আরও ডলার কিনল কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রিজার্ভও বাড়ল
সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬ ২১:০৪:০০
ডলার কেনা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবারও (২০ এপ্রিল) নিলামের মাধ্যমে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে তিন ব্যাংকের কাছ থেকে ৬ কোটি ডলার কেনা হয়েছে।
গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) একই দরে চার ব্যাংকের কাছ থেকে ৫ কোটি ডলার কেনা হয়। আগের দিন বুধবার (১৫ এপ্রিল) একই দরে একটি ব্যাংক থেকে ৭ কোটি ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সোমবার সন্ধ্যায় এ তথ্য জানিয়েছেন।
এ নিয়ে চলতি এপ্রিল মাসে তিন দফায় মোট ১৮ কোটি ডলার কিনল বাংলাদেশ ব্যাংক।
আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৫৬৫ কোটি ৩৫ লাখ (৫.৬৫ বিলিয়ন) ডলার কেনা হলো। আর এই ডলার কেনার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার গড়ে ১২২ টাকা ৫০ পয়সা) দিয়েছে। এতে ডলারের দর স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়েছে।
মুদ্রাবাজারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার পর ডলারের দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে বাণিজ্যক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পর থেকে ডলার কিনেই চলেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মাঝে দেড় মাস অবশ্য কোনো ডলার কেনেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। ২ মার্চ ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে দুটি ব্যাংক ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার কিনেছিল। সে সময় পর্যন্ত মোট ৫৪৯ কোটি ৩৫ লাখ (৫.৪৯ বিলিয়ন) ডলার কেনা হয়েছিল।
এর পর ১৫ এপ্রিল ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে ১৯ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার, ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯ ব্যাংক থেকে ২০ কোটি ৯০ লাখ ডলার, ৫ ফেব্রুয়ারি ১৬ ব্যাংক থেকে ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ডলার, ৪ ফেব্রুয়ারি ১৬ ব্যাংক থেকে ১৭ কোটি ১০ লাখ এবং ২ ফেব্রুয়ারি ১৬ ব্যাংকের কাছ থেকে ২১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার কিনেছিল কিনেছিল ব্যাংক।
সব মিলিয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ডলার কেনার পরিমাণ ছিল ১৫৩ কোটি ৫০ লাখ (১.৩৫ বিলিয়ন) ডলার। তার আগের মাস জানুয়ারিতে ৭৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার কেনা হয়েছিল। আর গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে কেনা হয়েছিল ১ দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলার।
আর এই ডলার কেনা এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উপর ভর করে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় অবস্থান করছে। এই সূচক নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই।
আরিফ খান জানান, সোমবার দিন শেষে বিপিএম-৬ হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ৩০ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। আর গ্রস বা মোট হিসাবে ৩৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফনে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে অর্থাৎ ডলারের দর যাতে কমে না যায় সেজন্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা হচ্ছে বলে জানান আরিফ খান।
তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বাজার স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনছে। ডলারের দর বেড়ে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য ভালো নয়, আবার কমে যাওয়াও ভালো নয়। তাই এ বাজারকে ‘সুস্থির’ রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। তাতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য প্রবাহ বাড়ছে।
বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দিকে হঠাৎ করেই ডলারের দর কমতে শুরু করে; এক পর্যায়ে ১২১ টাকায় নেমে আসে।
ডলারের দাম কমে গেলে রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সে কারণেই দাম ধরে রাখতে নিলামে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
১৩ জুলাই প্রথম ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যংক। ওইদিন ১৮টি ব্যাংক থেকে ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার কেনা হয়। ১৫ জুলাই একই দরে ৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২৩ জুলাই ১২১ টাকা ৯৫ পয়সা দরে ১ কোটি ডলার কেনা হয়।
এর পর ৭ আগস্ট ১২১ টাকা ৪৭ পয়সা থেকে ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার, ১০ আগস্ট ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ১৪ আগস্ট ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ১৭ কোটি ৬৫ লাখ ডলার, ২৮ আগস্ট ১২১ টাকা ৬৬ পয়সা থেকে ১২১ টাকা ৭০ পয়সা দরে ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এভাবেই ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা অতিরিক্ত ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব মিলিয়ে মোট অঙ্ক ৫ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
আর এই ডলার কেনার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত নয় মাসে ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। এতে ডলারের দর স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়েছে।
তবে ডলার কিনে বাজারে টাকা সরবরাহ করায় মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা প্রভাব পড়ছে বলে অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ডলারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়; ৮৫ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে ১২৫ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
ডলারের বাজারের অস্থিরতায় দেশে মুল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক সে সময় রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করে দিয়েছিল।
টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে আমদানি বিল পরিশোধে সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে ডলার বিক্রি করেছিল, সেখানে এখন চলছে উল্টো প্রবাহ।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত তিন বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ২৫ বিলিয়নের বেশি ডলার বিক্রি করে, যা মূলত জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানি বিল মেটাতে ব্যবহার হয়েছে।
রেমিটেন্সে উল্লম্ফন অব্যাহত
এদিকে যুদ্ধের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে; চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দশম মাস এপ্রিলের ১৯ দিনে ২১২ কোটি ৭০ লাখ (২.১২ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা।
এর মধ্যে চলতি সপ্তাহের প্রথম দিন রবিবার (১৯ এপ্রিল) একদিনেই পাঠিয়েছেন ১৬ কোটি ডলার; টাকার অঙ্কে যা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে এই আর্থিক বছরের ৯ মাস ১৯ দিনে (গত বছরের ১ জুলাই থেকে এই বছরের ১৯ এপ্রিল) ২৮ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন (২ হাজার ৮৩৪ কোটি) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অর্থবছরের বাকি সময়ে (২ মাস ১১ দিন, ১৯ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন) এই হারে এলে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এবার ৩৫ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স দেশে আসবে বলে হিসাব বলছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১৮ দিনে (১ থেকে ১৮ এপ্রিল) প্রবাসীরা ১৯৬ কোটি ৮০ লাখ (১.৮০ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন। ১৯ এপ্রিল রবিবার পাঠিয়েছেন ১৬ কোটি ডলার।
সব মিলিয়ে ১৯ দিনে (১ থেকে ১৯ এপ্রিল) এসেছে ২১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। যা গত বছরের এপ্রিলের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি।
২০২৫ সালের এপ্রিলের প্রথম ১৯ দিনে ১৭১ কোটি ৯০ লাখ (১.৭২ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা; পুরো মাসে এসেছিল ২৭৫ কোটি ২৩ লাখ (২.৭৫ বিলিয়ন) ডলার।
রেমিটেন্সে প্রতি ডলারে এখন ১২৩ টাকার মতো দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। সে হিসাবে এপ্রিলের ১৯ দিনে ২৬ হাজার ১৬২ কোটি টাকা দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। প্রতিদিনে গড়ে এসেছে ১১ কোটি ১৯ লাখ ডলার; টাকায় ১ হজার ৩৭৭ কোটি টাকা।
মাসের বাকি ১১ দিনে (২০ থেকে ৩০ এপ্রিল) এই হারে এলে মাস শেষে রেমিটেন্সের অঙ্ক ৩৩৬ কোটি (৩.৩৬ বিলিয়ন) ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। আর সেটা যদি হয়, তাহলে একক মাসের হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আসবে এপ্রিলে।
ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি—টানা তিন মাস ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসে দেশে। মার্চ মাসে আসে আরও বেশি পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার। এপ্রিলেও ৩ বিলিয়নের বেশি আসবে নিশ্চিত করে বলা যায়।
তাহলে টানা পাঁচ মাস ৩ বিলিয়নের বেশি রেমিটেন্স আসবে দেশে। বাংলাদেশের ইতিহসাসে এর আগে কখনও এমনটি দেখা যায়নি।
এই রেমিটেন্সের উপর ভর করেই যুদ্ধের ধাক্কায় ওলোটপালট হয়ে যাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যেও রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় অবস্থান করছে। এই সূচক নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই।
সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত (৯ মাস ১৮ দিন, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল) মোট ২ হাজার ৮৩৩ কোটি ৬০ লাখ (২৮.৩৪ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি।
গত মার্চ মাসে পৌনে ৪ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। একক মাসের হিসাবে যা সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক মাসে এত রেমিটেন্স দেশে আসেনি।
রোজা ও ঈদ সামনে রেখে ওই রেমিটেন্স দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। এর আগে এক মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছিল গত বছরের মার্চে, ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ (৩.২৯ বিলিয়ন) ডলার। ওই মাসেও রোজা ও ঈদ সামনে রেখে রেকর্ড হয়েছিল প্রবাসী আয়ে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা চালায়। পাল্টা হামলা চালায় ইরান; শুরু হয় যুদ্ধ। দেড় মাস পার হয়েছে; যুদ্ধ চলছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য এখন যুদ্ধের কবলে। তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। এখন পর্যন্ত কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মীর প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, আহত হয়েছেন অনেকে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল কেন্দ্র উপসাগরীয় ছয়টি দেশে নতুন কর্মী পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয়ে (রেমিটেন্স) বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করছেন সবাই। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব পড়েনি।
প্রতিবছরই দুই ঈদকে সামনে রেখে পরিবার-পরিজনের বাড়তি খরচ মেটাতে বেশি বেশি রেমিটেন্স দেশে পাঠান প্রবাসীরা। সবাই আশঙ্কা করছিলেন, যুদ্ধের কারণে এবার সেই প্রবাহ কমে যাবে। কিন্তু তেমনটি এখনও দেখা যাচ্ছে না।
গত ২১ মার্চ দেশে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। এর পরও রেমিটেন্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
মে মাসের শেষের দিকে দেশে ঈদুল আজহা (কোরবানি ঈদ) উদযাপিত হবে। ওই ঈদকে সামনে রেখেও রেমিটেন্স বাড়বে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এখন রেমিটেন্সই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, যা সঙ্কটে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩২ কোটি ৭৫ লাখ (৩০.৩৩ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা, যা ছিল আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) চেয়ে ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি।
গত অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে রেমিটেন্স এসেছিল ২৫২ কোটি ৭৪ লাখ (২.৫৩ বিলিয়ন) ডলার। আর চলতি অর্থবছরের নয় মাসের (জুলাই-মার্চ) হিসাবে গড়ে এসেছে ২৯১ কোটি ১৯ লাখ (২.৯১ বিলিয়ন) ডলার।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিটেন্স এসেছিল ২ হাজার ৩৯১ কোটি ২২ লাখ (২৩.৯১ বিলিয়ন) ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আসে ২ হাজার ২৬১ কোটি (২২.৬১ বিলিয়ন) ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে এসেছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি (২১.০৩ বিলিয়ন) ডলার।
২০২০-২১ অর্থবছরে আসে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি (২৪.৭৮ বিলিয়ন) ডলার। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এসেছিল ১ হাজার ৮২০ কোটি (১৮.২০ বিলিয়ন) ডলার।
সংকটেও রিজার্ভ বাড়ছে
এদিকে সংকটের মধ্যেও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ বেড়ে চলেছে; বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আর গ্রস বা মোট হিসাবে ছাড়িয়েছে ৩৫ বিলিয়ন।
গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ৩০ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। আর গ্রস বা মোট হিসাবে ছিল ৩৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে উল্লম্ফন এবং ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনার কারণে রিজার্ভ এই সন্তোষজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। বর্তমানের এই রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে চার মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে।
অর্থনীতির সামর্থ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক রিজার্ভ। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে রিজার্ভ কমতে কমতে ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছিল। আর সেটা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল।
রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স। গত আট মাস ধরে রপ্তানি আয় টানা কমলেও রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে।
গত ৮ মার্চ রিজার্ভ থেকে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মেয়াদের ১৩৫ কোটি ৮৭ (১.৩৬ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধ করার পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ কমে ২৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। আর গ্রস বা মোট নেমেছিল ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে।
এর পর রেমিটেন্সে ভর করে প্রতিদিনই রিজার্ভ বেড়েছে। ৯ এপ্রিল বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার।
মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আকুর মার্চ-এপ্রিল মেয়াদের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হবে। তার আগ পর্যন্ত রিজার্ভ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
সাড়ে ৪ মাসের আমদানি ব্যয় মিটবে
বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দাবি করে।
সবশেষ গত ফেব্রুয়ারি মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৬ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
সে হিসাবে বর্তমানের ৩০ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়।
আকু হলো এশিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যকার একটি আন্তঃআঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে এশিয়ার নয়টি দেশের মধ্যে যেসব আমদানি-রপ্তানি হয়, তার মূল্য প্রতি দুই মাস পরপর নিষ্পত্তি করা হয়।
আকুর সদস্য দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপ। এর মধ্যে ভারত পরিশোধ করা অর্থের তুলনায় অন্য দেশগুলো থেকে বেশি পরিমাণে ডলার আয় করে। অন্যদিকে বেশিরভাগ দেশকেই আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় হিসাবে অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে হয়।
ব্যাংকগুলো আমদানির খরচ নিয়মিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়, যা রিজার্ভে যোগ হয়। ওই দায় দুই মাস পরপর রিজার্ভ থেকে পরিশোধ করে দেওয়া হয়।
এক দশক আগে রিজার্ভের বাড়-বাড়ন্ত নিয়ে মধুর সমস্যায় ছিল বাংলাদেশ। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এই অর্থ অলস বসিয়ে না রেখে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ছিল চিন্তার বিষয়।
কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যায়। তাতে রিজার্ভ কমতে থাকায় দেখা দেয় উদ্বেগ।
রিজার্ভের পতন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ সরকার শেষের দিকে আইএমএফ থেকে ঋণ নেয়। তাদের শর্ত মেনে ২০২৩ সাল থেকে রিজার্ভের তথ্য গ্রস হিসাবের পাশাপাশি আইএমএফ অনৃসৃত বিপিএম-৬ পদ্ধতিও প্রকাশ শুরু করে।
এখন বিপিএম-৬ ও গ্রস হিসাবের পাশাপাশি রিজার্ভের নিট বা প্রকৃত হিসাবও করে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সেটি নিয়মিত প্রকাশ করা হয় না। মাঝে-মধ্যে প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২১ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ (তখন বিপিএম-৬ ও নিট হিসাবে প্রকাশ করা হতো না) ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ২০২৪ সালের জুলাই শেষে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল।