১৪ দিনেই ১৬১ কোটি ডলার পাঠালের প্রবাসীরা, বেড়েছে ২৫%
বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ২০:১০:০০
যুদ্ধের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে; চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দশম মাস এপ্রিলের প্রথম ১৪ দিনে ১৬০ কোটি ৭০ লাখ (১.৬১ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা।
এই অঙ্ক গত বছরের এপ্রিলের একই সময়ের চেয়ে ২৫ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের এপ্রিলের প্রথম ১৪ দিনে ১২৮ কোটি ৪০ লাখ (১.২৮ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন; পুরো মাসে এসেছিল ২৭৫ কোটি ২৩ লাখ (২.৭৫ বিলিয়ন) ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বুধবার সন্ধ্যায় এই তথ্য জানিয়েছেন।
অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকের ঊর্ধ্বগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, “ঈদের পরও রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছিল মধ্যপাচ্যে যুদ্ধের কারণে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব পড়েনি।”
তিনি বলেন, “প্রতিবারই দুই ঈদের পর রেমিটেন্স প্রবাহ বেশ কমে যায়। এবার কমেনি। এটা আমাদের অর্থনীতির জন্য ভালো।”
চলতি অর্থবছরের বাকি আড়াই মাসে (১৫ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন) এই হারে এল এবার অর্থবছর শেষে রেমিটেন্সের মোট অঙ্ক ৩৫ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশার কথা শুনিয়েছেন আরিফ খান।
রেমিটেন্সে প্রতি ডলারে এখন ১২৩ টাকা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। সে হিসাবে এপ্রিলের প্রথম ১৪ দিনে (১ থেকে ১৪ এপ্রিল) ১৯ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। প্রতিদিনে গড়ে এসেছে ১১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার; টাকায় ১ হজার ৪১১ কোটি টাকা।
মাসের বাকি ১৬ দিনে (১৫ থেকে ৩০ এপ্রিল) এই হারে এলে মাস শেষে রেমিটেন্সের অঙ্ক ৩৪৪ কোটি (৩.৫৯ বিলিয়ন) ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। আর সেটা যদি হয়, তাহলে একক মাসের হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আসবে এপ্রিলে।
সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত (৯ মাস ১৪ দিন, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল) মোট ২ হাজার ৭৮১ কোটি ৬০ লাখ (২৭.৮১ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত (৯ মাস ১৪ দিন, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল) ২ হাজার ৩০৭ কোটি ৭০ লাখ (২৩.০৭ বিলিয়ন) ডলার এসেছিল দেশে।
গত মার্চ মাসে পৌনে ৪ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। একক মাসের হিসাবে যা সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক মাসে এত রেমিটেন্স দেশে আসেনি।
রোজা ও ঈদ সামনে রেখে ওই রেমিটেন্স দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। এর আগে এক মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছিল গত বছরের মার্চে, ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ (৩.২৯ বিলিয়ন) ডলার। ওই মাসেও রোজা ও ঈদ সামনে রেখে রেকর্ড হয়েছিল প্রবাসী আয়ে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা চালায়। পাল্টা হামলা চালায় ইরান; শুরু হয় যুদ্ধ। দেড় মাস হতে চলেছে; যুদ্ধ চলছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য এখন যুদ্ধের কবলে। তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। এখন পর্যন্ত কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মীর প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, আহত হয়েছেন অনেকে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল কেন্দ্র উপসাগরীয় ছয়টি দেশে নতুন কর্মী পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয়ে (রেমিটেন্স) বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করছেন সবাই। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব পড়েনি।
প্রতিবছরই দুই ঈদকে সামনে রেখে পরিবার-পরিজনের বাড়তি খরচ মেটাতে বেশি বেশি রেমিটেন্স দেশে পাঠান প্রবাসীরা। সবাই আশঙ্কা করছিলেন, যুদ্ধের কারণে এবার সেই প্রবাহ কমে যাবে। কিন্তু তেমনটি এখনও দেখা যাচ্ছে না।
গত ২১ মার্চ দেশে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। এর পরও রেমিটেন্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
মে মাসের শেষের দিকে দেশে ঈদুল আজহা (কোরবানি ঈদ) উদযাপিত হবে। ওই ঈদকে সামনে রেখেও রেমিটেন্স বাড়বে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এখন রেমিটেন্সই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, যা সঙ্কটে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) তেলসমৃদ্ধ ছয়টি দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেকই এসেছে জিসিসিভুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলো থেকে।
চলমান সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে নির্ধারিত অনেক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে, আটকে পড়েছেন বহু কর্মী।
আবার কোনো কোনো দেশে বাংলাদেশের কর্মীদের ভিসা, বিশেষ করে এন্ট্রি ভিসা শেষ হওয়ার পথে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে নতুন করে কর্মী পাঠানো কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আবার কেউ কেউ ছুটি বা জরুরি প্রয়োজনে দেশে এসে আটকে গেছেন, এমন কর্মীদের ফিরে যাওয়াও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশের মধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার ও কুয়েতে ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আছেন।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নতুন কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও ধীরগতি দেখা দিতে পারে। এতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে।
রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার
ডিসেম্বর ও জানুয়ারির পর গত ফেব্রুয়ারির মাসেও ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসে দেশে। মার্চ মাসে আসে আরও বেশি পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের ইতিহসাসে এর আগে কখনও এমনটি দেখা যায়নি।
আর এই রেমিটেন্সের উপর ভর করে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় অবস্থান করছে। এই সূচক নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৮ মার্চ রিজার্ভ থেকে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মেয়াদের ১৩৫ কোটি ৮৭ (১.৩৬ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধ করার পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ কমে ২৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। আর গ্রস বা মোট নেমেছিল ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে।
গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার।
নিলামে ডলার কেনা রিজার্ভ বাড়ার আরেকটি কারণ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৫ বিলিয়ন (৫৫০ কোটি) ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩২ কোটি ৭৫ লাখ (৩০.৩৩ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা, যা ছিল আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) চেয়ে ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি।
গত অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে রেমিটেন্স এসেছিল ২৫২ কোটি ৭৪ লাখ (২.৫৩ বিলিয়ন) ডলার। আর চলতি অর্থবছরের নয় মাসের (জুলাই-মার্চ) হিসাবে গড়ে এসেছে ২৯১ কোটি ১৯ লাখ (২.৯১ বিলিয়ন) ডলার।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিটেন্স এসেছিল ২ হাজার ৩৯১ কোটি ২২ লাখ (২৩.৯১ বিলিয়ন) ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আসে ২ হাজার ২৬১ কোটি (২২.৬১ বিলিয়ন) ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে এসেছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি (২১.০৩ বিলিয়ন) ডলার।
২০২০-২১ অর্থবছরে আসে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি (২৪.৭৮ বিলিয়ন) ডলার। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এসেছিল ১ হাজার ৮২০ কোটি (১৮.২০ বিলিয়ন) ডলার।