Beta
Logo

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

প্রবৃদ্ধি হবে ৪.৭%, মূল্যস্ফীতি ৯.২ শতাংশে উঠবে : আইএমএফ

প্রবৃদ্ধি হবে ৪.৭%, মূল্যস্ফীতি ৯.২ শতাংশে উঠবে : আইএমএফ
আবদুর রহিম হারমাছি
বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:৩৮:০০

বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবির পর আন্তর্জতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে।

 

সংস্থাটি বলেছে, আগামী ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা আরও কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে।

 

এর মানে হলো—চলতি অর্থবছরে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়বে।

 

মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ বা ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভা চলাকালে সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

 

সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের গবেষণা বিভাগের পরিচালক পিয়েরে-অলিভিয়ে গুরনিয়ঁস প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

 

১৩ এপ্রিল সভা শুরু হয়েছে। ১৮ এপ্রিল শেষ হবে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল সভায় যোগ দিয়েছেন।

 

এর আগে গত বছরের অক্টোবর মাসে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় প্রকাশিত আউটলুকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল আইএমএফ।

 

তবে বৈশ্বিক আর্থিক খাতের মোড়ল সংস্থা বিশ্ব ব্যাংক ও ম্যানিলাভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) চেয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস বেশ খানিকটা বেশি।

 

গত ৮ এপ্রিল প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনের এপ্রিল সংস্করণে বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের ধাক্কায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

 

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দুই বার কমিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। গত বছরের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের অক্টোবর সংস্করণে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের ৪ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল সংস্থাটি।

 

পরে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেই পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

 

অন্যদিকে গত ১০ এপ্রিল প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকে (এডিও) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৪ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এই আউটলুকে ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে আভাস দেওয়া হয়েছিল।

 

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর ব্যাখ্যায় আইএমএফ বলেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে সংকটে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। তাই বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।

 

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন) বাংলাদেশে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছিল ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার।

 

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনে অন্তর্বর্তী সরকার।

 

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তিন প্রান্তিক (নয় মাস, জুলাই-সেপ্টেম্বর, অক্টোবর-ডিসেম্বর ও জানুয়ারি-মার্চ) শেষ হয়েছে। গত ৬ এপ্রিল দ্বিতীয় প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) সাময়িক হিসাব ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সংশোধিত জিডিপির তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।

 

সাময়িক হিসাবে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেশ খানিকটা কমেছে; নেমে এসেছে ৩ দশমিক শূন্য তিন শতাংশে।

 

সাময়িক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তথ্য দিয়েছিল বিবিএস। সংশোধিত (রিভাইজড) হিসাবে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস।

 

কৃষি, শিল্প ও সেবা—এই তিন খাতের উপাত্ত নিয়ে জিডিপির তথ্য প্রকাশ করা হয়। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়লেও শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে।

 

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকার অবশ্য এখনও জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেনি।

 

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ৪ দশমিক ২২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়।

 

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অর্জনের খাত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বরাবরই দেখিয়ে এসেছে।

 

২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা সর্বপ্রথম ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়; পরে সংশোধিত হিসাবে তা অবশ্য ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশে নেমে আসে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ওটাই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।

 

তার পরের বছর কোভিড মহামারির ধাক্কায় তা ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশে উঠেছিল। পরের বছর ৭ শতাংশ ছাড়ালেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবার ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমে আসে।

 

ইরান যুদ্ধের কারণে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। ২০২৫ সালে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল।

 

মূল্যস্ফীতি হবে ৯.২ শতাংশ

 

এদিকে ইরান যুদ্ধে কারণে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে।

 

তবে আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২৭) এই সূচক কমে ৬ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হয়েছে।

 

গত অক্টোবর মাসে আইএমএফ বলেছিল, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি হবে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এ হার গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১০ শতাংশ।

 

গত ৫ এপ্রিল মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিএস। তাতে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির পারদ খানিকটা নেমেছে; টানা চার মাস বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এই সূচক ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠেছিল। মার্চ মাসে তা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমেছে।

 

২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোলনের ধাক্কায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশেউঠেছিল। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

 

জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পরের কয়েক মাস সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করছিল।

 

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার লক্ষ্য ঠিক করেছিল অন্তবর্তী সরকার।

 

মার্চ শেষে (২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ) দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।

 

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন করে ধাক্কা খেয়েছে। আর এই ধাক্কায় বৈশ্বিক জিডিপি কমবে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কমার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরও