওরা র‌্যাঙ্কিংয়ে ছিল ৪ নম্বর। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই র‌্যাঙ্কিংয়ে সবার ওপরে- ৪৪ নম্বরে। অথচ আমরাই এই খেলাটা জাতীয় দলের হয়ে খেলিনি টানা ৭ বছর। ব্যাংককে টুর্নামেন্টটা হওয়ার আরেকটা কারণ ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। তাই মোটামুটি অবকাঠামো থাকলেও এটা ভারতে হয়নি। মালদ্বীপের মেয়েরা সব সময় ফুটসাল খেলে। তাদের অভিজ্ঞতা অনেক, তবে সেখানে সাফের মত টুর্নামেন্ট আয়োজনের অবকাঠামো নেই। বাকি দেশগুলো প্রায় সমান সমান। শেষ পর্যন্ত আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছি নিজেদের সেরাটা খেলতে পারায়।

প্রশ্ন : ভারত-পাকিস্তানের মতো না হলেও বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কও বেশ জটিল এখন। সাফের প্রথম ম্যাচটা আপনারা খেলেছেন ভারতের সঙ্গেই। তখন ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ভারতে খেলতে না যাওয়া নিয়ে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। সেই ম্যাচে এটা কোনো প্রভাব ফেলেছিল?

সাবিনা খাতুন : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিন্তু ভারতের ফুটবল, কাবাডি, আর্চারি দল খেলে গেছে বাংলাদেশে। সমস্যা শুধু ক্রিকেটে, ওরা এই খেলায় দাদাগিরি করতে চায়। অনেকে আইসিসিকে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট বোর্ডও বলেন এজন্য। তবে ফুটসালে কোনো সমস্যা নেই। আমরা দুই দল স্বাভাবিক ম্যাচই খেলেছি। ৩-১ গোলে জিতে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিলাম, দুই গোল করেছিলাম আমি। ভারত শেষ পর্যন্ত রানার্সআপ হয়েছে। ওদের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে সাফ শুরু করতে পেরে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল সবার।

 

 

 

প্রশ্ন : অথচ থাইল্যান্ড যাওয়ার আগে আপনাদের কোচ সাঈদ খোদারাহমি খুব বেশি আশাবাদী ছিলেন না। তিনি শুধু ভালো খেলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন।

সাবিনা খাতুন : ইরান ফুটসালের বড় শক্তি। সেই দেশের কোচকে জাতীয় দলের জন্য নিয়োগ দেওয়ায় ফেডারেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সাঈদ খোদারাহমি দায়িত্ব নিয়ে বুঝতে পারেন আমাদের অনভিজ্ঞতাটা। রীতিমতো হাতেকলমে শিখিয়েছেন তিনি। এরপর ইরান থেকে যোগ দিয়েছেন আরও দুজন ইরানি কোচ মিত্রা চিনসারি ও মাহানাজ আশতে। এই সাফল্যে কোচদের অবদান ভুললে চলবে না। কোচ সাঈদ খোদারাহমির চাওয়া আর ফুটসাল কমিটির চেয়ারম্যান ইমরানুর রহমানের উদ্যোগে আমরা টুর্নামেন্ট শুরুর ১০ দিন আগে থাইল্যান্ডে এসেছিলাম। এই ১০ দিনে আমরা তিনটা প্রীতি ম্যাচ খেলছি। সেই অভিজ্ঞতা অনেক কাজে দিয়েছে।

প্রশ্ন : ২০২২ সালে আপনার অধিনায়কত্বে প্রথমবার সাফ জিতেছিল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। এবার ফুটসালে আপনার নেতৃত্বেই এসেছে প্রথম শিরোপা। এছাড়া ২০২২ সাফ ফুটবলের মতো এবারের সাফ ফুটসালেও সবচেয়ে বেশি গোল আপনার। এগিয়ে রাখবেন কোনটাকে?

সাবিনা খাতুন : কোনো অর্জনকেই আলাদা করে দেখতে চাই না। দুটির গুরুত্ব দুই রকম। ২০২২ সালে সাফ ফুটবলে ট্রফি জেতার পর যে ভালো লাগা কাজ করেছিল, ফুটসালেও তেমনই। কোনোটাকে আলাদা করছি না। তবে ২০২৪ সাফের সময়টা কঠিন ছিল, অনেক কিছুর সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। কাউকে দোষ দিতে চাই না, অধ্যায়টা ভুলে যেতে চাই। ২০২২ সালের সাফের মত এবার ফুটসালেও সবচেয়ে বেশি গোল করেছি। এই দুটি অর্জনকেও আলাদা করছি না। কারণ, ফুটবল হোক বা ফুটসাল- গোল করাই আমার কাজ। তবে ফুটসাল ছোট মাঠের খেলা আর ভীষণ দ্রুতগতির। এক মুহূর্তও মনোযোগ হারালে চলবে না। তাই চ্যালেঞ্জটা একটু বেশি।

প্রশ্ন : স্ট্রাইকারের বদলে প্লে-মেকিং পজিশনে এবারের টুর্নামেন্টে খেলেছেন আপনি। দলের পরিকল্পনাই ছিল আপনাকে ঘিরে, সিদ্ধান্তটা আপনার ছিল নাকি কোচের?

সাবিনা খাতুন : জাতীয় দল দীর্ঘদিন না খেললেও বিদেশে অন্য ক্লাবের হয়ে ফুটসাল খেলার অভিজ্ঞতা আছে আমার। মালদ্বীপের ক্লাব টুর্নামেন্টে খেলেছি। সুমাইয়াও খেলেছে। কোচ সেটা জানতেন। আর ফুটসাল যেমন গতির খেলা তেমনি মানসিকভাবে দৃঢ় থাকারও। সেই জায়গা থেকে আমার ও কোচদের মনে হয়েছে প্লে-মেকিং পজিশনে থাকলে দলের ভালো হবে। পাশাপাশি দলের সবাইকে গাইডও করা যাবে। ক্যারিয়ার জুড়েই তো সতীর্থদের আগলে এসেছি। আমরা সবাই একটা পরিবার। ওদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক দিনের। ওরা আমার বোনের মতো। দীর্ঘদিন পর ওদের সঙ্গে জাতীয় দলের জার্সিতে খেলে উপভোগ করেছি আমি। লাল-সবুজ কেবল একটি জার্সি নয়, এটি সম্মান, ত্যাগ আর দায়িত্বের প্রতীকও। 

প্রশ্ন : কোচ পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর থেকে জাতীয় ফুটবল দলের বাইরে আপনি। বিদ্রোহ শেষে অনেকে জাতীয় দলে ফিরেছেন। কিন্তু আপনি নাকি কোচের ফিটনেস এবং পারফরম্যান্সের মাপকাঠি ছুঁতে না পারায় এখনও ফুটবল জাতীয় দলের বাইরে।

সাবিনা খাতুন : বিতর্ক ভুলে এগিয়ে যাওয়ার সময় এখন। কোনো বিতর্ক চাই না। কারও ওপর রাগ নেই, অভিমান নেই। মার্চে এশিয়ান কাপে খেলতে যাবে মেয়েরা। যাঁরা খেলবে সবার সঙ্গে আমার দারুণ সম্পর্ক। এমন সময় কোনো বিতর্ক তৈরির মানে নেই। আমার কাজ গোল করা আর দলকে জেতানো। সেটাই করছি।

প্রশ্ন :শিয়া কাপে দল গড়তে এক সুইডিশ প্রবাসী ফুটবলারকে ট্রায়ালে আনা হচ্ছে। তাহলে আপনার কথা ভাবা হচ্ছে না কেন?

সাবিনা খাতুন : দেখুন কোচ বাটলার উনার কাজ করছেন। আমি নিজের কাজ করছি। তিনি কীভাবে দল গড়বেন সেটা তাঁর ব্যাপার। আমার কোনো আফসোস নেই। সবকিছু সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। আল্লাহ চাইলে অবশ্যই জাতীয় ফুটবল দলে ফিরব। ফুটসালে তো ফিরলাম। এটাও জাতীয় দল। এই দলে ডাকার অর্থ, আমার প্রতি বাফুফের কোনো মান-অভিমান নেই। আসলে আমরা খেলোয়াড় বলুন কিংবা ফুটবল কর্তাই বলুন-সবার চাওয়া দেশের পতাকা উঁচুতে তুলে ধরা। এখন ফুটসালে আছি মানে এই নয় যে আমি ফুটবলে নেই। ফুটবল, ফুটসাল যেখানেই আমার প্রয়োজন, আমি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করব। বিতর্ক ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে চাই।

প্রশ্ন : ফুটসালের ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা কঠিন ছিল আপনার জন্য। তখন কি মনে হয়েছিল, এটা বাংলাদেশের জার্সিতে ফেরার নতুন পথ?

সাবিনা খাতুন : ফুটসালের প্রতি আমার আলাদা একটা সফটনেস আছে। বাংলাদেশের প্রথম কোনো নারী ফুটবলার বিদেশের মাটিতে খেলেছিল, সেটা হচ্ছি আমি এবং তখন ফুটসাল খেলতেই গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল যদি সাফে দেশকে একটা ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে পারি, তাহলে নতুন প্রজন্ম যারা আসবে, তাদের জন্য একটু সহজ হবে। অভিজ্ঞ হয়েও ট্রায়ালে অংশ  নিয়েছি যেন বাছাইটা ন্যায্য হয়। কেউ এটা না ভাবেন যে পক্ষপাতের কারণে আমি দলে ঢুকেছি। তখন চাইলে লিগ খেলার সুযোগ ছিল। তাহলে হয়তো মোটা টাকাও পেতাম। কিন্তু এক্ষেত্রে দেশের সম্মানটাকে বড় করে দেখেছি। হোক না ফুটসাল, এতদিন পর জাতীয় দলের ডাক উপেক্ষা করি কীভাবে? বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সিতে খেলার জন্যই মানুষ ভালোবাসে আমাকে। যে কোনো সময়, যে কোন উপলক্ষ্যে জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ হারাতে চাই না আমি।

 

 

প্রশ্ন : বিদ্রোহের পর আপনাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। সে সময়ও চুপ ছিলেন আপনি…

সাবিনা খাতুন:  কখনও কখনও চুপ থাকাটা সবার জন্যই ভালো। বাইরের মানুষ আসল ব্যাপারগুলো ওভাবে জানে না। আমি সবাইকে গিয়ে আলাদা করে বোঝাতে পারব না। বরং সে সময় কিছু বললে এর প্রভাব পড়ত আমার পরিবারের ওপর। এটা চাইনি বলেই চুপ ছিলাম। জাতীয় দলের কোচের বিরুদ্ধে গেলে যে গালিও খেতে হবে সেটা জানা ছিল। সেই গালিটা হজম করেছি। আবার এটাও সত্য যাঁরা গালি দিয়েছেন তাঁরা সম্মানও দিয়েছেন আমাকে। এসবে এখন অভ্যস্ত আমি।

প্রশ্ন : আপনাদের ত্যাগ আর সংগ্রামে মেয়েদের ফুটবল ভালো একটা জায়গায় পৌঁছেছে। ফুটসালের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছেন?

সাবিনা খাতুন : দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে র‌্যাঙ্কিংয়ে আমরাই সবচেয়ে এগিয়ে। সাফে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর র‌্যাঙ্কিংয়ে আরও সামনে এগিয়ে যাব নিশ্চিতভাবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করলে ভালো ভবিষ্যৎ আছে ফুটসালে। দলের পরিবেশটা অসাধারণ ছিল। কোচিং স্টাফের পাশাপাশি ফুটসাল কমিটির চেয়ারম্যান ইমরানুর রহমান ভাই ছিলেন অসাধারণ। পেশাদার দলে খেলোয়াড়দের কীভাবে সম্মান দিতে হয় তিনি সেটা দেখিয়েছেন। সাফে প্রতিটা ম্যাচ জয়ের পর উইনিং বোনাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল যা দলকে উজ্জীবিত করেছে। এই পরিবেশটা ধরে রাখতে পারলে সাফের পর এশিয়ান ফুটসালে ভালো কিছু করার সম্ভাবনা আছে এই দলের।

প্রশ্ন : ফুটসাল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ফেডারেশন বা সরকারের কাছে কোনো চাওয়া আছে আপনার?

সাবিনা খাতুন:  গত সাফের চ্যাম্পিয়নের বোনাসই তো এখনো পাইনি। নতুন করে আর কী চাইব? একটা দলকে যখন কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তখন সেটা পালন করা উচিত। নাহলে হতাশ হন খেলোয়াড়রা। আশা করছি দ্রুতই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে বাফুফে। আর নতুন উদ্যমে নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য নিজেদের উজাড় করে খেলবেন সবাই।

 

 

 

 

 

 

 

 

আরও