Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪

সাক্ষাৎকার

বাংলা ভাষার সাথে প্রতারণা করছে শাসকশ্রেণি

সলিমুল্লাহ খান

সমাজ ভাষ্যকার লেখক-অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান মনে করেন, একুশে ফেব্রুয়ারিতে ‘শহীদ দিবস’-এর চেয়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-কে বেশি করে সামনে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে শাসকশ্রেণি ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দায় এড়িয়ে যাওয়ার চালাকি করছে। গণবুদ্ধিজীবী হিসেবে আলোচিত এই প্রবন্ধকার মৌলিক রচনার পাশাপাশি প্লাতোন, জেমস রেনেল, ফ্রঁৎস ফানঁ, শার্ল বোদলেয়ার, ডরোথি জুল্লে প্রমুখের লেখা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। সুবক্তা হিসেবে সুবিদিত সলিমুল্লাহ খানের লেখালেখি ও বক্তৃতায় সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বিশ্লেষণ তরুণদের আলোড়িত করে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সকাল সন্ধ্যার জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক আহমেদ মুনীরুদ্দিন

বাংলা ভাষার সাথে প্রতারণা করছে শাসকশ্রেণি

সলিমুল্লাহ খান

সমাজ ভাষ্যকার লেখক-অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান মনে করেন, একুশে ফেব্রুয়ারিতে ‘শহীদ দিবস’-এর চেয়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-কে বেশি করে সামনে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে শাসকশ্রেণি ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দায় এড়িয়ে যাওয়ার চালাকি করছে। গণবুদ্ধিজীবী হিসেবে আলোচিত এই প্রবন্ধকার মৌলিক রচনার পাশাপাশি প্লাতোন, জেমস রেনেল, ফ্রঁৎস ফানঁ, শার্ল বোদলেয়ার, ডরোথি জুল্লে প্রমুখের লেখা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। সুবক্তা হিসেবে সুবিদিত সলিমুল্লাহ খানের লেখালেখি ও বক্তৃতায় সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বিশ্লেষণ তরুণদের আলোড়িত করে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সকাল সন্ধ্যার জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক আহমেদ মুনীরুদ্দিন

সকাল সন্ধ্যা: ৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮। এই তারিখটা আমরা বলি না বা মনে রাখি না। আমাদের মনে থাকে, আমরা বলি ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। আন্দোলন হয়েছিল মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করবার দাবিতে— রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। আমরা বলি— ‘ভাষা আন্দোলন’, ‘রাষ্ট্রভাষা’ কথাটা থাকে না। এই বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখেন?

সলিমুল্লাহ খান: অনেক প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক এই কথা বলেন যে, ৮ই ফাল্গুন না হয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি হলো কেন? এর জবাব আমি জানি না। তবে, আমি মনে করি একুশে ফেব্রুয়ারি হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।

কারণ শুধু বাংলাদেশেই নয়, ইউরোপসহ একসময় তাদের কলোনি থাকা দেশগুলোতে, আজকের আমেরিকাসহ অন্যান্য জায়গাতেও খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারই প্রতিষ্ঠিত। একসময় ‘CE’ বলতে আমরা বুঝতাম ‘Christian Era’। এর আগে লেখা হতো ‘AD’, মানে ‘Anno Domini’, অর্থাৎ ‘in the year of the Lord’। যীশু খ্রিষ্টের জন্মসালকে ধরে এই সন গণনা হয়। কিন্তু এখন ইউরোপ-আমেরিকাসহ মোটামুটি সারা বিশ্বেই ‘CE’ বলতে বোঝানো হয় ‘Common Era’। এটাই বাস্তবতা। সেই দিক থেকে আমার মনে হয়, একুশে ফেব্রুয়ারি হওয়াটাই ঠিক ছিল।

এই যে ‘৮ই ফাল্গুন, ১৩৫৮ কেন হলো না’ বলে যে কথা, এটাকে বলতে পারেন বাঙালির আদেখলাপনা, আদিখ্যেতা। আমাদের কোনও কিছুতেই তো বাংলা তারিখ চলে না, শুধু এটা নিয়ে কথা কেন?

আর মনে রাখতে হবে, এ আন্দোলনটা হয়েছিল পাকিস্তানে। পাকিস্তান কি? একটা নতুন রাষ্ট্র, তখনও চার বছরও হয়নি পাকিস্তানের। বিলেত যখন উপনিবেশগুলোকে ছেড়ে যায় তখন তারা ভারতকে দু’ভাগ করে—ভারত আর পাকিস্তান। আর পাশের শ্রীলংকা, যেটা, কখনও ভারতের অন্তর্ভুক্ত তারা করেনি, পরের বছর সেটাও স্বাধীন করে দেওয়া হয়। বার্মা ১৯৩৭ পর্যন্ত ভারতের সাথে ছিল, সেটাকেও ব্রিটিশরা স্বাধীন করে দেয়। আমি বলতে চাচ্ছি সেইরকম একটা পরিস্থিতিতে, সদ্য উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়া পাকিস্তান নামের যে রাষ্ট্র, সেখানে ২১ ফেব্রুয়ারি হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।  

‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’-কে ‘ভাষা আন্দোলন’ বলায় আমি দোষের কিছু দেখি না। এটা সংক্ষেপ করে বলে। ‘কান টানলে মাথা আসে’ বলে একটা কথা আছে। তেমনি ভাষা আন্দোলন বললেও এটা অনুমান করা যায় যে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্যই এই আন্দোলন। একবার আমি একজন লোককে ডাকলাম ‘রাজ্জাক সাহেব’, এক মৌলভী সাহেব আমার সমালোচনা করে বললেন, ‘‘উনার নাম কিন্তু আব্দুর রাজ্জাক, রাজ্জাক নয়।’’ আমি বললাম, ‘‘রাজ্জাক বললেই আব্দুর রাজ্জাক বোঝা যায়। বাংলা ভাষা সম্পর্কে আপনার সামান্যতম ধারণা থাকলেও আপনি একথা বলতেন না।’’ 

রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা না করে সংবিধানের সঙ্গে এই যে প্রতারণা, এই যে শঠতা যেটার ওপর আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র দুটোই দাঁড়িয়ে আছে, সেটাকে একটা বৈধতা দেবার জন্য আমরা একটা সীলমোহর দিচ্ছি—একুশে ফেব্রুয়ারি, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ বলে। ‘শহীদ দিবস’ পেছনে চলে গেছে। কদিন পরে দেখবেন যে এটা একেবারে কার্পেটের নিচে চলে গেছে।

সকাল সন্ধ্যা: এখন রাষ্ট্রীয় পরিসর থেকে শুরু করে সামাজিক পরিসরের চর্চায়ও ‘শহীদ দিবস’ কথাটা যেন অনেকটা পিছু হটে গিয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ কথাটাই শোনা যাচ্ছে বেশি। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

সলিমুল্লাহ খান: এখন যে বলা হচ্ছে ‘ভাষা শহীদ’, এটা অত্যন্ত প্রতারণামূলক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ। আমি পাকিস্তান আমলে জন্মগ্রহণ করেছি, পাকিস্তান আমলে বড় হয়ে উঠেছি, আমরা কখনও ‘ভাষা শহীদ’ বলতে শুনিনি। আমরা ‘শহীদ’ বলেছি, ‘শহীদ দিবস’ বলেছি। কখনও ‘ভাষা শহীদ’ বলিনি। এটা হচ্ছে কোনও ‘লেখক’-কে ‘নারী লেখক’ বলার মতো। বেগম রোকেয়াকে ‘লেখক’ না বলে ‘নারী লেখক’ বলার মতো। এতে তাকে ছোট করা হয়।

এখন ‘ভাষা শহীদ’ বলার মধ্যে একটা চালাকি আছে। ‘শহীদ দিবস’ না বলার মধ্যে একটা চালাকি আছে। চালাকিটা কি? চালাকিটা হলো, আমাদের আর ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলার’ দরকার নেই, সেজন্য এখন নাম দিয়েছি কি— ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’।

বামপন্থীদের সম্পর্কে আমার শ্রদ্ধা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। কমে গেছে অনেকদিন। আমি নিজেও নিজেকে একসময় বামপন্থীদের অন্তর্ভুক্ত ভাবতাম, এখনও ভাবি। কিন্তু এদের মতো বামপন্থী হতে আমি আর রাজি না, যারা মনে করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হওয়ার কারণে বাংলা ভাষার উন্নতি হয়েছে। এটা যে বাংলা ভাষার অবনতি, এই কথাটা যারা বুঝতে সক্ষম নয়, তাদের সাথে আপনি কি আন্দোলন করবেন? তাদের সাথে আপনি কিভাবে কথা বলবেন?

বাংলা সবসময়ই ‘মাতৃভাষা’ ছিল। পৃথিবীতে পাঁচ বা সাত হাজার ভাষা আছে, সবই কারও না কারও মাতৃভাষা। কিন্তু এর মধ্যে খুব অল্প ভাষাই ‘রাষ্ট্রভাষার’ মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। ১৯৭১ সনে যখন আমাদের বাংলাদেশ একটা স্বাধীন দেশে পরিণত হলো, যেভাবেই হোক, তখন নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কি হবে সেটা নিয়ে কোনও দ্বিমত ছিলনা। এজন্য একবছরের মধ্যে সংবিধানে লেখা হয়েছে—‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। এখন সেখান থেকে তারা সরে যাবেন কিভাবে? তখন তারা যেটা করলেন, বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষার মর্যাদা দিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রভাষার না। উচ্চ আদালতের ভাষা, সরকারি দপ্তরের ভাষা, উচ্চশিক্ষার ভাষা— এই তিনটাকে আমরা রাষ্ট্রভাষার মণ্ডল বলতাম, ঘরে তো সবাই-ই মাতৃভাষাতেই কথা বলেন। তারা কিন্তু রাষ্ট্রভাষার এই তিন মণ্ডলে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করলেন না। রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা না করে সংবিধানের সঙ্গে এই যে প্রতারণা, এই যে শঠতা যেটার ওপর আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র দুটোই দাঁড়িয়ে আছে, সেটাকে একটা বৈধতা দেবার জন্য আমরা একটা সীলমোহর দিচ্ছি—একুশে ফেব্রুয়ারি, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ বলে। ‘শহীদ দিবস’ পেছনে চলে গেছে। কদিন পরে দেখবেন যে এটা একেবারে কার্পেটের নিচে চলে গেছে।

সকাল সন্ধ্যা: অনেক সরকারি দপ্তরের অনুষ্ঠানে, রাজনৈতিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারেও দেখা যায় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’টাই বড় করে লেখা। ‘শহীদ দিবস’ অনেকে লেখেনও না। কেউ কেউ আবার ‘ভাষা শহীদ দিবস’ লেখে। অর্থাৎ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের চর্চাতেও এটাই বাস্তবতা। তাহলে কি আসলেই মানুষ ভাবছে যে, একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হওয়ায় আমাদের মর্যাদা বেড়ে গেছে? বাংলা ভাষার একটা বিশ্ব স্বীকৃতি মিলে গেছে? রাজনৈতিকভাবে এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?      

সলিমুল্লাহ খান: এই কথাটাই আমি বলছিলাম যে, এতে আমাদের স্ট্যাটাস বাড়ে নাই। আমাদের বাংলাদেশ যারা স্বাধীন করেছেন, তারা, মনে করেন একটা মই দিয়ে গাছে উঠেছেন। এখন তারা গাছে বসেই কাঁঠাল খেতে পারছেন, মই আর লাগছে না। তখন মইটা তারা লাথি দিয়ে ফেলে দিলেন। আমাদের অবস্থা হয়েছে তা-ই।

১৯৪৭ সালে পূর্ববাংলা উপনিবেশ হয় নাই, স্বাধীন হয়েছিল। একটা স্বাধীন দেশের একটা প্রদেশ ছিল পূর্ববাংলা। ধীরে ধীরে পূর্ববাংলার মানুষ আবিষ্কার করল স্বাধীন দেশের প্রদেশ হলেও তারা শোষিত হচ্ছে, অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু ১৯৬৯-৭০ এমনকি ১৯৭১-এর গোড়াতেও কেউ বলে নাই আমরা পরাধীন। পাকিস্তানিরা যখন আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে ২৫শে মার্চ রাতে, তখনই আমরা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছি। সংবিধানেও লেখা আছে— যেহেতু, যেহেতু…এমন ছয়টা যেহেতু আছে, তারপরে … আমরা একটা স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করলাম, যে দেশে ‘সাম্য ও মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।’ এখন এখান থেকে পশ্চাদপসরণের উপায় কী? প্রথম পথ হলো ভাষার ক্ষেত্রে বেঈমানি করা। ধরেন, ১৯৭১ থেকে ১৯৯৭/৯৮ পর্যন্তও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রসঙ্গটি ওঠে নাই।

এখন যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্ষমতায় বসেছে, যারা শাসকশ্রেণি হয়েছে, তারা মনে করছে কি দেশের ভাষা দুইটা—একটা জাতীয় ভাষা, আরেকটা আন্তর্জাতিক ভাষা। এইটা নিয়েও কেউ আপত্তি করে নাই। কিন্তু এখন তারা যেটা চেষ্টা করছে, সেটা আপনি উপরের দিকে দেখলেই বুঝতে পারবেন; তারা চেষ্টা করছে বাংলা ভাষাটাকে একেবারে সরিয়ে দিতে— উচ্চশিক্ষা থেকে, উচ্চ আদালত থেকে এবং সর্বত্র।

একটা কথা আছে যে ‘গোঁফ দিয়ে যায় চেনা’। আপনি যা তা দিয়ে যেমন আপনাকে চেনা যায় তেমনি আপনি যা না তা দিয়েও আপনাকে চেনা যায়। আমরা ইংরেজিভাষী নই। কিন্তু ইংরেজি পৃথিবীর সবচেয়ে আধিপত্যশীল ভাষা। আমরা জাতিসংঘে বাংলাতে বক্তৃতা দিতে পারি কিন্তু সেটা কেউ বুঝবে না। এটা ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হবে বা ফরাসি বা অন্য ভাষায় অনুবাদ করতে হবে। ইংরেজি ভাষার বিরোধিতা আমরা করছি না। কিন্তু ইংরেজি শেখার আগে আমাদের শিশুদের, তরুণদের বাংলা শেখা উচিৎ। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ হচ্ছে, বাংলা ভাষার উন্নতির জন্য তার অবদান রেখে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের জন্য শিক্ষার্থীদের তৈরি করা, আমাদের ছেলেমেয়েরা কিভাবে চাকরি খুঁজে পাবে সেই ব্যবস্থা করা। কিন্তু তা না করে আমরা পাশার দান উল্টে দিয়েছি।

আসল কথা হচ্ছে, এখন যারা শাসকশ্রেণি হয়েছেন, উচ্চশ্রেণি হয়েছেন, যারা ধনসম্পদের মালিক হয়েছেন, যারা আইনবহির্ভূত কায়দায় ধনসম্পদ এক জায়গায় করছেন, যেটাকে পুরনো বামপন্থীরা বলেন—‘প্রিমিটিভ একিউমুলেশন অব ক্যাপিটাল’ বা ‘পুঁজির আদি সঞ্চয়ন’। সেটাই চলছে দেশে এখন—আইনবহির্ভূতভাবে ‘পুঁজির আদি সঞ্চয়ন’। তারই অংশ হচ্ছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সেই প্রতিশ্রুতিকে সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করা। অথবা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।

আমি মনে করি যে, বর্তমানে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ কথাটা তুলে দেওয়ার মতো রাজনৈতিক সাহস শাসকশ্রেণির নেই। কিন্তু সেটাকে ওই প্রতিশ্রুতিতেই সীমিত রেখে তলে তলে খনন করে সেটাকে দুর্বল করে ফেলা, ভেঙে ফেলা। সেটাই চলছে এখন।  

সকাল সন্ধ্যা: আপনি ভাষার কথা বলছিলেন। স্বাধীনতার বায়ান্ন বছর পেরিয়েছে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বাহাত্তর বছর হতে চলল এখনও আমাদের বাংলা ভাষাকে উচ্চশিক্ষার মাধ্যম করা যায়নি। কেন এমন হলো তার একটা দিশা আপনার কথা থেকে পাওয়া যাচ্ছে। এই বিষয়টা যদি আরেকটু ব্যাখ্যা করেন।  

সলিমুল্লাহ খান: কারণ বা করণীয় বলার আগে, ঘটনাটার বিবরণ আরেকটু বুঝতে হবে, এটা যে কিভাবে হয়নি। ইংরেজি বাংলাদেশে শিক্ষার মাধ্যম হলো কখন? আপনি যদি এটার উত্তর না খোঁজেন তাহলে এই প্রশ্নেরও উত্তর পাবেন না।

আমি অতি সংক্ষেপে বলছি। ইংরেজরা এই দেশ শাসন করেছিল ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর। তখনি সরাসরি শাসনভার গ্রহণ করেনি, ১৭৭২ সালে, অর্থাৎ ১৫ বছর পরে ইংরেজরা সরাসরি শাসনভার গ্রহণ করে। এরপরও ১৮৩৫ পর্যন্ত তারা ফারসিকেই রাষ্ট্রভাষা রেখেছিল, ইংরেজি ভাষা চালু করেননি। কিন্তু এই দেশের যারা সওদাগরি অফিসে চাকরি করতে চান, তারা তখন ‘ফিলোসফার’— বিজ্ঞ লোক, ‘কুকুম্বার’—শসা এইভাবে ইংরেজি শিখতে শুরু করেছিল। ইংরেজি শব্দের অনুবাদ, ওয়ার্ড বুক পড়ত। কোলকাতায় প্রথম ভারতীয়দের উদ্যোগে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো যেখানে বৈধভাবে ইংরেজি শেখানো হবে, সেটা হলো ‘হিন্দু কলেজ’। ১৮১৬-তে প্রস্তাব হয় ১৮১৭-তে কাজ শুরু করে। তারও প্রায় বিশ বছর পরে, ১৮৩৫ সালে মেকোলে এবং বেন্টিঙ্কের সময় সিদ্ধান্ত হয় যে, এখন থেকে রাজভাষা, মানে সরকারি চাকরির ভাষা ইংরেজি হবে। তখন ফারসি উঠিয়ে দেওয়া হলো, পলাশীর প্রায় আশি বছর পর, একথাটা মনে রাখা দরকার।

এখন, ১৯৪৭ সনের আগে, মাত্র ১৯৪০ সনে, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিদ্ধান্ত নেয় যে এখন থেকে ‘প্রবেশিকা পরীক্ষা’, তৎকালে যেটাকে ‘এন্ট্রান্স’ পরীক্ষা বলতো, আরও আগে যেটাকে ‘ম্যাট্রিকুলেশন’ বলতো সেই পরীক্ষা বাংলা ভাষাতেও দেওয়া যাবে। এরপর পাকিস্তান হলো। পাকিস্তান আমলেও কিন্তু কেউ বাংলায় পরীক্ষা দেওয়া নিষেধ করেনি। আমি পাকিস্তান আমলে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম, বাংলাদেশ আমলে পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছি। বাংলা মাধ্যমেইে আমরা পরীক্ষা দিয়েছি।

আপনি উচ্চশিক্ষার কথা বলছেন, আগে তো নিম্মশিক্ষার কথা বলবেন। সবাই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কথা বলে, নিম্নাঙ্গ সঙ্গীতের কথা বললে লজ্জা পায়—নিম্নাঙ্গ যেন কোনও ভালো অঙ্গ নয়। কিন্তু এখানে নিম্নাঙ্গ সঙ্গীতের গানই আমি গাইবো। প্রাথমিক শিক্ষা— তারও নিচে কিন্ডারগার্টেন, প্লে-ওয়ান, প্লে-টু এগুলো ইংরেজি করা হচ্ছে কেন?

ফলে, আপনার এই প্রশ্নটা প্রত্যাহার করতে বলবো আমি যে, ‘বাংলাকে উচ্চশিক্ষার মাধ্যম করা যায়নি’। আরে ভাই, করা যায়নি মানে? বাংলা করার চেষ্টাই তো করা হয়নি। বলে যে ‘আঙুর ফল টক’। আঙুর ফল এতো উপরে যে, আপনি তার স্বাদই পাচ্ছেন না, তো বুঝবেন কি করে যে সেটা টক না মিষ্টি? পাকিস্তান আমলেও তো আমরা দেখেছি বি.এ., এম.এ., পর্যন্ত বাংলায় পরীক্ষা দেওয়া যেত, নিষেধ তো কেউ করেনি। কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পর তো এটা ধীরে ধীরে প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।

আপনি বলুন তো, এখানে একটি দুটি হাতে গোনা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বাদে আর কোথাও বাংলায় পরীক্ষা দেওয়া যায় কি না? অথচ আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো বাংলা মিডিয়ামে পরীক্ষা দিয়েই পাস করেছি আমরা। কোনও সমস্যা তো ছিল না। বি.এ., এম.এ পরীক্ষাতেও ইংরেজি বাংলা দুটোই লেখা যেত। বাংলা বিভাগেই শুধু নয়, আপনি অর্থনীতিতেও বাংলায় লিখে পাস করতে পারতেন। এখন তো এটা প্রায় নিষিদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। বিসিএস-ও দেওয়া যায় বাংলায়, কিন্তু দেখবেন কেউ দেবে না। কারণ বাংলায় লিখলে মাস্টাররা ভালো নম্বর দেবে না।

আমার স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে এই যে, উচ্চশিক্ষা বাংলায় প্রবর্তনের চেষ্টা আমরা করি নাই। অথচ যেটুকু হয়েছে সেটা উনবিংশ শতাব্দীতে।

এটা মনে রাখতে হবে, ১৮৪৪-এর পর সমস্ত পরীক্ষা ইংরেজিতে দিতে হতো। এক ভদ্রলোক ছিলেন তখন লর্ড হার্ডিঞ্জ, তার আমল থেকে। ১৮৩৫-এ ইংরেজিকে রাজভাষা করার পর (শিক্ষায় ইংরেজি চালুর জন্য) প্রায় ১০ বছর তারাও ট্রানজিশন নিয়েছে। কিন্তু ১৮৫৪ সালে যেটাকে বিখ্যাত ‘উড-এর ডেসপাচ’ বলা হয়, অর্থাৎ হাইস্কুলে কি পড়ানো হবে, লোয়ার স্কুলে কি পড়ানো হবে সেই ফয়সালা যখন হলো, সেখানেও কখনওই বলা হয়নি যে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি হতে হবে। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম বাংলাতেই হবে এদেশে।

এইসব ইতিহাস উপেক্ষা করে পাকিস্তান আমলে একটা যুক্তি দেওয়া হলো যে, পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে যদি আমাদের সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় প্রতিযোগিতা করতে হয় তাহলে ইংরেজিতে পরীক্ষা দিতে হবে। ভারতেও একই অবস্থা। ভারত যখন হিন্দি-কে রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করল তখন তামিলরা বলল, আমরা বরং ইংরেজিতে পরীক্ষা দেবো তবু হিন্দিতে দেবো না। আমাদের এখানে হলো— আমরা ইংরেজিতে দেবো, উর্দুতে দেবো না। এই দ্বন্দ্বটাই এখন নতুন রূপে ফিরে এসেছে। এখন তো আর হিন্দি বা উর্দুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় নেই। তাহলে আপনি ইংরেজির পক্ষ নিচ্ছেন কিসের নামে— গোলকায়নের নামে, গ্লোবালাইজেশনের নামে। অর্থাৎ দুর্জনের কোনওদিন ছলের অভাব হয় না।

বাংলাদেশে এখন যে শাসকশ্রেণি আছে এটা বিশ্বাসঘাতক শাসকশ্রেণি। তারা কৃষকদের ব্যবহার করে, শ্রমিকদের ব্যবহার করে ক্ষমতার স্বর্ণসোপানে উঠেছে। কিন্তু ক্ষমতায় আরোহণের পর তো আর তাদেরকে দরকার নাই, তাই কৃষক-শ্রমিকদেরকে তারা এখন ব্রাত্য, অর্থাৎ ভৃত্যশ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করছে। আসল সমস্যা এখানেই। আমি বলবো, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আদৌ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়নি। আমাদের শত চেষ্টা সত্ত্বেও।

আমাদের কিছু বামপন্থী, তাদের মধ্যে আপনার সম্পাদক খোকনরাও (সকাল সন্ধ‍্যা সম্পাদক গাজী নাসির উদ্দীন আহমেদ) আছেন, তাদের সাথে এ নিয়ে আমার একবার অযথা কুতর্ক হয়েছে, টেলিভিশনের টক শো-তে আমার মনে আছে। তারা এই রাষ্ট্রকে এখনও গণতান্ত্রিকই মনে করে। যেমন ধরেন, রাশেদ খান মেনন, ফজলে হোসেন বাদশা, হাসানুল হক ইনু যারা শাসকশ্রেণির সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন, তাদের স্লোগান কি ছিল— ‘সাম্প্রদায়িকতাকে রুখতে হবে’। এখনও ধরেন একাত্তর টেলিভিশন কি বলে— সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই তারা আন্দোলন করতেছে স্বাধীনতার বায়ান্ন বছর পরও। দেশের আসল সমস্যা কোথায় সেখানে না গিয়ে, ওই যে, পুরনো ‘জুজু’ সেটাই দেখাচ্ছে তারা। সাম্প্রদায়িকতা একসময় আমাদের ছিল। এখনও যে নাই সেটা আমি বলছি না। কিন্তু তার জায়গায় এখন যে, ‘প্রিমিটিভ একিউমুলেশন অব ক্যাপিটাল’ বা ‘পুঁজির আদি সঞ্চয়ন’ ঘটছে সেটা আড়াল করার জন্য, সেটা নিয়ে কথা না বলার জন্য তাদের একটা শত্রু দরকার এবং সাম্প্রদায়িকতাকে তারা সেই শত্রু বানিয়ে নিয়েছে। মানুষও চেনা যায় তার শত্রু দিয়ে। একাত্তর টিভির শত্রু কি? যে শত্রু নন-এক্সিসট্যান্ট, অস্তিত্বহীন। দুর্ভাগ্যবশত খোকনরা, যারা একসময় বামপন্থী ছিলেন তারাও একাত্তর টিভির দিক নিচ্ছে। কারণ তাকে তো অন্য কোথাও চাকরি করতে হয়। আমি জানি আপনি এসব ছাপবেন না। কিন্তু ছাপাবেন, নামসহ ছাপাবেন। আই ইনসিস্ট ইউ অন প্রিন্টিং দেম।

বাঙালির ভাষাই এখন বিপণ্ন। কি জন্য? গ্লোবালাইজেশনের নামে। তাহলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার অবস্থা কতটা শোচনীয় হতে পারে সেটা অনুমেয়। তাদের ওপর শোষণের মাত্রা কিন্তু দ্বিবিধ। গোলকায়ন বা আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি তো আছেই, আবার বাংলা ভাষাও তাদের ওপর চেপে বসেছে জাতীয় ভাষা হিসেবে—পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য স্থানেও। ফলে তাদেরকে দুইটা বোঝার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সকাল সন্ধ্যা: ২১ শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসের প্রভাতফেরি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৩ সাল থেকেই শহীদ দিবস পালিত হতে শুরু করে এবং যতদূর জানি, কয়েক বছরের মধ্যেই শহীদ মিনার নির্মাণ ও একুশের প্রভাতে প্রভাতফেরির এই চর্চা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। স্বাধীনতা উত্তরকালে মধ্যরাতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার রীতি চালু হয়েছে। প্রভাতফেরি এখন হয়ে গেছে মধ্যরাতের প্রথম প্রহরে ফুল দেওয়া। এই পরিবর্তনকে আপনি কিভাবে দেখেন?’

সলিমুল্লাহ খান: মধ্যরাতে ফুল দেওয়ার রীতি, সকলেই জানেন, পাশ্চাত্যের বা আমাদের নতুন ঔপনিবেশিক প্রভুভক্তি বিশেষ। এই হনুমানবৃত্তির কোনও দরকার ছিল না।

এদেশে দিনের শুরু গভীর রাতে নয়, গভীর ভোরে (বেগম রোকেয়া যাকে বলেন সুবেহ সাদেক সেই ক্ষণে)। তদুপরি ১৯৭১ পর্যন্ত (জাতীয় জোশ তুঙ্গে থাকতে) এই প্রভাতফেরির সংস্কৃতি আর ফুল দেওয়ার রীতি বহাল ছিল। এইটা পরে কেন বদলে গেল? গেল, কারণ এখন যে শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছেন তাদের ‘মুখে শেখ ফরিদ কিন্তু বগলে ইট’। এই নতুন ধনীরা নিজ শ্রেণিস্বার্থের কারণে জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করতে পিছপা নন।

আসলে সমাজে নতুন উপনিবেশ ব্যবস্থা এখন যে পাকাপোক্ত হয়েছে গভীর রাতের ‘রজনীফেরি’ তাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

সকাল সন্ধ্যা: একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির সূত্র ধরে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। এই ইনস্টিটিউট বলছে বাংলাদেশে অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর ৪১টি ভাষাভাষীরা বাস করছেন। কিন্তু এর মধ্যে অনেকগুলো ভাষাই বিপণ্নপ্রায় এবং বিলুপ্তির পথে। তারা তো মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাও পাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের যে গৌরবের দাবিদার হলো বাংলাদেশ সেই দেশে অন্যান্য ভাষাভাষীদের ভাষা-পরিস্থিতি আর তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?   

সলিমুল্লাহ খান: ধন্যবাদ, আমাদের আগের বিশ্লেষণগুলো যদি সঠিক হয়ে থাকে, সবগুলোই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে, কেননা এগুলো একজন ব্যক্তির মত হিসেবে আপনি দেখতে পারেন। তবে, যদি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে এর উত্তর এরমধ্যেই দেওয়া হয়ে গেছে। বাংলা এদেশে ১৮ কোটি বা তারচেয়ে বেশি লোকের মাতৃভাষা, পাশের দেশে ভারতেও ১০-১২ কোটি বাঙালি আছে। বলা হয়, দেশ-বিদেশ মিলিয়ে পৃথিবীতে এখন প্রায় ৩০ কোটির ওপরে বাঙালি আছে। সেই বাঙালির ভাষাই এখন বিপণ্ন। কি জন্য? গ্লোবালাইজেশনের নামে। তাহলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার অবস্থা কতটা শোচনীয় হতে পারে সেটা অনুমেয়। তাদের ওপর শোষণের মাত্রা কিন্তু দ্বিবিধ। গোলকায়ন বা আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি তো আছেই, আবার বাংলা ভাষাও তাদের ওপর চেপে বসেছে জাতীয় ভাষা হিসেবে—পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য স্থানেও। ফলে তাদেরকে দুইটা বোঝার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

আমরা একসময় ব্রিটেনের সরাসরি উপনিবেশ ছিলাম। পরাধীন ছিলাম। কিন্তু ব্রিটেন চলে যাবার আগেই আমাদের মধ্যে আমেরিকা প্রবেশ করেছে। এখন আমেরিকাকে ঠেকাবার জন্য আমরা যদি রাশিয়া বা চীনের হাতে পড়ি, তাহলে আমাদের অবস্থা খুব বেশি ভালো হবে না। এই ক্ষেত্রে আমেরিকানদের একটা পোয়াবারো হয়েছে। তারা বলছে, আমরা তোমাদেরকে গণতন্ত্রও দিচ্ছি আবার নিজের ব্যক্তিগত সুবিধাদিও দিচ্ছি। আমেরিকানদের ইমফেসিসটা কি? ইনডিভিজুয়ালিজম। আগে রাশিয়া বা চীনারা কি বলতো, কালেক্টিভলি সমস্ত শ্রেণির এবং সমাজের উন্নতি না হলে হবে না। এখন যে কথাটা আমি বারবার বলতে চাচ্ছি, সেটা হলো বাংলাদেশে যে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলো না—মুখে হলো, কাজে হলো না এর প্রধান কারণ হচ্ছে শ্রেণিচরিত্র।

একইভাবে আমাদের ক্ষুদ্র জাতিগুলোর ওপর যে আক্রমণ চলছে সেটার প্রধান কারণও কিন্তু শ্রেণিচরিত্র। আমরা একসময় বলতাম—‘‘আমার এ দেশ সব মানুষের।/ছোটদের বড়দের সকলের…/গরিবের নিঃস্বের ফকিরের/আমার এ দেশ সব মানুষের, সব মানুষের।’’ অত্যন্ত জনপ্রিয় গান হয়েছিল এটা, রেডিও, টেলিভিশনে, অনুষ্ঠানে সবাই গাইতো। কিন্তু ‘আমার এ দেশ’ কি সব মানুষের হয়েছে? হয়নি।

আমি কাউকে ছোট করতে চাচ্ছি না, কিন্তু বাঙালি গরীব আর মারমা গরীব এক নয়। এর মধ্যেই আবার একটা জাতিগত হিংসার বিষয় জড়িত হয়ে পড়েছে। এখন দেখেন, ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম মেলা চলছে, অফিসার্স ক্লাবের পাশে। তার মানে কি, এখানে একটা ট্যুরিস্ট পিস হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রেজেন্ট করা হচ্ছে। কিন্তু সেখানে জমি দখল করা হচ্ছে। আসল সমস্যা তো হচ্ছে জমি দখল করা। তারপরে বলা হচ্ছে, চাকমাদেরকে অনেক বেশি চাকরি দেওয়া হচ্ছে, শতকরা পাঁচ ভাগ কোটা রাখা হচ্ছে ধরেন। এটা আসলে কি? এটাকে বলা যেতে পারে একধরনের প্রণোদনা, যদি আপনি অভদ্র ভাষায় বলেন, তাহলে একধরনের ঘুষ দেওয়া।

শিক্ষা নিয়ে আসল কথাটা কি? বাংলাদেশের সর্বত্র জনশিক্ষার প্রসার হয়নি। যদি এমন হতো যে, বাঙালিদের মধ্যে শতকরা ১০০ জন সাক্ষর হয়েছে, চাকমাদের মধ্যে ৫ জন তাহলে বিষয়টা আরেকরকম হতো। আমি একটা উদাহরণ দেই। যে জায়গায় আমি জন্মেছি মহেশখালী নামের একটা ক্ষুদ্র দ্বীপে, সেখানে এখনও সাক্ষরের সংখ্যা সরকারি হিসেবে শতকরা ৩০ জন। পার্বত্য চট্টগ্রামের চেয়েও খারাপ। এমন নয় যে এটা ক্ষুদ্র জাতি অধ্যুষিত এলাকা। এটা হচ্ছে, দারিদ্যের যে ঐতিহ্য আমাদের আছে সেটা দূরীভূত হয়নি। সব জায়গায় পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন আছে, মহেশখালীতে যাওয়া-আসা করবার কোনও পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন নাই, নাই লঞ্চ, নাই বাস। এখনও সেখানে আদিম শোষণ চলে। এটা কোনও জাতিগত কারণে হচ্ছে আমি বলব না। মহেশখালীর শতকরা ৯০ জন লোক মুসলমান, কিন্তু এখনও সাক্ষরের হার শতকরা ৩০ জন কেন? শিক্ষায় এত পিছিয়ে কেন? এরকম আপনি বহু পকেট পাবেন, সারা দেশে।

এখন দেখেন, সাঁওতাল, যারা আছে রাজশাহী বিভাগে, তাদের জমি বারবার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আমরা আলফ্রেড সরেনের নাম শুনেছি, এমন আরও নাম শুনেছি। আবার টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহে গারোদের অঞ্চলের দিকে দেখেন, সেখানে কি হচ্ছে। একটা গারো মেয়েকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে কোনও পত্রিকার এক সম্পাদকের বাসা থেকে, হবিগঞ্জে বাড়ি মেয়েটার। এই যে শোষণের যে মাত্রা সেটা সর্বত্রই আছে।

এখন আসল কথায় আসি আমরা— সকল শিশুরই তার মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার আছে। কিন্তু এখানে বামপন্থীদের একটা শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের দেশের বড় সমস্যা কিন্তু বামপন্থীরা। তারা কিন্ত সমস্যাটা কি সেটাই জানে না। তাহলে তারা আন্দোলন করবে কিভাবে? প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কথা উঠছে, যদি বলা হয় যে প্রাথমিক শিক্ষা কাকে বলে? তারা বলবে ‘ক্লাস ফাইভ’ পর্যন্ত। এজন্য জাতিসংঘ তাদেরকে প্রতারিত করতে পারছে। ইউনিসেফের অধীনে যে স্কুল হচ্ছে—‘ইউসিইপি স্কুল’, ‘চিল্ড্রেন্স ইমার্জেন্সি স্কুল’, এগুলো কি? ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াবে। এগুলোর নাম ‘নন ফরমাল এডুকেশন’। বাংলাদেশে মাত্র চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়ে একটা শিশুকে শ্রমিকের কাজে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বলা হচ্ছে তার শিক্ষা সমাপ্ত হয়েছে। এমনটা ‘ব্র্যাক’ করতেছে, সরকার করতেছে, জাতিসংঘ করতেছে। কিন্তু কোনওদিন কোনও বামপন্থীকে এটা নিয়ে কথা বলতে শুনেছেন?

এখানে মূল চিন্তাটা হচ্ছে, কতটুকু পর্যন্ত শিক্ষা সমাপ্ত না হলে ‘প্রাথমিক শিক্ষা’ হয় না সেটা বোঝা। সেটা হলো, ১২ বছর লেখাপড়া না করলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হয় না। আমাদের দেশে যেটাকে ইন্টারমিডিয়েট বলে। অথবা, শিশুর বয়স ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত লেখাপড়াই প্রাথমিক শিক্ষা। এর যুক্তিটা আমি বহুবার বলেছি। কারণ ১৮ বছর না হলে আপনি তাকে প্রাপ্তবয়স্ক বলেন না, তিনি ভোট দিতে পারেন না, বিয়ে করতে পারেন না, এই বয়স না হলে পুরোপুরি ক্রিমিনাল লায়েবিলিটি হয় না। সুতরাং এই বয়স পর্যন্ত শিক্ষার ভার অভিভাবকের হাতে থাকে। এবং রাষ্ট্রকেই এই ভার নিতে হবে। এটাই হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। শিশুদেরকে সান্তনা দেওয়ার জন্য আমরা বলি, তুমি এখন নিম্নমাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিকে উঠেছো। সে তো আর ১২ বছর এক ক্লাসে থাকবে না। কিন্তু শিক্ষা পরিকল্পনাকারীদের চোখে এটা শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা। তারপর শুরু হবে পেশাগত শিক্ষা। শিক্ষা সংক্রান্ত আমাদের ধারণা সঠিক নয়। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা হলে ভুল বোঝাবুঝি হবে।

আমাদের উচিৎ হচ্ছে মাতৃভাষায় সম্পূর্ণ দক্ষ হওয়ার পর ইংরেজি ভাষা শিক্ষা দেওয়া। তাহলে শিশুরা ইংরেজি দ্রুত শিখতে পারতো। একটা বিদেশি ভাষা শিখতে সবচেয়ে বেশি লাগলে তিন বছর লাগে। তাহলে আমরা বিশ বছর নষ্ট করছি কেন? আপনার উপযুক্ত শিক্ষক নেই তো শিক্ষক তৈরি করেন, দেশের লোককে শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষিত করতে পারেন, বিদেশ থেকে আনতে হলে আনতে পারেন। ইংরেজি শিক্ষার বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিই যথেষ্ঠ। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি ছোঁয়ারই দরকার নাই।

সকাল সন্ধ্যা: এইপ্রাথমিক শিক্ষা কি মাতৃভাষায় হবে? মাতৃভাষার বাইরে ইংরেজি বা আন্তর্জাতিক ভাষা শিশুরা কখন শিখবে? এই বিষয়ে আরেকটু বিস্তারিত জানতে চাই।

সলিমুল্লাহ খান: এটা বোঝা দরকার প্রাথমিক শিক্ষা মানে, আমাদের এখনকার উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ মাতৃভাষায় হবে। এছাড়া সে যখন গণিত শিখবে, গণিত একটি ভাষা, মাতৃভাষায় গণিতের কথা বলিনা আমরা, ফলে সেটা শিখতে হবে। অনুরূপভাবে এখন আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি এখন আমাদের শিখতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে কখন ইংরেজি শেখা শুরু করব?

আমি উদাহরণ দিই, কোলকাতায় হিন্দু কলেজ যখন শুরু হলো, ১৮১৬ সনে। স্যার হাইড ইস্ট বলে একজন ব্রিটিশ বিচারপতির সভাপতিত্বে শুরু হয় এটা। এবং রাজা রাধাকান্ত দেব থেকে শুরু করে হিন্দু সমাজের বড় বড় লোকেরা, তারা আমার ভাষায় দুইটা অন্যায় করেছে। এক, এই কলেজের নাম তারা দিয়েছে—‘হিন্দু কলেজ’, একটা কলেজের নাম হিন্দু কলেজ হতে পারে না। দুই, হিন্দু ছাড়া আর কেউ সেখানে ভর্তি হতে পারবে না। আবার হিন্দু মানে শুধু মুসলমান বা অন্যদের বাদ দেওয়া নয়, নিম্ন বর্ণের হিন্দুদেরও তারা বাদ দিয়েছে। সব হিন্দুও না—ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ শুধু এই তিনটা বর্ণ ছাড়া আর কেউ ভর্তি হতে পারবে না। কিন্তু আরেকটা ভুল তারা করেনি—শিশুর অষ্টম বর্ষ হওয়া পর্যন্ত কোনও ইংরেজি শিক্ষা হবে না, শুধু বাংলায় শিক্ষা চলবে।

আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান ত্রুটি হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কোনও ভাষানীতি নেই। আমরা বলছি শিশুদের ইংরেজি শিখতে হবে ভালোভাবে। কিন্তু আমরা তো বিশ বছর ইংরেজি শিখেও ভালোমতো ইংরেজি জানিনা। আমাদের উচিৎ হচ্ছে মাতৃভাষায় সম্পূর্ণ দক্ষ হওয়ার পর ইংরেজি ভাষা শিক্ষা দেওয়া। তাহলে শিশুরা ইংরেজি দ্রুত শিখতে পারতো। একটা বিদেশি ভাষা শিখতে সবচেয়ে বেশি লাগলে তিন বছর লাগে। তাহলে আমরা বিশ বছর নষ্ট করছি কেন? আপনার উপযুক্ত শিক্ষক নেই তো শিক্ষক তৈরি করেন, দেশের লোককে শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষিত করতে পারেন, বিদেশ থেকে আনতে হলে আনতে পারেন। ইংরেজি শিক্ষার বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিই যথেষ্ঠ। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি ছোঁয়ারই দরকার নাই।

পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী সরকার এটা চেষ্টা করেছিল জ্যোতি বসুর আমলে। তাদের মুখে দুয়ো দিয়েছে সকলে যে এমন করা যাবে না। আপনি বাংলাদেশের দুরবস্থা বোঝার জন্য পশ্চিবঙ্গের দিকে তাকালেই ভালো হয়। বলে যে, দর্পণে নিজ মুখ দেখেন। পশ্চিমবঙ্গ আরও অধঃপতনে গেছে। হিন্দির আগ্রাসন থেকে বাঁচতে তারা বলছে যে ইংরেজিকে আঁকড়ে ধরতে হবে আমাদের। আমরা আগে যেমন উর্দুর আগ্রাসন নিয়ে একই কথা বলতাম।

এখন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা বলছি কি, বাংলাদেশে তো নামকাওয়াস্তে একটা দেশ। দেশ তো আসলে আমেরিকা, অবশ্য আমেরিকা বলে না, বলে দেশ তো গোটা পৃথিবী। সুতরাং পৃথিবীর ভাষা (অর্থাৎ আমেরিকার ভাষা) ইংরেজি শেখাতে হবে শিশুদের, খামোখা বাংলা শিখিয়ে সময় নষ্ট করবো কি কারণে?

আমার মুখের কথায় বিশ্বাস করার দরকার নাই। আপনি সাংবাদিক হিসেবে গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডিতে একটা সার্ভে চালিয়ে দেখেন বাড়িগুলোর নাম কী? দোকানপাটের নাম কী? এই যে কদিন আগে প্রথম আলোতে ফিচার দেখলাম—‘ধানমন্ডির এই বাড়িটি কি কেউ খেয়াল করেছেন’। বাড়িটার নাম—‘টাইগার ডেল’, আরেকটা বাড়ির নাম—‘টাইগারস ডেন’। সাবেক মিলিটারি অফিসারদের বাড়ি। একটা শিশু যখন গ্রাম থেকে শহরে আসবে অথবা শহরে চলাফেরা করবে সে তো রাস্তাঘাটে সাইনবোর্ড থেকে শিখবে, বাড়ির নাম থেকে শিখবে। সবগুলো বাড়ির নাম ইংরেজিতে, দোকানপাটের নাম ইংরেজিতে। তো এখান থেকে শিশুরা কী শিখবে? সবাই বাড়ির নাম ইংরেজিতে দেবে, আমাদের নেমপ্লেট আমরা ইংরেজিতে দেবো, আমি নিজেকে বাদ রেখে বলছি না, আমি নিজেও সেই পঙ্কে ডুবে আছি, তো এখানে আর কী হবে?

সকাল সন্ধ্যা: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সলিমুল্লাহ খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকারটি অডিও রেকর্ড থেকে শ্রুতিলিখনের মাধ্যমে প্রকাশিত। তাই এতে সাক্ষাৎকারদাতার ভাষারীতি অনুসরণ করা যায়নি। সাক্ষাৎকারদাতার মুখের কথা যতটা সম্ভব অবিকল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত