হরমুজ প্রণালি খুলতেই বিশ্ববাজারে তেলের দামে ধস
শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০০:৪০:০০
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সুখবর। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের উত্তেজনা অনেকটাই কমে এসেছে। ইরান দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্তের পর লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছে। ইরান হরমুজ প্রণালী খোলার ঘোষণা দিয়েছে।
আর এ সব ইতিবাচক খবরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ধস নেমেছে; এক ধাক্কায় ১৩ শতাংশ কমে গেছে।
হরমুজ প্রণালি সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। অন্যদিকে ইরান আর কখনোই এ প্রণালি বন্ধ না করার বিষয়ে একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এ খবরের পর শুক্রবার তেলের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি খোলার ঘোষণার পর অপরিশোধিত তেলের বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১২ ডলার ৮৭ সেন্ট কমে ৮৬ দশমিক ৫২ ডলারে নেমে এসেছে। শতাংশ হিসাবে কমেছে ১২ দশমিক ৯৫ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম সাড়ে ১৩ ডলার বা ১৪ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৮১ দশমিক ১৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ইউবিএস বিশ্লেষক জিওভানি স্টাউনোভো বলেন, “ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য নির্দেশ করে, যতক্ষণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে ততক্ষণ উত্তেজনা কম থাকবে। এখন আমাদের দেখতে হবে এ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ট্যাঙ্কারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় কি না।”
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয়, তাই এটি খোলা থাকলে সরবরাহ বাড়ে এবং দাম কমে যায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা চালায়। পাল্টা হামলা চালায় ইরান; শুরু হয় যুদ্ধ। দেড় মাস পার হয়েছে; যুদ্ধ চলছে। এর মধ্যে একবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে।
শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, লেবাননের যুদ্ধবিরতির মধ্যে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়ে এই প্রণালি দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজ অতিক্রম করতে পারবে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা ইরানের অন্যতম দাবি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর তিনটা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।
এর আগে ৮ এপ্রিল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। লেবাননও ওই যুদ্ধবিরতির আওতায় ছিল বলে বারবার বলে আসছিল ইরান। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও সেটাই বলছিল।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তা অস্বীকার করছিল। ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। ইরান দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত হলে বৃহস্পতিবার লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। এরপর শুক্রবার ইরান বলল, লেবাননে যুদ্ধবিরতির ১০ দিন হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্য এখন যুদ্ধের কবলে। তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। এখন পর্যন্ত কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মীর প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, আহত হয়েছেন অনেকে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এক পর্যায় প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারে উঠে যায়।
৮ এপ্রিল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতির খবরে তা কমে ১০০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। শুক্রবার হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্তের খবরে বড় দরপতন হয়েছে।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতে সারা বিশ্বে যখন লকডাউন চলছিল, তখন জ্বালানি তেলের দাম মাইনাস ৩৭ ডলারে নেমে এসেছিল। অর্থাৎ এক ব্যারেল তেল কিনলে ক্রেতাকে উল্টো ৩৭ ডলার দিতে হয়।
এরপর ওপেক ও রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে তেল সরবরাহ কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি করে। সে বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বাজারে গড়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ৪২ ডলার। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৪৯ ডলার।
সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে গড়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৫৩ ডলার, মার্চে ৬০ ডলার, এপ্রিলে ৬৫ ডলার, মে তে ৬৪ ডলার, জুনে ৬৬ ডলার, জুলাইয়ে ৭৩ ডলার এবং আগস্টে ৭৪ ডলার।
অক্টোবরে সেই দাম ওঠে ৮৫ ডলারে। সে সময় দেশের বাজারেও তেলের দাম বাড়ানো হয়।
এরপর তেলের দাম খানিকটা কমে আসে। তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম ফের বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
পরে অবশ্য তা কমে আসে; ৮০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে লেনদেন হয়।
এর পর গত বছরের এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের ধাক্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় দরপতন হয়।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৬০ ডলারে নেমে আসে। আর ডব্লিউটিআই ক্রুডের দর নামে ৬৪ ডলারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার আগে বিশ্ববাজারে এই দুই অপরিশোধিত তেলের দাম ৬০ থেকে ৬৫ ডলারের মধ্যেই ছিল।