Beta
Logo

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

সংকটের মধ্যেও রিজার্ভ বাড়ছে, ৩৫ বিলিয়ন ছাড়াল

সংকটের মধ্যেও রিজার্ভ বাড়ছে, ৩৫ বিলিয়ন ছাড়াল
আবদুর রহিম হারমাছি
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:১২:০০

সংকটের মধ্যেও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ বেড়ে চলেছে; বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আর গ্রস বা মোট হিসাবে ছাড়িয়েছে ৩৫ বিলিয়ন।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার রাতে সকাল সন্ধ্যাকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) দিন শেষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছড়িয়ে ৩০ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। আর গ্রস হিসাবে ৩৫ বিলিয়ন ছাড়িয়ে ৩৫ দশমিক শূন্য চার বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

 

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে উল্লম্ফন এবং ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনার কারণে রিজার্ভ এই সন্তোষজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। বর্তমানের এই রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে চার মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে।

 

অর্থনীতির সামর্থ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক রিজার্ভ। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে রিজার্ভ কমতে কমতে ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছিল। আর সেটা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল।

 

রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স। গত আট মাস ধরে রপ্তানি আয় টানা কমলেও রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে।

 

এর আগে ৩৯ মাস পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। ৩৫ বিলিয়ন ছাড়িয়েছিল গ্রস রিজার্ভ।

 

২০২২ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমেছিল। এর পর আর ৩৫ বিলিয়ন ডলারের উপরে ওঠেনি।

 

গত ৮ মার্চ রিজার্ভ থেকে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মেয়াদের ১৩৫ কোটি ৮৭ (১.৩৬ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধ করার পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ কমে ২৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। আর গ্রস বা মোট নেমেছিল ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে।

 

এর পর রেমিটেন্সে ভর করে প্রতিদিনই রিজার্ভ বেড়েছে। গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার।

 

সাড়ে ৯ মাসেই ২৮ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স

 

মধ্যপাচ্যে যুদ্ধের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে; চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দশম মাস এপ্রিলের ১৫ দিনে ১৭৮ কোটি ৮০ লাখ (১.৭৮ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা।

 

সব মিলিয়ে এই আর্থিক বছরের সাড়ে নয় মাসে (গত বছরের ১ জুলাই থেকে এই বছরের ১৫ এপ্রিল) ২৮ বিলিয়ন (২ হাজার ৮০০ কোটি) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অর্থবছরের বাকি আড়াই মাসে (১৬ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন) এই হারে এলে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এবার ৩৫ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসবে বলে হিসাব বলছে।

 

২০২৫ সালের এপ্রিলের প্রথম ১৫ দিনে ১৪৭ কোটি ২০ লাখ (১.৪৭ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন; পুরো মাসে এসেছিল ২৭৫ কোটি ২৩ লাখ (২.৭৫ বিলিয়ন) ডলার।

 

অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকের ঊর্ধ্বগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে আরিফ খান বলেন, “ঈদের পরও রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছিল মধ্যপাচ্যে যুদ্ধের কারণে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব পড়েনি।”

 

তিনি বলেন, “প্রতিবারই দুই ঈদের পর রেমিটেন্স প্রবাহ বেশ কমে যায়। এবার কমেনি। এটা আমাদের অর্থনীতির জন্য ভালো।”

 

চলতি অর্থবছরের বাকি আড়াই মাসে (১৬ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন) এই হারে এল এবার অর্থবছর শেষে রেমিটেন্সের মোট অঙ্ক ৩৫ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫৩৭ কোটি) ডলারে গিয়ে পৌঁছবে বলে হিসাব দেন তিনি।

 

এপ্রিল মাসের বাকি ১৫ দিনে (১৬ থেকে ৩০ এপ্রিল) এই হারে এলে মাস শেষে রেমিটেন্সের অঙ্ক ৩৫৭ কোটি (৩.৫৭ বিলিয়ন) ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। আর সেটা যদি হয়, তাহলে একক মাসের হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আসবে এপ্রিলে।

 

ডিসেম্বর, জানুয়ারির ও ফেব্রুয়ারি—টানা তিন মাস ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসে দেশে। মার্চ মাসে আসে আরও বেশি পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার। এপ্রিলেও ৩ বিলিয়নের বেশি আসবে নিশ্চিত করে বলা যায়।

 

তাহলে টানা পাঁচ মাস ৩ বিলিয়নের বেশি রেমিটেন্স আসবে দেশে। বাংলাদেশের ইতিহসাসে এর আগে কখনও এমনটি দেখা যায়নি।

 

মূলত এই রেমিটেন্সের উপর ভর করেই যুদ্ধের ধাক্কায় ওলোটপালট হয়ে যাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যেও রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় অবস্থান করছে। এই সূচক নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই।

 

মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আকুর মার্চ-এপ্রিল মেয়াদের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হবে। তার পর্যন্ত রিজার্ভ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

 

বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান এআরএইচ ডটকমকে বলেন, “বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আইএমএফের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রয়েছে এবং সংস্থাটির সব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।”

 

সাড়ে ৪ মাসের আমদানি ব্যয় মিটবে

 

বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দাবি করে।

 

সবশেষ গত ফেব্রুয়ারি মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৬ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।

 

সে হিসাবে বর্তমানের ৩০ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।

 

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়।

 

আকু হলো এশিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যকার একটি আন্তঃআঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে এশিয়ার নয়টি দেশের মধ্যে যেসব আমদানি-রপ্তানি হয়, তার মূল্য প্রতি দুই মাস পরপর নিষ্পত্তি করা হয়।

 

আকুর সদস্য দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপ। এর মধ্যে ভারত পরিশোধ করা অর্থের তুলনায় অন্য দেশগুলো থেকে বেশি পরিমাণে ডলার আয় করে। অন্যদিকে বেশিরভাগ দেশকেই আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় হিসাবে অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে হয়।

 

ব্যাংকগুলো আমদানির খরচ নিয়মিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়, যা রিজার্ভে যোগ হয়। ওই দায় দুই মাস পরপর রিজার্ভ থেকে পরিশোধ করে দেওয়া হয়।

 

এক দশক আগে রিজার্ভের বাড়-বাড়ন্ত নিয়ে মধুর সমস্যায় ছিল বাংলাদেশ। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এই অর্থ অলস বসিয়ে না রেখে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ছিল চিন্তার বিষয়।

 

কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যায়। তাতে রিজার্ভ কমতে থাকায় দেখা দেয় উদ্বেগ।

 

রিজার্ভের পতন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ সরকার শেষের দিকে আইএমএফ থেকে ঋণ নেয়। তাদের শর্ত মেনে ২০২৩ সাল থেকে রিজার্ভের তথ্য গ্রস হিসাবের পাশাপাশি আইএমএফ অনৃসৃত বিপিএম-৬ পদ্ধতিও প্রকাশ শুরু করে।

 

এখন বিপিএম-৬ ও গ্রস হিসাবের পাশাপাশি রিজার্ভের নিট বা প্রকৃত হিসাবও করে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সেটি নিয়মিত প্রকাশ করা হয় না। মাঝে-মধ্যে প্রকাশ করা হয়।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২১ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ (তখন বিপিএম-৬ ও নিট হিসাবে প্রকাশ করা হতো না) ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ২০২৪ সালের জুলাই শেষে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল।

 

আবার ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক

 

আবার ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার নিলামের মাধ্যমে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে চার ব্যাংকের কাছ থেকে ৫ কোটি ডলার কেনা হয়েছে। আগের দিন বুধবার একই দরে একটি ব্যাংক থেকে ৭ কোটি ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

 

এ নিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৫৬৫ কোটি ৩৫ লাখ (৫.৬৫ বিলিয়ন) ডলার কেনা হলো।

 

মুদ্রাবাজারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার পর ডলারের দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে বাণিজ্যক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পর থেকে ডলার কিনেই চলেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

 

মাঝে দেড় মাস অবশ্য কোনো ডলার কেনেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে সবশেষ ২ মার্চ ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে দুটি ব্যাংক ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার কিনেছিল। সে সময় পর্যন্ত মোট ৫৪৯ কোটি ৩৫ লাখ (৫.৪৯ বিলিয়ন) ডলার কেনা হয়েছিল।

 

জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে ১৯ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার, ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯ ব্যাংক থেকে ২০ কোটি ৯০ লাখ ডলার, ৫ ফেব্রুয়ারি ১৬ ব্যাংক থেকে ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ডলার, ৪ ফেব্রুয়ারি ১৬ ব্যাংক থেকে ১৭ কোটি ১০ লাখ এবং ২ ফেব্রুয়ারি ১৬ ব্যাংকের কাছ থেকে ২১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার কিনেছিল কিনেছিল ব্যাংক।

 

সব মিলিয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ডলার কেনার পরিমাণ ছিল ১৫৩ কোটি ৫০ লাখ (১.৩৫ বিলিয়ন) ডলার। তার আগের মাস জানুয়ারিতে ৭৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার কেনা হয়েছিল। আর গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে কেনা হয়েছিল ১ দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলার।

আরও