শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির ১১টিই এস আলমের, দুটি সালমানের বেক্সিমকোর
সোমবার, ০৬ এপ্রিল, ২০২৬ ২১:০৬:০০
দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাতে দেখা যায়, এই ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের প্রথম চারটিসহ পাঁচটি বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম মাসুদের। আর দুটি নানা কারণে বহুল আলোচিত সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো শিল্প গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান।
সোমবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী। এদিন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।
এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) প্রশ্নের লিখিত জবাবে অর্থমন্ত্রী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকাও সংসদে উপস্থাপন করেন। তবে এই শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার খেলাপি ঋণ কতো, তা জানাননি অর্থমন্ত্রী।
হাসনাত আবদুল্লাহ তার প্রশ্নে জানতে চান, দেশে এই মুহূর্তে প্রকৃত খেলাপি ব্যাংক ঋণের পরিমাণ কত, শীর্ষ ২০ খেলাপি কারা, খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং সংসদ সদস্যদের ব্যাংক ঋণ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত।
জবাবে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম ভেজিট্যাবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাজট্রিজ লিমিটেড, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস লিমিটেড, সোনালী ট্রেডার্স, বেক্সিমকো লিমিটেড, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড, চেমন ইসপাত লিমিটেড, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাজট্রিজ লিমিটেড, কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরাণীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড, কর্ণফুলি ফুডস প্রাইভেট লিমিটেড, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি, বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লিমিটেড ও রংধনু বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড।
১১টির মালিক এস আলম গ্রুপ
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তালিকা অনুযায়ী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টিই চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। এর কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) গত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দখল করেন। আরও পাচটি ব্যাংকের মালিকানা ছিল তার হাতে ছিল। ব্যাংকগুলো থেকে সব মিলিয়ে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি তুলে নেন তিনি।
তালিকায় থাকা ২০ খেলাপির মধ্যে শীর্ষ ৫টিই এস আলম গ্রুপের। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লি., এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লি., এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লি., এস আলম কোল্ড রোলেড স্ট্রিলস লি., সোনালী ট্রেডার্স।
তালিকায় ৭ থেকে ১০ এবং ১৬ ও ১৭তম স্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও এস আলম গ্রুপের। এগুলো হলো—গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন, চেমন ইস্পাত, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি., ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ।
ইনফিনিটি গ্রুপের মালিক হলেন এস আলমের ছেলে আহসানুল আলম। শেখ হাসিনার পতনের আগপর্যন্ত তিনি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।
তালিকায় ১৬ ও ১৭তম স্থানে থাকা কোম্পানিগুলো হলো কর্ণফুলি ফুডস (প্রা.) লি. ও মুরাদ এন্টারপ্রাইজ।
সালমান রহমানসহ সাবেক এমপি–উপদেষ্টারাও তালিকায়
তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে থাকা বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেডের মালিকানা রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের হাতে। এ ছাড়া তালিকায় ১৯তম স্থানে থাকা বেক্সিমকো কমিউনিকেশন লিমিটেডও (আকাশ ডিটিএইচ) সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন। তিনি গ্রুপটির ভাইস চেয়ারম্যান, তার বড় ভাই সোহেল এফ রহমান চেয়ারম্যান।
তালিকায় ১১তম স্থানে থাকা কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের মালিক হলেন আবদুল খালেক পাঠান। ১২তম স্থানে থাকা দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেডের মালিক হলেন গোলাম মোস্তফা।
এরপর ১৩ ও ১৪তম তালিকায় রয়েছে সিকদার গ্রুপের মালিকানাধীন পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট ও পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট.। প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের দুই পুত্র রন হক সিকদার ও রিক হক সিকদার এই দুই প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন।
১৫তম স্থানে রয়েছে বিএনপি সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খানের মালিকানাধীন প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (সিটিসেল)। এরপর খেলাপির তালিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগের প্রয়াদ সংসদ আসলামুল হকের মালিকানাধীন সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি। এরপর রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেডের কর্ণধার ঢাকার রূপগঞ্জের রফিকুল ইসলাম। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান তিনি এবং রংধনু গ্রুপের স্বত্বাধিকারী।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিতে ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
তবে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ হিসেবে দেখানো হয়নি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে ডজনখানেক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ তুলে নেয়। এসব অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির চাপে ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে গভীর সংকটে পড়ে। এর মধ্যে সংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংক একত্রিত করে ‘সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক’ গঠন করেছে অন্তবর্তী সরকার।
একীভূত হওয়া ব্যাংক পাঁচটি হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক।
এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের। বাকি চারটি ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার ও বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে।
তারা দুজনেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এসব ব্যাংকে নামে ও বেনামে তাদের শেয়ার ছিল।
বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি, শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।
ব্যাংক, পুঁজিবাজারসহ দেশের ব্যবসায়ী মহলে নানান কারণে আলোচিত ও বিতর্কিত সাবেক সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমান গত বছর জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কয়েক দিনের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন। এরপর তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে সালমান রহমানের মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মোটা অঙ্কের খেলাপি ঋণ রয়েছে। এই ঋণের ভারে এক সময়ের ভালো ব্যাংকটি এখন ডুবতে বসেছে।
নজরুল ইসলাম মজুমদারও কারাগারে রয়েছেন। সাইফুল আলম দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
ঋণ আদায়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে
সংসদে খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের নেওয়া ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি জানান, যেসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের সঙ্গে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা করা হচ্ছে। কোন কোন বাধায় ঋণ আদায় ব্যাহত হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কর্মপরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিটি ব্যাংকার্স সভায় ব্যাংকভিত্তিক শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, যেসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেশি, সেগুলোর জন্য ‘শ্রেণিকৃত ঋণ রেজল্যুশন স্ট্র্যাটেজি’ বিষয়ে গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি শনাক্তে ২০২৪ সালের ১২ মার্চ জারি করা বিআরপিডি সার্কুলার নম্বর ৬ এর কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ব্যাংক-কোম্পানি আইনে সংজ্ঞায়িত ‘উইলফুল ডিফল্টার’-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান লিগ্যাল টিম বা আইন বিভাগ শক্তিশালী করতে বিআরপিডি সার্কুলার নম্বর ১৪/২০২৪-এর মাধ্যমে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে সংসদকে জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর পদ্ধতি অনুসরণ করে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণস্থিতির ন্যূনতম ১ শতাংশ নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিআরপিডি সার্কুলার নম্বর ১১/২০২৪-এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদ, আইএফআরএস ৯ অনুযায়ী এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস ভিত্তিক ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং তালিকাভুক্ত জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জামানতের মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানে আরও কিছু কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী।
তার মধ্যে রয়েছে— ব্যাংক কোম্পানি আইন, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট, অর্থঋণ আদালত আইন, ব্যাংকরাপ্সি অ্যাক্টসহ সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংশোধনের উদ্যোগ; স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা পর্যালোচনা; খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতার তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ; ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রণোদনা নীতিমালা হালনাগাদ; একজন ঋণগ্রহীতা সমগ্র ব্যাংকিং খাত থেকে কত সর্বোচ্চ ঋণ নিতে পারবেন, তার সীমা নির্ধারণ; কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ খেলাপিদের ওপরও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের জন্য প্রযোজ্য ব্যবস্থা আরোপের লক্ষ্যে আইনি সংস্কার; অর্থঋণ আদালতের বিচারক প্যানেল বা জুরি বোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্তি; রিটের মাধ্যমে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির হওয়া ঠেকাতে ব্যবস্থা এবং বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন।