Beta
Logo

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

৯ মাসে এডিপির ৩৬% বাস্তবায়ন, ইতিহাসের সবচেয়ে কম

৯ মাসে এডিপির ৩৬% বাস্তবায়ন, ইতিহাসের সবচেয়ে কম
আবদুর রহিম হারমাছি
রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১৯:২৫:০০

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের উন্নয়ন কাজে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা এখনও অব্যাহত আছে। আগামী ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।

 

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরু থেকে আন্দোলন ও পরে অগাস্টে ক্ষমতার পালাবদলে সৃষ্টি হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি প্রশাসনে রদবদলের ধাক্কায় সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল, তা এখনও চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে ভোটের আগে দেশে উন্নয়ন কাজের ধুম পড়ে যায়। ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ক্ষমতাশীল সরকার সারা দেশে তড়িঘড়ি করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।

 

সবশেষ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তেমনটি দেখা গেছে; একটার পর একটা উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু অন্তবর্তী সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তেমনটি দেখা যায়নি। সে কারণেই সরকারের উন্নয়ন কাজে বেশ মন্থরগতি দেখা যাচ্ছে।

 

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে; আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি হবে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট।

 

তার আগে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাকি তিন মাসেও (এপ্রিল-জুন) এডিপি বাস্তবায়নে বেহাল দশাই থাকবে বলে মনে করছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) রবিবার এডিপি বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা অর্থ ব্যয় হয়েছে; যা গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮২ হাজার ৮৯৪ কোটি ৮ লাখ টাকা।

 

এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ের চেয়ে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ৭ হাজার ২৪৮ কোটি ৮৪ টাকা টাকা কম ব্যয় হয়েছে।

 

অর্থবছরের মোট বরাদ্দের হিসেবে এই নয় মাসে বাস্তবায়নের হার ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৩৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

 

২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ১ লাখ ৭ হাজার হাজার ৬১২ কোটি ৪২ লাখ টাকা খরচ করেছিল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।

 

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য এডিপির মাধ্যমে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক হওয়ায় গত ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্পসহ এডিপির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা করা হয়।

 

আইএমইডির তথ্যে দেখা যায়, সবশেষ মার্চ মাসে ১২ হাজার ২৭৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা খরচ করেছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। গত অর্থবছরের মার্চ মাসে খরচের অঙ্ক ছিল ১৫ হাজার ৩৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

 

এডিপি বাস্তবায়নে এমন বেহাল দশা আগে কখনও দেখা যায়নি। ৯ মাসের (জুলাই-মার্চ) বাস্তবায়ন বাংলাদেশে ইতিহাসে সবচেয়ে কম। এমনকি কোভিড মহামারির সময় যখন সব কিছু স্থবির ছিল, তখনও এডিপি বাস্তবায়ন এবারের চেয়ে বেশি ছিল। মহামারির সময় ২০২০-২১ অর্থবছরের ৯ মাসে বাস্তবায়নের হার ছিল ৪৬ শতাংশের বেশি।

 

চলতি অর্থবছরের বাকি তিন মাসে অর্থাৎ এপ্রিল-জুন সময়ে সংশোধিত এডিপির পুরোটা খরচ করতে হলে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩২৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা খরচ করতে হবে। যা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

 

এই বিষয়ে জানতে চাইলে আইএমইডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “গত অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরের শুরুতেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইন শৃঙ্খলার অবনতিকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

 

“অর্থবছরের শুরুতে প্রতি বছরেই বাস্তবায়ন একটু কম থাকে, তা পরের মাসগুলোতে পুষিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু চলতি অর্থবছরে মুলত চলমান প্রকল্পগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী অর্থের জোগান দিতে না পারায় উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হয়।”

 

আইএমইডির ওই কর্মকর্তা বলেন, এডিপি বাস্তবায়নের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ৯ মাসে এত কম এডিপি বাস্তবায়ন এর আগে কখনই দেখা যায়নি।

 

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপিতে ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস করেছিল।

 

অন্তর্বর্তী সরকার সেই এডিপি কমিয়ে ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৪ কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছিল। যার মধ্যে খরচ করা হয় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। যা ছিল ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

 

তার আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) এই হার ছিল ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

 

মাঠ পর্যায়ের কাজে ঢিমেতালের পাশাপাশি ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্বে আসা অন্তর্বর্তী সরকার অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেয়।

 

এতে করে আগের সরকারের নেওয়া অনেক প্রকল্পে অর্থছাড় কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে চলমান অনেক প্রকল্পের কাজও স্থগিত হয়ে যায়। সব মিলিয়ে এডিপির বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় কমে যায়।

 

সাধারণত অর্থবছরের প্রথমদিকে এডিপির ব্যয়ের পরিমাণ কম থাকে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর গত অর্থবছরে তা আরও কম বাস্তবায়ন হয়।

 

এর আগের ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল যথাক্রমে ৪৫ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ, ৪১ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ।

 

১৫ মন্ত্রণালয়ের গড় বাস্তবায়নের হার ৪৪.২২%

 

আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রাপ্ত ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়নের হার ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশ।

 

এই অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকার যে সংশোধিত এডিপির (আরএডিপি) ৭০ দশমিক ৯৭ শতাংশই বরাদ্দ আছে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের।

 

এর মধ্যে শতাংশ হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৭৪ দশমিক ১৬ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৫ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ ব্যয় করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৫৩ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ ব্যয় করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

 

এছাড়া ৫১ দশমিক ৫২ শতাংশ অর্থ খরচ করেছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। ৪৫ দশমিক ২৭ শতাংশ খরচ করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। ৪৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ অর্থ খরচ স্থানীয় সরকার সম্পদ বিভাগ।

 

সেতু বিভাগ খরচ করেছে ৪৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ; বিদ্যুৎ বিভাগ বাস্তবায়ন করেছে ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ৩৫ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ।

 

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ৩১ দশমিক ৩৯ শতাংশ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ৪২ দশমিক ২৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ খরচ করেছে মোট বরাদ্দের ৩৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

আরও